14/04/2026
গুম অধ্যাদেশ বাতিলের ব্যাপারে সরকারের অজুহাত ও আমাদের বক্তব্য:
● অধ্যাদেশ বাতিলের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুতর পরিণতি হলো এর ফলে বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে গুমের কোনো সংজ্ঞাই আর থাকে না।
সরকার যদি সত্যিই মনে করত অধ্যাদেশে সংশোধন দরকার, তাহলে সেটি আপাতত বহাল রেখে পরে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন করা যেত।
পুরো অধ্যাদেশ বাতিল না করে আংশিক সংশোধনের এই পথটি সরকার নেয়নি। ফলে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়:
সংস্কার করতে না পারা আর সংস্কার করতে না চাওয়ার মধ্যে পার্থক্যটা এখানে কোথায়?
● সরকার দাবি করছে এই আইন নির্বাহী কার্যকারিতা ও নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেবে। আইনমন্ত্রী বলেছেন মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি ভিকটিমের জন্য আরেকটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমান।
কেন বা কীভাবে এই আইন নির্বাহী বিভাগের কার্যকারিতাকে হ্রাস করবে বা মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে, এ ব্যাপারে সরকার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি।
গুম প্রতিকার সংক্রান্ত আইনের মূল উদ্দেশ্যই হলো সরকার কর্তৃক সংঘটিত একটি বিশেষ অপরাধ যেন ভবিষ্যতে না ঘটতে পারে, সে লক্ষ্যে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
উল্লেখ্য, অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীর যেকোনো স্থাপনায় পূর্বঘোষণা ছাড়াই পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
এই বিধানটিকে "নির্বাহী কার্যকারিতার বিরুদ্ধে" বলা মানে বায়বীয় ও অপ্রমাণিত নিরাপত্তা-ঝুঁকির নামে সেইসব মানুষদের অধিকার বিসর্জন দেওয়া যাদের ওপর যুলুমের একাংশের প্রমাণ গুম কমিশনের ১,৭০০-এর বেশি নথিভুক্ত কেস হয়ে বিদ্যমান। এসবগুলো "নিরাপত্তা-ঝুঁকি"র একমাত্র দাবি এবং 'প্রমাণ'ও এসেছিল রাষ্ট্রের কাছ থেকেই।
● আইনমন্ত্রী দাবি করেছেন International Crimes Act 1973-এর অধীনে গুম সংক্রান্ত অপরাধের বিচার হতে পারে, নতুন আইনের প্রয়োজন নেই। এই দাবি তিনটি কারণে আইনগতভাবে ভুল এবং একটি কারণে রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক।
প্রথমত, দণ্ডবিধির কিডন্যাপিং ধারা (৩৫৯-৩৬৩) কেবলমাত্র অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, পুরুষের ক্ষেত্রে ১৬ বছর এবং নারীর ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে। গুমের শিকার প্রায় সকল ব্যক্তিই প্রাপ্তবয়স্ক, সুতরাং কিডন্যাপিং ধারায় বিচার শুধু অপর্যাপ্ত নয়, আইনত প্রযোজ্যই নয়।
দ্বিতীয়ত, অ্যাবডাকশন (ধারা ৩৬২) স্বতন্ত্র শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়, এটি কেবল তখনই দণ্ডযোগ্য হয় যখন ধারা ৩৬৩(ক) থেকে ৩৭৪-এর অধীনে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক অভিপ্রায় বা intent প্রমাণ করা যায়।
একটি গোপন রাষ্ট্রীয় আটকাদেশে যেখানে গন্তব্য এবং উদ্দেশ্য উভয়ই আড়াল করা হয়, সেখানে এই অভিপ্রায় প্রমাণ করা কার্যত অসম্ভব।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণ দণ্ডবিধিতে চেইন অব কমান্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধ করার, অর্থাৎ superior responsibility doctrine প্রয়োগের, কোনো পথ এখানে নেই।
তৃতীয়ত, আইসিটি আইনের অধীনে বিচার পেতে হলে প্রমাণ করতে হয় যে সংঘটিত অপরাধটি ছিল ব্যাপক বা সুপরিকল্পিত (widespread or systematic)। গণহারে গুমের বিচার আইসিটিতে কেবল তখনই সম্ভব যখন পুরো চক্র সমাপ্ত হয়ে যায়, অর্থাৎ গুম যাদের নির্দেশে হয়েছে সেই শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর।
কিন্তু কাল যদি কেউ গুম হয় এবং সেই অভিযোগ আইসিটিতে যায়, তারা বলবে আমাদের কিছু করার নেই, কারণ সেই ক্ষমতাই তাদের নেই।
আইসিটি আইনে এই প্রমাণের মানদণ্ড (threshold of burden of proof) অত্যন্ত উঁচুতে রাখা হয়েছে, যা সাধারণ দণ্ডবিধির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। গুমকে আইসিটির অধীনে নিয়ে আসার ফলে অপরাধ প্রমাণের দায়ভার ভুক্তভোগীর ওপর এমনভাবে চেপে বসেছে যে, তা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেখানে গুমের অভিযোগ সরাসরি সরকারি কোনো সংস্থার বিরুদ্ধে এবং সমস্ত তথ্য-প্রমাণ সেই সংস্থারই নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেখানে একজন সাধারণ পরিবারের পক্ষে আইসিটির এই কঠিন শর্ত পূরণ করে গুম হওয়া ব্যক্তির হদিস বের করা বা অপরাধ প্রমাণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এর চেয়েও বিপজ্জনক হলো রাজনৈতিক দিকটি। আইসিটিতে মামলা পুরোপুরি সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, অথচ এখানে এমন একটি অপরাধের বিচার করা প্রয়োজন যেখানে সরকার নিজেই অভিযুক্ত হতে পারে। সরকার যদি নিজেই কোনো অপরাধে যুক্ত হয়, তাহলে সে কেন সেই অপরাধের জন্য তদন্ত করবে?
