23/05/2022
এক রোগীর মাধ্যমে পেইজটির সন্ধান পেয়েছিলাম। ক্যান্সারের রোগীদের পেইজ। ভাবলাম একটু ঘুরে দেখি আমাদের সম্পর্কে লোকেদের ধারণা কি? গত কয়েকদিনে যা দেখলাম তাতে আমার পাগল হবার যোগাড়। পেইজের নাম বলছি না। তবে কি পেলাম তার summary পড়েন-
1) আমাদের অভ্যাস হলো সঠিক স্থানে প্রশ্ন না করা। CT scan Brain-এ Brain metastases বলছে- এটার মানে কি?
CT Abdomen এ Retroperitoneal tumor বলছে- এটার মানে কি? আমার প্রশ্ন হলো যিনি আপনাকে এই টেষ্ট করতে দিয়েছেন তাকে এই প্রশ্ন না করে কেন রোগীদের গ্রুপে এই প্রশ্ন করা? ফলাফল যা দাঁড়ায় তা হলো সবাই ডাক্তার হয়ে যার যার মনের মতো মত দেয়। Breast ক্যান্সারের চিকিৎসা করা রোগীর এটেন্ডেন্ট Colon ক্যান্সারের রোগের চিকিৎসার মতামত দেন।
রোগী কেমো পেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। আপনি ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ না করে গ্রুপে পোষ্ট দেন। এটা কি ক্যান্সারের ডাক্তারের গ্রুপ যে আপনি সমাধান পাবেন? এখানে আপনার রোগীর চিকিৎসা দেয় ইলেকট্রিকাল ইন্জিনিয়ার, অর্থনীতির ছাত্র, বিতার্কিক!! আপনি ক্যান্সারের চিকিৎসা কন্টিনিউ করবেন কিনা এই মতামত গ্রুপে জানতে চান। এখন আমাকে বলুন তো চিকিৎসা করানো না করানোর ফল, ভবিষ্যতের জটিলতা কি আপনার গ্রুপ মেম্বাররা জানবেন? নাকি আপনার ডাক্তার জানবেন? সব ক্যান্সারের চিকিৎসা কি এক মনে হয় আপনাদের? যখন breast ক্যান্সারের ভয় লাগে তখন জানতে চান কোন ডাক্তার দেখাবো? আর ডাক্তারের পরামর্শে করা রিপোর্ট যখন নরমাল আসে, তখন জানতে চান- এই রিপোর্ট কি ডাক্তারকে দেখাবো? ডাক্তার যদি এতই অপছন্দ হয় তাহলে তার কাছে যানই বা কেন? আপনার মা হার্ট এটাক করলে গ্রুপে পোষ্ট দিবেন- কি চিকিৎসা দেব? ইনজেকশন কোনটা দেব? হার্টে রিং কি পরাবো? গুগলে সার্চ দিয়ে চিকিৎসা বের করবেন। গুগলে এখন অনেক কিছু পাওয়া যায়। সেসব দেখে আপনার বাবা মা সন্তানের কেমোথেরাপী বাসায় নিজেই দিয়ে দিন। কি দরকার ভাই ডাক্তারদের? সত্যি বলতে কি আপনারা বড় নির্মম। নিজের পরিবারের সদস্যদের আপনারা মোটেও ভালবাসেন না। যদি সত্যিই ভালবাসতেন তবে অস্থানে প্রশ্ন করে আর উত্তর শুনে আপনার বাবা মা ভাই বোন সন্তানের জীবন হুমকীতে ফেলতেন না।
2) এদেশে সবাই ডাক্তার। ক্যান্সার specialist। ব্লাড ক্যান্সারের রোগীর CBC রিপোর্টে Hb%, Platelet count কম। অথচ অনার্স পড়ুয়া এক মেয়ে বলে দিয়েছে রিপোর্ট ভাল। আমার প্রশ্ন হলো এই ভুল তথ্যের জন্যে রোগী যদি বিনা চিকিৎসায় মরে যেত সে দায় কার? জরায়ুর ক্যান্সারে কি টেষ্ট করবে জানতে চাইলে এক ইলেকট্রিকাল ইন্জিনিয়ার বলেছে CT scan, CEA করাতে। আমি সেই মুর্খকে সামনে পেলে জানতে চাইতাম- বেটা তুই জানিস CEA কখন বাড়ে? মলদ্বারের ক্যান্সার কিভাবে বুঝবো জানতে চাইলে একজন বলছেন Upper GI endoscpy, CA 19.9 করাতে। তার