07/06/2026
কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি নিয়ে ভূল ধারণা আর যে সমস্যাগুলো দেখা যায় তার কিছু অংশ তুলে ধরাটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি (পার্ট-১)
১. অনেকের প্রশ্ন থাকে, সাইকিয়াট্রিস্ট বা ডাক্তার যদি রোগ নির্ণয় করতে/ওষুধ লিখতে বেশি সময় না নেন, তাহলে সাইকোলজিস্টের কাছে এতো সময় দিতে হয় কেন বা এত বার আসতে হয় কেন?
উত্তরটা হলো, সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ যে ওষুধ দেন তা কেবল শারীরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করে। কিন্তু মানসিক রোগের বড় একটা অংশ থেকে যায় রোগ সম্পর্কৃত আচরণ, চিন্তা, আবেগ, সমস্যা, ট্রমা ইত্যাদির মধ্যে৷ মানুষ মূলত গাছের মতোন, আপনার মূল শিকর অব্দি কাজ করা না হলে, সমস্যা বার বার ফিরবে। তাই শুধু ওষুধ দিয়ে ডালপালা ছাটায় করে আপনি কখনো মূল রোগ/সমস্যা থেকে বের হতে পারবেন না। আর এই চিন্তা, আবেগ, দ্রুত পরিবর্তনশীল নয়। যার দরুন সাইকোথেরাপিতে অনেক সময় লাগে।
তার উপর তাড়াহুড়ো করে কোনো একটা নির্দিষ্ট রোগেই ফেলতে হবে বিষয়টি সঠিক নয়৷ মানুষের জীবণে এমন কিছু সমস্যা থাকতে পারে যা হয়তো হালকা কিছু লক্ষণ হিসেবে আছে, পুরোপুরি কোনো স্পেশিফিক রোগের বৈশিষ্ট্য নয় অর্থাৎ পুরোপুরি একটা নির্দিষ্ট রোগে পড়ে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কয়েকটা রোগের লক্ষণ একসাথে কয়েকটা করে মিশ্রিত অবস্থায় আছে। সেক্ষেত্রে সাইকোলজিস্ট হিসেবে এইটা লক্ষণ বা সমস্যা হিসেবে আমরা ট্রিটমেন্ট করি। তাই এসেসমেন্ট বা সমস্যার মূল পয়েন্ট নির্ণয় করতে আমাদের সাইকোলজিস্টদের অনেক সময় লাগতে পারে।
সাইকিয়াট্রিস্ট এর মতো সাইকোলজিস্ট যেহেতু শুধু শারীরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাজ করেনা। মূল সমস্যা এবং একজনের ছোট বেলা থেকে তথ্য নেওয়া, সমস্যার উৎস খোঁজা, এমনকি প্রতিটা সমস্যা বা লক্ষণ ধরে ধরে যেহেতু সাইকোথেরাপিতে কাজ করা হয় তাই সময় বেশি লাগাটা খুব স্বাভাবিক।
ঠিক এই কারণে কাউন্সেলিং কখনো ১ দিনে হয় না। আপনার মূল সমস্যা বের করতেই ৩-৪ টা সেশন এভারেজে লেগে যেতে পারে। টেকনিক ব্যবহার করে আপনার চিন্তা আবেগ ও সমস্যার মূলে পৌঁছানো, তারপর সেশনের লক্ষ্য ঠিক করা, ট্রিটমেন্ট দেওয়া সহ এইটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বলা চলে। যেহেতু আপনার সমস্যাটা গতদিনের না সেহেতু ১-২ টা সেশনে আপনি একজন পার্ফেক্ট হয়ে যেতে পারবেন এই আশা রাখাটাও ত্রুটিমূলক চিন্তা।
একটু ভেবে দেখুন কি কারণে সাইকোলজিস্ট এর আপনার সব সমস্যা, কথা শোনা জরুরি! আপনি এই সমস্যার সমাধান পাচ্ছেন না বলেই অনেক সাফার করে শেষে পেশাদার সাহায্যর কথা ভাবেন। এই একই কথাগুলো যদি আপনি সবাইকে বলতে পারতেন সবাই আপনাকে বুঝতে পারতো, আপনার সমস্যাটাকে খুব একটা সমস্যা মনে হতো না। যেহেতু একজন পেশাদার সাইকোলজিস্ট এর কাজ আপনার ইমোশনগুলোকে গ্রহণ করা, তাই এই সেবাটাকে ছোট করার কোনো অবকাশ নাই।
এরপর যে পয়েন্টটা বলতে হয় "নন-জার্জমেন্টাল"। আপনাকে বিচার করার জন্য পুরো পৃথিবী আছে, পাড়া প্রতিবেশী,জানা অজানা অনেক মানুষ আছে। যে মানুষ ৭ টা খুন করেও সাইকোলজিস্ট এর কাছে আসবে সেও নিশ্চয় চাই, আমাকে আমার মতো বিচারহীনভাবে কেউ বুঝুক। আগেই বলেছি সাইকোথেরাপি এর একটা বড় অংশ চিন্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষ করে সিবিটি থেরাপিতে৷ যেখানে চলমান চিন্তাটাকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়। কিন্তু শুরুতেই যদি আপনাকে আপনার চিন্তাটা ভূল কেউ বলে আপনার তাকে আর ভালো লাগবে কি? আপনি মেনে নিতে পারবেন কিনা? নিশ্চিয় না। তখন মনে হবে সবার মতোন উনিও আপনাকে জার্জমেন্ট/বিচার করলেন। তাই প্রতিটা সাইকোথেরাপি একটা নির্দিষ্ট ফরম্যাট বা স্ট্রাকচারে চলে। যেহেতু পরের কাজ আগে করা যায় না এবং এতে আপনি উপকৃত ও হবেন না। তাই সাইকোথেরাপি একটা লম্বা কিন্তু ইফেক্টিভ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
২. আপনি তোহ প্রেসক্রিপশন লিখবেন না। তাহলে ফি টা বেশি হয়ে গেল না?
উল্লেখিত বিষয়টি বুঝে থাকলে এইটাও আশা করি বুঝাতে পারছি কি কারণে এই সেবাটা নেওয়া এতো গুরুত্বপূর্ণ। এইখানে অনেক টুলস টেকনিক ব্যবহার করা হয় যা চোখে দেখা যায় না। তাই যেহেতু সাইকোথেরাপি মেডিসিন এর মতো আংশিক বা সম্পূর্ণ দেখা যায় না তাই হয়তো প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয় না। তবে অবশ্যই প্রতি সেশনে কি কি কাজ হয়েছে তা ক্লায়েন্টকে লিখে নিতে বলা হয়। এবং এইখানে মেডিসিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয় কিছু দক্ষতা, টেকনিক ও হোম ওয়ার্ক। প্রতিটা সেশন যেহেতু ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা করে হয়, কাজেই ফি টা সময়, কাজ, অভিজ্ঞতা যাচাইয়ে তার কাছে যা ন্যায্য তাই ধার্য করেন। তাছাড়া এইগুলো অভিজ্ঞতার বাইরের অংশ না। তা না হলে সাইকোথেরাপিস্ট আপনি পথে পথে পাবেন।
চলবে..........
উম্মে সালমা সায়মা
প্রফেশনাল সাইকোলজিস্ট
fans