18/12/2025
#স্তন্যপায়ীরা চোষে ... দুধ 💞
তিনি ভেবেছিলেন তিনি গবেষণা করছেন দুধ নিয়ে।
কিন্তু গবেষণায় যা পেলেন, চাঞ্চল্যকর!
২০০৮ সাল। ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রাইমেট রিসার্চ ল্যাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেটি হিন্দে, অভিভূত চোখে তাকিয়ে, তার প্রাপ্ত উপাত্তগুলোর দিকে। যে-উপাত্ত তার প্রত্যাশিত স্বাভাবিক রেজাল্ট প্রদর্শন করছে না। যা দেখাচ্ছে— অকল্পনীয়!
তিনি বিশ্লেষণ করছিলেন মাতৃদুগ্ধ, রিসাস ম্যাকাক প্রজাতির বানর-মায়েদের— শয়ে-শয়ে নমুনার হাজারে-হাজার সংখ্যা নিয়ে। এবং এমন একটি রেজাল্ট-প্যাটার্ন বেরিয়ে এলো, যা এযাবৎকালের বিজ্ঞানের নীতিগুলোকে অর্থহীন করে দিয়েছে!
পুত্রসন্তানের মায়েরা যে দুগ্ধ উৎপন্ন করছেন, তা ফ্যাট ও প্রোটিনে তুলনামূলক অধিক সমৃদ্ধ।
কন্যাসন্তানের মায়েরা যে দুগ্ধ উৎপন্ন করছেন, তা পরিমাণে তুলনামূলকভাবে খুবই বেশি ও এর nutrient অনুপাতও ভিন্ন।
এটি হুট করে প্রাপ্ত রেজাল্ট নয়।
এটি বারেবার নীরিক্ষা শেষে প্রাপ্ত রেজাল্ট।
বিজ্ঞানভিত্তিক ফলাফল।
কেটির সহকর্মীরা এই রেজাল্টকে উড়িয়ে দিলো—
মাপঝোঁকের ভুল।
যন্ত্রপাতির অসহযোগিতা।
কো-ইন্সিডেন্স।
কিন্তু কেটি আস্থা রাখলেন সংখ্যাগুলোয়।
এবং ওগুলো দিচ্ছিলো চরম কিছু বার্তা:
দুধ কেবলমাত্র খাবার নয়।
এ প্রকৃতপক্ষে তথ্যভাণ্ডার।
বিজ্ঞান, দশকের পর দশক ধরে, মাতৃদুগ্ধকে প্যাট্রোলের মতো পর্যালোচনা করে এসছে— ক্যালরি প্রবেশ করবে, দৈহিক গঠন তৈরি হবে। সিম্পল জ্বালানি। কিন্তু সেটিই যদি সত্য হয়, তাহলে কেন এ পরিবর্তিত হয়ে যায় সন্তানের লিঙ্গ-পার্থক্যের ভিত্তিতে?
কেটি আরও গভীরে গেলেন।
তিনি, ২৫০-এর বেশি মায়ের দুগ্ধ, ৭০০'র বেশি স্যাম্পলিং ইভেন্ট থেকে, অ্যানালাইজ করলেন। এবং ঘটনা আরও ঘনীভূত হলো।
প্রথমবারে, অল্পবয়সী মায়েরা দুগ্ধ উৎপাদন করেন তুলনামূলক কম ক্যালরি-যুক্ত— কিন্তু তাতে মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন কর্টিসলের পরিমাণ অনেক বেশি। যে-শিশুরা এই দুগ্ধ পান করেছে, তারা দ্রুত বেড়েছে; এবং তারা হয়ে উঠেছে তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক-ভাবাপন্ন, বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, কম আত্মবিশ্বাসী।
এই দুগ্ধ কেবলমাত্র দেহ গঠন করেনি, একইসাথে তৈরি করেছে মেজাজ বা আচরণ।
এরপরই এলো সেই আবিষ্কারটি, যা স্তব্ধ করে দিয়েছে এমনকি সংশয়বাদীদেরকেও।
যখন শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করে, ওসময় তার মুখ থেকে অল্প পরিমাণ লালা মাতৃস্তনবৃন্তের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্তন-টিস্যুতে প্রবেশ করে। ওই লালায় থাকে শিশুটির রোগপ্রতিরোধ-ক্ষমতা সম্পর্কিত সাঙ্কেতিক কোড।
শিশু অসুস্থ কিনা, মায়ের দেহ তা বুঝতে পারে এভাবেই।
অসুস্থতার সঙ্কেত পেলেই, ঘণ্টার কয়েকের মধ্যেই তাঁর দুগ্ধ পরিবর্তিত হয়ে যায়:
দুগ্ধে—
শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বেড়ে যায়,
ম্যাক্রোফেজ বা ভক্ষক-কোষ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়,
প্রয়োজনমাফিক নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি-সমূহের আবির্ভাব ঘটে।
তারপর যখন শিশু সেরে ওঠে, দুগ্ধের অবস্থা পূর্বের স্বাভাবিকতায় ফিরে যায়।
এটা কাকতাল নয়।
এটা— সন্তান-জননীর মধ্যকার নিয়মিত খোঁজ, 'ডাক ও সাড়া'— 'কল এন্ড রেসপন্স'।
শিশুর থুতু মাকে জানায় তার অসুস্থতার কথা। মায়ের দেহ তৈরি করে দেয় সেই অসুস্থতার ঠিক-ঠিক ওষুধটি।
একটা জৈবিক কথোপকথন— প্রাচীন, নির্ভুল, শতশত বছর ধরে যা বিজ্ঞানের কাছে অধরা ছিল।
২০১১ সালে, কেটি যোগ দিলেন হার্ভার্ডে। ওখানে তিনি বিস্তৃতভাবে গবেষণার ক্ষেত্র দেখেন। কিন্তু ওখানকার অমন সুবিধাজনক পরিবেশেও এতোদিন যা গবেষণা হয়ে আসছিলো, তা রীতিমতো অস্বস্তিকর! তিনি দেখলেন, ওখানে মাতৃদুগ্ধের গঠন নিয়ে যতোটা গবেষণা হয়েছে, তার দ্বিগুণের বেশি গবেষণা হয়েছে পুরুষের লিঙ্গোত্থান-সমস্যা নিয়ে!
