07/05/2026
চাইল্ড সাইকোলজি বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই প্রয়োজনীয় হলেও এতে দক্ষ পেশাদারের অভাব যেমন রয়েছে, যথাযথ ট্রেইনিং ছাড়াই চিকিৎসা দেওয়ার ফলে নতুন বিড়ম্বনার ঘটনাও ঘটে অহরহ। কিন্তু যত সময় যাচ্ছে নতুন নতুন জেনারেশনের চ্যালেঞ্জ ও জটিলতা ততই নতুন নতুন পথ উন্মুক্ত করছে। যা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখা ছাড়া তাদের সাথে কাজ করা খুবই কঠিন।
নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার গুলোর বাইরে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ODD বা Conduct disorder প্রাইমারিলি বেশি আসলেও, পরবর্তীতে সেগুলো অনেকক্ষেত্রে ADHD, personality disorder, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে psychopathy বা sociopathy পর্যন্ত ডেভেলপ করতে পারে।
যেসব বাচ্চারা ভায়োলেন্ট হয়ে যায়, রেবেল করে, এটা যে কেবল তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এমনটা মোটেই নয়।
হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া বাচ্চাটার মধ্যে কেবল ডিপ্রেশন নয়, ডিপ্রেশন থেকে তৈরি হওয়া অসহায়ত্ব, সেখান থেকে ক্ষোভ, ক্রোধ ও পর্যায়ক্রমে নিষ্ঠুরতাকে অ্যাপ্রোপ্রিয়েট রেসপন্স হিসাবে দেখার মত পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
তিনজন বাচ্চাকে নিয়ে কাজ করছি বর্তমানে। যাদের তিনজনেরই ভিন্ন ভিন্ন ফর্মে প্যারেন্টাল অ্যাটাচমেন্টে ডিপ্রাইভেশন আছে। কিন্তু তিনজনের আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যে তিনজন বাচ্চার কথা বলছি তারা ১৩-১৫ এর মধ্যে। এদের প্যারেন্টাল অ্যাটাচমেন্ট কিভাবে তাদের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি ও মেইনটেইন করছে, আজকে সেটিই কিছুটা দেখার চেষ্টা করি।
প্রথমজনের সিবিলিংদের মধ্যে একজন সাইকোটিক ডিসঅর্ডারে ভুগছেন। ফলে বাবা-মা স্বাভাবিকভাবেই সে সন্তানটিকে অধিক সময় দিতে হয়েছে চিকিৎসা, ম্যানেজমেন্ট ও অন্যান্য ক্ষেত্রে। পাশাপাশি তারা দুজনেই যেহেতু কর্মজীবী, তাই যে বাচ্চাটি অতি ভদ্র, মেধাবী ও অনুগত, তাকে খুব একটা অ্যাটেনশন, অ্যাপ্রিসিয়েশন কিংবা এইজ অ্যাপ্রোপ্রিয়েট অ্যাক্টিভিটি’র পরিবর্তে প্রচুর পড়াশোনা ও অসুস্থ বড় সন্তানটির অড বিহেভিয়ার সহ্য করা, তার সাথে মানিয়ে চলা ও তাকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখতেই বলা হয়েছে। সে সেটি করেছেও এতদিন।
কিন্তু এই সবকিছু করেও সে যে অ্যাক্সেপ্ট্যান্স, সিন ফিল করা বা অ্যাপ্রিসিয়েশন পেয়েছে, তা কিন্তু নয়। তার শখ হয়ে গিয়েছিল সময় নষ্ট এবং পড়াশোনায় তার সর্বোচ্চ চেষ্টা কখনোই প্যারেন্টকে সন্তুষ্ট করতে যথেষ্ট হয়নি।
ফলে একদিন খুব সভ্য-ভব্য সন্তানটির আচরণে একে একে যুক্ত হল অবাধ্যতা, অশালীন ভাষার ব্যবহার, বখে যাওয়া সমবয়সীদের সাথে সময় কাটানো, পড়াশোনা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া, স্কুল চেঞ্জ না করলে আত্মহত্যার হুমকি দেওয়া ও বাবা-মায়ের গায়ে হাত তোলা ও ডিম্যান্ডিং বিহেভিয়ার।
দ্বিতীয় বাচ্চাটি মায়ের সঙ্গে থাকে। বাবার মৃত্যুর পর থেকে বাবার অভাবজনিত একটি সুক্ষ কষ্ট তার আছে, তবে তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার উশৃংখল আচরণ। তার সোশ্যাল ক্লাস ও বয়সে মেয়েদের মধ্যে সিগারেট খাওয়ার প্রবণতা কম দেখা গেলেও তার এই আচরণটি ছাড়াও বিপরীত লিঙ্গের অনুকরণে পোশাক পরা, ভিনদেশীদের অনুকরণে চুলের কাটিং, হাত ভর্তি কাটাকুটি ও কথা বলতে গিয়ে তীব্র অসহায়ত্ব আর অভিমানে ফুলে ফুলে ওঠা নাকের পাটায় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে আসে এক্সিস্ট্যানশিয়াল ক্রাইসিস।
মায়ের সাথে তার বনেনা ভালো। থাকতেও চায় না তার সাথে, তাই তার পয়সা চুরি করে যে বন্ধুদের কাছে রেখেছিল তারাও আবার সেটি বেমালুম গায়েব করে ফেলেছে। জীবনে যতবারই কাউকে ভরসা করেছে, তারা হয় মারা গিয়েছে অথবা তাকে অপছন্দ করতে শুরু করেছে। ফলে কাউকে বিশ্বাস করা কিংবা ভরসা করার ক্ষেত্রে শক্ত রেজিস্ট্যান্স তার আছে।
মাকে যে বড় অপছন্দ এমন কিছু নয়। কিন্তু মা যে তাকে ভালোবাসে না এতটুকু তার বদ্ধমূল ধারণা। কেননা তার জীবনের অসহায়বোধ করার সময়ে মা তার কাচজে ছিলেন না।
এছাড়া, হাসপাতালে থাকার সময়টিতে অন্য বাচ্চাদের মা খাইয়ে দেয়, যত্ন করে, সেসব দেখে তার ঈর্ষা হয়। অভিমানও হয়, কেন এইসব ভালোবাসা আমি পেতে পারি না। তাহলেই তো চুরি করা, ঘর পালানো, উশৃংখল আচরণ কিংবা নিজেকে আঘাত বা আত্মহত্যার চেষ্টা করে মনের ক্ষত ভুলানোর প্রয়োজন হতো না।
মায়ের মনটাও আবার অন্যরকম। সন্তানের বাবার সাথে বরাবরই ঝামেলা ছিল। সেই মানুষটা মরে গেলেও বাচ্চাটি তো তারই আদল। চাইলেও সব সময় অত আদর আসে না তাই। তবে ভালো যে বাসেন না তা নয়। অতগুলো দিন বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে পড়ে আছেন, ভালো না বাসলে কি ভাবতেন ওসব?
