31/07/2026
মোটামুটি বোধশক্তি বিকশিত হয়েছে এরকম মানুষ জীবন যাপনের জন্য নিচের চারটি পদ্ধতির মধ্যে ঘোরাঘুরি করে। পদ্ধতিগুলোতে যাওয়ার আগে ভয় সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার।
ভয়
ভয় সবসময় কোনো বাস্তব কিছুর দিকে নির্দেশ করে। রাস্তার কুকুর, অস্ত্রধারী মানুষ, রোগ, আগুন — এসবের প্রতি ভয় নিবদ্ধ হয়। ভয় জানে তার প্রতিপক্ষ কে। দুশ্চিন্তা ভিন্ন। সেখানে প্রতিপক্ষের মুখ দেখা যায় না। কেবল এক ধরনের অনিশ্চয়তা, এক অজ্ঞাত আশঙ্কা, যা মনের ভেতরেই জন্ম নেয়। ভয় আসে বাইরের জগত থেকে; দুশ্চিন্তা জন্ম নেয় ভেতরের জগতে। কোনো বিশ্বাস, কোনো কল্পনা, কোনো সম্ভাবনাকে মন যখন হুমকি হিসেবে গ্রহণ করে, তখন দুশ্চিন্তার জন্ম হয়। একজন ব্যক্তি যখন জ্বলন্ত ভবনে আটকে পড়ে তখন সে মৃত্যুকে ভয় পায়। একজন ব্যক্তি যখন ভাবতে থাকে, যদি হঠাৎ আমার ক্যান্সার হয়, আমি যদি ঘুমের মধ্যে মারা যাই, মৃত্যুর পরে কী হবে – তখন সে দুশ্চিন্তা করছে।
ভয় বা দুশ্চিন্তার মুখোমুখি হলে মানুষ সাধারণত তিনটি পথের একটিতে যায় — থমকে যায়, লড়াই করে, অথবা এড়িয়ে চলে। কুকুরকে ভয় পাওয়া মানুষ কুকুর দেখে থমকে যেতে পারে, কুকুরকে আঘাত করতে পারে, কিংবা পালাতে পারে। এই তিনটি প্রতিক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার কৌশল।
সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে মৃত্যু ভয়। প্রতিটি মানুষ জানে, একদিন সে আর থাকবে না। শুধু একদিন নয় — পরের মুহূর্তেও নাও থাকতে পারে। এই জ্ঞান মানুষের চেতনার গভীরে এমন এক সত্য, যাকে পুরোপুরি ভুলে থাকা যায় না, আবার সারাক্ষণ মনে রেখে বাঁচাও যায় না।
বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি সকল জীবের সবচেয়ে মৌলিক তাড়না। কিন্তু মৃত্যুর কাছে এই তাড়না পরাজিত। কারণ মৃত্যু এমন এক প্রতিপক্ষ, যার বিরুদ্ধে কোনো বিজয় সম্ভব নয়। তাই মানুষ মৃত্যুকে জয় করার চেষ্টা করে না; বরং এমনভাবে বাঁচতে শেখে যেন মৃত্যু সাময়িকভাবে অনুপস্থিত। জীবন আসলে মৃত্যুকে ভুলে থাকার শিল্প। এই ভুলে থাকার জন্য মানুষ নানা জীবনব্যবস্থা নির্মাণ করে।
চার জীবনব্যবস্থা
১. এড়িয়ে চলা
সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মৃত্যুকে জীবনের বাইরে সরিয়ে রাখা। জীবনের সবচেয়ে বড় ভয় নিয়ে কথা না বলা। মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয় এমন জিনিস থেকে দূরে থাকা। ছোটদের সামনে মৃত্যু নিয়ে আলোচনা না করা, সিনেমায় মৃত্যুর দৃশ্য আসলে টেনে দেয়া, কাপড় দিয়ে মৃতদেহ ঢেকে দেয়া, দ্রুত দাফন করা, পুড়িয়ে ফেলা, লোকচক্ষুর আড়ালে যেমন হাসপাতালে মৃত্যুর ব্যবস্থা করা – এসব কিছু করা হয় মৃত্যুকে এড়িয়ে চলার জন্য। এই সবকিছুর পেছনে একটি নীতি কাজ করে — যা চোখের সামনে কম থাকবে, তা মনের ভেতরও কম জায়গা নেবে। আমরা মৃত্যুকে সরাই না; কেবল তাকে দৃষ্টির বাইরে রাখার চেষ্টা করি।
২. অ্যাটাচমেন্ট
