22/07/2025
মর্গে রাখা মানিকধন
(একজন মায়ের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ)
আমার কলিজার টুকরো, আমার ধন, আমার জীবন... আমার আরাফাত। 🥹
প্রতিদিন স্কুল শেষে আমার ছেলেটা ছুটে আসে আমার কোলে। আর প্রতিদিনই তার বাবাই তাকে স্কুলে দিয়ে আসে এবং আবার কোলে করে নিয়ে আসে। চারজনের ছোট্ট কিন্তু সুন্দর পরিবার — শ্বশুর, স্বামী, আমি আর আমার আদরের মানিকধন আরাফাত। 🏠💓
🔸 সে পড়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে, ক্লাস ফাইভে।
প্রতিদিনের মতো আজও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলাম। কিন্তু আজকের সকালটা কেমন জানি অন্যরকম লাগছিলো... মৃদু বাতাস, কোলাহলমুক্ত চারপাশ, মনে হচ্ছিলো আজকের দিনটা খুব স্পেশাল। 🌤️
আরাফাতকে নিয়ে ছাদে গেলাম। কবুতরকে নিজের হাতে খাবার দেওয়া তার দারুণ একটা অভ্যাস, সেটা করল সে। 🕊️ এরপর একটু রাইটিং প্র্যাকটিস করলো, বেশ মনোযোগীভাবেশেষমেশ নাস্তা করে, হাতে পিঠাভর্তি টিফিন বক্স নিয়ে, বাবার সঙ্গে স্কুলে বেরিয়ে গেলো।
বিদায়ের আগে এসে বলল,
“মাম্মাহ, আসি।” 🧒🏻
আমাকে জড়িয়ে ধরল — তার কোমল স্পর্শে বুকটা জুড়িয়ে গেলো।
সেও হাসল, আমিও হাসলাম। মনে হলো, আমার জীবনটা ভরে গেছে।
📦 ওর জন্য বানানো পান্তুয়া পিঠা — ওর প্রিয়। আজ খুব যত্ন করে দিয়েছি ওর বক্সে।
যখন স্কুলে থাকে, আমার মন কেমন কেমন করে... অজান্তে বারবার ওর কথা মনে পড়ে। আল্লাহর কাছে ওকে সুরক্ষিত রাখার দোয়া করি। আজ অদ্ভুতভাবে ওর কথা আরও বেশি করে মনে পড়ছে।
আমি আর থাকতে না পেরে ওর বাবাকে ফোন করলাম। উনি আশ্বস্ত করলেন, “ছুটি হলে আমি ওকে নিয়ে আসছি। চিন্তা কোরো না।”
আমি তাড়াতাড়ি দুপুরের খাবার প্রস্তুত করলাম — ইলিশ আর পুঁইশাকের ঝোল, আরাফাতের পছন্দ। আজ খাবো একসাথে বসে, মায়ের হাতের খাবারে ওর মুখ ভরে উঠবে। 🍛🥬
ছুটির সময় ঘনিয়ে এল।
📞 আবার ফোন করলাম ওর বাবাকে। উনি বললেন, রওনা হয়েছেন।
মনটা কেমন যেন অস্থির!
ঠিক তখনই আমার শ্বশুর ভয়ভীত কণ্ঠে ডাকলেন।
গিয়ে দেখি টিভিতে "স্কুল ভবনে অগ্নিকাণ্ড" — আমি হতবিহ্বল! 😱
মাত্র কয়েক সেকেন্ড, অথচ মনে হলো কয়েক যুগ পেরিয়ে গেছে...
আমি দৌঁড়ে বের হয়ে গেলাম।
চোখের পানি থামানো যাচ্ছে না। আরাফাত! আমার আরাফাত কোথায়!
