25/05/2026
হোসেন রাব্বি, ৩২ বছর (ছদ্মনাম), বাংলাদেশ এর একটি ছোট গ্রামের বাসিন্দা, কিছুদিন আগে বিয়ে করেছেন, ১টা সন্তান ও আছে, টুকিটাকি কিছু ব্যবসার চেষ্টা করলেও কোনটাতেই ঠিক সফলতা আসেনি।
তাই পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পৈত্রিক বেশ কিছু জমি-সম্পত্তি বিক্রি করে ভাগ্যের অন্বেষণে পাড়ি জমালেন বিদেশ, স্বপ্নের দেশটির নাম সৌদি আরব! চোখে নতুন বিবাহিতা স্ত্রী আর সন্তান কে ফেলে রেখে দূর দেশে পাড়ি জমানোর বিষন্নতা একদিকে, কিন্তু অন্যদিকে আরেক স্বপ্ন, একটু স্বচ্ছলতার, একটু ভাল থাকার, অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির, কিছু টাকা পয়সা জমিয়ে দেশে আবার ফিরে আসার প্ল্যান, দেশে এসে কিছু না কিছু ব্যবসা করে ফেলাই যাবে জমানো টাকা দিয়ে!
সব ঠিকঠাক ভাবেই শুরু হল, বাইরে গিয়ে কাজ ও পেলেন, একটু শারীরিক পরিশ্রমের কাজ, কিন্তু করে ফেলতে পারবেন বলেই ভাবলেন।
সমস্যা বাধল মাস ঘানিক পর, পরিশ্রম যেন আর শরীরে সইছেনা, অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে যান, খাবারে একদম রুচি নেই, কিছু মুখে তুলতে গেলেই বমি ভাব হয়। আশেপাশের বাংগালিরা প্রায় জোর করেই একটি মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে গেলেন। সাধারন চেক আপে রক্তচাপ পাওয়া গেল ২০০/১২০মিমি মার্কারি, ইনভেস্টিগেশনের রিপোর্টে পাওয়া গেল ক্রিয়েটিনিন (সহজ বাংলায় কিডনীর পয়েন্ট) ১৭, রক্তে হিমোগ্লোবিন ৬.৫।
মিশরীয় একজন ডাক্তার চেক আপ করেছিলেন, তিনি যা বললেন তার বেশির ভাগই রাব্বি বুঝলেন না, শুধু এতটুকু বুঝলেন তার কিডনীর বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে, মাথায় যেন আকাশ ভেংগে পড়ল তার! এখন কি হবে?
রিপোর্ট এর কথা শুনে তার চাকুরিদাতাও দ্রুত বললেন দেশে চলে যেতে, দেশে গিয়ে চিকিৎসা করে ভাল হয়ে আবার ফিরে আসলে চাকুরি ফেরত পাবেন এই আশ্বাস ও দিলেন।
নিরুপায় রাব্বি জমানো টাকা দিয়ে টিকেট কেটে ফিরে এলেন দেশে, অসহায় হতবিহ্বল বাবা, মা, স্ত্রী এয়ারপোর্ট থেকেই তাকে নিয়ে গেলেন একজন কিডনী বিশেষজ্ঞের চেম্বারে, তিনি দ্রুত তাকে চেক আপ করে ব্লাড প্রেশার এবার ও অনেক বেশি পেলেন, মুখে কিছু ঔষধ দিলেন, কিডনীর পরীক্ষাগুলো রিপিট করলেন, এইবার কিডনির পয়েন্ট (ক্রিয়েটিনিন) পাওয়া গেল ২০!
দ্রুত তাকে রেফার করলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, সেখানকার কিডনী বিভাগের ডাক্তার রা আরো কিছু পরীক্ষা নিরিক্ষা করলেন, তারপর তাকে জানালেন, তার দুটি কিডনীই কাজ করছেনা, এবং এই এটি স্থায়ীভাবেই!
