27/08/2026
২০১০ কি ২০১১ সাল। আমি তখন দেশে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটু একটু কইরা পরিচিতি হইতেসে। আর দেশজুড়ে তখন ফরমালিন নিয়া তুলকালাম। টিভি খুললেই মাছের বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত, লাল-নীল কিট, ট্রাকভর্তি মাছ ধ্বংস। মানুষ ভয়ে মাছ কেনা ছাইড়া দিতেসে।
মেডিক্যাল কলেজের এক সিনিয়র ভাই ফোন দিলেন। খুব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলেন উনি। বললেন, এক দুই ফোঁটা ফরমালিন দিয়া মাছ মাংসের পচন ঠেকানো যায়, এইটা তুমি বিশ্বাস করো?
আমি হাসলাম। বললাম, না।
তারপর বললাম, বাইরে থেকে এক দুই ফোঁটা দেওয়ার দরকারই নাই। মরা মাছের শরীরে নিজে নিজেই ফরমালডিহাইড তৈরি হয়। ওই কিটে ওইটাই ধরা পড়ে।
তারপর আমরা দুইজনেই হাসতে থাকলাম।
কারণ ফরমালিন আমাদের কাছে খবরের জিনিস না। ফরমালিন আমাদের শরীরে লাইগ্যা থাকা একটা স্মৃতি।
অ্যানাটমি ক্লাস। ডিসেকশন ক্লাসে কাটার জন্য মরদেহগুলা ঘন ফরমালিনের চৌবাচ্চায় ডুবানো থাকত। আমরা ওইখান থেকে তুইলা আইনা কাটতাম। ওই ঝাঁঝ আমি আজও ভুলি নাই। নাকের ভিতরের ঝিল্লি যেন জ্বইলা যাইত। চোখ দিয়া পানি পড়তে পড়তে চোখ লাল হইয়া যাইত। ঘর থেকে বাইর হইয়া অনেকক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকতে হইত, বুকটা ভইরা একটু বাতাস নেওয়ার জন্য। জামায় গন্ধ লাইগা থাকত, হোস্টেলে ফিরাও ওই গন্ধ যাইত না। তারপরেও ওই পরিমাণ ফরমালিনেও মরদেহগুলা পুরাপুরি পচন থেকে রক্ষা পাইত না। আর মাছ ব্যবসায়ীরা এক দুই ফোঁটায় কেল্লা ফতে কইরা দিল।এলেম আছে বলতে হয়। সেদিন আমরা হাসছিলাম।
আর ঠিক ওই হাসির নিচে, ওই হৈচৈয়ের নিচে, ভয়ানক একটা জিনিস চাপা পইড়া যাইতেসিল। ঠিক ওই বছরগুলাতেই, ওই একই দেশে, একজন মা রান্না করতেসিলেন। কড়াইয়ে তেল। পেঁয়াজ। তারপর হলুদ। এক চিমটি। প্রতিদিনের মতো। যেই হাতটা হলুদ ছিটাইতেসিলো, সেই হাতটাই রাতে বাচ্চার কপালে জ্বর দেখে। সেই হাতটাই ভোরে স্কুলের ব্যাগ গুছায়। সেই হাতটাই বাচ্চার মাথায় ফুঁ দিয়া দোয়া পড়ে, যাতে ছেলেটার কোনো ক্ষতি না হয়। ওই হাতেই রান্নায় ছিটানো এক চিমটি হলুদে সীসা ছিল।
মা জানতেন না। বাবা জানতেন না। যে দোকানে বেচল সে জানত না। আর আমরা, যারা ডাক্তার, যারা ফরমালিনের চৌবাচ্চা থেকে মরদেহ তুইলা এনে কাটসি, আমরাও জানতাম না। আমরা তখন মাছের বাজারে ফরমালিন ধরার যন্ত্র নিয়া দাঁড়ায়ে ছিলাম।
