14/04/2026
১৫ বছর আগের কথা। ২০০৭ সালে এলাম বিটিআরসিতে। সেনাবাহিনী থেকে প্রথম পাবলিক ফেসিং অ্যাসাইনমেন্ট। শুরুতেই ওপেন ডোর পলিসি, একসেসেবল টু এভরিওয়ান। মোবাইল নাম্বার দিয়ে দিলাম বিটিআরসি সাইটে। জনসেবা ১০১। সেনাবাহিনীতে দেশরক্ষা ঠিক আছে, কিন্তু জনসেবা করার সুযোগ হাতেনাতে পেয়ে হারাতে চাইলাম না। এই সুযোগ তো সামনে আর আসবে না।
অনেক কিছু করতে চাই, মাথায় একগাদা আইডিয়া, কিন্তু কিছুতেই কিছু ঠিকঠাক হচ্ছিল না। একটা কাজ শুরু করি, মাঝপথে থেমে যাই। দিনশেষে দেখি, কিছুই শেষ করতে পারছি না, বরং অজস্র টু-ডু লিস্ট লিখে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। বিশাল ঝামেলা, ঠিক না? কিন্তু সমাধান তো করতে হবে। ওয়ান ম্যান আর্মি দিয়ে তো সম্ভব নয়। কাছে পেলাম বিটিআরসির দুর্দান্ত টিম। তাহলে সমস্যা কোথায়?
মনোযোগের বারোটা বেজে যাচ্ছে—একবার ফোন, একবার মেইল, হাজারো এসএমএস, আবার হঠাৎ নতুন একটা আইডিয়ার পিছু ছোটা। ঠিক তখনই একদিন কানে এল এক লাইনে বলা কথা: “Creativity মানে শুধু ইন্সপিরেশন না, রুটিনের (নিয়মের) ভিতরেই লুকিয়ে থাকে এর আসল শক্তি।” আর আমি তো রুটিনের লোক। তখনই খুঁজে পেলাম বইটা, একটা ইউএস ট্রিপে—Manage Your Day-to-Day। পড়া শুরু করতেই মাথায় ইলুমিনেশন শুরু হয়ে গেল। এই বইটা শুধু প্রোডাক্টিভিটির কথা বলে না, বলে সময়, মনোযোগ আর এনার্জিকে কীভাবে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে হয়।
আপনি কিভাবে এত কাজ ডেলিভারি করেন? এত কাজ কিভাবে প্রসেসে ফেলে শেষ করেন? শুরু করলে কি শেষ করতে পারেন? এই প্রশ্নগুলো প্রায় পাই আমি। তাই এই বই এবং আমার নিজ থেকে কিছু টিপস:
১. সময় পাওয়া যায় না, সময় বানাতে হয়
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় লেসনগুলোর একটা ছিল—“সময় খুঁজতে চাইলে, কোনোদিনই সেটা পাবেন না।” কারণ আনএক্সপেক্টেড কাজ, নোটিফিকেশন, বাড়তি রিকোয়েস্ট সবসময় আসবেই। যারা নিজের কাজকে সিরিয়াসলি নেয়, তারা কিন্তু সময়কে ঠিকই প্রোটেক্ট করে—প্রায়োরিটি ঠিক করে নেয়, সঙ্গে একটা রুটিন বানিয়ে নেয় যাতে জরুরি জিনিসগুলো ঠিকমতো জায়গা পায়। আমার কথা হচ্ছে, যেটা শুরু করব সেটাকে শেষ করতেই হবে।
২. রুটিন না, বরং রুটিনেই থাকে ক্রিয়েটিভিটির স্পেস
আগে ভাবতাম রুটিন, (সেনাবাহিনীতে প্রতিটা জায়গায় নিয়ম) মানেই একঘেয়েমি, কিন্তু এই বইটা উল্টে দিয়ে বলল—রুটিন মানে মাথার ঝামেলা কমানো। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় নিজের গভীর কাজের জন্য রাখলে, মনের মধ্যে খালি জায়গা তৈরি হয়, যেখানে চিন্তা, আইডিয়া, ইনোভেশন সহজে ভেসে আসে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে অথবা হুমায়ুন আহমেদ, সবারই জীবনে রুটিনই আসল।
৩. দিন শুরু করতে হয় নিজের মতো করে, ফোনের স্ক্রল দিয়ে নয়
অনেকদিন ধরে আমার সকাল শুরু হতো ফোন চেক করে। একবার ফেসবুক, একবার ইনবক্স, তারপর কার কী পোস্ট। বইটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল, আমার দিন তো আমি চালাব—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়টাই সকাল। যারা সিরিয়াসলি প্রোডাক্টিভ, তারা সকালে নিজের মতো সময় নেয়—চুপচাপ বসে, হয়তো একটু মেডিটেশন, অথবা সোজা ঢুকে পড়ে ডিপ ওয়ার্কে। বাইরের কোলাহল ঢোকার আগেই নিজের কাজ এগিয়ে নেয়াটাই মুন্সিয়ানা।
