30/06/2026
আমার বয়স ৩৪ বছর। ঢাকার উত্তরায় থাকি।আমি ঢাকার একটি স্বনামধন্য মাল্টিন্যাশনাল সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করি। বেতন ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে মাসে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার + । পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং থেকে মাসে ৫০-১০০ হাজার টাকার মতো আয় হয়। এছাড়া ঢাকায় আমার দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
মিরপুরে একটি ক্রোকারিজের শোরুম এবং মোহাম্মদপুরে একটি কাপড়ের দোকান। আরও কিছু জায়গায় আমার বিনিয়োগ রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে মাসিক আয় সাধারণত ৫ লাখ টাকার আশেপাশে থাকে, কোনো কোনো মাসে তারও বেশি হয়। আলহামদুলিল্লাহ, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল আছি।
২০২২ সালে ঢাকার উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে নিজের একটি ফ্ল্যাট কিনেছি।সেখানে একাই থাকি। দেখতে আমি একেবারে সাধারণ মানুষ। দেখতে মোটেও ভালো না, অতটা স্মার্ট না, শ্যামলা গায়ের রং, উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি। নিজেকে কখনো বিশেষ কিছু মনে করি না। একদম সাধারণ একজন মানুষ।
আমরা দুই ভাই। আমি ছোট। বড় ভাই সরকারি ফরেস্টে জব করেন। ভাবি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাবা আর বেঁচে নেই। মা আছেন। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধা ছিলেন,মা প্রতি মাসে বাবার পেনশন,মুক্তিযুদ্ধের ভাতা পাচ্ছেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি দেশের দক্ষিণাঞ্চলে, বরিশাল অঞ্চলে। মা,ভাবি, ভাতিজিরা গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। ভাইয়া বান্দরবান, আমাদের পৈত্তিক ভালই জমিজমা আছে, মাছের ঘের আছে, পুরোনো পারিবারিক সম্পদও আছে। আলহামদুলিল্লাহ, জীবন,পরিবার নিয়ে আর্থিক কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
এবার আসল কথায় আসি।
আমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমার কোনো বন্ধু নেই।
অনেকেই এটা বিশ্বাস করতে চায় না। কিন্তু সত্যি বলতে আমার জীবনে বর্তমানে এমন একজন মানুষও নেই, যাকে আমি ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে পারি।
স্কুল জীবনের বন্ধু, কলেজ জীবনের বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু—সবাই যেন ধীরে ধীরে অনেক দূরে চলে গেছে। কারও সঙ্গে ঝগড়া হয়নি, সম্পর্ক খারাপ হয়নি। কিন্তু যোগাযোগ নেই। আর সত্যি বলতে আমি নিজেও যোগাযোগ করার প্রয়োজন অনুভব করি না।
অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই কথা বলি। কাজের জন্য মিশি, প্রয়োজন হলে কথা বলি, হাসি-ঠাট্টাও করি। কিন্তু অফিস শেষ হলে আবার নিজের জগতে ফিরে যাই।
বাসার কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে সৌজন্যতার সম্পর্ক আছে, কিন্তু তার বাইরে কিছু না।
ঢাকায় আমার আপন,মামা,চাচা, ফুফুরা থাকে,কিন্তু আমি গত ১৫ বছর তাদের কারোর বাসায় ই যায় নি। হয়ত কেউ বিশ্বাস করবে না,কিন্তু সত্যই যায় নি। কিন্তু যোগাযোগ রাখি কারো কোন প্রয়োজন হলে হেল্প করি।
