27/06/2026
আদরের সোনামণির মিষ্টি হাসির জন্য আমরা কত কিছুই না করি। শখের খেলনা থেকে শুরু করে পছন্দের খাবার শিশু যা চায়, তা মুহূর্তেই হাতে তুলে দিতে আমাদের ভালো লাগে। কিন্তু মা-বাবা হিসেবে আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, তাৎক্ষণিক আনন্দ আর দীর্ঘমেয়াদী বিকাশের মধ্যে সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য আছে। শিশুর প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করা কি আসলেই তার জন্য কল্যাণকর? নাকি এতে অজান্তেই আমরা তার ভবিষ্যৎ আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছি? শিশুর প্রতিটি আবদার বিনা বিচারে পূরণ করা দীর্ঘমেয়াদে তার ধৈর্য এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
বিজ্ঞানসম্মতভাবে দেখলে, একটি শিশুর মস্তিষ্কের গঠন ও আবেগীয় বিকাশে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যখন একটি শিশু যা চায় তা-ই পেয়ে যায়, সে না শুনতে শেখে না। এর ফলে বড় হয়ে তারা কোনো কাজ বা পরিস্থিতিতে বাধা পেলে দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে (Low frustration tolerance)। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শিশুকে প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। সব চাহিদা পূরণ করলে এই শেখার সুযোগটি নষ্ট হয়ে যায়। কোনো কিছু অর্জনের জন্য যে ধৈর্য ও পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, সেটি তারা শিখতে পারে না। ফলস্বরূপ, কোনো কিছুর মূল্য বোঝা বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মানসিকতা তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে না। সব সময় সবকিছু হাতের কাছে পেলে শিশু মনে করে পৃথিবীটা তার ইশারায় চলে, যা পরবর্তী জীবনে বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে বাধা দেয়।
শিশুর সব ইচ্ছা পূরণ না করাই ভালো, কিন্তু এর মানে এই নয় যে তার ওপর কঠোর হতে হবে। ভারসাম্য বজায় রাখাটাই মূল চাবিকাঠি। সব ইচ্ছায় সায় না দিয়ে যৌক্তিক কারণে বিনয়ের সাথে না বলতে শিখুন। এতে শিশু বুঝতে পারবে সব কিছু পাওয়ার অধিকার তার নেই। শিশুকে বোঝান যে কোনো কিছু পেতে হলে সময়ের অপেক্ষা প্রয়োজন। এটি তাদের ধৈর্যশীল হতে শেখায়। কোনো কিছু না পেলে সেটির বদলে অন্য কোনো আনন্দদায়ক বা সৃজনশীল কাজ করতে উৎসাহিত করুন। শিশু কান্নাকাটি করলেই তার ইচ্ছা পূরণ করবেন না। সে কেন কান্নাকাটি করছে তা শান্তভাবে বোঝার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে তাকে আবেগ সামলানো শেখান। ভালো কাজের জন্য খেলনা না কিনে, শিশুকে মুখে প্রশংসা করুন বা তার সাথে সময় কাটান। এতে বস্তুবাদী চিন্তার চেয়ে মানসিক বন্ধন শক্তিশালী হবে।
একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হলো শিশুকে এমনভাবে বড় করা, যেন সে বাস্তব পৃথিবীর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারে। তাকে আদর করুন, ভালোবাসুন, কিন্তু তার ইচ্ছা পূরণ করার ক্ষেত্রে বুদ্ধিদীপ্ত অভিভাবকত্বের পরিচয় দিন। মনে রাখবেন, আজকের এই ছোট না আগামী দিনে আপনার সন্তানকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও ধৈর্যশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
ডাঃ মোঃ আবদুল্লাহ ইউসুফ
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ইউএসএ