মৃত্যুকে ভুলে থাকার দ্বিতীয় উপায় হলো কোনো কিছুকে গভীরভাবে আঁকড়ে ধরা। কেউ অতল সমুদ্রে ভাসছে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। কোনো তীর নেই, নিচে মাটি নেই, দিক নেই। এমন অবস্থায় হাতের কাছে ভেসে আসা একটি কাঠের টুকরোও জীবন হয়ে ওঠে। মানুষের অস্তিত্বও অনেকটা তেমন। এই বিশাল, উদাসীন মহাবিশ্বে সে ভেসে আছে। তাই সে কিছু একটা আঁকড়ে ধরে। এই একটা কিছু ক্যারিয়ার হতে পারে, সফল মানুষ হওয়া হতে পারে, ভালো পিতা-মাতা হওয়ার চেষ্টা হতে পারে, ভালো মানুষ হওয়ায় চেষ্টা হতে পারে। এটা হতে পারে নিষ্ঠার সাথে ধর্ম পালন করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা, আইন মেনে চলা। এটা হতে পারে বাড়ি, গাড়ি, অর্থ-সম্পদ অর্জন নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করা।
এগুলো মানুষকে অস্তিত্বের অতল শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়ানো থেকে রক্ষা করে। এসবকে ভালোবাসে এসব মূল্যবান নয় বলে, এসবকে মূল্যবান বানানো হয়েছে; ভালোবাসে কারণ এসব ছাড়া ভেসে থাকার আর কোনো উপায় নেই। অ্যাটাচমেন্ট যত গভীর হয়, স্বাধীনতা তত সংকুচিত হয়। অ্যাটাচমেন্ট পরিবর্তন হলে বা অর্জন সম্ভব না হলে বিষণ্ণতা ধরে, অর্থহীন মনে হয়, আত্মঘাতী হয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দেয়।
৩. ডাইভারশন
মন দীর্ঘ সময় শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না। তাই মানুষ নিজেকে ব্যস্ত রাখে।
নতুন খাবার, নতুন শহর, নতুন সম্পর্ক, নতুন গান, নতুন চলচ্চিত্র, নতুন বিনোদন, নতুন পার্টি, নতুন অভিজ্ঞতা – এসব চোখ ও মনকে ভরিয়ে রাখে, ফলে সেখানে নিস্তব্ধতার কোনো অবকাশ থাকে না। নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা, আরও একটা স্কিল অর্জনের চেষ্টা, প্রোডাক্টিভিটি হ্যাকস, কন্টিনিউয়াস লারনিং, লাইফ লং ডেভেলপমেন্ট। পরবর্তী ডিগ্রি, পরবর্তী পদোন্নতি, পরবর্তী প্রকল্প, পরবর্তী লক্ষ্য, পরবর্তী জীবন, মৃত্যুর পরের জীবন, পুনর্জীবন। পরবর্তী কিছু থাকলে বর্তমানের শূন্যতা অনুভূত হয় না।
আজকে দিনটা বোরিং, কিছু ভালো লাগছে না, দেখার কিছু নেই, শোনার কিছু নেই, যাওয়ার কোন জায়গা নেই, কাজ পাগল মানুষের হাতে কাজ নেই – ডাইভারশন প্রয়োজন। মন মৃত্যুকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়, তার ব্যস্ত থাকার জন্য কিছু দরকার, এমন কিছু যা নতুন, তার ডাইভারশন দরকার।
মানুষ তাই ক্রমাগত নতুন কিছুর সন্ধান করে। নতুন অভিজ্ঞতার ক্ষুধা জীবনের প্রতি ভালোবাসা নয়; মৃত্যুকে, অর্থহীনতাকে ভুলে থাকার প্রয়োজন।
৪. সাবলিমেশন
অনেকে মৃত্যুকে এড়িয়ে চলে না। তারা তাকে জীবনের উপাদান বানিয়ে ফেলে। ভয়কে শক্তিতে, সৃজনে রূপান্তর করে।
কেউ পাহাড়ে ওঠে, কেউ আকাশ থেকে ঝাঁপ দেয়, কেউ সমুদ্রের গভীরে নামে। বিপদের সঙ্গে খেলা করে। মৃত্যু এখনো আমাকে নিতে পারেনি – মৃত্যুকে জয় করেছি।
মৃতকে বীর বানানো, অমরত্ব দান করা। মৃত্যুকে অস্বীকার করা। পিরামিড থেকে শিখা অনির্বাণ, শহিদ মিনার থেকে স্মৃতিসৌধ – সব কিছুই চোখের সামনে রাখা হয়েছে মানুষকে সাহস দেয়ার জন্য – মৃত্যুর পরেও তুমি টিকে থাকবে। তুমি মারা যেতে পারো, কিন্তু নাম বেঁচে থাকবে। এমন কিছু করো যেন তোমার নাম টিকে থাকে, তুমি বেঁচে থাকো। মৃত্যুর ভেতর থেকেই অমরত্ব নির্মাণের চেষ্টা।
পথ চারটি ভিন্ন হলেও শুরু হয়েছে একই জায়গা থেকে। আপনি কোনটি বেছে নিয়েছেন?
#দা লাস্ট মেসিয়াহ