20/04/2026
রাশিয়ার পথে আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় যাত্রা (পর্ব–২) ✈️🇷🇺 (আমার রাশিয়ায় অবস্থানকালীন সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
“রাশিয়ায় সেই দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিন ছিল … I ” আল্লাহর অশেষ রহমতে অবশেষে আমরা রোস্তভ ইউনিভার্সিটিতে এসে পৌঁছালাম। তামিলনাড়ুর সেই বড় ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যিনি পানির ব্যবস্থা করে আমাদের জীবন বাঁচিয়েছেন। তিনি আমাদের ইউনিভার্সিটির ডিন অফিস অবধি পৌঁছে দিলেন।
আমরা দুজন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মানুষ লাগেজ নিয়ে দ্বিতীয় তলা ডিন অফিসের ভেতরে প্রবেশ করলাম।
একবার লাগেজ হারিয়ে যে বিপদে পড়েছি তার আর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। ডিন অফিসের ভেতরে থাকা সবাই আমাদের দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। মনে হলো যেন তারা ভূত দেখছেন 👻। এরা কারা! কোত্থেকে এলো! ডিন অফিসের ভেতরে কেউ লাগেজ নিয়ে ঢোকে নাকি!
একজন ৬ ফিট লম্বা দৈত্যাকার সুঠাম দেহের সুপুরুষ আমাদের দিকে এগিয়ে আসলেন। তিনি ভাঙা ভাঙা ইংলিশে আমাদের সবকিছু জিজ্ঞেস করলেন। আমরা পুরো ঘটনা তাকে খুলে বললাম।
তিনি আমাদেরকে অফিসের ভেতরেই বসতে দিলেন এবং আশ্বস্ত করলেন আমরা যেন চিন্তা না করি । আমাদের জন্য তৎক্ষণাৎ হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে 🏨।
পরে জানতে পারলাম, ওই ভদ্রলোক ছিলেন আমাদের অংকের শিক্ষক I তিনি কাউকে ফোন করে আসতে বললেন, আর আমরা ডিন অফিসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। পরে যতবার এই ঘটনাটা আমার মনে পড়েছে, ততবারই হাসি পেয়েছি। ডিন অফিসে কি কেউ লাগেজ নিয়ে ঢোকে নাকি?
অবশেষে যে এল, সে এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা—মঙ্গোলিয়ান মহাবীর চেঙ্গিস খানের বংশধর, নাম তার উশুখু বায়ার উলানবাটর! না, সে যুদ্ধ করার জন্য রাশিয়ায় আসেনি। সে এসেছে মেডিকেল পাস করে ডাক্তার হওয়ার জন্য। যদিও তার বাবা একজন জাঁদরেল মঙ্গোলিয়ান আর্মি জেনারেল।
উশুখু আমাদেরকে রিসিভ করে সামনে সামনে হাঁটতে লাগল, আমরা লাগেজ দুটো টানতে টানতে ওকে অনুসরণ করলাম। একটা সময় ও একটা সাদা বিল্ডিংয়ের কাছে এসে থেমে গেল।
ও রাশিয়াতে আরও ২ মাস আগে এসেছে। অল্প স্বল্প চালিয়ে নেওয়ার মতো রুশ ভাষায় কথা বলতে পারে। ও আমাদেরকে নিয়ে কমিনড্যান্টের কাছে নিয়ে গেল। হোস্টেল সুপারকে কমিনড্যান্ট বলে।
তিনি একজন রাশিয়ান ভদ্র মহিলা। সব ফরমালিটি শেষ করে তিনি আমাদের দুজনের হাতে চাবি বুঝিয়ে দিলেন।
আমি আর শাহনুর উশুখুর সাথে একটা রুমে প্রবেশ করলাম। আজ থেকে এটাই হলো আমাদের থাকার রুম। দ্বিতীয় তলায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো।
আর উশুখু হলো আমাদের রুমমেট। জীবনের এই প্রথম কোনো বিদেশি মঙ্গোলিয়ানের সাথে আমাদের থাকতে হবে।
উশুখু অল্প ইংলিশ জানতো, আমরা ওর সাথে ইংলিশ ভাষায় আর বাকিটা আকার ইঙ্গিতে ইশারায় কথা বলতাম।
উশুখু ছিল ৬ ফিট লম্বা, বোচা নাকের অধিকারী, গোলাকার টিপিক্যাল মঙ্গোলয়েড ফেস। কালার ছিল ধবধবে সাদা, রেগে গেলে একদম লাল বর্ণ ধারণ করতো। সব সময় হাফ প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতো। শান্তিপ্রিয় ছেলে ছিল।
ওর সাথে আমি এক বছর রুম শেয়ার করে থেকেছি।
আমরা একটু ফ্রেশ হলে উশুখুকে নিয়ে পাশের মার্কেটে শপিংয়ের জন্য বের হলাম। এটা অনেকটা সুপার মার্কেটের মতো শপ।
রস্তভ শহর রাশিয়ার সুন্দর শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমি আর সাহানুর কিছু হাঁড়ি-পাতিল, আলু, তেল, লবন, পিয়াজ, একটা ব্রেড, কিছু ডিম, আর মিনারেল ওয়াটার কিনে বাসায় ফিরে আসলাম I
রাশিয়ান কিচেনগুলো একটু অন্যরকম। সব ইলেকট্রিক চুলা। এক চুলায় ৪টা হাঁড়ি বসানো যায়। প্রথম প্রথম এই চুলায় রান্না করতে খুব কষ্ট হয়েছে। চুলার হিট বুঝতাম না। আমি আর সাহানুর ডিম ভেজে ব্রেড দিয়ে খেয়ে এই রাতটা পার করলাম। আমরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর ঘুমানোর সুযোগ পেলাম।
এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি। ঘুম ভাঙে উশুখুর ডাক শুনে।
এখন ফ্রেশ হতে হবে, ওয়াশরুম যেতে হবে—একি মহা বিপদ। আমি ওয়াশরুম খুঁজছি, এমন সময় দেখি কিছু স্কার্ট পরা স্বর্ণকেশী রাশিয়ান মেয়েরা এক লিটারের পানির বোতল হাতে নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। আমিতো খুবই অবাক হলাম। ছেলেদের হোস্টেলে এত ভোরে মেয়ে এলো কোথা থেকে!
