12/07/2026
ডাক্তার সাহেব, আমি বসে থাকতে পারি না। বসে থাকলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়, শরীরটাও যেন আরও ভারী লাগে। কোনো কাজে ব্যস্ত থাকলে বরং ভালো থাকি। কিন্তু একটু বেশি পরিশ্রম করলেই শরীর ভেঙে পড়ে। কোমর ব্যথা করে, কিডনির জায়গায় ভেতর থেকে ভোঁতা ব্যথা আর গরম লাগে। আর তলপেটটা, মনে হয় ভেতরের সবকিছু নিচের দিকে টেনে নামছে। কখনো পেটটা হাত দিয়ে ধরে রাখলে একটু স্বস্তি পাই।
কথাগুলো বলছিলেন পঁচিশ বছর বয়সী এক সুদর্শনা রমণী। বয়সের স্বাভাবিক তারুণ্য তখনও তাঁর মুখে অম্লান। পরিপাটি অবয়ব, শান্ত চোখ, সংযত সৌন্দর্য এবং কথাবার্তায় এক ধরনের সহজ আভিজাত্য। প্রথম দর্শনে তাঁকে অসুস্থ বলে মনে হওয়ার বিশেষ কারণ নেই। অথচ সেই সুন্দর মুখের প্রশান্ত আবরণের নিচে জমে ছিল এক দীর্ঘ ক্লান্তির ইতিহাস। যেন শরীরের ভার ধীরে ধীরে এসে তাঁর মনের আলোতেও ছায়া ফেলেছে।
রমণী আরও বলেন, ডাক্তার সাহেব, আমার কষ্টটা শুধু ব্যথা নয়। মনে হয় পুরো শরীরটাই ভারী হয়ে গেছে। কোথাও ভোঁতা ব্যথা, কোথাও টনটনে যন্ত্রণা, কোথাও জ্বালাপোড়া। বিশেষ করে কোমর, পিঠ, পেশি আর কিডনির জায়গায়। কখনো দুই কাঁধের পাতার মাঝখানেও ব্যথা হয়। উরুর বাইরের দিকটাও ব্যথা করে। খুব ক্লান্ত হয়ে গেলে শরীরের ভেতর কেমন গরম গরম লাগে।
তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় তলপেটে।
মনে হয় পেলভিসের ভেতরে একটি অদৃশ্য ভার ঝুলছে। সবকিছু যেন নিচের দিকে টেনে নামছে। কখনো মনে হয় জরায়ুটাই বুঝি নেমে আসছে। ঝুঁকে কাজ করলে কষ্ট বাড়ে। শরীরে আঁটসাঁট কাপড়ের চাপও ভালো লাগে না। তখন পেটটা দুই হাত দিয়ে ধরে রাখলে একটু আরাম পাই। যেন নিজের হাত দিয়েই ভেতরের ভারটাকে সামলে রাখছি।
কখনো জরায়ুর জায়গাটা ভারী, ব্যথাযুক্ত এবং স্পর্শকাতর লাগে। স্রাবও সবসময় স্বাভাবিক থাকে না। কখনো দুর্গন্ধযুক্ত, কখনো দলাযুক্ত বা দইয়ের মতো। বহিঃজননাঙ্গে চুলকানি, জ্বালা বা প্রদাহও হতে পারে। কখনো স্তন ফুলে ব্যথা করে, স্তনবৃন্ত এতটাই স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে যে সামান্য স্পর্শও বিরক্তিকর লাগে।
এরপর কিছুটা নীরব হয়ে তিনি বললেন, আমার কষ্ট শুধু জরায়ুতে নয় ডাক্তার সাহেব। কিডনির জায়গাতেও ভেতর থেকে ভোঁতা ব্যথা আর উত্তাপ অনুভব করি। কখনো প্রস্রাবের পরিমাণও বেশি মনে হয়। শরীরটা এমনভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যেন সামান্য পরিশ্রমও আমার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করে দেয়।
গর্ভাবস্থা, প্রসব অথবা গর্ভপাতের পর এমন গভীর অবসাদ আরও প্রকট হতে পারে। পরিশ্রমে কষ্ট বাড়ে। ঝুঁকে থাকলে বাড়ে। গর্ভাবস্থায় বাড়তে পারে। এমনকি কাপড়ের চাপও অসহ্য মনে হতে পারে।
তারপর কথার সুর বদলে গেল।
তিনি বললেন, শরীরের কষ্ট যতটা, মনের কষ্টও কখনো তার চেয়ে কম নয়। মাঝে মাঝে মনটা এত গভীরভাবে খারাপ হয়ে যায় যে কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। বিরক্ত লাগে। একা থাকতে চাই। মনে হয় একটি অদৃশ্য অন্ধকার আমাকে ঘিরে আছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় জানেন ডাক্তার সাহেব।
আমি যখন কোনো কাজে ব্যস্ত থাকি, তখন ভালো থাকি।
কোনো দায়িত্বে ডুবে গেলে, মন অন্যদিকে চলে গেলে, নিজের কষ্ট নিয়ে ভাবার সময় না থাকলে যেন সেই অন্ধকার কিছুটা সরে যায়। অথচ কাজ থেমে গেলেই আবার শরীরের সমস্ত ভার এবং মনের সমস্ত বিষণ্নতা ফিরে আসে।
