18/02/2026
ডায়াবেটিস এবং রমজান:
রমজান মাসে রোজা রাখা মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিধান। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এবং খাদ্যাভ্যাসের আকস্মিক পরিবর্তন বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করলে অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগী নিরাপদে রোজা রাখতে পারেন।
কারা রোজা রাখতে পারবেন না-
১। টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগী যাদের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল
২। রমজানের আগের তিন মাসে গুরুতর হাইপোগ্লাইসেমিয়া (শর্করা কমে যাওয়া) হয়েছে
৩। যাদের ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিসের ইতিহাস আছে
৪। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস (HbA1c > 9%)
৫। গর্ভবতী ডায়াবেটিক মহিলা
৬। যাদের কিডনি (ইস্টেজ ৩-৪), হৃদরোগ বা অন্যান্য জটিলতা আছে
শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম:
১। দিনের বেলা ভারী শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন
২। অতিরিক্ত গরম এবং সূর্যালোকে বাইরে যাওয়া কমিয়ে দিন
৩। প্রয়োজনীয় কাজ সকাল বা সন্ধ্যায় করুন
৪। বিশ্রাম নিন, বিশেষ করে দুপুরে
৫। ইফতারের ১-২ ঘণ্টা পর মাঝারি মাত্রার ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা বা হালকা যোগব্যায়াম উপকারী, (তারাবির নামাজ নিজেই একটি ভালো ব্যায়াম)
সেহরির পর: ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন, হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকে
পানি পান:
ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ছড়িয়ে ছড়িয়ে পর্যাপ্ত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কম পান করুন (মূত্রবর্ধক), সেহরিতে বেশি পানি পান করুন
খাদ্য ব্যবস্থাপনাঃ
খাবারের সাধারণ নির্দেশনা: ৩ বার খাবার: সেহরি, ইফতার এবং রাতের খাবার, প্রতিবার পরিমিত পরিমাণে খান, আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান (হজম ধীর হয়, দীর্ঘ সময় শক্তি দেয়)
ফল ও সবজি প্রচুর পরিমাণে রাখুন, প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
সেহরির সময়ের খাবার
জটিল শর্করা (লাল আটার রুটি, লাল চাল, ওটস)
প্রোটিন (ডিম, দুধ, ডাল, মাছ)
স্বাস্থ্যকর চর্বি (বাদাম, অলিভ অয়েল)
আঁশযুক্ত খাবার (শাকসবজি, ফল)
উদাহরণ মেনু:
লাল আটার রুটি (২-৩টি) + ডিম সেদ্ধ (১-২টি) + সবজি, ওটস + দুধ + বাদাম + ১টি মাঝারি ফল
অথবা লাল চালের ভাত (১ কাপ) + মাছ + ডাল + সবজি, দই,
সেহরিতে খাবেন না:
ভাজা-পোড়া খাবার
অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার
সাদা ভাত বা ময়দার রুটি বেশি পরিমাণে, অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার
ইফতারের খাবার হতে পারে:
রোজা খোলার সাথে সাথে- ১-২টি খেজুর + পানি, তাজা ফলের রস (চিনি ছাড়া), হালকা স্যুপ, দই বা লাচ্ছি (চিনি কম)
মূল খাবার (১৫-২০ মিনিট পর):
শর্করা + প্রোটিন + সবজি
লাল আটার রুটি বা ভাত, মাছ, মুরগি বা ডাল, প্রচুর সবজি, সালাদ
ইফতারের এড়িয়ে চলুন:
বেগুনি, পেঁয়াজু, আলুর চপ ইত্যাদি ভাজা খাবার বেশি
অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার (জিলাপি, রসগোল্লা), কোমল পানীয় একবারে বেশি পরিমাণ খাওয়া।
