01/06/2026
ছবিতে রোদনরত এই আদুরে শিশুর নাম আবদুর রহমান। বয়স ১৭ মাস।আব্দুর রহমান এসেছিলো আমার কাছে ঈদের আগের এক রবিবারে, তার বাসা পেকুয়ার টৈটং ইউনিয়নে। জ্বর, তার ক'দিন পরেই সারা শরীরে র্যাশ, কাশি, চোখ লাল, মুখে ঘা হওয়ার পর শেষ দিকে শুরু হয়ে যায় শ্বাসকষ্ট। তীব্র জ্বর আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে আব্দুর রহমান আমার কাছে এসেছিল। আমি তাকে ভালভাবে শারীরিক পরীক্ষা করি, ফুসফুসে স্টেথো বসাতেই শুনতে পাই কড়কড়ে শব্দ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Crepitation. পালস অক্সিমিটারে দেখলাম তার শরীরের দ্রবীভূত অক্সিজেন উঠা নামা করছে, কোনভাবেই সেটা ৮৫% এর বেশি নয়।বলাবাহুল্য, হাম আবদুর রহমানের শরীরে প্রবেশ করেই থেমে থাকে নি, আক্রান্ত করে ফেলেছে তার ফুসফুস, নিউমোনিয়া হয়েছে তার। প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়ে তাকে আমি পেকুয়া আমাদের মুজিব স্যারের নুর হাসপাতালে পাঠায়, এখানেই সে প্রাথমিক ম্যানেজমেন্ট পেয়েছে, এবং কিছুটা স্থির হয়েছে, স্যারের হাসপাতালে তার চিকিৎসার সলল ব্যবস্থাই ছিল, তবু রোগীর মায়ের শঙ্কা ও আর্থিক দিক বিবেচনা করে পরবর্তীতে তাকে চমেকে পাঠাই, চমেকের আমাদের চিকিৎসকরা তাকে আন্তরিকভাবে চিকিৎসা দিয়েছেন (রোগীর অভিভাবকের ভাষায়) এবং তার ফুসফুস এখন অনেকটাই পরিষ্কার, সুস্থ হয়ে উঠেছে সে ধীরে ধীরে। গতকাল ফলোয়াপে আসলো, বুঝিয়ে দিলাম আগামীর কি করণীয় , এখনো বিপদ কাটে নি, হাম চলে যাওয়ার সময় রেখে যায় দাগ, হাম পরবর্তী জটিলতার সং্খ্যা নেহায়েত কম নয়, সাবধান থাকতে হবে তাকে, স্বাস্থ্য সুরক্ষার সকল নিয়ম মেনে চলতে হবে, খেতে হবে পুষ্টিকর খাদ্য, ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা মেনে চলতে হবে, কোলাহলযুক্ত স্থান এড়িয়ে চলায় উত্তম, এবং যেকোন উপসর্গ দেখা দিলে নিতে হবে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ।
সুপ্রিয় সুধী, একটু অন্য প্রসংগে যাই।
শিশুদের চিকিৎসা করা একটি অত্যন্ত জটিল কাজ, তারা মানুষের মতো নিজের উপসর্গ, নিজের খারাপ লাগা বলতে পারে না, শারিরীক পরীক্ষা আর মায়ের অভিযোগ শুনে আমাদের অনুমান করে নিতে হয়, মাঝে মাঝে হতে হয় রক্ত কিংবা বিভিন্ন যান্ত্রিক পরীক্ষার শরণাপন্ন। আমি নিশ্চিত আমাদের দেশের প্রায় প্রত্যেক চিকিৎসক আপ্রাণ চেষ্টা করে প্রতিটি শিশুকে সুস্থ করে তোলার, কিন্তু হায়! সবকিছু আমরা নির্ধারণ করি না, যেমন আমরা নির্ধারণ করি না জন্ম মৃত্যু, এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই সেই সর্বশক্তিমান নিয়ন্ত্রণ করছেন।
একটা রোগের চিকিৎসা শুধু জ্ঞান আর ম্যানেজমেন্ট কিংবা ঔষধ দিয়ে হয় না, অসংখ্য ঔষধ দিয়েও আমরা ফিরিয়ে আনতে পারে নি অনেক হাম আক্রান্ত শিশুকে।তাহলে কি প্রয়োজন?
প্রয়োজন চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা, শরীর কিভাবে লড়তে পারছে, শরীরের ইম্যুন সিস্টেম, প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয়ের সুবিধা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ঔষধ, সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তার কৃপা, তবেই সম্ভব এই এইসব জটিল রোগের চক্রব্যুহ থেকে বেরিয়ে আসা এবং সুস্থ পৃথিবীর আলো দেখা।
সবার অভিজ্ঞতা সমান না, আমার নিজেরই বা কি এমন? চিকিৎসাপেশা একটি প্রতিনিয়ত চলমান শিক্ষাব্যবস্থা, এখানে শেখার কোন শেষ নেই। প্রতিনিয়ত আপডেট হচ্ছে প্রতিটি রোগের ব্যবস্থাপনা।
আমরা আপনারা যদি আজ আবেগের বশীভূত হয়ে প্রতিটা মৃত্যু কিংবা জটিলতা নিয়ে এভাবে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ি, আহত করি তাদের বারংবার, আমাদের চিকিৎসকরা তখন আর আগ্রহ পাবে না আন্তরিকতা নিয়ে সেবা করার, কারণ এই আঘাত তার মনে জায়গা পেয়েছে, দিনরাত সমান করে যে সাধনা করে সে এই জায়গায় এসেছে তার বিপরীতে সে যা পেয়েছে সেটি কখনোই তার প্রাপ্য ছিল না। এই চিকিৎসক হয়তো আর কখনো ঝুঁকি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়বে না কোন রোগীর জীবন বাঁচাতে!
আমরা আরো সহনশীল হই, বিচক্ষণতার সাথে কঠিন সময়ের মোকাবেলা করি, এই প্রার্থনায় রইলো।
[উল্লেখ্য, প্রতি রবিবার শহর হতে পেকুয়া ছুটে যাই একদিন সেবা দিতে, অল্প বিস্তর যা রোগী পাই তাদের সুস্থ করার অঙ্গীকার নিয়েই ঘরছাড়ি! পেকুয়ার যারা সেবা নিবেন অনুগ্রহ করে রবিবারেই যোগাযোগ করবেন। ধন্যবাদ। ]