আশির দশকে এক বিরাট বন্যায় হলুদের ফসল ভিজা যায়, রঙ হইয়া যায় ম্লান। ক্রেতা ফ্যাকাশে হলুদ কেনে না। বাজার রঙের দাম দেয়, বিশুদ্ধতার দাম দেয় না। তো কেউ একজন উপায় বাইর করল। লেড ক্রোমেট। প্লাস্টিক আর শিল্পরঙে ব্যবহার হয়। সস্তা, উজ্জ্বল, আর ওজনও বাড়ায়। কেউ খেয়াল করল না। প্রায় ত্রিশ বছর, মানে একটা গোটা প্রজন্ম। ওই ত্রিশ বছরে যেই বাচ্চাগুলা জন্মাইল, বড় হইল, স্কুলে গেল, পরীক্ষা দিল, তাদের প্রত্যেকটা ভাতের প্লেটে ওই জিনিসটা ছিল। সীসার বিষ। আমরা না জাইন্যা খাওয়াইসি।
২০১৪ সালে স্ট্যানফোর্ডের গবেষক জেনা ফরসিথ দেখলেন, বাংলাদেশের গ্রামে গর্ভবতী নারী আর শিশুদের রক্তে সীসা অস্বাভাবিক বেশি। অথচ আশেপাশে ব্যাটারির কারখানা নাই, ঘরে সীসাযুক্ত রঙও নাই। কোথা থেকে আসল এই সীসা? প্রথম জরিপেই দেখা গেল, ত্রিশ শতাংশের বেশি গর্ভবতী নারীর রক্তে সীসার মাত্রা বেশি। গর্ভবতী নারী। মানে যে মানুষটা তখন আরেকটা মানুষ বানাইতেসে। উৎসটা ছিল রান্নাঘরে।
পরীক্ষায় দেখা গেল, লেড ক্রোমেট মেশানো হলুদে সীসার মাত্রা বাংলাদেশের আইনি সীমার পাঁচশ গুণ পর্যন্ত। সীসার আইসোটোপ মিলায়ে গবেষকরা দেখাইলেন, মানুষের রক্তের সীসা আর হলুদের সীসা একই উৎসের। এইটাই প্রথম সরাসরি প্রমাণ। আর যেসব শিশুর রক্তে সীসা বেশি, তারা বুদ্ধি পরীক্ষায় সমবয়সীদের চাইতে তিন থেকে পাঁচ পয়েন্ট কম পায়। শুধু এই হারানো বুদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বছরে ক্ষতি আনুমানিক ১৬ বিলিয়ন ডলার, জিডিপির ছয় শতাংশ।এই খুনে কোনো লাশ পড়ে না। কোনো রক্ত পড়ে না। কেউ কোনোদিন থানায় যায় না। শুধু একটা জাতির গড় বুদ্ধি এক ইঞ্চি কইমা যায়, প্রতি প্রজন্মে।
শুধু একটা ছেলে ক্লাসে বইসা থাকে, আর বোর্ডের লেখাটা কিছুতেই মাথায় ঢোকে না। শিক্ষক বলেন ছেলেটা মনোযোগী না। বাবা বলেন ছেলেটার মন নাই পড়ায়। মা রাতে ছেলেকে নিয়া কাঁদেন, ভাবেন কোথায় ভুল করলাম। কেউ বলে না ছেলেটার মাথার ভিতরে বারো বছর ধইরা একটা ধাতু জইমা উঠতেসিল। প্রতিদিন। দুপুরের ভাতের সাথে। মায়ের হাতে।
কে ধরল এইটা? এক বিদেশি গবেষক আইসিডিডিয়ারবির সাথে কাজ করে। অথচ আমাদের হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী আছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত আছে, বিশ্ববিদ্যালয় আছে, গবেষণাগার আছে, পিএইচডি আছে, সেমিনার আছে, বাজেট আছে। কেউ ধরতে পারল না।
সেইদিন আমরা যা নিয়া হাসতেসিলাম, তা কোন মজার বিষয় ছিল না।
