22/02/2026
“শুভ জন্মদিন প্রিয় আম্মা”
২১ শে ফেব্রুয়ারি আমার মায়ের জন্মদিন।
১৯৪৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমার মা ঘর আলো করে এসেছিলেন মমতাজ এবং মান্নাফের কোলে। মাত্র ৫ বছর কাটতে না কাটতেই ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাভাষা ও দেশমাতৃকাকে ভালবেসে তৎকালীন পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার জন্য কারাগারে নিক্ষিপ্ত হোলেন শিশু খুকুর প্রিয় “আম্মা”। আর খুকুর ঠাঁই হোল মায়ের আঁচল হাড়িয়ে ফুফুদের আঁচল তলে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানীর “রাজপাঠ মিয়া বাড়ি” নামক গ্রামটিতে। ৫২- এর ভাষা আন্দোলনের তিব্র স্রোতে ভেসে গেল মা-মেয়ের আদর-ভালবাসায় ভরা সুন্দর পৃথিবীটি।
ছোট্ট খুকুর মায়ের সাথে দেখা হয়েছিল দীর্ঘ ১০ বছর পর। এই দীর্ঘ ১০ বছরে একদিকে যেমন মা মমতাজ বেগম কাটিয়েছেন সন্তানের স্পর্শ বিহীন মরুময় এক জীবন, অন্যদিকে শিশু খুকুকে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই শৈশবের সমস্ত চন্চলতাকে হাড়িয়ে বধুবেশে ঘর করতে যেতে হয় ফরিদপুরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে মনিরুল ইসলামের সংসারে। যে সন্তানের মা এবং বাবা দুজন ই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত, সেই সন্তানকেই স্কুলের চৌহদ্দি পাড় হবার পূর্বেই সংসারের জোয়াল তুলে দেয়া হয় ছোট্ট ঘাড়টিতে। তবে সে ঘাড়টি ছিল বড়ই শক্তিশালী…হুম, আম্মা একে একে চারটি সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন, দিয়েছেন তাদের উচ্চশিক্ষা এবং নিজেও ছাড়িয়ে ছিলেন স্কুল-কলেজের গন্ডি।
আমার বাবা তথা মনিরুল ইসলাম ছিলেন বিশিষ্ট সনেট লেখক সুফি মোতাহার হোসেনের ভাস্তে এবং অত্যন্ত সজ্জ্বন পুরুষ। তিনি বিয়ের দিনই অনুভব করতে পারেন স্ত্রীর হৃদয়ের ক্রন্দন। তিনি একটুও সময় ক্ষেপন না করে ফরিদপুর থেকে স্ত্রী খুকুকে নিয়ে যান ঢাকায় তার মায়ের কাছে। দীর্ঘ ১০ বছর পর মা ও মেয়ের পূনর্মিলন ঘটে….একজন মা হিসেবে আমি প্রতিটি মুহূর্তেই অনুভব করতে পারি সেই বিশেষ ক্ষণটিকে।
তারপর কেটে গিয়েছে বহু যূগ, আমার মা এবং আমার নানু-দুজনেই চলে গিয়েছেন সব দুঃখ, কষ্ট, ভালবাসাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে। আমার মা খুকু সবে যখন মায়ের স্নেহ-ভালবাসা পেতে শুরু করলো তখনই হাড়িয়ে ফেললো মাকে, তবে এবার চিরতরে। ফরিদপুরে বাবার ও শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল কিছুদিনের জন্য, কিন্তু এরই মাঝে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন মা মমতাজ বেগম। হাসপাতালে ভর্তি হবার পর যখন হাসপাতাল কতৃপক্ষ জানতে পারলো হাসপাতালের বিছানায় যিনি শুয়ে আছেন তিনি আর কেউ নয়, রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য লড়ে যাওয়া অসম সাহসী অকুতোভয় নারায়ণগন্জের মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের চাকুরীচ্যূত প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম তখনই ঠিক করলো তার কণ্যাসহ কাওকেই জানানো যাবে না তাঁর অসুস্থতার কথা। তৎকালীন পাকিস্থান সরকার ভয় পেতেন অগ্নিকন্যা মমতাজ বেগম এবং তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের, যদি তাঁর অসুস্থতার জন্য সরকারকে দায়ী করে আবারো আগুন জ্বলে ওঠে-এবার ঢাকার রাস্তায়! হাসপাতালে ভর্তির মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই জীবন প্রদীপ নিভে যায় এই মহিয়সী নারীর, তথা খুকুর মায়ের আর আমাদের নানুর। নানুকে তৎকালিন সরকার অতীব গোপনীয়তার সঙ্গে রাতের অন্ধকারে আজিমপুর কবরস্থানে শায়িত করার পরই শুধু খুকুকে তাঁর মায়ের মৃত্যএ সংবাদ দেয়া হয়।
আমার মা তথা মমতাজ বেগমের একমাত্র কণ্যা কোনদিনই তাঁর মায়ের কবর খুজে পাননি, শুধু জানতেন মা তাঁর শুয়ে আছে আজিমপুরে হাজারো কবরের মাঝে কোন একটিতে। এখানে আরো উল্লেখযোগ্য ঢাকায় এসে মায়ের বাসায় যেয়ে স্তম্ভিত খুকু দেখেছিলেন লন্ড-ভন্ড হয়ে যাওয়া মায়ের সংসার। নানুর ঘরের প্রতিটি কাগজ যেন একটি একটি করে ছিড়ে ফেলে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, বাদ যায়নি মায়ের প্রিয় বইগুলোও। খুকু শুধু খুঁজে পেয়েছিল ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা মায়ের একটি এ্যালবাম যার মধ্যে ছিল মায়ের কিছু সার্টিফিকেট এবং ছবি। এই এ্যালবামটিকেই আমার আম্মা তথা মমতাজ বেগমের একমাত্র কণ্যা খুকু আজীবন আগলে রেখেছেন যক্ষের ধনের মতন। সেই এ্যালবামে সংরক্ষিত একটি ছবিই হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে পোষ্ট করা আমার নানুর ছবি।
জিবৎদশায় আমার নানু তথা খুকুর মা তাঁর আপোষহীন রাজনীতির জন্য হয়েছিলেন অত্যাচারিত, পরবর্তীতেও তিনি হাড়িয়ে গিয়েছিলেন ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মহাণ ইতিহাসের পাতা থেকে। কিন্তু আমার মা, মমতাজ বেগমের একমাত্র কণ্যা খুকু একজন বাংলাদেশি হিসেবে তাঁর মায়ের ঋণ শোধ করার জন্য জীবন বাজি ধরেছিলেন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে তিনি খুঁজে বের করেছেন ৫২ এবং ৫২ পরবর্তীতে রাজনীতির সঙ্গে/ভাষা আন্দলনের সাথে যুক্ত মহান ব্যক্তিত্বদের, জেনেছেন মায়ের কথা, পুরোনো কাগজ আর ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা ঐতিহাসিক বইগুলোর পাতা উল্টে উল্টে খুঁজে বের করেছেন মায়ের নাম ও তাঁর সমঝোতাহীন লড়াইয়ের কাহিনী। কিছুটা হলেও হাড়িয়ে যাওয়া মমতাজ বেগমকে ফিরিয়ে এনেছেন ইতিহাসের পাতায়-মমতাজ বেগম থেকে ভাষা সংগ্রামী মমতাজ বেগম হিসেবে পূণরজন্ম দিয়েছেন মমতাজ বেগমের ই সেই ছোট্ট শিশু কন্যা “খুকু” যে কিনা মায়ের স্নেহ থেকে বন্চিত হয়েছিল মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর পন্চম জন্মবার্ষিকীতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে।
প্রিয় আম্মা, আমি আমার নানু ভাষা সৈনিক একুশে পদক জয়ী (মরোনোত্তর) অগ্নিকন্যা মমতাজ বেগমের নাতনী হোতে পেরে যেমন গর্বিত, ঠিক তেমনি তোমার মতন কখনো হেড়ে না যাওয়া এবং নিজ গন্তব্যের প্রতি অবিচল থাকা এক কণ্যার ঔড়ষে জন্ম গ্রহণ করে ধন্য ও কৃতজ্ঞত।
পবিত্র রমজান মাসে রোজা রেখে তোমার শুভ জন্মদিনে আমি মহান আল্লাহ্ পাকের কাছে দোয়া করি তিঁনি যেন তোমাকে এবং তোমায় জন্মদানকারী আমার নানুকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আমিন।
ছবিতে আমরা “চার প্রজন্ম”