আসলে আমার পাশের রুমটাতেই ওরা থাকে। বলে রাখা ভালো, রাশিয়ান টয়লেটে কোনো পানির ব্যবস্থা নেই। ওরা শুধু টয়লেট পেপার ব্যবহার করে।
যে দুইটা মেয়ের হাতে পানির বোতল ছিল, ওরা রাশিয়ান চেচেন অঞ্চলের মুসলিম মেয়ে। একজনের নাম দিয়া আর একজনের নাম মারিয়া। ওরা ফার্স্ট ইয়ার মেডিকেল স্টুডেন্ট, আমাদের থেকে এক বছরের সিনিয়র I
আমি টয়লেটে গিয়ে কোনো পানি না পেয়ে ফিরে আসলাম। খুবই আশাহত হলাম। এটা ছিল রাশিয়ায় আমার জন্য আরেকটা ধাক্কা। নতুন দেশ, নতুন রীতিনীতি—মানিয়ে নিতেই হবে।
গতকালের কেনা পানির বোতলটাই এখন আমার একমাত্র সম্বল I রুমে এসে ওটা নিয়ে ওয়াশরুমে গেলাম। খাবার পানি রেখে দেওয়ার চেয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াশরুমে ঢুকলাম—একি, দরজা কোথায়? দরজা ছাড়া আবার টয়লেট হয় নাকি! পাশের টয়লেটে উঁকি দিলাম, যা দেখলাম তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। এক আফ্রিকান ভদ্রলোক দরজা ছাড়া টয়লেটে বসে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। আমি লজ্জা পেয়ে কোনো মতে সেখান থেকে সরে এলাম।
দৌড়ে রুমে এসে সাহানুরের কাছে বললাম, “এই সাহানুর, এদিকে আসো—এখানকার ওয়াশরুমে তো দরজা নেই! কী করব, তাড়াতাড়ি বলো!”
ও আমার কথা শুনে নিজেও কিছুটা অবাক হয়ে গেল। বলল, “কি! তাই নাকি?” আমি বললাম, “বিশ্বাস না হলে দেখে আসো।”
ও গিয়ে সত্যিই সেই আফ্রিকান ভদ্রলোককে দরজা ছাড়া হাই কমোডের উপর বসে থাকতে দেখল। সেও খুব লজ্জা পেল।
এখন তো আর লজ্জা পেলে চলবে না—প্রকৃতি বড়ই নিষ্ঠুর, তার ডাকে সাড়া না দিয়ে উপায় আছে!
আমি আর সাহানুর এবার টয়লেটের দরজা খুঁজতে বের হলাম। অবশেষে স্টোররুমের এক কোণায় টয়লেটের ভাঙা দরজা আবিষ্কার করলাম। অনেকটা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মতোই খুশি হলাম। 😆
দুজন মিলে সেটাকে টেনে-হিঁচড়ে টয়লেটের মুখে এনে রাখলাম। আমি বোতলে পানি ভরে ভেতরে গেলাম। দরজাটা কোনো মতে টয়লেটের সামনে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখলাম।
আর সাহানুরকে বললাম, “তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দাও, যাতে কেউ ভেতরে ঢুকে না পড়ে!”
এভাবেই আমি আর ও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলাম।
পোস্টটি ধৈর্য সহকারে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। ❤️
স্বাস্থ্য টিপস ও পরামর্শের জন্য নিচের পেইজটি ফলো করুন। 👇
https://www.facebook.com/share/1CYMET92iC/
✈️ #বাংলাগল্প
#গল্প #ভ্রমণকাহিনী #ফেসবুকপোস্ট #ভাইরাল #লাইফস্টোরি
🇷🇺