ফরমালডিহাইড খাবারে প্রাকৃতিকভাবেই থাকে, আর ফরমালিনের ক্ষতি নিয়া বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছিল সামান্য, তারপরও আতঙ্ক এমন ছড়াইল যে মানুষ জ্যান্ত মাছ কিনতে শুরু করল। সমস্যা হইল, প্রচলিত পরীক্ষা অন্য অ্যালডিহাইড, কিটোন বা অ্যালকোহলেও পজিটিভ রেজাল্ট আসে। আর এই দেশের মাছ, ফল ও সবজিতে প্রাকৃতিক ফরমালডিহাইডের স্বাভাবিক মাত্রা কত, তা নিয়া বড় কোনো গবেষণাই হয় নাই। ফল যা হইল, মাছ বিক্রেতারা জরিমানা খাইল ফরমালডিহাইড পাওয়ার কারণে, যদিও তারা বাড়তি ফরমালিন মেশায় নাই। একটা লোক ভোর চারটায় ঘাটে গিয়া মাছ কিনসে, সারাদিন বাজারে বইসা আছে, আর সন্ধ্যাবেলা তারে জরিমানা করা হইল এমন একটা জিনিসের জন্য যেইটা সে দেয়ই নাই, যেইটা মাছের শরীরে এমনিতেই থাকে।
একটা গোটা রাষ্ট্র একটা গোটা দশক খরচ করল এমন এক শত্রুর পিছনে, যেইটা মাপার যন্ত্রটাই ঠিক ছিল না।
এইটা দুর্নীতি না। এইটা আরও খারাপ। এইটা দেখানোর জন্য কাজ করা। ক্যামেরা ছিল, নাটক ছিল, উর্দি ছিল, ট্রাকভর্তি মাছ ধ্বংস করার ছবি ছিল, সন্ধ্যার খবরে হেডলাইন ছিল। আর ওই একই বাজারের পাশের গলিতে, ওই একই সময়ে, বস্তায় বস্তায় হলুদে সীসার বিষ মেশানো হইতেসিল। নিঃশব্দে। কোনো ক্যামেরা ছাড়া।
গত জুনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন হিসাব বাইর হইসে। ২০২১ সালে দূষিত খাবারে বিশ্বে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ অসুস্থ হইসে, মারা গেছে ১৫ লাখ ২০ হাজার। আর সবচেয়ে জরুরি তথ্যটা হইল, মৃত্যুর ৭৩ শতাংশের কারণ জীবাণু না, রাসায়নিক। তার মধ্যে ৪২ শতাংশ অজৈব আর্সেনিক আর ৩১ শতাংশ সীসা। জীবাণু মানুষকে অসুস্থ করে। রাসায়নিক মানুষকে মারে।
আর আমাদের পুরা ব্যবস্থাটা বানানো জীবাণুর জন্য। মেয়াদ দেখা, পচা মাছ ধরা, নোংরা হোটেল সিলগালা। রাসায়নিক দেখতে ল্যাব লাগে।
এই দেশে প্রতি বছর আনুমানিক তিন কোটি মানুষ খাদ্যবাহিত অসুখে ভোগে। ওইটা তো তাৎক্ষণিক অংশ। ওইটা আমরা দেখি, ডায়রিয়া, জ্বর, হাসপাতাল। দীর্ঘমেয়াদি অংশটা কোনো হিসাবেই ওঠে না। কারণ কিডনি বিকল হয় বিশ বছর পরে। ক্যান্সার ধরা পড়ে ত্রিশ বছর পরে। আর কমে যাওয়া বুদ্ধি কোনোদিনই ধরা পড়ে না।
দোষটা তাইলে কার?
আমরা ভাবতে ভালোবাসি, এই দেশের মানুষগুলাই খাইষ্টা। আমাদের রক্তেই সমস্যা। ঘটনা কি আসলেই তাই?
ক্রেতা যা যাচাই করতে পারে, তার দাম আছে। যা পারে না, তার দাম নাই। ক্রেতা রঙ দেখে, গন্ধ পায়, আকার বোঝে। ক্রেতা সীসা দেখে না। তাই যে বিশুদ্ধ পণ্য বানায়, সে খরচ বেশি কইরাও দাম বেশি পায় না। ফল হইল, সৎ ব্যবসায়ী ধীরে ধীরে বাজার থেকে বাইর হইয়া যায়, আর টিকা থাকে ভেজালদার। এইটা ব্যক্তির নৈতিকতার সমস্যা না। এইটা বাজারের ডিজাইনের সমস্যা। যেই বাজারে মান যাচাই করা যায় না, সেই বাজার সৎ লোককে শাস্তি দেয়। আমরা একটা এমন বাজার বানায়ে রাখসি যেইখানে সৎ থাকাটা বোকামি।
তাহলে এই ভেজাল মেশানো লোকগুলা ভয় পায় না কেন?