সাধারণ মানুষ হয়তো মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বোঝেন না। কিন্তু যারা এই নীতি প্রণয়ন করছেন তারা সেই পার্থক্য ভালো করেই জানেন।
● সরকার বলেছে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কাউকে আটক করা হলে সেটাকে গুম বলা যাবে না। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি বার্তা বহন করে। ঠিক এই অজুহাতেই বিগত হাসিনা সরকার অসংখ্য মানুষকে গুম করেছিল।
সরকার যদি কাউকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক মনেই করে, সেক্ষেত্রে তাকে গ্রেপ্তার করার পর এটা স্বীকার করতে অসুবিধা কোথায় যে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে? এখানে লুকোচুরি করার প্রয়োজন কী? জাতীয় নিরাপত্তা একটি বায়বীয় অজুহাত যা সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার দরজা খুলে দেয়।
● সরকারপক্ষীয় একজন উপদেষ্টা বলেছেন "এই সরকার গুম করবে না," তাই গুম প্রতিরোধের আইনের কোনো প্রয়োজন নেই। যদি সরকারের নেক-নিয়তই যথেষ্ট হয় তাহলে গুম প্রতিরোধ কেন, দেশে কোনো আইনেরই প্রয়োজন নেই।
বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনের সীমাবদ্ধতাই শেখ হাসিনাকে ক্রমশ স্বৈরাচারে পরিণত করেছিল। এই কাঠামো যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে পরবর্তী যেকোনো সরকারের ক্ষেত্রেও সেই একই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কাঠামোগত সংকটকে কাঠামোগতভাবে মোকাবেলা করতে হবে, যা ভালো মানুষ বা ভালো সরকারের দোহাই দিয়ে সমাধান করা যাবে না।
● ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট জাতিসংঘে Instrument of Accession জমা দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে (ICPPED) ৭৬তম রাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এবং ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে এই সনদ আইনিভাবে কার্যকর।
লক্ষণীয় বিষয় হলো - এটি স্রেফ স্বাক্ষর নয়, এটি accession, যা আইনিভাবে ratification-এর সমতুল্য।
এই সনদের ৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী গুমকে একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেশের নিজস্ব আইনে অন্তর্ভুক্ত করা এখন রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। প্রচলিত অধ্যাদেশ বাতিল করা সেই বাধ্যবাধকতার সরাসরি লঙ্ঘন।
Convention on Enforced Disappearances-এর কমিটি (CED) নিয়মিতভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতির প্রতিবেদন চেয়ে থাকে। সনদে যোগ দেওয়ার পরপরই কার্যকর অধ্যাদেশটি কেন বাতিল করা হলো, সেই ব্যাখ্যা সেই কমিটির কাছে দিতে হবে।
● গুমের একটি বিশেষ দিক হলো এটি একটি চলমান অপরাধ (continuous crime)। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একজন মানুষ যতদিন নিখোঁজ থাকেন, ততদিন পর্যন্ত ধরে নেওয়া হয় যে অপরাধটি প্রতি মুহূর্তেই ঘটছে।
এই যৌক্তিক কারণেই গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে বিচারের জন্য সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা (statute of limitations) রাখা হয়নি। তবে বর্তমান অধ্যাদেশ বাতিল করে গুমকে সাধারণ দণ্ডবিধির অধীনে রাখা হলে বিচারের ক্ষেত্রে তামাদির প্রশ্ন চলে আসবে এবং হাসিনা আমলে ঘটে যাওয়া অনেক গুমের ঘটনা আইনি জটিলতায় ঢাকা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
দীর্ঘ পনেরো বছরের এই অপরাধের বোঝা যদি স্রেফ আইনি মারপ্যাঁচে বিচারের আওতার বাইরে চলে যায়, তবে তা হবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য দ্বিতীয়বার বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া।
ইন্তিফাদা বাংলাদেশ