আমি একান্ত না পারলে কোন সামাজিক অনুসঠানে যাই না।
আমি বুঝতে পারি না কেন, মানুষের সঙ্গে বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করে না। মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতে ইচ্ছে করে না। মানুষের সঙ্গে মিশতে ইচ্ছে করে না। অথচ মানুষকে আমি ঘৃণা করি না।
সপ্তাহে দুই দিন ছুটি পাই। মাসে মোটামুটি আট দিনের মতো ছুটি থাকে। বেশিরভাগ সময় বৃহস্পতিবার রাত হলেই আমি হুট করে কোথাও বের হয়ে যাই।
কখনো বাইক নিয়ে, কখনো গাড়ি নিয়ে, কখনো ট্রেনে।
আমার নিজের একটি ছোট গাড়ি আছে, একটি বাইকও আছে। কিন্তু অনেক সময় গাড়ি বা বাইক থাকতেও ট্রেনে চলে যাই। কারণ আমার ভালো লাগে।
আমি বাংলাদেশের জেলা, উপজেলা, গ্রাম, হাট-বাজার ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি। আমার একটা ইচ্ছা আছে—যতদিন বেঁচে থাকি, বাংলাদেশের যত বেশি সম্ভব জায়গা ঘুরে দেখব।একটি মোটরহোম কিনে তা নিয়ে সারা দেশ ঘুরে বেড়াবো।
আমি কোনো পরিচিত মানুষের কাছে যাই না। কোনো আত্মীয়ের বাসায় যাই না। শুধু ঘুরি।
রাস্তায় হাঁটি। চায়ের দোকানে বসি। রিকশাওয়ালার সঙ্গে কথা বলি। দিনমজুরদের নিন্ম আয়ের লোকদের জীবন কাছ থেকে দেখি। ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে নিচের মানুষের কর্মব্যস্ততা দেখি।
দেখি সবাই কোনো না কোনো কিছুর পেছনে ছুটছে।
কেউ টাকার পেছনে।
কেউ সম্মানের পেছনে।
কেউ ক্ষমতার পেছনে।
কেউ সুখের পেছনে।
কিন্তু সবাই কি সেটা পায়?
এই প্রশ্নটা আমাকে প্রায়ই ভাবায়।
আমি এখনো রাস্তার ধারে সস্তা হোটেলে খেতে সাছন্দবোধ করি, খাওয়ার সময় আশে পাশের লোকদের সাথে গল্পো করি।
আমি শহুরে জীবন খুব একটা পছন্দ করি না। অথচ আমি নিজেই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। প্রযুক্তির মানুষ। ডিজিটাল জগতের মানুষ।
তারপরও এই কর্পোরেট জীবন, ডিজিটাল জীবন, সামাজিক প্রতিযোগিতা—এসবের সঙ্গে নিজেকে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারি না।
আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে গ্রাম।
আমাদের গ্রামের বাড়িতে গাড়ি যায়। আমার নিজেরও গাড়ি আছে। তারপরও যখন গ্রামে যাই, আমি ইচ্ছা করেই লঞ্চে যাই।
অনেকে বলে, এখনো কে লঞ্চে যায়?
কিন্তু আমার ভালো লাগে।
নদী দেখতে ভালো লাগে।
ঘাট দেখতে ভালো লাগে।
পথের মানুষের জীবন দেখতে ভালো লাগে।
বরিশালে আমাদের মূল বাড়ির পাশে আমি একটা কাঠের বাংলো টাইপের ঘর বানিয়েছি। পুরোনো দিনের কাঠের দোতলা গ্রামের ঘরের আদলে। যারা ওই অঞ্চলের তারা পরিচিত এই সব ঘরের সাথে
সুযোগ পেলেই সেখানে গিয়ে সময় কাটাই।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা বসে থাকতে আমার কোনো সমস্যা হয় না।
বৃষ্টির দিন আমি অসম্ভব পছন্দ করি। বিশেষ করে গ্রামের টিনের ঘরে বসে বৃষ্টির শব্দ শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। বিষেশ করে গভীর রাত্রে, অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু বৃষ্টি দেখি। কোনো কাজ করি না, কোনো তাড়া থাকে না। শুধু বৃষ্টির শব্দ শুনি আর ভাবি।