আইনের অভাবে না। এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা তদারকিতে পনেরোটা মন্ত্রণালয় জড়িত। একই অপরাধ একাধিক আইনে সংজ্ঞায়িত। দণ্ডবিধি ১৮৬০, বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ ১৯৫৯, বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ যেখানে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত আছে, ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯, আর নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩। শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত আছে। কেন পনেরোটা মন্ত্রনালয় থাকবে। কেন এইসব একটা মন্ত্রনালয়ের অধীনে আনা যাবেনা। কেন অভিন্ন সরল একক আইন থাকবে না? এই প্রশগুলো কেউ তোলেনা। না মিডিয়ায়। না সংসদে। আমি সংদসের আলাপ দেখি, বাংলাদেশের টক শো দেখি, পত্রিকার হেডিং দেখি। আপনাদের কখনো মনে হসে আপনার জীবনের সংকটগুলা আলাপ হইতেসে। রাজনৈতিক নেতারা আপনার সমস্যা নিয়া আদৌ ভাবে? তাদের সেই যোগ্যতা আছে? নাই।
এই যে বোম্বাস্টিং আইন কইর্যা রাখসে, তারপরও কেউ ভয় পায় না। কারণ আইনের কঠোরতা মানুষকে থামায় না। থামায় ধরা পড়ার সম্ভাবনা।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সাময়িক, ৭৮ ধারায় সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা প্রশাসনিক জরিমানা করতে পারে, কারাদণ্ড দিতে পারে না। বাস্তবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করার চাইতে জরিমানা আদায়ে বেশি আগ্রহী, আর এইটাই ভেজালদারদের সাহস বাড়াইসে। সিলগালা বা জব্দের নিজস্ব ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষ খুব কমই ব্যবহার করে। বাহান্নটা জেলায় ছোট গবেষণাগার বসানো হইসে, কিন্তু নমুনা পরীক্ষা হয় নামমাত্র। আর শাস্তির মাত্রাটা একবার দেখেন। চলতি আগস্টের ৯ থেকে ১৫ তারিখ, সারা দেশে এক সপ্তাহের অভিযানে জরিমানা হইসে সাতটা প্রতিষ্ঠানের, মোট দশ লাখ টাকা। আঠারো বিশ কোটি মানুষের দেশ। এক সপ্তাহ। সাতটা দোকান। ভেজালদারের কাছে এইটা শাস্তি না। এইটা ব্যবসার খরচ। ধরা পড়লে তিন লাখ, না পড়লে ত্রিশ লাখ। যেকোনো হিসাবি লোক মিশাইবে।
তাহলে এই ভেজালওয়ালাদের ধরবেন কেমনে?
আঠারো বিশ কোটি মানুষের খাবার প্লেট পরীক্ষা করা অসম্ভব। কিন্তু লেড ক্রোমেট কয়টা পথে দেশে ঢোকে, তা গোনা যায়। যে রাসায়নিকের খাদ্যে কোনো বৈধ ব্যবহারই নাই, তার আমদানি আর বিক্রিতে ক্রেতার নাম নিবন্ধিত করা মাত্রই এই ভেজাল থাইমা যাবে। রঙের বস্তা কিনতে গিয়া যদি নাম লিখতে হয়, ভোটার আইডি কার্ড দেখাইতে হয়, বেশিরভাগ লোক আর কিনবে না।
আর রাষ্ট্র নিজেই তো খাদ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। স্কুলের খাবার, হাসপাতাল, সেনাবাহিনী, কারাগার, ওএমএস। এই পুরা কেনাকাটা যদি শুধু পরীক্ষিত সরবরাহকারীর কাছ থেকে হয়, তাহলে এই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশুদ্ধতার একটা দাম তৈরি হবে। আইন যা পারে না, কেনাকাটা তা পারে।
রাষ্ট্র কি বিশুদ্ধ হলুদ কিনসে বা কিনতেসে? কিনে নাই। সে কি তার সাপ্লায়ারের হলুদে সীসা মাপসে? মাওএ নাই। রাষ্ট্র তো জানতোই না হলুদে সীসা মেশানো হইতেসে।
আবার দেখেন, মিলের শ্রমিক জানে বস্তায় কী মেশানো হইতেসে। ওই লোকটা সব দেখে। তথ্যদাতাকে বিশাল পুরস্কার দেন, পরিচয় গোপন রাইখা।
আর শাস্তি বাড়ায়েন না, নিশ্চিত করেন। এখন ভোক্তা অধিকার আইনে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা বা তিন বছর, নিরাপদ খাদ্য আইনে দশ লাখ টাকা বা তিন বছর। এইটা বাড়ায়ে বারো বছর করলে কিছুই বদলাবে না। বরং দুইটা ভাগ করেন। যে না জাইনা করসে, তার জন্য প্রশিক্ষণ। আর যে জাইনাশুইনা শিশুদের খাবারে স্নায়ুবিষ মিশাইসে, তার জন্য এইটা আর নিয়ন্ত্রণমূলক অপরাধ না। ওইটা শরীরের বিরুদ্ধে অপরাধ। জেল, প্রতিষ্ঠান বন্ধ, আর নাম প্রকাশ।
আর ভোক্তা হিসাবে আপনার করণীয় কী?