কিন্তু বাচ্চার সাব-কনশাস মাইন্ড ঠিকই পড়ে ফেলে জড়তাটুকু।
তৃতীয় বাচ্চাটি নিশ্চুপ চেয়ে থাকে। ডাক্তারদের সাথে তো কথাই বললো না। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ স্বাভাবিক, অন্য কোন রোগের লক্ষণও নেই, স্রেফ কথা বলবেনা। নজরটা শূন্য, বোকা বোকা চাহনি, ভেতরে চাপা একটা কষ্ট। একটাই ঘটনা। ভুলতে পারছেনা কিছুতেই। একাকী বসার পর দীর্ঘ সময় পেরুলে মুখ ফুটে বলে, "যারা আমাকে অপমান করেছে তাদেরকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে ইচ্ছা করে"। বিষন্নতা এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, এর মধ্যে ১৫ বারের বেশি আত্মহত্যার চেষ্টা করা হয়ে গেছে৷ বর্তমানে, ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া বাচ্চাটি চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকে।
ছোটবেলা থেকেই যথাযথ সোশ্যালাইজেশনের ঘাটতি ও সম্পর্ক তৈরির স্কিল সীমাবদ্ধ হওয়ায় রিজেকশন ও ডিস্ট্রেস টলারেট করতে পারার ক্যাপাসিটি কিছুটা কম। ফলে নিজেকে আঘাত করা বা মরে যাওয়ার চিন্তাটা অতিক্রম করতে পারেনা যখন তাকে কষ্ট দেওয়া মানুষদের সে শাস্তি দিতে পারার মত শক্তিশালী নয় বলে অসহায় বোধ করে।
তীব্র মিসট্রাস্ট ও সবাইকে খারাপ মানুষ মনে করা তার জন্য পৃথিবীকে একটা ভয়ংকর জায়গা করে তুলেছে যেখান থেকে সে পালাতে চায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাচ্চাটির ক্ষেত্রে প্যারেন্টাল অ্যাটাচমেন্ট কিভাবে ভূমিকা রেখেছে?
শিশুর একটি মৌলিক চাহিদা হল সিকিউর বেস। যেখানে সে নিরাপদ এবং আন-কন্ডিশনালি অ্যাক্সেপ্টেড ফিল করবে। এই সিকিউর বেসটা তৈরি হয় অ্যাটাচমেন্ট ফিগার হিসাবে শিশুর জীবনে প্রাথমিক পর্যায়ে যে মানুষগুলো থাকেন তাদের কাছে সেইফ, অ্যাক্সেপ্টেড, প্রোটেক্টেড এবং লাভড ফিল করার মাধ্যমে।
কোন কারণে যদি বাচ্চার এই সেন্স অফ সিকিউরিটি তৈরি না হয়, তবে একেক বাচ্চা একেকভাবে নিজের চারপাশে একটি প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করতে চেষ্টা করে, যার মাধ্যমে সে নিজেকে ভবিষ্যৎ স্ট্রেস আর কষ্ট থেকে রক্ষা করবে। এই ক্ষেত্রে কেউ কেউ সবার প্রতি খুবই আক্রমনাত্মক হয়ে উঠতে পারে, কেউ কেউ নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিতে পারে, এবং কেউ কেউ আত্মহত্যাপ্রবণও হয়ে উঠতে পারে যদি সে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয় বলে মনে করে।
কেননা একদিকে অতীত অভিজ্ঞতা ও অন্যদিকে নিরাপদ ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তার বর্তমান জীবনকে দূর্বিষহ করে তোলে।
প্যারেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে প্যারেন্ট, গার্ডিয়ান, কেয়ারগিভার বা অ্যাটাচমেন্ট ফিগাররা তাদের কথা ও আচরণের মাধ্যমে তাকে যে মেসেজগুলো দেয় এবং সেগুলোকে সে যেভাবে ইন্টারপ্রেট করে, সেগুলো ব্যবহার করেই শিশু পরবর্তী করনীয় নির্ধারণ করে।
এই সময়ে এসে পিতামাতার জন্য হেলথি ও পজিটিভ প্যারেন্টিং শেখা কেন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় কিভাবে শিশুর মনোজগতে বিরাট সব পরিবর্তন আনে ও তার গোটা জীবনকে প্রভাবিত করে তার কিছুটা ধারণা দেওয়ার জন্যেই আজকের আলোচনা।