জগতের প্রত্যেকটা শিশু তার যে-আহারটি জীবনের শুরুতেই গ্রহণ করে সর্বপ্রথমেই— যে-উপাদানেই তৈরি হয় জগৎ, জগতের সমস্ত প্রজাতি ও প্রজাতিদের ভবিষ্যৎ— তা লক্ষ্যণীয়ভাবে অবহেলিত হয়ে আছে!
কেটি সাহসী পদক্ষেপটা নিলেন।
তিনি একটি ব্লগ লিখা আরম্ভ করলেন, ইচ্ছাকৃতভাবেই এর একটি উত্তেজক নাম দিয়ে: 'স্তন্যপায়ীরা চোষে... দুধ।'
একবছরের মধ্যেই, ব্লগটার পাঠকসংখ্যা দশ লাখ ছাড়িয়ে গেলো। বাবামা, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী। সবাই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলেন, যেসব প্রশ্ন গবেষণা এড়িয়ে গিয়েছিলো।
এবং, একের পর এক আবিষ্কার হতে লাগলো:
• দিনের বেলার পরিবর্তনের সাথেসাথে দুগ্ধও পরিবর্তিত হয় (সকালবেলার মাঝামাঝি সময়ে এতে ফ্যাট-এর পরিমাণ সর্বোচ্চ থাকে)।
• শুরুর-দিকের দুগ্ধের উপাদান শেষের-দিকের দুগ্ধের উপাদান থেকে আলাদা (দীর্ঘসময় ধরে স্তন্যপান করালে শিশু ঘন দুধ পায়)।
• মানুষের দুগ্ধে ২০০'র বেশি শর্করা-অণু বা অলিগোস্যাকারাইড থাকে, যা শিশু হজম করতে পারে না— কারণ এগুলোর কাজ হচ্ছে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে খাওয়ায়।
• প্রত্যেক মায়ের দুধ আলাদা, আঙুলের ছাপের মতোই অনন্য।
২০১৭ সালে, কেটি তার আবিষ্কার নিয়ে এলেন বৈশ্বিক-মঞ্চ টিইডি'তে। লক্ষ-লক্ষ মানুষ দেখলো।
২০২০ সালে, তার আবিষ্কারকে বিশ্বের সামনে বিস্তারিতভাবে উত্থাপন করলেন তিনি, 'নেটফ্লিক্স বেবিজ' অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
অবশেষে, বর্তমানে, অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি'র 'কম্পারেটিভ ল্যাকটেশন ল্যাব'-এ, ড. কেটি হিন্দে মাতৃদুগ্ধ কীভাবে মানবজীবনের প্রথম প্রহরটি থেকেই মানুষের জীবনকে প্রভাবিত ও বিকশিত করে তা নিয়ে বিভিন্ন করে চলেছেন বিভিন্ন যুগান্তকারী আবিষ্কার— যা বিশ্বব্যাপী মা ও শিশুদের এনআইসিইউ পরিষেবাকে, চিকিৎসাপদ্ধতিকে, এবং জনস্বাস্থ্য নীতিকে নতুন করে সাজাচ্ছে।
মাতৃদুগ্ধ— যে-আহার ২০০ মিলিয়ন বছর ধরে বিকশিত হয়ে আসছে পৃথিবীতে, পৃথিবীর মাটিতে ডাইনোসর হাঁটারও আগে থেকে।
বিজ্ঞান যাকে 'সাধারণ পুষ্টি' বলে খারিজ করে দিয়েছিলো, সেটা প্রকৃতপক্ষে জীববিজ্ঞানের উপহার দেওয়া সবচেয়ে উন্নত ও গুরুত্ববহ যোগাযোগ-ব্যবস্থাগুলোর একটি।
কেটি হিন্দে শুধুমাত্র গবেষণা করেননি মাতৃদুগ্ধ নিয়ে, তিনি আবিষ্কার করে দিয়েছেন যে— জগতের প্রাচীনতম পুষ্টিকর উপাদানটিই হচ্ছে জগতের সর্বাধিক জ্ঞানদায়িনী উপাদান। মাতৃদুগ্ধ হচ্ছে— দু'টি দেহের মধ্যে জ্যান্ত, সদাজাগ্রত, পারস্পরিক কথোপকথন; যা মানুষের ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেয় মানুষ এমনকি কথা বলতে শেখার আগেই।
এইসবই সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র একজন বিজ্ঞানী এ মানতে রাজি হননি বলে, যে— তার গল্পের অর্ধেকই মাপঝোঁকের ভুল।
মাঝেমাঝে, বৃহত্তম বিপ্লবটা আরম্ভ হয়— অন্যরা যাকে পাত্তা দেয় না সেটাকে তীব্র মনোযোগে শোনার মধ্য দিয়ে।
Salah Uddin Ahmed Jewel
#মাদুগ্ধপ্রাণ, ১৭.১২.২০২৫ খৃষ্টাব্দ