03/06/2026
সবুজ ওড়না গায়ে সাত বছরের ফাতেমা যখন হাসে, মনে হয় পুরো পৃথিবী আলো হয়ে গেছে। সেই হাসিমুখটা একদিন খান জাহান আলী মাজারের দিঘিতে নেমেছিল গোসল করতে। মা ভেবেছিল পুণ্যের পানি। কিন্তু দিঘির নিচে অপেক্ষা করছিল একটা কুমির। কয়েক সেকেন্ডে সব শেষ। নয় ঘণ্টা পর ভেসে উঠল শুধু একটা নিথর শরীর। ফাতেমার হাসিটা কুমির খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু ওকে কবর দিয়েছে আমাদের অন্ধ বিশ্বাস আর কিছু মানুষের লোভ।
এই কুমিরের গল্পটা নতুন না। পনেরো শতকে খান জাহান আলী যখন বাগেরহাটে আসেন, তখন এই অঞ্চল ছিল জঙ্গল আর জলাভূমি। কথিত আছে, তিনি ইরান থেকে দুইটা কুমির আনেন। নাম ছিল কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড়। লোককথা বলে, এই কুমির দুইটা তাঁর আদেশ মানত। মানুষের ক্ষতি করত না। সেই থেকে শুরু। শত শত বছর ধরে মানুষ বিশ্বাস করে আসছে, দিঘির কুমির খান জাহান আলীর পালিত। এগুলো কামিল। এগুলোকে খাওয়ালে মনের বাসনা পূর্ণ হয়।
ইরান থেকে কুমির আসা প্রাণীবিজ্ঞানের হিসাবে প্রায় অসম্ভব। মরু অঞ্চলে কুমিরের প্রজাতি নেই। আর যদিও পনেরো শতকে দুইটা কুমির আনা হয়, সেই কুমির পাঁচশ বছর বাঁচে না। কুমিরের গড় আয়ু ৭০ থেকে ১০০ বছর। তার মানে দিঘির বর্তমান কুমিরগুলো সেই আমলের না। এগুলো পরে আনা হয়েছে। লোককথাকে ব্যবসা বানানোর জন্য বারবার নতুন কুমির ছাড়া হয়েছে। ইতিহাসের নামে গল্প বিক্রি হচ্ছে, আর গল্পের নামে চলছে মানতের বাণিজ্য।
দ্বিতীয় ছবিটা দেখো। সবুজ প্যান্ট পরা মেহেদী হাসান কুমিরের গায়ে হাত দিয়ে বসে আছে। লোকমুখে শোনা যায়, সে-ই মাজারের কুমিরের খাবারের দেখভাল করে। আমরা হাঁস মুরগি ছাগল মানত করি। চোখের পানি ফেলে বলি, আল্লাহ কবুল করো। ভাবি কুমির খাবে আর আমাদের দুঃখ ঘুচবে। অথচ কুমিরের মুখ পর্যন্ত কয়টা পৌঁছায়। বেশিরভাগ মানত ঘাটেই বিক্রি হয়ে যায়। মেহেদীদের পেটে যায়, পকেটে যায়। কুমিরের নামে ভয় দেখিয়ে আমাদের পকেট কাটাই তাদের ব্যবসা। ইতিহাসের কালাপাহাড় ধলাপাহাড় এখন মেহেদীদের এটিএম মেশিন।
তৃতীয় ছবিতে একজন দাড়িওয়ালা মানুষ (জামাল যথাসম্ভব খাদেম) ছাগল নিয়ে পানিতে দাঁড়ানো। এটা পুণ্যের নাটক। ক্যামেরা অন হবে, ছাগল পানিতে নামবে, ফেসবুকে ভাইরাল হবে। ক্যাপশন থাকবে, দেখুন কামিল কুমির কীভাবে মানত খায়। অথচ ভিডিও শেষ হলেই ঘাটের লোকেরা ছাগলটা টেনে তোলে। পরদিন হাটে আবার বিক্রি হয়। একটা ছাগল দশবার বিক্রি হয়। আর আমরা দশবার ঠকি। বিশ্বাসের দামে কেনা হয় প্রতারণা। খান জাহান আলী যে ইসলাম প্রচার করতে এসেছিলেন, সেই ইসলামে প্রতারণার কোনো জায়গা ছিল না।