রাতের খাবার হতে পারে (তারাবির পর): হালকা খাবার, ফল, বাদাম, দই
হালকা স্যান্ডউইচ বা সালাদ, প্রয়োজনে হালকা ভাত ও তরকারি
ওষুধের সমন্বয়:
মেটফরমিন: সাধারণত ডোজ পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই,
সাধারণ নিয়ম: দিনে ২ বার নিবেন - সেহরি ও ইফতারের সাথে,
দিনে ১ বার নিলে: ইফতারের সাথে
সালফনাইলইউরিয়া (যেমন: গ্লিক্লাজাইড, গ্লিমেপিরাইড, ডায়ামাইক্রোন এমআর): সাবধানতা: হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি বেশি
সকালের ডোজ ইফতারে এবং সন্ধ্যার ডোজ সেহরিতে নিতে হবে
ডোজ কমানোর প্রয়োজন হতে পারে (বিশেষ করে সেহরিতে)
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ৫০% পর্যন্ত কমানো যেতে পারে
DPP-4 ইনহিবিটর (যেমন: সিটাগ্লিপটিন, ভিলডাগ্লিপটিন, লিনাগ্লিপটিন ): সাধারণত ডোজ পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না ।
SGLT2 ইনহিবিটর (যেমন: ডাপাগ্লিফ্লোজিন, এমপাগ্লিফ্লোজিন):
সাবধানতা: পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ায়
তাই পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত করতে হবে
GLP-1 এগোনিস্ট ( লিরাগ্লুটাইড, সেমাগ্লুটাইড, ওরসেমা): সাধারণত ডোজ পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই,
ইনসুলিন থেরাপি:
নিয়ম- ব্লাড গ্লুকোজ ৫-৭ মিলিমল এর মধ্যে আছে বা নিয়ন্ত্রণে আছে তাদের ইনসুলিন কমাতে হবে।
আর যাদের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ নেই তাদের ইনসুলিনের ডোজ কমানোর প্রয়োজন নেই।
বেসাল ইনসুলিন (যেমন: ল্যান্টাস, লেভেমির, ভাইব্রেনটা): সকালের ডোজ ইফতারের সময়ে স্থানান্তর করুন, যাদের সুগার নিয়ন্ত্রণ আছে ডোজ ১৫-৩০% কমবে।
রেপিড ইনসুলিন (যেমন: নোভোরেপিড, হিউমালগ): সকালের ডোজ ইফতারে,
রাতের ডোজ ডোজ সেহরিতে (৫০% কমিয়ে), আর দুপুরের ডোজ অফ হবে
মিক্সড ইনসুলিন:( মিক্সটার্ড, ম্যাক্সুলিন, ৩০/৭০, ৫০/৫০)-
সকালের ডোজ ইফতারের সময় ডোজ একই থাকবে কিন্তু রাতের ডোজ সেহরির সময় ২৫ থেকে ৫০% কমাতে হবে।
গ্লুকোজ মনিটরিং:
সেহরির আগে, সেহরির ২ ঘণ্টা পর
দুপুরে (বিশেষ করে প্রথম সপ্তাহে)
ইফতারের আগে, ইফতারের ২ ঘণ্টা পর
ঘুমাতে যাওয়ার আগে, অসুস্থ বোধ করলে যেকোনো সময়
লক্ষ্যমাত্রা:
ইফতারের আগে: ৫.০-৭.০ mmol/L (৯০-১৪৪ mg/dl)
খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর: ৫.০-১০.০ mmol/L (৯০-১৮০ mg/dl)
জরুরি অবস্থা:
অবিলম্বে রোজা ভাঙুন যদি:
১. হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করা < ৩.৯ mmol/L (৭০ mg/dl) এর নিচে নেমে যায়।
লক্ষণ: ঘাম হওয়া, কাঁপুনি, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড়, ক্ষুধা
করণীয়: তাৎক্ষণিক ১৫-২০ গ্রাম গ্লুকোজ/চিনি নিন
২. হাইপারগ্লাইসেমিয়া (শর্করা বেশি):
রক্তে শর্করা > ১৬.৭ mmol/L (৩০০ mg/dl)
লক্ষণ: অতিরিক্ত পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব, দুর্বলতা
৩. পানিশূন্যতা: তীব্র তৃষ্ণা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা
৪. অসুস্থতা:জ্বর, বমি, ডায়রিয়া
পরিশেষে রমজানের আগে অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের সাথে বিস্তারিত পরামর্শ নিন এবং তাঁর নির্দেশনা মেনে চলুন।
(Ref: Bangladesh Endocrine Society, international Diabetes Federation and DAR alliance)
Abu Shahin Sir