29/09/2026
প্যালিয়েটিভ চিকিৎসা ব্যবস্থাতে শুধুমাত্র রোগীর শারীরিক কষ্ট লাঘবে ই গুরুত্বপূর্ণ নাকি সাথে অন্য কিছুও গুরুত্বপূর্ণ??
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগে, ঢাকার একটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা চব্বিশ জন ক্যান্সার রোগীর গল্প এই গবেষণা পত্রটি।
শিরোনামেই আছে সেই বেদনার সুর, "ক্লান্ত আত্মার প্রতিধ্বনি"। এই মানুষগুলো শুধু শরীরে নয়, মনে ও আত্মায় যে যন্ত্রণা বহন করছিলেন, গবেষকরা সেই নীরব কষ্টের কথা শুনতে বসেছিলেন তাদের বিছানার পাশে।
প্রথম যে বিষয়টি উঠে আসে তা হলো অনিশ্চয়তা আর হতাশা। রোগ নির্ণয়ের পর থেকেই জীবনের সব পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যায়। একজন মা প্রশ্ন করেন, তার কিশোরী মেয়েকে মায়ের অভাবে সমাজের কাছে কে রক্ষা করবে। আরেকজন ভাবেন, নিজের হাতে গড়া ঘরবাড়ি সবই থেকে যাবে, শুধু তিনি থাকবেন না। চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমি বিক্রি, ঋণের বোঝা, আর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা যেন এই অসুস্থতাকে আরও ভারী করে তোলে।
দ্বিতীয় স্তরে দেখা যায় অন্তর্দ্বন্দ্ব, নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে করার গ্লানি। যে মানুষ একদিন সংসারের ভরসা ছিলেন, আজ তিনিই সবার সেবার মুখাপেক্ষী। এই পরিবর্তন তাদের ভেতরে অপরাধবোধ জাগায়। অনেকে নিজের অসুস্থতার জন্য নিজেকেই দায়ী করেন। আবার অনেকে, বিশেষত পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষরা, নিজের কষ্ট চেপে রাখেন, যাতে পরিবার আরও ভেঙে না পড়ে। এই চাপা কান্না শরীরের উপসর্গকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব দেখা যায়। কারো কারো দাম্পত্য সম্পর্কে অবিশ্বাস আর দূরত্ব বাড়ে, কেউ কেউ আবার জীবনসঙ্গীর ভালোবাসা আর যত্নে নতুন করে শক্তি খুঁজে পান। চুল পড়ে যাওয়া, শরীরের পরিবর্তন, বিছানায় পড়ে থাকা তরুণ-তরুণীদের বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তারা নিজেকে একা, অদৃশ্য, সমাজের বাইরের মানুষ মনে করতে শুরু করেন।
সবচেয়ে গভীর অংশটি হলো আধ্যাত্মিক যন্ত্রণা। রোজা রাখতে না পারা, নামাজ পড়তে না পারার কষ্ট অনেকের কাছে শারীরিক কষ্টের চেয়েও ভারী মনে হয়েছে। কলোস্টমি বা ক্ষতের কারণে শুচিতা রক্ষা করতে না পারার অসহায়ত্ব তাদের আরও ভেঙে দেয়। কেউ কেউ মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে প্রশ্ন করেন, কেউবা আত্মহত্যার চিন্তা আসলেও ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তা থেকে বিরত থাকেন। আর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিক হলো, এই মানুষগুলো তাদের মনের কথা কাউকে বলতে পারেননি। সাক্ষাৎকারের সময়ই যেন প্রথমবার তারা মন খুলে কথা বলার সুযোগ পান, আর তাতেই অনেকে বলেছেন, "এত হালকা লাগছে"।
এই গবেষণা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি ফাঁক স্পষ্ট করে দেয়। রোগের চিকিৎসা যতটা গুরুত্ব পায়, মনের আর আত্মার যত্ন ততটা পায় না। গবেষকরা তাই বলছেন, প্যালিয়েটিভ কেয়ারে মানসিক কাউন্সেলিং, আধ্যাত্মিক সহায়তা, এবং পরিবারকেন্দ্রিক যত্নকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যাতে জীবনের শেষ সময়গুলোতেও মানুষ মর্যাদা আর অর্থপূর্ণতার সঙ্গে বাঁচতে পারেন।
Nadia Farheen
Mostofa Kamal Chowdhury Adil