কাছে জানতে চাই, Endoscopy তে কার মলদ্বার দেখা যায় আর কার মলদ্বারের ক্যান্সারে CA 19.9 বাড়ে? ঘরে একটা ক্যান্সার রোগী থাকলে গুগল বাবার কল্যাণে সবাই নিজেকে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ভাবেন। বিশ বছর পড়ে যেটার জ্ঞানের সীমা পাইলাম না, বিশ মিনিট গুগল সার্চ দিয়ে সবাই নিজেকে মস্ত পন্ডিত ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। ক্যান্সারের ডাক্তারের চেম্বারে আসার আগেই আপনারা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন কিভাবে চিকিৎসা করাতে হবে। এর পরে এই ডাক্তার ঐ ডাক্তারের কাছে ঘুরে বেড়ান যতক্ষন না আপনার মনের মতো করে ডাক্তার চিকিৎসা করাতে রাজি হন। সিদ্ধান্ত আপনি নিলে আর ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কি দরকার? আপনার সাথে মিললে ভাল ডাক্তার আর না মিললে কশাই ডাক্তার এই ধারণা থেকে কবে বের হবেন আপনারা? ভাল ডাক্তার হলেন তিনি, যিনি আপনার আপনজনকে নিজের আপনজন ভেবে নিজের জ্ঞানের সেরা চিকিৎসা দেবেন। হতে পারে এতে রোগী পুরো সারবে, কিংবা সারবে না। ক্যান্সারের রোগীর সুস্থতা অনেক অনেক বিষয়ের উপর নির্ভর করে। এর সব দিক নিয়ম মেনে করতে গেলে এদেশে হাজারে এক জনের পক্ষেও ক্যান্সারের চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে যাবে। এই যে ক্যান্সারের ডাক্তারের মধ্যেও এত মত, তার মানে কি তারা সবাই ভুল? মোটেও না। এদেশের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা নিজেরা কিছু আবিষ্কার করেননা। বিদেশের গাইডলাইনগুলোই তারা অনুসরন করেন। এক ক্যান্সারের বিভিন্ন ধরনের কেমোথেরাপী হয়। একেক জন একেক কেমোথেরাপী দিয়ে সাফল্য পেয়েছেন। হাতের পাঁচ আঙ্গুলের সবাই যে এক আঙ্গুল পছন্দ করবেন এটা ভাবেন কেন? তাই, আসলে কেউই ভুল না। এটা আপনাকে বুঝতে হবে।
3) সব কিছুতেই ভারতপ্রীতি। কিছু হলেই ভারতে পাঠানোর উপদেশ সবচেয়ে বেশী আসে। আপনি যদি খুলনায় থেকে ঢাকার খবর না জানেন, তাহলে দেশে থেকে বিদেশের খবর ঠিকঠাক পান কিভাবে। একজন ভারতে চিকিৎসা করে ভাল আছে বলেই ভারতে দৌড় দেন। দেশে চিকিৎসা করে হাজার হাজার রোগী ভাল আছেন। কই, তবুও দেশে থাকতে চান না কেন? বলবেন- দেশের ডাক্তারের ব্যবহার ভাল না। যিনি ভাল ব্যবহার করেন- তার কাছে তো আপনারা যান না।
রোগীর লম্বা সিরিয়াল থাকলে অধৈর্য হয়ে যান। আবার সিরিয়াল লম্বা না হলে তাকে ভাল ডাক্তার মনেই করেন না।
ভিজিট নিয়েও সমস্যা। অথচ ভারতে এর চেয়ে কয়েকগুন বেশী ভিজিট দিয়ে দেখাতে আপনাদের সমস্যা হয় না। কারণ তাদের ব্যবহার। হাসতে হাসতে গলা কেটে টাকা নেয়। আপনি টেরও পাননা। দেশে 500 টাকা ভিজিট দিতেই কশাই লেভেলে ফেলে দেন। এদেশের কোন ডাক্তারকে 5000 টাকা ভিজিট দিয়ে তার ব্যবহারটা দেখিয়েন।
আপনারা বলেন পরীক্ষা নীরিক্ষার খরচ কম। ভারতে ভাল সেন্টারে PET scan করাতে যত খরচ হয়, এদেশের সরকারি হাসপাতালে তার চেয়ে দশ হাজার টাকা কম লাগে।
