08/09/2026
ভেরিকোসিল — সম্পূর্ণ আলোচনা
ভেরিকোসিল হলো অণ্ডথলির ভেতরের অণ্ডকোষের শিরাগুলো অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত ও পেঁচিয়ে যাওয়া। এটি মূলত “প্যাম্পিনিফর্ম প্লেক্সাসের শিরাগুলোর ভেরিকোজ প্রসারণ”।
১. কোন বয়সে বেশি হয়?
* সাধারণত কৈশোর ও তরুণ বয়সে বেশি দেখা যায়।
* প্রায় ১৫–২৫% পুরুষের মধ্যে কোনো না কোনো মাত্রার ভেরিকোসিল থাকতে পারে।
* বাম পাশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
* ডান পাশের ভেরিকোসিল তুলনামূলকভাবে কম।
* হঠাৎ শুরু হওয়া ডান পাশের ভেরিকোসিল, বিশেষ করে শুয়ে থাকলেও কমে না গেলে, পেট বা রেট্রোপেরিটোনিয়ামের কোনো বাধা/মাস আছে কি না খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
⸻
২. লক্ষণ ও উপসর্গ
অনেক রোগীর কোনো উপসর্গই থাকে না এবং অন্য কারণে পরীক্ষা করার সময় ধরা পড়ে।
সাধারণ উপসর্গ
১. অণ্ডথলিতে ব্যথা বা অস্বস্তি
* সাধারণত মৃদু, ভোঁতা ধরনের ব্যথা।
* দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বা শারীরিক পরিশ্রমের পর বাড়তে পারে।
* শুয়ে পড়লে সাধারণত কমে যায়।
২. অণ্ডথলিতে ভারী বা টানটান অনুভূতি
৩. অণ্ডথলির শিরা ফুলে ওঠা
* দাঁড়ালে বেশি স্পষ্ট হয়।
৪. “কেঁচোর গুচ্ছের মতো” অনুভূতি
* বড় ভেরিকোসিলে অণ্ডথলির ওপর হাত দিলে প্রসারিত শিরাগুলো কেঁচোর গুচ্ছের মতো অনুভূত হতে পারে।
৫. বন্ধ্যাত্ব
* কিছু রোগীর ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা ও গঠন খারাপ হতে পারে।
* তবে ভেরিকোসিল থাকলেই বন্ধ্যাত্ব হবে—এমন নয়।
৬. অণ্ডকোষের আকার ছোট হয়ে যাওয়া
* বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত পাশের অণ্ডকোষের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
⸻
৩. শারীরিক পরীক্ষা
রোগীকে সাধারণত দাঁড়ানো এবং শোয়া—দুই অবস্থায়ই পরীক্ষা করা হয়।
দাঁড়ানো অবস্থায়
* অণ্ডথলি দেখা ও হাত দিয়ে পরীক্ষা করা হয়।
* রোগীকে ভালসালভা ম্যানুভার করতে বলা যেতে পারে।
* শিরাগুলো ফুলে ওঠে কি না দেখা হয়।
গ্রেডিং
গ্রেড ১:
শুধু ভালসালভা করলে অনুভব করা যায়।
গ্রেড ২:
স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে হাত দিয়ে অনুভব করা যায়, কিন্তু চোখে দেখা যায় না।
গ্রেড ৩:
দাঁড়ানো অবস্থায় শিরাগুলো চোখেও দেখা যায় এবং হাতেও স্পষ্ট অনুভূত হয়।
সাবক্লিনিক্যাল ভেরিকোসিল:
শারীরিক পরীক্ষায় ধরা পড়ে না, কিন্তু ডপলার আল্ট্রাসনোগ্রামে পাওয়া যায়।
⸻
৪. পরীক্ষা-নিরীক্ষা
১. অণ্ডথলির আল্ট্রাসনোগ্রাম ও কালার ডপলার
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এতে দেখা যায়—
* প্রসারিত শিরার ব্যাস
* রক্তের প্রবাহের ধরন
* ভালসালভা করলে রিফ্লাক্স হয় কি না
* অণ্ডকোষের আকার
* দুই পাশের অণ্ডকোষের তুলনা
* অন্য কোনো অণ্ডথলির রোগ আছে কি না
সাধারণভাবে ৩ মিমি বা তার বেশি শিরা এবং ভালসালভায় রিফ্লাক্স থাকলে ভেরিকোসিলের পক্ষে যায়, তবে রিপোর্টকে রোগীর শারীরিক পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।
২. বীর্য পরীক্ষা
যদি রোগীর—
* সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকে,
* বন্ধ্যাত্বের সমস্যা থাকে,
* অথবা ভেরিকোসিলের জন্য চিকিৎসা বিবেচনা করা হয়,
তাহলে বীর্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে সাধারণত দুইবার পরীক্ষা করা হয়, কারণ ফলাফলে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ওঠানামা হতে পারে।
৩. হরমোন পরীক্ষা
যদি বন্ধ্যাত্ব বা অণ্ডকোষের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার সন্দেহ থাকে:
* এফএসএইচ
* এলএইচ
* টেস্টোস্টেরন
* প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য হরমোন
৪. কিশোর রোগীর ক্ষেত্রে
দুই পাশের অণ্ডকোষের আকার ও বৃদ্ধি তুলনা করা গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত অণ্ডকোষের বৃদ্ধি পিছিয়ে থাকলে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বেশি।
⸻
৫. চিকিৎসা
সব ভেরিকোসিলের অপারেশন প্রয়োজন হয় না।
পর্যবেক্ষণ
যদি—
* কোনো ব্যথা না থাকে,
* বীর্য পরীক্ষা স্বাভাবিক থাকে,
* অণ্ডকোষের বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে,
* এবং সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা না থাকে,
তাহলে অনেক ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট।
প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় পর পর শারীরিক পরীক্ষা, ডপলার এবং কিশোরদের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
⸻
ব্যথা হলে
প্রথমে সাধারণত—
* বিশ্রাম
* দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ও অতিরিক্ত ভারী কাজ কমানো
* অণ্ডথলিকে ভালোভাবে সাপোর্ট দেয় এমন অন্তর্বাস
* প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যথানাশক
দেওয়া যেতে পারে।
তবে এগুলো ভেরিকোসিলের মূল সমস্যা দূর করে না, শুধু উপসর্গ কমায়।
⸻
৬. কখন অপারেশন বিবেচনা করা হয়?
প্রধান কারণগুলো হলো:
১. ভেরিকোসিলের সঙ্গে বন্ধ্যাত্ব এবং অস্বাভাবিক বীর্য পরীক্ষা
বিশেষ করে যখন দম্পতি সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারণ পাওয়া যাচ্ছে না।
২. কিশোরের আক্রান্ত অণ্ডকোষের বৃদ্ধি কমে যাওয়া
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি indication।
৩. দীর্ঘস্থায়ী বা উল্লেখযোগ্য ব্যথা
ওষুধ ও অন্যান্য conservative treatment-এর পরও ব্যথা থাকলে।
৪. বড় ও স্পষ্ট ভেরিকোসিল
বিশেষ করে যখন এর সঙ্গে অণ্ডকোষের কার্যকারিতা বা আকারে সমস্যা রয়েছে।
⸻
৭. অপারেশনের পদ্ধতি
মাইক্রোসার্জিক্যাল সাবইনগুইনাল ভেরিকোসিলেকটমি
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এটি পছন্দনীয় পদ্ধতি।
এতে মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে আক্রান্ত শিরাগুলো চিহ্নিত করে বেঁধে দেওয়া হয় এবং অণ্ডকোষের ধমনী ও লসিকানালী সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হয়।
অন্যান্য পদ্ধতি
* ইনগুইনাল ভেরিকোসিলেকটমি
* ল্যাপারোস্কোপিক ভেরিকোসিলেকটমি
* অ্যান্টিগ্রেড/রেট্রোগ্রেড এম্বোলাইজেশন
কোন পদ্ধতি সবচেয়ে উপযুক্ত হবে তা রোগীর বয়স, ভেরিকোসিলের ধরন, সার্জনের অভিজ্ঞতা এবং fertility status-এর ওপর নির্ভর করে।
⸻
৮. অপারেশন না করলে কী হতে পারে?
সব রোগীর ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা হবে না। তবে উল্লেখযোগ্য ভেরিকোসিল দীর্ঘদিন থাকলে—
🔸 ১. অণ্ডকোষের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে
বিশেষ করে কৈশোরে আক্রান্ত অণ্ডকোষ অন্য পাশের তুলনায় ছোট হয়ে যেতে পারে।
🔸 ২. শুক্রাণুর মান কমে যেতে পারে
* শুক্রাণুর সংখ্যা কমতে পারে
* গতিশীলতা কমতে পারে
* গঠন অস্বাভাবিক হতে পারে
ফলে সন্তান ধারণে সমস্যা হতে পারে।
🔸 ৩. অণ্ডকোষের কার্যকারিতা কমতে পারে
দীর্ঘস্থায়ী ভেরিকোসিলের সঙ্গে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়।
🔸 ৪. দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা অস্বস্তি থাকতে পারে
🔸 ৫. ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্বের সমস্যা দেখা দিতে পারে
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভেরিকোসিল থাকা মানেই ভবিষ্যতে অবশ্যই বন্ধ্যাত্ব হবে না। অনেক পুরুষের ভেরিকোসিল থাকা সত্ত্বেও স্বাভাবিক সন্তান ধারণের ক্ষমতা থাকে।
Dr.Md.Nowshad Hossain
M.B.B.S (DU) FCPS (Surgery)
Junior Consultant
General Surgery
Square Hospital Consultation & Diagnostic Center ~ Mirpur-11
Sunday and Wednesday (4:30pm -7:00 pm)
Uttara ——Monday and Tuesday (5-7 pm)