🔥 ছোটবেলায় একবার আগুনে তার বাম হাতের কব্জি পুড়ে গিয়েছিলো। সেই থেকে ও আগুনকে ভীষণ ভয় পায়।
যদিও দাদু তাকে পানির ভয় কাটিয়ে সাঁতার শিখিয়েছিলেন, আগুন নিয়ে ভয় আজও কাটেনি।
🚒 স্কুলে পৌঁছাতেই দেখি আগুন আর ধোঁয়ার রাজত্ব! বাচ্চাগুলো একের পর এক বেরিয়ে আসছে — কেউ অর্ধপোড়া, কেউ পুরোপুরি।
চিৎকার, কান্না, আর্তনাদে স্কুল চত্বর কাপছে।
আমি ছুটে যাচ্ছি, “আমার আরাফাত কোথায়? প্লিজ কেউ বলুন...” 😭
কেউ উত্তর দেয় না।
আরাফাতের বাবা থরথর কাঁপছে, হাউমাউ করে কাঁদছে।
হঠাৎ দেখি একজন উদ্ধারকর্মী পুড়ে যাওয়া এক শিশুকে কোলে করে বেরিয়ে আসছেন। শিশুটির শরীর পুড়ে চেনার উপায় নেই।
তবু তার কাঁধে ছিল একটা ব্যাগ — সেই ব্যাগটা নিচে রেখে বললেন,
“এই ছিল শেষ উদ্ধার হওয়া শিশুটি।”
🎒 ব্যাগটা খুলে দেখি — ভেতরে আধপোড়া খাতা, আর একটি বেঁচে থাকা পান্তুয়া পিঠা...
আমার বুকটা যেন ছিঁড়ে গেলো।
“না আল্লাহ! এটা হতেই পারে না!”
আরাফাতের বাবা নিশ্চিত করলো — এই সেই ব্যাগ, এই আমাদের আরাফাত!
আমার জ্ঞান হারিয়ে গেলো...
🛏️ জ্ঞান ফিরে দেখি হাসপাতালে। আমি ছুটে গেলাম বার্ন ইউনিটে।
আরাফাত শুয়ে আছে — পুরো শরীরে ব্যান্ডেজ, নাকে মুখে অক্সিজেন পাইপ, চোখ বন্ধ।
তাকে দেখে বুক ফেটে কান্না আসছে, অথচ মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছে না। 😢
ডাক্তার বললেন, ওর রক্তের গ্রুপ A Negative — বিরল গ্রুপ।
আমার স্বামী — আরাফাতের বাবা — নিজেই দিলো রক্ত। ❤️🩹
হাসপাতালের বারান্দায় কান্নার রোল, রক্তের জন্য হাহাকার...
রোগীর স্বজনরা অনেকে হন্যে হয়ে A Negative খুঁজছে।
এই যেন আরেক যুদ্ধক্ষেত্র — জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দোল খাচ্ছে সব মায়ের হৃদয়।
🌙 রাত হয়ে এল। আমি মিনতি করলাম, “একটু শুধু পাশে বসে থাকি... আমার ছেলের পাশে।”
ডাক্তার নার্স কেউ অনুমতি দিলো না।
ওকে নিয়ে যাওয়া হলো আইসিইউতে।
🕯️ নিস্তব্ধ সেই কক্ষ। একটিমাত্র মেশিনের শব্দ, “টিপ টপ” করে বেজে যাচ্ছে।
আরাফাত ঘুমিয়ে আছে। ওর বুকের উপর ছোট ছোট উঠানামা...
আমি মুখে মুখে ডেকেই যাচ্ছি:
"বাবা... একবার শুধু চোখটা খোল। মাম্মাহ এসেছে..."
মনে পড়ছে —
বিয়ের ৬ বছর পর কত সাধনায়, কত কষ্টে, কত দোয়ায় এই সন্তানকে পেয়েছি আমরা।
আজ সেই সন্তানকে... আমি শুধু দূর থেকে দেখতে পারি, স্পর্শও করতে পারি না।
🚑 সকাল হতেই এম্বুলেন্সে আরাফাতকে নেওয়া হলো —
কদমতলী গ্রামে, চিরনিদ্রায় শুইয়ে দেওয়ার জন্য।
তার স্কুলের সব বন্ধুরা কাঁদছে, শিক্ষকরা শোকাহত, প্রতিবেশীরা স্তব্ধ।
আজ আমার মানিকধন পেল এমন ছুটি —
যেখানে নেই সকাল, নেই স্কুল, নেই আর ফিরে আসা।
কেবল আছে চিরকালের ঘুম...
একটা অসমাপ্ত গল্প,
একটা পুড়ে যাওয়া ব্যাগ,
আর একটি মায়ের আজীবনের কান্না। 💔