ভারত গেলেই তাদের ঔষধ নিয়ে আসেন। অথচ সারা পৃথিবীতে যারা প্রথম এই আবিষ্কার করেছে তাদের research molecule ঔষধ আপনারা নিতে চান না। দেশের ঔষধের মান ভাল না। ভারতের ঔষধের মান ভাল আপনি জানেন কিভাবে? ক্যান্সারের রোগী সুস্থ হবে কিনা সেটা নির্ভর করে stage এর উপর। কোটি টাকার ঔষধ দিলেও stage 4 এর রোগী সুস্থ হবার সম্ভবনা কম। রোগী সুস্থ না হলে ডাক্তার আর ঔষধের বদনাম করা আপনাদের বদভ্যাস। একটা রোগী এক দিনে last stage এ যায় না। রোগী আর তার পরিবারের অবহেলায় রোগী শেষ পর্যায়ে আসে। অথচ এর জন্যে আপনাদের অপরাধবোধ আসেনা। যত দোষ ডাক্তারের। আর এদেশের ডাক্তার হলে তো কোন কথাই নেই। ভাবখানা এমন যে অন্তিম শ্বাস নেয়া রোগীকে বাঁচানোর ক্ষমতা রাখতে ডাক্তার বাধ্য। বাঁচানোর ক্ষমতা যদি ডাক্তারের থাকতো তাহলে কোন ডাক্তার কিন্তু মারা যেত না।
আপনারা শুধু ঔষধ আর পরীক্ষার খরচ হিসেব করেন। অথচ যাওয়া আসা, থাকা খাওয়া, attendent এর খরচ মিলায়ে যা হয় তাতে এই দেশেই রাজার হালে আপনার চিকিৎসা শেষ হবার কথা। কিন্তু আপনি তা করবেন। কারণ জন্ম থেকে আজোবধি ভারতের নানা উপকরণে আপনার জীবন এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, ভারতের যে কোন কিছুই আপনার কাছে অধিক প্রিয়।
বিদেশ মানে কিন্তু শুধু ভারত নয়। আপনি ব্যংকক বা সিঙ্গাপুরেও যেতে পারেন। কিন্তু আপনি যাবেন না ঐ mentalityর সমস্যায়। একবার ব্যংকক বা সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করালে বুঝতেন আমাদের তুলনায় তাদের খরচ কত বেশী।
আপাততঃ এইই থাক। বাড়তি জানার থাকলে সাক্ষাতে কথা হবে। তবে এই টুকু বলি-আমাদের দেশ ক্যান্সার চিকিৎসায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। আর যা ঘাটতি আছে সেটার জন্যে প্রয়োজনে আপনার ডাক্তারই বলে দিবেন কোথায়, কোন দেশে ভাল চিকিৎসা পাবেন। আর যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের বলি- আপনার বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। প্রয়োজনে তাকে না পেলে তার অধিনস্তদের সাথে কথা বলুন। প্রাণ খুলে কথা বলুন। তবুও অস্থানে কথা বলে অপচিকিৎসার শিকার হবেন না।
একটা উদাহরণ সব সময় কাছের মানুষদের বলি- ক্যান্সার রোগের চিকিৎসাকে নিজেদের দেশের বাড়িতে ঈদ করতে যাওয়ার মত ভাববেন। আপনি লোকাল বাসে কিংবা এসি বাসে কিংবা মার্সিডিস বেন্জে চড়ে যেতে পারেন। বাসের কোয়ালিটি যত ভাল, পথের ঝাঁকুনির কষ্ট তত কম। আপনি যদি বলেন, বাহন ভাল হলেই বাসায় পৌছানোর গ্যারান্টি আছে? আমি বলবো- নাহ্। আপনার বাহন যতই ভাল হোক- এক্সিডেন্ট হতেই পারে। তাহলে কি ঈদে বাসায় যাবো না? আমি বলবো- যাবেন। আপনার সামর্থে যতটুকু কুলায় ততটুকুই চেষ্টা করবেন, যাতে আফসোস না হয় যে আপনি চেষ্টা করেননি। বাকিটা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেন।