01/07/2025
প্রবন্ধ: কালান্তরের পঞ্চভূতে সভ্যতার সংকট ও মানুষের ধর্ম
"কালান্তর" কেবল সময়ের পরিক্রমাই নয়, এটি একটি সচেতন বিবেচনা—যেখানে মানুষের বিবেচনা ও অবিবেচনার দ্বন্দ্ব যুগে যুগে সভ্যতার নির্মাতা ও বিনাশক উভয় হিসেবেই কাজ করেছে। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই জন্ম নেয় লোকহিত ভাবনা, আর তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে সংকীর্ণ স্বার্থ ও লোভের ঘূর্ণি।
মানুষের প্রকৃত "লড়াইয়ের মূল" কিন্তু চিরকালই এই বিবেচনাবোধের মধ্যে নিহিত। সমাজে যে "কর্তার ইচ্ছায় কর্ম" হয়, তা যদি জনগণের হিতসাধনে ব্যবহৃত না হয়, তবে তা দমননীতি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ছোট ও বড়ো সকল সংগ্রামে মানুষ নিজের অবস্থান নির্ধারণ করেছে—কখনও বাতায়নিকের পত্র লিখে, কখনও আবার রক্ত ঢেলে।
শক্তির পূজা যেন অন্ধ অনুসরণ না হয়, তাই প্রয়োজন শিক্ষার মিলন, অর্থাৎ জ্ঞানের আলোয় সমাজকে আলোকিত করা। সত্যের পথ সহজ নয়, কিন্তু সেই সত্যের আহবান যুগে যুগে মানুষকে পরিচালিত করেছে চরকা ঘোরানোর মতো ধৈর্য আর আত্মনির্ভরতার পথে। এই চরকা ছিল কেবল এক তাঁতের প্রতীক নয়, বরং স্বরাজ সাধন এর এক গর্বিত দ্যোতক।
এ সংগ্রাম ছিল সকলের, শুধু উচ্চবর্ণ বা অভিজাতদের নয়। তাই শূদ্র ধর্ম কিংবা রায়তের কথা অবহেলার নয়, বরং গণআন্দোলনের প্রাণ ছিল তারা। এই আন্দোলন শুধু ভারতবর্ষের গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না; বরং স্বপ্ন ছিল বৃহত্তর ভারত—যেখানে জাতপাতের বিভেদ নয়, থাকবে সাম্য, মৈত্রী ও সম্মান।
কিন্তু সেই আদর্শ তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন হিন্দু মুসলমান এক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে। এই ঐক্যের বার্তা দিয়েছিলেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, যিনি বলেছিলেন, ধর্ম হোক নিজস্ব, কিন্তু দেশ হোক সবার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাষ্ট্রনৈতিক মত এ আমরা দেখতে পাই মানবিকতার নির্ভুল নির্দেশনা—যেখানে জাতীয়তাবাদ নয়, মানবতাবাদই মুখ্য। তিনি সরাসরি রাজনীতিতে না এলেও তাঁর চিন্তা প্রভাব ফেলেছে হিজলী ও চট্টগ্রাম এর তরুণ বিপ্লবীদের মাঝে, যারা রক্ত দিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল প্রচলিত দণ্ডবিধি আদৌ ন্যায়ের প্রতিফলন কিনা।
এই বিপ্লবের অন্যতম রূপকার ছিলেন নারী। হ্যাঁ, সেই যুগেও নারী কেবল প্রেরণা নয়, নেতৃত্বেও এগিয়ে এসেছে। কন্গ্রেস ছিল তাদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, কিন্তু তাদের অবদান ছিল দল ছাড়িয়ে দেশের প্রতিটি স্তরে।
এই ধারা থেকেই উঠে এসেছেন দেশনায়ক, যাঁরা ‘মহাজাতি-সদন’ গড়েছেন কেবল ইট-পাথরের দালান হিসেবে নয়, বরং ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। এভাবেই গড়ে উঠেছিল এক নবযুগ, যেখানে মানুষ বলেছিল—প্রলয়ের সৃষ্টি নয়, চাই নতুন সৃজন।
এই নবযুগের প্রথম শর্ত ছিল আরোগ্য—শুধু শারীরিক নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক আরোগ্য। আজ যখন আবার সভ্যতার সংকট ঘনিয়ে আসে, তখন প্রশ্ন উঠে, আমাদের সত্যিকার ‘মানুষের ধর্ম’ কী?
উত্তর লুকিয়ে আছে পঞ্চভুত-এর মধ্যে—মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশ, যা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। মানুষ যদি নিজের ধর্মে—প্রকৃতি, সত্য, করুণা, সাম্য ও ত্যাগে—অটল থাকে, তবেই সেই কালান্তরের পথে আবার আলো জ্বলে উঠবে।