23/05/2026
কিন্তু আমি বলি, এই উদর এবং জিব্বার উপর নির্ভর না করিয়া বুদ্ধি এবং দৃষ্টিশক্তির সাহায্যে লইয়া কাটা গাছগুলো বাছিয়া ফেলিয়া, সেই অমৃতলতাটির সন্ধান করিলে কি কাজটা অপেক্ষাকৃত সহজ এবং মানুষের মতো দেখিতে হয় না ?
ভগবান মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন কি জন্য? সে কি শুধু আরেকজনের লেখা শাস্ত্রীয় শ্লোক মুখস্ত করিবার জন্য? এবং একজন তাহার কি টীকা করিয়াছেন এবং আরেকজন সেই টীকার কি অর্থ করিয়াছেন ---তাহাই বুঝিবার জন্য ? বুদ্ধির আর কি কোন স্বাধীন কাজ নাই ? কিন্তু বুদ্ধির কথা তুলিলেই পণ্ডিতরা লাফাইয়া উঠেন, ক্রুদ্ধ হইয়া বারংবার চিৎকার করিতে থাকেন, শাস্ত্রের মধ্যে বুদ্ধি খাটাইবে কোনখানে? এ যে শাস্ত্র ! তাহাদের বিশ্বাস,শাস্ত্রীয় বিচার শুধু শাস্ত্র কথার লড়াই ! তাহার হেতু, কারণ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সত্য, মিথ্যা এ সকল নিরূপণ করা নয় ! শাস্ত্র ব্যবসায়ীরা কতকাল হইতেছে যে এই রূপ অবনত হীন হইয়া পরিয়াছেন, তাহা জানিবার উপায় নাই , -----কিন্তু এখন তাহাদের একমাত্র ধারণা যে, ব্রহ্মপুরাণের কুস্তির প্যাঁচ বায়ু পুরান দিয়ে খষাইতে হইবে। আর পরাশরের লাঠির মার হারিতের লাঠিতে ঠেকাইতে হইবে । আর কোন পথ নাই ! সুতরাং যে ব্যক্তি এই কাজটা যত ভাল পারেন, তিনি তত বড় পন্ডিত ! শিক্ষিত ভদ্র ব্যক্তির স্বাভাবিক বুদ্ধির কোন স্থানই নাই ! কারণ সে শ্লোক এবং ভাষ্য মুখস্ত করে নাই !
অতএব হে শিক্ষিত ভদ্র ব্যক্তি! তুমি শুধু তোমাদের সমাজের নিরপেক্ষ দর্শকের মত মিটমিট করিয়া চাহিয়া থাক, এবং শাস্ত্রীয় বিচারের আসরে স্মৃতিরত্ন আর তর্করত্ন কণ্ঠস্হ শ্লোকের গদকা ভাজিয়া যখন আসর গরম করিয়া তুলিবেন, তখন হাততালি দাও !
কিন্তু তামাশা এই যে, জিজ্ঞাসা করিলে এসব পণ্ডিতেরা বলিতেও পারিবেন না, ---কেন তাহারা ও-রকম উন্মত্তের মতো ওই যন্ত্রটা ঘুরাইয়া ফিরিতেছেন এবং কি তাদের উদ্দেশ্য এবং কেনইবা এই আচারটা ভালোবাসিতেছেন এবং কেনই বা এটার বিরুদ্ধে এমন বাঁকিয়া বসিতেছেন ?
যদি প্রশ্ন করা যায়, তখনকার দিনে যে উদ্দেশ্য বা যে দুঃখের নিষ্কৃতি দেওয়ার জন্য অমুক বিধি নিষেধ প্রবর্তিত হইয়াছিল, ---এখনো কি তাই আছে ; ইহাতেই দিয়ে কি মঙ্গল হইবে ? প্রতুত্তরে স্মৃতিরত্ন তাহার গদকা বাহির করিয়া তোমার সম্মুখে ঘুরাইতে থাকিবেন, যতক্ষণ না তুমি ভীত ও হতাশ হইয়া চলিয়া যাও ! ....... বস্তুতঃ এই সত্য ও স্বাধীন বিচার হইতে ভ্রষ্ট হইয়াই হিন্দুর শাস্ত্ররাশি এমন অধঃপতিত হইয়াছে । নিছক নিজের বা দলটির সুবিধার জন্য কত যে রাশি রাশি মিথ্যা উপন্যাস রচিত এবং অনুপ্রবিষ্ট হইয়া হিন্দুর শাস্ত্র সমাজকে ভারাক্রান্ত করিয়াছে, কত অসত্যের বেনামীতে প্রাচীনতার ছাপ মাখিয়া ভগবানের অনুশাসন বলিয়া প্রতিষ্ঠা করিয়াছে, তাহার সীমা পরিসীমা নাই ! ..... অতএব শুধু প্রাচীনত্বই কোন বস্তুর ভাল-মন্দর সাফাই নয় ! ...... এই ভারতেই একদিন ছিল যখন এই চন্দ্র এবং সূর্যের বিবাহ ব্যাপারটা খাঁটি সত্য ঘটনা বলিয়া গ্রহণ করিতে মানুষ ইতস্তত করে নাই ! আবার আজ যাকে সত্য বলিয়া আমরা অসংশয়ে বিশ্বাস করিতেছি, তাহাকেই হয়ত আমাদের বংশধরেরা রূপক বলিয়া উড়াইয়া দিবে ।...এ সকল প্রবন্ধ ও মতামতের যে প্রতিবাদ করা আবশ্যক সেই কথা অবশ্য কেউই বলিবেন না । আমিও একেবারেই বলিতাম না, যদি না ইহা আমার প্রবন্ধের ভূমিকা হিসেবেও কাজে লাগিত । তথাপি প্রতিবাদ করিতে আমি চাহি না, ---কিন্তু ইহারই মত বড় কাতর কণ্ঠে ডাকিতে চাহি, ---ভগবান এই সমস্ত শ্লোক আওড়ানোর হাত হইতে এই হতভাগ্য দেশকে রেহাই দাও ! ঢের প্রায়শ্চিত্ত করাইয়া লইয়াছ, এবার একটু নিষ্কৃতি দাও ।
(ভারতবর্ষ, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩২৩)
(সমাজ-ধর্মের মূল্য)------ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়