24/08/2026
পেইনকিলারের দুষ্ট চক্র: ট্রিলিয়ন ডলার ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি এবং আমাদের চিরস্থায়ী ব্যথার রহস্য। বিকল্প ও সমন্বিত চিকিৎসা কেন মূলধারায় ঢাকা পড়ে যায়? সত্যটা জানা প্রয়োজন!
একটি মাত্র পেইনকিলার বড়ি মুখে পুরে দেওয়া আর ১০ মিনিটের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা পিঠের বা হাঁটুর ব্যথা গায়েব হয়ে যাওয়া—শুনতে দারুণ লাগে, তাই না? কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, এই ১০ মিনিটের 'জাদু'র আড়ালে আপনার শরীরে আসলে কী ঘটছে?
আমরা অনেকেই অজান্তে একটি বড় চক্রের ভেতরে আটকে যাচ্ছি। আসল কারণটা না জেনে শুধুই 'ব্যথা চেপে রাখার' এই দৌড় কীভাবে আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালসের ওপর আজীবন নির্ভরশীল করে তুলছে—চলুন, খুব সহজ একটা গল্পের মতো করে বিষয়টির গভীরে ঢোকা যাক।
**১. পেইনকিলার যেভাবে আপনার ব্রেনকে 'বোকা' বানায়**
ধরুন, আপনার ঘরের কোনো একটি দেওয়াল থেকে ইলেকট্রিক শর্টসার্কিটের কারণে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এখন আপনার কাজ হওয়া উচিত ফিউজ অফ করে ফায়ার সার্ভিসকে ডাকা বা ওয়ারিং ঠিক করা। কিন্তু আপনি কী করলেন? অ্যালার্মের স্পিকারের তারটা কেটে দিলেন যাতে শব্দ না হয়!
পেইনকিলার ঠিক এই কাজটাই করে:
* **সংকেত বন্ধ করা:** NSAID বা ওপিওয়েড জাতীয় ওষুধ আপনার পেশি, জয়েন্ট বা লিগামেন্টের মূল সমস্যা মেরামত করে না; এরা শুধু মস্তিষ্কে ব্যথার সিগন্যাল যাওয়া বন্ধ করে দেয়।
* **'রিবাউন্ড' থ্রেড:** নিয়মিত ওষুধ খেলে শরীরের রিসেপ্টরগুলোর সংবেদনশীলতা কমে যায়। একই ডোজে আর কাজ হয় না, ডোজ বাড়াতে হয়। আর ওষুধ বন্ধ করলেই নার্ভাস সিস্টেম দ্বিগুণ শক্তিতে চিৎকার করে ওঠে (যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে *Hyperalgesia*)।
**২. ক্রনিক ডিজিজ: নিরাময় নয়, ব্যবসার মডেল!**
স্বাস্থ্যসেবা যখন বিশাল ব্যবসায়িক মডেলে রূপ নেয়, তখন তাদের অর্থনৈতিক মুনাফা আসে রোগী 'পুরোপুরি ভালো' হওয়া থেকে নয়, বরং রোগী 'আজীবন ওষুধ খেয়ে যাওয়া' থেকে।
* **পেটেন্টের খেলা:** ভুল পোশ্চার ঠিক করার ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যভ্যাস বা ম্যানুয়াল থেরাপিকে পেটেন্ট করা যায় না। পেটেন্ট করা যায় শুধু নতুন কেমিক্যাল মলিকিউল। তাই গবেষণার সব টাকা যায় সিন্থেটিক ড্রাগের পেছনে।
* **ব্যবসার সহজ অঙ্ক:** এককালীন নিরাময়ে লাভ কম, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী 'ডিজিজ ম্যানেজমেন্ট' থেকে বছরের পর বছর সুনির্দিষ্ট রাজস্ব আসে।
**৩. বিকল্প ও সমন্বিত চিকিৎসা কেন মূলধারায় ঢাকা পড়ে যায়?**
শরীরের নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলার যে সায়েন্টিফিক মেথডগুলো আছে (যেমন: ফিজিওথেরাপি, বায়োমেকানিক্যাল কারেকশন, অ্যাকুপাংচার, থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ), সেগুলো পিছিয়ে থাকার পেছনে মূল কারণ তিনটি:
1. **ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অর্থের অভাব:** জীবনযাত্রার পরিবর্তন বা ব্যায়াম থেকে কোটি কোটি ডলারের মুনাফা আসে না, তাই এতে বড় ফার্মাসিউটিক্যালগুলোর বিনিয়োগও নেই।
2. **আমাদের 'ইনস্ট্যান্ট' মানসিকতা:** পেইনকিলার ১০ মিনিটে কাজ করে, কিন্তু শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ করতে সময় ও রোগীর সক্রিয় পরিশ্রম লাগে। আমরা ধৈর্য ধরতে চাই না।
