17/07/2026
মানুষটা কি সত্যিই বদলে গিয়েছিল?
৫৫ বছর বয়সী একজন অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের একটি বড় গার্মেন্টস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। গত ৩০ বছরে অসংখ্য ব্যবসায়িক উত্থান-পতন দেখেছেন, কিন্তু তাকে সবাই চিনতেন একজন অসাধারণ ঠান্ডা মাথার, হিসাবি এবং নীতিবান মানুষ হিসেবে।
বন্ধুরা মজা করে বলতেন,
"ও যদি ১০ টাকা খরচ করে, তারও হিসাব রাখে!"
পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত সুন্দর। বিবাহিত জীবন প্রায় ৩০ বছরের। স্ত্রী প্রায়ই বলতেন,
"এই মানুষটার উপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।"
একটা ছোট্ট সমস্যা...
গত এক বছর ধরে রাতে ঘুমাতে গেলেই দুই পায়ে অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হয়। মনে হতো পা না নাড়ালে যেন সহ্য করা যায় না। হাঁটাহাঁটি করলে কিছুটা আরাম মিলত, কিন্তু বিছানায় শুয়ে থাকলেই আবার একই অনুভূতি।
একজন নিউরোলজিস্ট তাকে Restless Legs Syndrome (RLS) হিসেবে নির্ণয় করলেন এবং Pramipexole শুরু করলেন।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সমস্যার অসাধারণ উন্নতি হলো।
রোগী খুব খুশি।
"ডাক্তার সাহেব, এতদিন পরে মনে হচ্ছে আবার ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি।"
প্রায় ছয় মাস পরে তিনি ব্যবসার কাজে ইউরোপে গেলেন। সফরের শেষদিকে সহকর্মীরা বললেন,
"একদিন Monaco যাই। Monte Carlo Casino শুধু একবার ঘুরে দেখব।"
তিনি হেসে বললেন,
"আমি এসব খেলি না। শুধু দেখে আসব।"
সেদিন রাতে তিনি প্রথমবারের মতো রুলেট টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন।
শুধু একটা বাজি...
তারপর আরেকটা...
তারপর আরেকটা...
ভোর হতে না হতেই তিনি কয়েক হাজার ইউরো হারিয়ে ফেলেছেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত নন।
বরং বললেন,
"আরেকবার খেললেই সব উঠে আসবে।"
পরদিন সকালেও তিনি মিটিং বাদ দিয়ে আবার ক্যাসিনোতে চলে গেলেন।
সহকর্মীরা ভেবেছিলেন, এটা হয়তো বিদেশের উত্তেজনা।
কিন্তু আসল সমস্যা তখনও শুরু হয়নি।
দেশে ফিরে যেন অন্য একজন মানুষ...
বাংলাদেশে ফিরে তার আচরণ ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।
প্রতিদিন রাত জেগে অনলাইন ক্যাসিনো খেলছেন।
প্রথমে কয়েক হাজার টাকা।
তারপর কয়েক লাখ।
এরপর কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি।
ব্যবসার হিসাব থেকে গোপনে টাকা সরাতে শুরু করলেন।
একদিন স্ত্রী দেখলেন, বাড়িতে একের পর এক পার্সেল আসছে।
দামী ঘড়ি...
লাক্সারি কলম...
ডিজাইনার স্যুট...
একই মডেলের পাঁচটি ঘড়ি।
একই জুতার চারটি ভিন্ন রঙ।
যার অর্ধেকই কখনো খোলা হয়নি।
স্ত্রী অবাক হয়ে বললেন,
"এসব দিয়ে কী করবে?"
তিনি শুধু হাসলেন।
"ভালো লেগেছে... তাই কিনেছি।"
কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল অন্য জায়গায়...
কয়েক সপ্তাহ পরে স্ত্রী আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করলেন।
যে মানুষটি সারাজীবন অত্যন্ত সংযত ছিলেন, তিনি হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক যৌন আচরণ করতে শুরু করেছেন।
রাতের পর রাত পর্নোগ্রাফি দেখছেন।
গোপনে বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন।
অপরিচিত নারীদের বারবার ব্যক্তিগত বার্তা পাঠাচ্ছেন।
একদিন স্ত্রী আবিষ্কার করলেন, তিনি বিদেশে থাকাকালে কয়েক হাজার ডলার দিয়ে একটি এসকর্ট সার্ভিস বুক করার চেষ্টা করেছিলেন।
স্ত্রী ভেঙে পড়লেন।
কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
"এটা আমার স্বামী হতে পারে না। ত্রিশ বছরের সংসারে এমন মানুষ আমি কোনোদিন দেখিনি।"
রোগীর নিজেরও কষ্ট হচ্ছিল...
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় ছিল—
রোগী নিজেও বুঝতে পারছিলেন যে কিছু একটা ভুল হচ্ছে।
তিনি একদিন চিকিৎসককে বললেন,
"ডাক্তার সাহেব... আমি জানি আমি যা করছি, সেগুলো ভুল। প্রতিবারই নিজেকে বলি—এটাই শেষ। কিন্তু তারপর একটা অদ্ভুত তাগিদ আসে। মনে হয় এখনই এটা করতেই হবে। আমি যেন নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি।"
তার চোখে তখন লজ্জা।bকণ্ঠে অসহায়ত্ব।
পরিবারের ধারণা...
পরিবার ভাবল—
হয়তো mid-life crisis।
হয়তো গোপন সম্পর্ক।
হয়তো মানসিক রোগ।
হয়তো dementia-এর শুরু।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো হলো।
সাইকোলজিস্ট দেখানো হলো।
কিন্তু কোথাও কোনো ব্যাখ্যা মিলল না।
শেষ পর্যন্ত একজন নিউরোলজিস্ট ওষুধের তালিকা দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
"এই পরিবর্তনগুলো কি Pramipexole শুরু করার পর থেকেই হয়েছে?"
স্ত্রী একটু ভেবে বললেন,
"জি... আসলে ঠিক ওই সময় থেকেই। এর আগে উনি জীবনে কখনো জুয়া খেলেননি, কখনো এমন অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করেননি, আর এমন আচরণ তো কল্পনাও করা যায় না।"
নিউরোলজিস্ট শান্তভাবে বললেন,
"আপনার স্বামী খারাপ মানুষ হয়ে যাননি। এটি তার চরিত্রের সমস্যা নয়। এটি একটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—Dopamine agonist–induced Impulse Control Disorder।"
তিনি ব্যাখ্যা করলেন,
Pramipexole শুধু পায়ের অস্বস্তি কমায় না, এটি মস্তিষ্কের reward pathway (mesolimbic dopamine system)-কেও অতিরিক্ত উদ্দীপিত করতে পারে।
ফলে কিছু রোগীর মধ্যে দেখা দিতে পারে—
Pathological gambling
Compulsive shopping
Hypersexuality
Binge eating
Excessive internet use বা gaming
ওষুধটি ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা হলো।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে অনলাইন জুয়া বন্ধ হয়ে গেল।
অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমে গেল।
ধীরে ধীরে তার যৌন আচরণও আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল।
স্ত্রী একদিন ফলো-আপে এসে শুধু একটি কথাই বললেন—
"ডাক্তার সাহেব... মনে হচ্ছে আমি আমার পুরনো মানুষটাকে আবার ফিরে পেয়েছি।"
(C)