24/05/2026
আমাদের মায়েরাও মিথ্যা শিখে যাচ্ছে..
০১.
২ দিনের বাচ্চা। জন্ম থেকে হার্টের অসুখ তথা CHD নিয়ে জন্ম হইসে। । বাচ্চার জীবন মরণ লড়াই। নাইট ডিউটি করতেসি, রাত তিনটার মতো বাজে। বাচ্চা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেসে। মা এসে বলতেসে নার্সরা বাচ্চাকে মেরে ফেলসে। ঠিক মতো ঔষধ দেয় নি।
দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি নার্সরা আম্বু দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। বাচ্চা বেঁচে আছে। তবে যায় যায় অবস্থা।
বললাম," মা বাচ্চা তো মারা যায় নি। মিথ্যা কথা কেনো বলেছেন।"
বললো— স্যার, মরে গেসিলো, নার্সরা যন্ত্র দিয়ে ফিরায়া আনসে।
আমি বললাম, মা একবার কেউ মারা গেলে তাকে ফিরায়া আনা যায়? আর আপনি অভিযোগ করতেসেন ভুল ঔষধ দিতেসে। এটা কিভাবে বলেন? বাচ্চাটা তো হার্টের রোগী। যেকোন সময়ই খারাপ হতে পারে।
পরে শুনলাম সকালে রোগীর মা'র সাথে নার্সদের একটু কথা কাটাকাটি হইসিলো। সেই থেকে অন্তর্দ্বন্দ্ব, মনোমালিন্য। সেজন্য বাচ্চা খারাপের সুযোগ বুঝে ডাক্তার, নার্স সবার নামে একযোগে আবেগে এবং প্রতিশোধে যা ইচ্ছা বলেতেসে।
আমি শান্ত হয়ে বললাম— মা, আপনি এটা বলেন যে নার্সদের সাথে আপনার একটু কথা কাটাকাটি হয়েছে। আমি তাহলে সেটার মীমাংসা করে দেই। দেখেন এটা সরকারি হসপিটাল, বেডের তুলনায় দ্বিগুন রোগী। নার্স ডাক্তার যত দরকার তার অর্ধেকও পোস্টিং নাই। এই পরিবেশে আপনাদের থাকতে কষ্ট, চিকিৎসা নিতেও কষ্ট হয়। ডাক্তার, নার্সদেরও সেবা দিতে কষ্ট হয়। আমাদের সবারই সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। নাহলে সবার জন্যই কঠিন হয়ে যাবে সেবা দেওয়া, সেবা নেওয়া।
০২.
আজ ইভিনিং ডিউটি করতেসি। একটা বাচ্চা এসেছে, ডায়রিয়ার রোগী। পানিশূন্যতা আছে ভালোই। স্যালাইন অর্ডার দিয়েছি। নার্সরাও বাচ্চাকে ক্যানুলা করে স্যালাইন দিয়েছেন।
বিশ মিনিট পর রোগীর মা হাঁপায়া আসলো, বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। দৌড়ে গেলাম চারতলা থেকে একতলার ডায়রিয়া ওয়ার্ডে। গিয়ে দেখি বাচ্চার আসলেই শ্বাসকষ্ট। রোগীর মা'র দাবি স্যালাইন দেওয়াতে তা হয়েছে। আমি খানিকটা ভয় পেয়ে গেলাম। দেখলাম কাগজে সাইন আমার করা। আমিই স্যালাইন অর্ডার দিয়েছি। ভাবতে লাগলাম নরমাল কলেরা স্যালাইনে কোন ডায়রিয়ার রোগীর এই অবস্থা হওয়ার কথা না, যদি না তার অন্য কোন রোগ না থাকে।
তড়িঘড়ি করে স্টেথো দিয়ে রোগীর ফুসফুস চেক করলাম। রোগীর জামা কাপড় খুললাম, হেলান দিয়ে বসালাম যেন শ্বাস নিতে সহজ হয়। অক্সিজেন দিলাম, নেবুলাইজ করলাম, আইভি কর্টিসল দিলাম।
এর ফাঁকে বাচ্চার কোন রোগ ছিলো কিনা মাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে কোন কিছু না পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বাচ্চাকে মাঝে কি খাওয়াইসেন? মা বলে, ডাবের পানি। জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে খাওয়াইসেন? শুইয়ে?
বাচ্চার মা বলে, না স্যার। বসায়া।
বাচ্চার নানি ছিলো পাশে। বললো, শুয়ায়েই খাওয়াইসি স্যার। রোগীর নানী রোগীর মাকে ইঙ্গিত করে বললো, শুয়াইয়েই তো খাইছস।
আমি বললাম, দু'জন দুই কথা বললে কেমনে কি? সত্যটা বলেন।
পরে মা স্বীকার করলো৷
বললাম, মা মিথ্যা কথা বললে কেমনে কি? আপনাদের তো সরল সোজা ভাবি, কিন্তু বিপদে এমনে ফালায়া দিলে মহা মুশকিল।
বাচ্চাকে ডাবের পানি শুয়াইয়ে খাইওয়াইতে গিয়ে ফুসফুস পানি চলে গেসে। তাই বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিলো।
পাঁচ মিনিট পর বাচ্চার শ্বাসকষ্ট কমলো। আমি আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করলাম।
পানি বেশী খাওয়াই নাই, তাই এই যাত্রায় বেঁচে গেসে। নাহলে সোনার চাঁন হারাইত মা আর মরার দায়ভার যাইত ডাক্তারের ওপর দিয়া।
খুবই ডেঞ্জারাস অবস্থায় আছে বাংলাদেশের ডক্টর-প্যাশেন্টস, নার্স-প্যাশেন্টস রিলেশনশিপ ও কমিউনিকেশন। বিশেষ করে ইমার্জেন্সি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার পার্টে ভয়াবহ অবস্থা।
এর কারণ কি, এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে। থিসিস, পিএইচডি পর্যন্ত চালু করা যেতে পারে। শুধু ডাক্তার না মাল্টি সেক্টরাল গবেষকের ইনভলভ প্রয়োজন হবে এতে। যা এইদেশে বিলাসিতা।
তবু স্বপ্ন দেখতে তো সমস্যা নাই..
-Dr. Md Kamrul Islam