21/08/2026
পত্রিকায় শুধু লেখা হলো-
টানা ১৪ দিন ঘুমাতে না পেরে বাচ্চাকে হত্যা করল মা।
তারপর সেই খবরের লিংক ছড়িয়ে পড়ল।
হাজার হাজার মানুষ মাকে গালি দিলেন। কেউ বললেন, “এমন মা হয়?” কেউ বললেন, “নিজের সন্তানকে যে মেরে ফেলতে পারে, তার শাস্তি হওয়া উচিত।”
কিন্তু খুব অল্প মানুষ হয়তো থেমে ভাবলেন,
টানা ১৪ দিন ঠিকমতো ঘুম না হলে একজন মানুষের মস্তিষ্কের ওপর কী ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে?
আমি একজন মা।
আমার নিজের ছোট্ট বাচ্চাটাও সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দেয়। সেই হাসিটা দেখলে মনে হয়, এই ছোট্ট মানুষটাকে ঘিরেই তো আমার পুরো পৃথিবী।
তাই সেই মাকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে একটা প্রশ্ন বারবার মনে আসে,
যে মা নিজের সন্তানকে এতদিন গর্ভে বহন করলেন, প্রসবের এত কষ্ট সহ্য করলেন, সেই মা হঠাৎ কীভাবে নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারলেন?
হয়তো আমরা পুরো ঘটনাটা জানি না।
হয়তো সেখানে ছিল ভয়ংকর কোনো মানসিক অসুস্থতা।
হয়তো ছিল postpartum psychosis।
হয়তো সেই মা নিজেই তখন নিজের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন না।
আর আমরা কী করলাম?
একটা পত্রিকার শিরোনাম পড়ে তাকে একজন নিষ্ঠুর মা বানিয়ে ফেললাম।
আমি সেই মায়ের কাজকে সমর্থন করছি না। একটি শিশুর মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো নয়। কিন্তু অপরাধ আর অসুস্থতা- দুটোকে বোঝার চেষ্টা করা এক জিনিস নয়।
প্রসবের পর একজন মায়ের ঘুম কেমন হচ্ছে, আচরণ বদলাচ্ছে কি না, অস্বাভাবিক কিছু দেখছে বা শুনছে কি না, বাস্তবতা বুঝতে পারছে কি না, এসবও খেয়াল রাখা জরুরি।
কারণ কখনো কখনো একজন মা যখন অস্বাভাবিক আচরণ করছেন, তিনি হয়তো “খারাপ মা” হয়ে যাননি।
তিনি হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
আর অসুস্থ মানুষকে শুধু গালি নয়, সময়মতো চিকিৎসাও দিতে হয়।
পত্রিকার শিরোনাম খুব সহজে একজন মানুষকে বিচার করে ফেলতে পারে।
কিন্তু একজন মানুষের ভেতরে ঠিক কী ঘটছিল, সেটা বোঝার জন্য একটা শিরোনাম কখনোই যথেষ্ট নয়।
১৪ দিনের একটা শিশুকে আমরা হারিয়েছি।
হয়তো এই ঘটনাটা আমাদের আরেকটা জিনিস শেখাবে, সন্তান জন্মের পর শুধু শিশুটার দিকে নয়, মায়ের চোখের দিকেও তাকাতে হবে।
ডা: নাজিয়া তাসনিম
শিশু ও নবজাতক রোগ বিশেষজ্ঞ