3. **অপচিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য:** বিজ্ঞানসম্মত বিকল্প চিকিৎসার পাশাপাশি ভুয়া প্র্যাকটিশনারদের (কোয়াকরি) ছড়াছড়ি থাকায় সাধারণ মানুষ সঠিক বিকল্প থেরাপির ওপরও আস্থা হারিয়ে ফেলে।
---
**সমাধান তবে কোথায়?**
সমাধানে আসার আগে আপনাদের সাথে একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। ২০১৬ সালের কথা, আমি তখন সবেমাত্র ইন্টার্নশিপ করছি। কমিউনিটি বেজড মেডিক্যাল সার্ভিসের অংশ হিসেবে আমাকে পাঠানো হলো দিনাজপুরের প্রত্যন্ত এক গ্রামে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি সাব-সেন্টারে।
সেখানের অনেক স্মৃতির ভিড়ে ৭৫+ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা মায়ের কথা আজও আমার হৃদয়ে ভীষণভাবে গেঁথে আছে। তিনি এসেছিলেন তীব্র হাঁটু ব্যথা নিয়ে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে রোগীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে ৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ফিজিওথেরাপি চার্জ ধরা হতো। উনার আর্থিক কষ্টের কথা ভেবে আমরা সর্বনিম্ন চার্জটাই রেখেছিলাম, এমনকি উনার অনুরোধে দুই দিনের খরচে তিন দিন চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছিলাম।
চিকিৎসা চলার ফাঁকে ফাঁকে তিনি উনার বিগত চার দশকের হাঁটু ব্যথার করুণ ইতিহাস আমাদের সাথে শেয়ার করলেন। আমাদের কাছে আসার কিছুদিন আগেই তিনি উনার শেষ সম্বল—একমাত্র গরুর বাছুরটি ১৮,০০০ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সেই টাকার মধ্যে ১৫,০০০ টাকাই শেষ হয়ে গিয়েছিল কেবল নানাবিধ ওষুধ আর প্রথাগত চিকিৎসার পেছনে। কিন্তু দীর্ঘ চার দশকের তীব্র ব্যথার কোনো উপশমই হয়নি। অথচ মাত্র এক মাস ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দিয়ে আমরা উনাকে সেই যাত্রায় ব্যাথামুক্ত করে দিতে পেরেছিলাম।
আমার প্র্যাকটিক্যাল লাইফে এমন অসংখ্য রোগী দেখেছি, যারা বছরের পর বছর শুধু ব্যথানাশক ওষুধ খেয়েই জীবন পার করে দিচ্ছেন। বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে ফিজিওথেরাপির মাধ্যমেও যে এই যন্ত্রণা থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়া সম্ভব, সে কথা কখনো তাদের বলাই হয় না; বা এই বিষয়ে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণাও থাকে না। অথচ সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পেয়ে আবার দিব্যি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরতে পারছেন।
জরুরি চিকিৎসায় ওষুধের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার স্থায়ী সমাধানের জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে:
* ব্যথার মূল কারণ চিহ্নিত করুন (এটি বায়োমেকানিক্যাল নাকি সিস্টেমিক প্রদাহ)।
* ওষুধে ব্যথা চেপে না রেখে অ্যাক্টিভ রিহ্যাবিলিটেশন ও সঠিক এক্সারসাইজের মাধ্যমে জয়েন্ট ও পেশির শক্তি ফেরান।
* প্রদাহরোধী খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনুন।
সাময়িক স্বস্তি আর স্থায়ী নিরাময় কিন্তু এক নয়! ব্যথা হলে শুধু সিগন্যাল বন্ধ না করে, আসল কারণটা খুঁজে বের করুন।
ডাঃ সোহেল আহমেদ, পিটি
বিপিটি, এমপিটি, এমডিএমআর
স্পোর্টস ফিজিওথেরাপিস্ট, মেডিকেল সেন্টার, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
কনসালটেন্ট এন্ড ফাউন্ডার, আহমেদ ফিজিওথেরাপি এন্ড রিসার্চ সেন্টার