16/09/2026
সমাজটা বড় অদ্ভুত!
টং দোকানে বসে চায়ে পাউরুটি ভিজিয়ে খেতে খেতে রিকশাচালক এলাকার কাউন্সিলরকে গালি দেয়।আবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ নিজের বাসার ১২ বছরের শিশুকে বেদম পিটিয়ে পরদিন আদালতে দাঁড়িয়ে শিশু নির্যাতনের মামলা লড়ে।
হাঁটতে-বসতে ডাক্তারকে ‘কসাই’ বলে গালি দেওয়া মানুষটিই আবার নিজের সন্তানকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখে। স্পেশালিষ্ট, জেনারেল ফিজিশিয়ান, পল্লী ডাক্তার, ফার্মেসী ওয়ালা পরস্পরের প্রতি তীব্র বিরুপ ভাব। এক টাকা ভাড়া কম-বেশি হওয়া নিয়ে সুটেড-বুটেড ভদ্রলোক লোকাল বাসের হেল্পারের সঙ্গে এমন বিবাদে জড়িয়ে পড়েন যে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি রক্তারক্তি পর্যন্ত গড়ায়।
আমরা আসলে কেমন সমাজ তৈরি করছি? যে সমাজে সবাই সবার প্রয়োজন, অথচ কেউ কাউকে সম্মান করতে রাজি নয়! একবার নিজের শরীরটার দিকে তাকান। আপনার মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, লিভার প্রত্যেকটি অঙ্গের কাজ আলাদা। কিন্তু কোনো অঙ্গই একা আপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। হৃদপিণ্ড রক্ত সঞ্চালন করে।ফুসফুস অক্সিজেন দেয়। কিডনি রক্ত পরিশোধন করে বর্জ্য বের করে। লিভার বিপাকক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মস্তিষ্ক পুরো ব্যবস্থাটাকে সমন্বয় করে।
কেউ কারো ‘বস’ নয়। কেউ কারো ‘চাকর’ নয়।প্রত্যেকে নিজের কাজ করে বলেই পুরো শরীরটা বেঁচে থাকে।
ভাবুন তো, একদিন যদি হৃদপিণ্ড কিডনিকে বলে ‘ব্যাটা কিডনি, আমার পাঠানো রক্তে বেঁচে আছিস!’
কিডনি যদি জবাব দেয়,"তোর রক্তের বর্জ্যগুলো প্রতিমুহূর্তে ছেঁকে বের করি বলে এত দেমাক! একদিন কাজ বন্ধ করে দিই, তখন বুঝবি আমার গুরুত্ব!"
তাহলে শরীরের কী অবস্থা হবে?
অবশ্যই ভয়াবহ। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রতিদিন প্রায় সেটাই ঘটছে। কৃষকের ঘামে উৎপাদিত খাবার খেয়ে আমরা কৃষককে ছোট করি। শ্রমিকের হাতে তৈরি বাড়িতে বসে শ্রমিককে অবজ্ঞা করি। রিকশাচালকের রিকশায় চড়ে গন্তব্যে পৌঁছে তাকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে ভুলে যাই। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর শ্রমে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসে তার পেশাকে নিচু চোখে দেখি।শিক্ষকের কাছে পড়িয়ে সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করি, আবার সেই শিক্ষককেই নানা সময়ে অসম্মান করি।চিকিৎসকের কাছে সুস্থ হতে গিয়ে চিকিৎসককেই ‘কসাই’ বলি। আবার নিজের সন্তানকে সেই পেশাতেই দেখতে চাই।
কী ভয়াবহ বৈপরীত্য!
অথচ সত্যিটা খুব সহজ।
সমাজে মানুষের মর্যাদা তার পোশাক, পদবি, ব্যাংক ব্যালেন্স কিংবা ডিগ্রিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। কারণ একজন মানুষের কাজ আপনার চোখে যত ছোটই মনে হোক, কোনো না কোনো জায়গায় সেই কাজটি আপনার জীবনকে স্পর্শ করছে।
আপনি হয়তো একজন ডাক্তার। কিন্তু আপনার খাবার কে ফলিয়েছে? আপনি হয়তো একজন প্রকৌশলী।কিন্তু আপনার বাড়িটি কে নির্মাণ করেছে? আপনি হয়তো একজন কর্মকর্তা।কিন্তু আপনার যাতায়ামের পথটি কে সচল রেখেছে? আপনি হয়তো একজন ব্যবসায়ী।কিন্তু আপনার ব্যবসার পণ্যটি উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ করেছে কারা? আমরা কেউই স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। আমাদের প্রত্যেকের জীবন অসংখ্য মানুষের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
তাই সমাজকে যদি একটি বিশাল মানবদেহ হিসেবে কল্পনা করি, তাহলে কৃষক, শ্রমিক, চালক, শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আইনজীবী, প্রকৌশলী, কর্মকর্তা প্রত্যেকেই যেন সেই দেহের একেকটি অঙ্গ। অঙ্গগুলোর কাজ আলাদা হতে পারে,কিন্তু প্রয়োজনীয়তা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।একটি অঙ্গ অন্য অঙ্গকে অপমান করলে পুরো শরীরেরই ক্ষতি হয়। তাহলে আমাদের সমাজের এত বিভাজন, এত অবজ্ঞা, এত গালি, এত হিংসা এসব কি আসলে আমাদের নিজেদেরই ক্ষতি নয়?
জীবনকে সুন্দর করতে হয়তো অনেক টাকা দরকার নেই।অনেক ক্ষমতা দরকার নেই।অনেক খ্যাতিও দরকার নেই। কখনো কখনো শুধু একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করাটাই যথেষ্ট। রিকশাচালককে ‘ভাই’ বলে ডাকা, বাসের হেল্পারের সঙ্গে একটু ভদ্রভাবে কথা বলা, কৃষকের শ্রমকে সম্মান করা, গৃহকর্মীর সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, সহকর্মীর কাজের মূল্য স্বীকার করা এসবের জন্য কোনো ডিগ্রি লাগে না। শুধু মানুষ হতে হয়।
আমাদের শরীরের অঙ্গগুলো একে অপরকে ছোট করে না বলেই আমরা বেঁচে আছি। তাহলে সমাজ নামের এই বিশাল শরীরটাকে সুস্থ রাখতে আমরা একে অপরকে একটু সম্মান করতে পারি না?
সমাজ বদলানোর সবচেয়ে বড় কাজটা কোনো আইন দিয়ে নয়, আমাদের দৈনন্দিন আচরণ দিয়েই শুরু হতে পারে। আজ থেকে অন্তত একজন মানুষকে, যাকে এতদিন নিজের চেয়ে ‘ছোট’ মনে হতো, একবার মানুষ হিসেবে তাকে সম্মান দিয়ে দেখুন কতটা আনন্দ হয়।
゚viralシ