এবং এর পিছনের কারন তার আগে কখনো চেক আপ না হওয়া উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন! তাকে এই মুহূর্তে রক্ত সহ ডায়ালাইসিস শুরু করতে হবে!
অসহায় রাব্বি এবার পুরোপুরি ই ভেংগে পরলেন, কিন্তু কিছুত করার নাই, বেচে থাকার তাগিদে রক্ত জোগার করে রাতেই ডায়ালাইসিস এর জন্য টেম্পোরারি ভাস্কুলার এক্সেস অপারেশন করে শুরু করা হল ডায়ালাইসিস। টানা তিন দিন ৩ সেশন ডায়ালাইসিস এবং ২ইউনিট ব্লাড পাওয়ার পর তার অবস্থার উন্নতি হল ঠিক ই,
কিন্তু যখন জানতে পারলেন এই ডায়ালাইসিস তার সারাজীবন ই নিয়ে যেতে হবে সপ্তাহে ২ কিংবা ৩টি করে এসব শুনে অসহায় ভাবে ফ্যালফ্যাল করব চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলনা তার! ঢাকা মেডিকেলে এই ডায়ালাইসিস এর খরচ প্রতি সেশন ৫০০টাকা হলেও এখানে ত আর সারাজীবন ভর্তি থাকতে পারবেন না! বাইরে প্রাইভেট হাসপাতালে প্রতি সেশনের দাম ৩,০০০-৪০০০ টাকা বা আরো বেশি, আর এরকম সেশন তার সারাজীবন নিতে হবে প্রতি সপ্তাহে ২দিন! আরো ঔষধ পত্র ত আছেই!
আর একটি অপশন দেয়া হল কিডনী ট্রান্সপ্লান্ট এর, পাশে দাড়ানো স্ত্রী কিডনী দিতে রাজি, কিন্তু অপারেশন এর আগের পরীক্ষা নিরিক্ষা , অপারেশন চার্জ আর ট্রান্সপ্লান্টের পরের ঔষধের দামের পরিমান শুনে বুঝলেন, ভিটেমাটি বেচে দিয়েও হয়ত কঠিন হয়ে যাবে ম্যানেজ করা।
মোট কথা, কিছুদিন আগেও যে পরিবারটি আশায় বুক বেধেছিল একটু ভাল ভবিষ্যতের, এখন তারা পুরোপুরি অসহায়, হতবিহ্বল!
উপরের গল্পটি কিন্তু সত্যিকার অর্থে গল্প নয়, একেবারেই সত্য ঘটনা, আর এরকম ঘটনা একটি দুটি নয়, ঢাকা মেডিকেল বা জাতীয় কিডনী ইন্সটিটিউট এ ঘুরলেই এরকম অসংখ্য রাব্বির অসহায় আর্তনাদ শুনতে পাবেন।
এই নীরব ঘাতক এর নাম উচ্চ রক্তচাপ , শুধুমাত্র আগে ধরা পরলেই হয়ত জীবনযাত্রা, খাদ্যভাস পরিবর্তন আর ঔষধের নাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যেত এই রোগ, এই অসহায় অবস্থার সৃষ্টি হতনা!
এই নীরব ঘাতককে নিয়ে জনসচেতনতা তৈরীর উদ্দেশ্যে প্রতিবছর এর মত এই বছরও পুরো পৃথিবী জুড়ে ১৭ মে পালিত হয়েছে বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবস!
উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক। অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এবং এই হার্ট, কিডনী কে পার্মানেন্ট ডেমেজ করে ফেলতে পারে!
তাই
✅ নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন
✅ লবণ কম খান
✅ প্রতিদিন কিছুটা হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন
✅ ধূমপান ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ এড়িয়ে চলুন
আজই নিজের এবং পরিবারের সবার রক্তচাপ পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। দরকার হলে চিকিৎসক এর কাছে যান!
সচেতনতা হোক সুস্থ জীবনের প্রথম পদক্ষেপ।