08/03/2026
নারী দিবস: সমান হওয়ার নয়, পরিপূরক হওয়ার বাস্তব গল্প
আমাদের সমাজে নারী নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই একটি শব্দ খুব বেশি শোনা যায়—“সমান”। অনেকেই বলেন নারীকে পুরুষের মতো একদম সমান হতে হবে। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন নারীর ভূমিকা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।
কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। প্রকৃতি কখনো কপি-পেস্ট করে কিছু তৈরি করে না। প্রকৃতি ভারসাম্য তৈরি করে। আর সেই ভারসাম্যের মধ্যেই নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে বোঝা যায়—প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, পরিপূরক হিসেবে।
একটু সহজভাবে ভাবুন।
যদি পৃথিবীতে শুধু পুরুষেরই প্রয়োজন হতো, তাহলে আল্লাহ নারীদের সৃষ্টি করতেন না। আবার যদি শুধু নারীরাই যথেষ্ট হতো, তাহলে পুরুষদেরও সৃষ্টি করা হতো না।
কিন্তু আমরা দেখি—দুজনেই আছে, এবং দুজনের বৈশিষ্ট্য আলাদা। এই আলাদা হওয়াটাই আসলে সমস্যার নয়; বরং এটিই সৃষ্টির ভারসাম্য।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পুরুষরা শারীরিকভাবে বেশি শক্তিশালী। অন্যদিকে নারীরা অনেক সময় বেশি ধৈর্যশীল, সহনশীল এবং আবেগিকভাবে সংবেদনশীল।
এগুলোকে প্রতিযোগিতার বিষয় বানালে সমস্যা তৈরি হয়। কিন্তু যদি এটাকে পরিপূরক হিসেবে দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি অনেক পরিষ্কার হয়ে যায়।
তবুও বাস্তবে আমাদের সমাজে কিছু সাধারণ সমস্যা দেখা যায়।
প্রথম সমস্যা: মেয়েদের স্বপ্নকে ছোট করে দেখা
অনেক পরিবারে এখনো একটি কথা খুব স্বাভাবিকভাবে বলা হয়—
“মেয়েদের এত পড়াশোনা করে কি হবে? শেষ পর্যন্ত তো সংসারই করবে।”
ধরা যাক একটি পরিবারের দুই সন্তান। একজন ছেলে, একজন মেয়ে। ছেলেটির পড়াশোনার জন্য কোচিং, বই, সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু মেয়েটিকে বলা হচ্ছে—
“এত পড়ার দরকার নেই, রান্না শেখো।”
কিন্তু যদি একটু ভেবে দেখা যায়, তাহলে প্রশ্ন আসে—কেন?
যে মেয়েটি পড়াশোনায় ভালো, যার স্বপ্ন আছে সমাজে কিছু করার—তার সুযোগ কমিয়ে দিলে শুধু একজন মানুষের স্বপ্নই ভাঙে না; অনেক সময় সমাজও একজন সম্ভাবনাময় মানুষকে হারায়।
দ্বিতীয় সমস্যা: গৃহিণীদের কাজকে তুচ্ছ মনে করা
আরেকটি খুব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো—যেসব নারী বাড়িতে থাকেন, তাদের কাজকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
আমরা অনেক সময় শুনি, “সে তো বাসায়ই থাকে।”
কিন্তু বাস্তবে একজন গৃহিণীর দিনটি কেমন?
সকালে সবার আগে ঘুম থেকে ওঠা, পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করা, সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ কেউ থাকলে তার যত্ন নেওয়া, পরিবারের আবেগিক পরিবেশ ঠিক রাখা—এসব কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই।
ধরা যাক একটি ছোট শিশুর কথা। সে প্রথমে ভাষা শিখছে, আচরণ শিখছে, ভালো-মন্দ শিখছে। এই শেখার সবচেয়ে বড় অংশটি সে কার কাছ থেকে পায়? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার মায়ের কাছ থেকেই।
অর্থাৎ একজন মা শুধু একটি শিশুকে বড় করছেন না; তিনি ভবিষ্যতের একজন মানুষ তৈরি করছেন।
তৃতীয় সমস্যা: পরিপূরকের জায়গায় প্রতিযোগিতা তৈরি করা
কখনো কখনো আমরা নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে অজান্তেই প্রতিযোগিতায় পরিণত করি।
কিন্তু একটু বাস্তবভাবে ভাবলে দেখা যায়—জীবনের অনেক ক্ষেত্রে একজন যা পারে না, অন্যজন সেটি পারে।
ধরা যাক একটি পরিবারে কঠিন একটি সময় এসেছে। সেখানে হয়তো বাবা বাইরে কঠোর পরিশ্রম করছেন, পরিবারকে আর্থিকভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য। আবার একই সময়ে মা তার ধৈর্য, মানসিক শক্তি এবং যত্ন দিয়ে পরিবারটিকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছেন।
এই দুই ভূমিকার কোনোটাই ছোট নয়।
একজন শক্তি দিয়ে ধরে রাখে, আরেকজন মমতা দিয়ে ধরে রাখে।
এই দুই শক্তি একসাথে থাকলেই একটি পরিবার সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পায়।
সমাধান কোথায়?
সমাধান খুব বড় কোনো তত্ত্বে নয়, বরং আমাদের চিন্তার পরিবর্তনে।
প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে—নারী ও পুরুষ আলাদা হতে পারে, কিন্তু সেই আলাদা হওয়াটাই সমাজের শক্তি।
দ্বিতীয়ত, একটি পরিবারে ছেলে এবং মেয়ে—দুজনের স্বপ্ন ও প্রতিভাকেই গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
তৃতীয়ত, গৃহিণীদের অবদানকে সম্মান করা দরকার। কারণ তারা হয়তো অফিসে যান না, কিন্তু তারা প্রতিদিন একটি পরিবারের ভিত্তি তৈরি করেন।
এজন্যই
নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি সহজ কিন্তু গভীর সত্য—
নারী ও পুরুষ কেউই একা সম্পূর্ণ নয়।
একজন যেখানে শক্তি দেয়, অন্যজন সেখানে যত্ন দেয়।
একজন যেখানে কঠোরতা দেয়, অন্যজন সেখানে কোমলতা দেয়।
আর এই দুই শক্তির মিলেই তৈরি হয় একটি পরিবার, একটি সমাজ, এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী।
যখন একটি পরিবারে একজন বাবা তার মেয়ের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেন, একজন ভাই তার বোনকে সম্মান করেন, এবং একজন স্বামী তার স্ত্রীর মতামতকে মূল্য দেন—তখনই সেই পরিবার সত্যিকারের ভারসাম্য পায়।
সমান হওয়ার প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—
আমরা কি একে অপরের পরিপূরক হতে পারছি?
আপনি কি মনে করেন? আপনার মতামত জানান,,,,,,,,,,
লেখা : রুবিনা ইসলাম
ডিপার্টমেন্ট অফ সাইকোলজি
Kazi Azimuddin College
সেশন: 24-25