চতুর্থ ছবিটা বুকের ভেতর কাঁপুনি ধরায়। দুইটা লোকআনে মেহেদি আরেকটা ছেলেকে জোর করে পানিতে নামাচ্ছে। কুমির ছোঁয়াবে। কারণ তাদের শেখানো হয়েছে এই কুমির সাধারণ না, এই কুমির পবিত্র। মানুষ মা*রলেও পবিত্র। এই বিশ্বাসটা কে ঢুকিয়েছে ওদের মাথায়। যারা বছরের পর বছর ধরে কুমিরকে অলৌকিক বানিয়ে টাকা কামাচ্ছে, তারাই। মৃ*ত্যুকে যারা তামাশা বানায়, তাদের হাতে আমরা আমাদের সন্তানদের বিশ্বাস তুলে দিয়েছি। বিজ্ঞান বলে কুমির একটি শিকারী প্রাণী। তার ধর্ম শিকার করা। পবিত্র বা অপবিত্র বলতে সে কিছু বোঝে না। খিদে পেলে সে মানুষ খাবে। এটাই প্রকৃতি। এই প্রকৃতিকে অস্বীকার করাই হলো সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি।
এই গল্প শুধু বাগেরহাটের না। এটা পুরো বাংলাদেশের ছবি। বায়েজিদ বোস্তামিতে কচ্ছপকে খাওয়ালে মনের আশা পূর্ণ হয়। সিলেটে গজার মাছকে পীরের মাছ বলে মানত চলে। গোলাপ শাহ মাজারে গাঁ'জা'র ধোঁয়ার সাথে উড়ে টাকা। চট্টগ্রামে মোমবাতির আলোয় কোটি টাকার বাণিজ্য। সব জায়গায় একটাই সূত্র। একটা দিঘি বানাও, একটা প্রাণী ছাড়ো, একটা গল্প বানাও। তারপর মানুষের ভয় আর লোভকে পুঁজি করে আজীবন খাও।
চিড়িয়াখানায় বাঘ রাখা হয় বিশ ফুট উঁচু খাঁচায়। কারণ সবাই জানে বাঘের ধর্ম মানুষ খাওয়া। কিন্তু মাজারের দিঘিতে কুমির থাকে একদম খোলা। কারণ এখানে মানুষের জীবনের চেয়ে মানতের টাকার ওজন বেশি। মেহেদী হাসানরা জানে, কুমির থাকলেই ভয় থাকবে। ভয় থাকলেই মানুষ টাকা দেবে। তাই দিঘিতে বেড়া উঠবে না, সিসিটিভি বসবে না। একটা সাইনবোর্ডে লেখা থাকবে সাবধান। ব্যস দায়িত্ব শেষ। আসলে ওটা সাবধানবাণী না, ওটা ব্যবসার লাইসেন্স।
ফাতেমার মা এখন কোন দিঘিতে চোখের পানি ফেলবে। কোন কুমির ফেরত দেবে তার মেয়ের হাসি। আমরা পারব না। কিন্তু আমরা চাইলে পরের ফাতেমাকে বাঁচাতে পারি। তার জন্য চারটা কাজ করতে হবে।
প্রথম, ফাতেমার মৃ*ত্যুর বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাই। খোলা দিঘিতে কুমির রেখে মানুষ মা*রার দায় যাদের, তাদের শাস্তি চাই। এটা দুর্ঘটনা না, এটা খু*ন।
দ্বিতীয়, মানতের নামে যে কোটি টাকা ওঠে তার হিসাব চাই। মেহেদী হাসানদের মতো যারা খাদ্য বণ্টনের নামে খায় আর বিক্রি করে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। গত বিশ বছরের অডিট চাই।
তৃতীয়, খান জাহান আলীর দিঘি থেকে কুমির এখনই সরাতে হবে। সুন্দরবন বা সরকারি চিড়িয়াখানায় পাঠাও। ধর্মের নামে খোলা জায়গায় কোনো হিংস্র প্রাণী থাকতে পারবে না। মানুষের জীবন পুণ্যের চেয়ে দামি। খান জাহান আলী মানুষ বাঁচাতে এসেছিলেন, মা*রতে না।
চতুর্থ, দেশের সব মাজারে সরকারি নজরদারি চাই। প্রাণী দিয়ে মানত, তাবিজ বাণিজ্য, অলৌকিক গল্প বেচা বন্ধ করতে হবে। ধর্ম থাকবে মানুষের মুক্তির জন্য। প্রতারণার হাতিয়ার হওয়ার জন্য না।
ফাতেমার সবুজ ওড়নাটা এখনো হয়তো কোনো ঘরে ভাঁজ করে রাখা আছে। ওর মা রোজ রাতে ওড়নাটা বুকে চেপে ঘুমায়। আমরা চাইলে এই কান্নাটা শেষ কান্না হতে পারে। আর যদি চুপ থাকি, কাল আমার আপনার ঘরের হাসিটাও চার ভাগ হয়ে ফেসবুকে ঘুরবে। তখন আমরা শুধু কমেন্টে লিখব ইন্নালিল্লাহ।
আহা বলার সময় শেষ। এবার আওয়াজ তোলার সময়। ফাতেমার জন্য না, আগামীকালের সব ফাতেমার জন্য।