৪. মাল্টিটাস্কিং নয়, সিঙ্গেলটাস্কই আসল শক্তি
ভাবতাম, মাল্টিটাস্কিং মানে একসাথে অনেক কিছু করা যায়। কিন্তু রিয়েলিটি হচ্ছে, প্রতিটা কাজ একটার পর একটা করলে মান ও সময়—দুটোই বাঁচে। যখন একটার ফোকাস ছেড়ে অন্যটায় যাই, তখন সময় শুধু নষ্টই হয় না, ভুলও হয় বেশি। কাজটা যদি পুরো মনোযোগ দিয়ে করা যায়, তখন রেজাল্টও আসে অন্যরকম। আমার সব বইগুলো পড়লে বুঝতে পারবেন, ফিলোসফিক্যাল আলাপ রয়েছে পরতে পরতে।
৫. শুধু সময় না, এনার্জিও গুরুত্বপূর্ণ
বইটা আরেকটা জিনিস চোখে আঙুল দিয়ে দেখালো—সময় তো আছেই, কিন্তু কাজের সময় যদি আপনার এনার্জি না থাকে, তাহলে সে সময়ও কাজে লাগবে না। কেউ সকালবেলা ঝরঝরে থাকে, কেউ দুপুরে, কেউ আবার রাতের দিকে। নিজের শরীর আর মনের এই রিদম বোঝা খুব দরকার, যাতে সেই এনার্জি-পিক টাইমে আপনি আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করতে পারেন। আমার জন্য এই সময়টা হচ্ছে সকাল। সকালেই লেখালেখি করি বেশি। আর ভিডিও রাতে।
৬. নিজের কাজের সময়টাকে প্রোটেক্ট করুন, ঠিক যেভাবে ডাক্তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়
এইটা আমার একদম ফেভারিট লেসন। যারা সত্যিকারের ক্রিয়েটিভ, তারা কিন্তু তাদের কাজের সময়কে কোনোভাবেই স্যাক্রিফাইস করে না। “আজ একটু পরে করব”—এই জিনিস তারা জানেই না। তারা জানে, একবার যদি নিজের সেই ডিপ ওয়ার্ক টাইম নষ্ট হয়, তাহলে পুরো দিনটাই ভেস্তে যেতে পারে। তাই তারা আগে থেকে ব্লক করে রাখে—কোনো ফোন না, মিটিং না, ডিস্টার্বেন্স না—শুধু নিজের কাজ। স্বাতীর সাথে ঝামেলা হয় ঠিকই, কিন্তু আমি বেড়ালের মত তাকিয়ে থাকি তার দিকে।
৭. বিশ্রাম রিলাক্সেশন নয়, বরং দরকারি এলিমেন্ট
আগে ভাবতাম বেশি কাজ করলে বেশি রেজাল্ট পাব। কিন্তু বইটা বুঝিয়ে দিল, একটানা খেটে যাওয়ায় লাভ নেই। আমাদের ব্রেইনও রিফ্রেশ হওয়া দরকার। রেস্ট, স্লিপ আর ছোট ছোট ব্রেকগুলোই ব্রেইনকে নতুন করে ফোকাস করতে সাহায্য করে। না হলে, সব কিছু কেমন ঝাপসা লাগতে শুরু করে।
একটা উদাহরণ দিই—আমার এক বন্ধু, গ্রাফিক ডিজাইনার। দারুণ প্রতিভাবান, কিন্তু সবসময় ব্যস্ত, সবকিছু করতে চায় একসাথে। আমি তাকে বললাম এই বইটার কথা। এখন সে সকালবেলা এক ঘণ্টা শুধু নিজের আর্ট প্রজেক্ট নিয়ে বসে, তখন ফোন অফ রাখে, সোশ্যাল মিডিয়া দূরে রাখে। কয়েক মাসের মধ্যেই তার কাজে একদম অন্যরকম একটা ম্যাচুরিটি এসেছে। কারণ সে এখন জানে, প্রোডাক্টিভিটি মানে অনেক কিছু করা না, বরং ঠিক কাজটা ঠিক সময়ে করা।
ফাইনালি—এটা আমার কথা। নিজেকে গুছিয়ে রাখতে হলে শুধু সময় ম্যানেজ করলেই হবে না, মাথা আর মনকেও ঠিক রাখতে হবে। এই পোস্টে বলার চেষ্টা করেছি, কীভাবে নিজের উপর কন্ট্রোল নিতে হয়, কীভাবে নিজের দিনটা নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে হয়। আর দিন ঠিক হলে, জীবন তো এমনিতেই গুছিয়ে যায়।
পুনশ্চ: স্বাতীর কাছে আমি সবচেয়ে "ডিজ-অরগানাইজড" মানুষ। আমাকে ভালো হয়ে যেতে বলেছে। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি।
- সংগৃহীত