আপনি সীসা দেখতে পারবেন না। শুঁকতে পারবেন না। ধুইয়া ফেলতে পারবেন না। রান্নাঘরের কোনো কৌশলে ওইটা যাবে না। তাই "সচেতন ভোক্তা হন" এই কথাটা একটা প্রতারণা। ওইটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব আপনার ঘাড়ে চালান কইরা দেওয়া। যা আপনি পারেন, রঙের পিছনে ছুটবেন না। যে হলুদ বেশি উজ্জ্বল, যে মিষ্টি বেশি চকচকে, যে মাছের কানকো বেশি লাল, সন্দেহটা ঠিক ওইখানেই করেন। গোটা হলুদ কিনে বাসায় গুঁড়া করলে আপনার ঝামেলা অনেকটা কমে। তাই আসল কাজটা রান্নাঘরে না। আসল কাজটা হইল দাবি করা যে পরীক্ষার ফল প্রকাশ্য হোক। কোন ব্র্যান্ডে কবে কী পাওয়া গেছে, ওইটা রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য না। ওইটা আপনার সন্তানের জীবনের খবর।
সেই ফোনকলটার কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে।
দুইজন ডাক্তার। দুইজনেই জানি ফরমালিন জিনিসটা কী, কারণ আমাদের চোখ ওই ঝাঁঝে লাল হইসে, আমাদের নাকের ভিতর জ্বলসে। আমরা জানতাম গল্পটা ভুল।
আমরা হাসছিলাম। কিন্তু আমরা শুধু হাসছিলাম। আমরা লিখি নাই। আমরা কারও দরজায় যাই নাই। আমরা প্রশ্নটা করি নাই। ঠিক আছে, ফরমালিন যদি না হয়, তাহলে আসলে কী?
ওই প্রশ্নটা করসিল কয়েকজন বিদেশি গবেষক। তারা আমাদের গ্রামে আসল। আমাদের মায়েদের রক্ত পরীক্ষা করল। আর তারপর আমাদের হাতে ধইরা দেখাইল, আমাদের নিজেদের মশলার কৌটায় কী আছে।
আমাদের ডিসেকশন রুমের মরদেহগুলা ঘন ফরমালিনেও পুরাপুরি অক্ষত থাকত না। তবুও আমরা ভুল শত্রুর পিছনে দৌড়াইসি। ভুল চৌবাচ্চার দিকে তাকায়ে ছিলাম। ভুল যন্ত্র হাতে নিয়া বাজারে দাঁড়ায়ে ছিলাম।
আর ঠিক ওই সময়টাতেই আমাদের বাচ্চারা প্রতিদিন এক চিমটি কইরা বিষ খাইতেসিল। মায়ের হাতে। ভালোবাসার সাথে। আমরা নিজেরাও ধরতে পারি নাই।
সেই শিশুরা যেদিন আমাদের প্রশ্ন করবে, আমাদের রক্ষার দায়িত্ব নিতে পারো নাই তো আমাদের এই দুনিয়ায় আনসিলা ক্যান?
সেদিন আমরা ওই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াইতে পারব তো?
লিখা- পিনাকী ভট্টাচার্য