পুরোনো দিনের গান শুনতেও আমার খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে ৮০ ও ৯০ দশকের বাংলা গান, পুরোনো ব্যান্ডের গান, পুরোনো হিন্দি গান। অনেক সময় রাতে একা বসে চা খেতে খেতে বা বৃষ্টির মধ্যে এসব গান শুনি।
আমি মোবাইল আসক্ত না।
অবসর সময়ে বই পড়ি।
পুরোনো বাংলা নাটক দেখি।
৯০ দশকের সিনেমা দেখি।
আর একা একা ভাবি।
গত প্রায় ১০ বছরের উপর আমি কোনো আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাইনি।
মামা, খালা, চাচা, ফুফু—কারও বাসায় না।
আমার বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে ১২ বছর আগে। বিয়ের দিন তার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলাম। এরপর আজ পর্যন্ত আর যাইনি।
তাদের সঙ্গে কোনো ঝামেলা নেই। প্রয়োজন হলে সাহায্য করি। খোঁজখবরও রাখি। কিন্তু যেতে ইচ্ছে করে না।
রাজনীতি আমার একদমই ভালো লাগে না।
আমি মেয়েদের অপছন্দ করি না। বরং সুন্দর মেয়েদের দেখতে আমার ভালো লাগে।অনেক সময় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোনো মেয়ের চোখ, হাসি, চুল, পোশাক বা ব্যক্তিত্ব আমার নজর কাড়ে।আমি তাকিয়ে থাকি।অনেকে হয়তো এটাকে ভুলভাবে নেবে, কিন্তু আমার উদ্দেশ্য খারাপ না।আমি আসলে মানুষের সৌন্দর্য দেখি।
কোনো মেয়ের চোখ সুন্দর লাগে।কোনো মেয়ের হাসি সুন্দর লাগে।কোনো মেয়ের চলাফেরা সুন্দর লাগে।অনেক সময় ১০০-২০০ জন মেয়েদের মধ্যে একজনকে দেখে মনে হয়—আহা, মেয়েটা কী সুন্দর!
তবে কাউকে ভালো লাগলেও তার সঙ্গে সম্পর্ক করার বা বিয়ে করার ইচ্ছা জাগে না।বিয়ের কথা ভাবলেই মনে হয় আমি যেন একটা বন্ধনে আটকে যাব।অনেক দায়িত্ব, অনেক সমঝোতা, অনেক হিসাব।
আমি দায়িত্বকে ভয় পাই না, কিন্তু নিজের স্বাধীনতা হারানোর চিন্তা ভালো লাগে না।তাই বয়স ৩৪ হলেও এখনো বিয়ে করিনি।
আমার আশপাশে অনেকে পরিচত জনরা বিয়ের জন্য চেষ্টা করেছে,
কিন্তু আমি নিজেই আগ্রহ দেখাইনি।
রাস্তার কুকুর-বিড়ালের প্রতি আমার অনেক মায়া।প্রায় সব সময় ব্যাগে তাদের জন্য খাবার থাকে।কোনো অসহায় প্রাণী দেখলে সাহায্য করার চেষ্টা করি।
অনেক সময় মনে হয়, মানুষ আমাকে দেখলে ভাববে আমি হয়তো বেকার, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াই।কিন্তু বাস্তবতা উল্টো।আমার কাজ আছে।আয় আছে।দায়িত্ব আছে।কিন্তু মানুষের, ভিড়ে নিজেকে খুঁজে পাই না।
আমি একা থাকতে পছন্দ করি।আমি নির্জনতা পছন্দ করি।আমি মানুষের জীবন দেখতে পছন্দ করি, কিন্তু মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে পছন্দ করি না।
আমি জানি পোস্টটা অনেক বড় হয়ে গেছে।হয়তো অনেকেই পুরোটা পড়বেন না।
তবে যারা পড়েছেন, তাদের কাছে জানতে চাই—
আমার মতো কি আর কেউ আছে? এমন চিন্তা ভাবনার?
যাদের মানুষের প্রতি কোনো ঘৃণা নেই, কিন্তু মানুষের ভিড় ভালো লাগে না?
যারা একা থাকতে ভালোবাসেন, গ্রাম ভালোবাসেন, পুরোনো গান ভালোবাসেন, মানুষের জীবন পর্যবেক্ষণ করতে ভালোবাসেন, কিন্তু নিজের জীবনে খুব বেশি মানুষকে ঢুকতে দিতে চান না?
আমি কি স্বাভাবিক, আমি কি অসুস্থ, সত্যিই আমার মধ্যে কোনো সমস্যা আছে?মানষিক ভাবে দূর্বল হয়ে যাচ্ছি। আমি কি সত্যিই কি আনসোস্যাল !!
-- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক