25/07/2026
চেম্বারে বসে কিছু দরকারি রিপোর্ট দেখছিলাম, ঠিক তখনই দরজার পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন পঞ্চান্ন বছরের এক প্রবীণ শিক্ষক। ওনার সঙ্গে ওনার স্ত্রী আর পঁচিশ বছরের তরুণ ছেলে। ভদ্রলোকের মুখে এক গভীর গ্লানি আর বিষণ্ণতার ছাপ। চেয়ারে বসেই তিনি বেশ অনুতপ্ত গলায় বললেন, "ডাক্তার সাহেব, রুটিন চেকআপে আমার হেপাটাইটিস বি ধরা পড়েছে।
সেই থেকে বাড়ির লোক আমাকে একরকম আলদা করে দিয়েছে। আত্মীয়স্বজন কেউ পাশে বসতে চায় না, নাতিটাকে কোলে নিতে দেয় না, সবাই নাকি ভাবছে আমার সাথে এক ঘরে থাকলে বা শ্বাস নিলে ওনাদেরও এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়বে! রোগটার চেয়ে মানুষের এই ব্যবহারেই আমি দিনে দিনে শেষ হয়ে যাচ্ছি ডাক্তার সাহেব..."
আমি ভদ্রলোকের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ওনার পরিবারের সদস্যদের দিকে তাকালাম। শান্ত গলায় বুঝিয়ে বললাম, "আপনারা অজ্ঞতার কারণে একজন মানুষকে কতটা মানসিক যন্ত্রণা দিচ্ছেন, তা হয়তো বুঝতেও পারছেন না।
হেপাটাইটিস কোনো ছোঁয়াচে সর্দি-কাশি নয় যে বাতাসে ভেসে অন্য কারো শরীরে ঢুকে পড়বে।" একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিদিন এমন অসংখ্য রোগীর মুখোমুখি হতে হয়, যারা ভাইরাসের চেয়েও মানুষের ভুল ধারণা আর সামাজিক কুসংস্কারের কাছে বেশি হেরে যান।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্যটা অত্যন্ত পরিষ্কার:হেপাটাইটিস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না, তাই হেপাটাইটিস রোগীদের সামাজিক তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকুন।
হেপাটাইটিস (বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি এবং সি) হলো লিভারের এক ধরনের সংক্রামক ব্যাধি। এটি কোনোভাবেই সাধারণ হাঁচি, কাশি, থুতু, এক ঘরে থাকা, একসাথে খাবার খাওয়া, কিংবা মেলামেশা বা হাত মেলানোর মাধ্যমে ছড়ায় না। এই ভাইরাস ছড়ায় প্রধানত দূষিত রক্ত বা রক্তের উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে, অনিরাপদ ও ব্যবহৃত সিরিঞ্জ-সুঁই ব্যবহার করলে, জীবাণুমুক্ত না করা স্যালোনের ব্লেড ব্যবহার করলে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে।
অতএব, আক্রান্ত মানুষকে একঘরে করে রাখা বা অবহেলা করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং মানসিক চাপ ও সামাজিক তিরস্কার রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও কমিয়ে দেয়। উপযুক্ত মেডিসিন চিকিৎসা, নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট এবং ডাক্তারের সঠিক দিকনির্দেশনায় হেপাটাইটিস আক্রান্ত ব্যক্তিও দীর্ঘকাল সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। আর পরিবারের বাকি সদস্যরা সহজেই হেপাটাইটিস বি-এর ভ্যাকসিন নিয়ে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারেন।
তাই আপনার পরিচিত বা প্রিয় কেউ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলে তাকে দূরে ঠেলে দেবেন না, ভুল ধারণার বশে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলবেন না। তাকে ভালোবাসা দিন, পাশে থাকুন এবং একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করুন।
মনে রাখবেন, সামাজিক কুসংস্কার ও তিরস্কার রোগের চেয়েও মারাত্মক। সঠিক তথ্য জানুন, সচেতন হোন এবং হেপাটাইটিস আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করুন।