কখনো মাথার একেবারে ওপরের দিকে উত্তাপ অথবা ওপরের দিকে চাপের মতো অনুভূতি হয়। মুখে ছোট ক্ষত হতে পারে। রক্তস্বল্পতা থাকলে ক্লান্তি যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে।
তাঁর সমস্ত কথা শুনতে শুনতে একটি শব্দ যেন বারবার ফিরে আসে।
Heavy।
ভারী শরীর। ভারী পেলভিস। ভারী জরায়ু। ভারী মন।
আর সেই ভারের সঙ্গে থাকে dragging। এক অদৃশ্য নিম্নমুখী টান। যেন শরীরের ভেতরের সবকিছু ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে যেতে চাইছে।
এই রমণীর চরিত্রে তাই শুধু একটি জরায়ুর অভিযোগ নেই। এখানে Female organs, Kidneys, Mind এবং Muscles একই গভীর exhaustion এর ভাষায় কথা বলে।
একদিকে Deep gloom।
অন্যদিকে If busy, better।
একদিকে Heavy dragging in pelvis।
অন্যদিকে Holding abdomen, better।
একদিকে Fatigue এ অবনতি।
অন্যদিকে Diversion এ সাময়িক স্বস্তি।
এমন এক নারী, যিনি বিশ্রামের নীরবতায় নিজের ক্লান্তিকে আরও গভীরভাবে অনুভব করেন, অথচ ব্যস্ততার মধ্যে সাময়িকভাবে নিজেকে ফিরে পান।
এবার যেন বহু আগে লেখা Materia Medica এর একটি পৃষ্ঠা ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
এই চরিত্রটি আমাদের সামনে এঁকেছিলেন সি এম বোগার।
তিনি একে বলেছিলেন Unduly exhausted females। অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে গভীর ক্লান্তিতে অবসন্ন নারী।
তাঁর ভাষায় Helonias dioica এর প্রধান Sphere of action হলো Female organs, Kidneys, Mind এবং Muscles। তিনি এর যন্ত্রণার ভাষা লিখেছিলেন Heavy, sore, aching, burning। মনের গভীরে দেখেছিলেন Deep gloom। পেলভিসে দেখেছিলেন Heavy dragging। কিডনির অঞ্চলে Dull ache and heat। জরায়ুকে বর্ণনা করেছিলেন Heavy, sore, tender, ulcerated or pr*****ed womb হিসেবে।
আর এই গভীর ক্লান্ত চরিত্রটির সবচেয়ে সূক্ষ্ম বৈপরীত্যটিও বোগার আমাদের দেখিয়ে গেছেন।
If busy, better।
Diversion, better।
Holding abdomen, better।
অন্যদিকে Fatigue, Labor, Abortion, Stooping, Pregnancy এবং Pressure of clothes এ aggravation।
বোগার Helonias dioica কে Senecio, Sepia এবং Trillium এর সঙ্গে related হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে related remedy কখনো একই remedy নয়। রোগীর individuality, generals, modalities, mental state এবং সম্পূর্ণ symptom totality বিচার করেই সাদৃশ্য নির্ণয় করতে হয়।
শেষ পর্যন্ত সেই পঁচিশ বছরের রমণীর সমস্ত দীর্ঘ কথার সারাংশ যেন একটি ছোট বাক্যে এসে থামে।
ডাক্তার সাহেব, শরীরটা খুব ক্লান্ত। ভেতরের সবকিছু যেন নিচের দিকে টেনে ধরে। মনটাও অন্ধকার হয়ে আসে। কিন্তু আমাকে কোনো কাজে ব্যস্ত রাখুন। কাজের মধ্যে থাকলে আমি যেন কিছুক্ষণের জন্য আবার নিজেকে ফিরে পাই।
সেখানেই বোগারের Helonias dioica আর বইয়ের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন লক্ষণ হয়ে থাকে না।
সে একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র হয়ে ওঠে।
এই আলোচনা Materia Medica ভিত্তিক শিক্ষামূলক উপস্থাপনা। অস্বাভাবিক রক্তপাত, গর্ভাবস্থায় ফোলা বা কিডনি সমস্যা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা সুগার, তীব্র পেলভিক ব্যথা বা জরায়ু prolapse এর ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয় জরুরি। Helonias dioica রোগের নামের ভিত্তিতে নয়, রোগীর সম্পূর্ণ উপসর্গচিত্রের সঙ্গে সাদৃশ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের বিবেচনায় আসতে পারে।
ধন্যবাদ।
মুহাম্মদ সালিম আহমাদ সাদী
ডিএইচএমএস, নরসিংদী- ঢাকা
তা:- ১২.৭.২৬