29/06/2025
♦আমাদের চোখের মধ্যে একটি লেন্স থাকে, যা আলোকরশ্মিকে রেটিনার ওপর ফোকাস করে । এই লেন্সটি যখন ঘোলাটে হয়ে যায়, তখন তাকে ছানি বলে।
বয়সজনিত কারণ ছাড়াও আরও নানা কারণে ছানি পড়তে পারে । অনেক ক্ষেত্রে এমনকি মাতৃগর্ভস্থ বা সদ্যোজাত শিশুর চোখেও ছানি দেখা যায় ।
চোখে আঘাত লাগলে ছানি পড়তে পারে।
যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করছেন, তাঁদের চোখে ছানি পড়তে পারে।
যাঁদের পারিবারিক ছানি পড়ার প্রবণতা আছে, তাঁদের অল্পবয়সে ছানি পড়তে পারে ।
যাঁদের ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো মেটাবলিক অসুখ আছে, তাঁদেরও তাড়াতাড়ি ছানি পড়তে পারে ।
♦ছানি পড়লে নিম্নলিখিত উপসর্গগুলি দেখা যায়
(1) দৃষ্টিশক্তি আবছা হয়ে যায় ।
(2) ঘন ঘন চশমার পাওয়ার পাল্টাতে হয়, নতুন চশমাতেও সন্তোষজনক ফল পাওয়া যায় না ।
(3) কম আলোতে চলাফেরা করতে সমস্যা হয়
(4) রাতে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায় ।
(5)আলোর চারপাশে রংধনুর রঙের ছটা দেখা যায় ।
(6) রঙের ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়ে যায়, দৃষ্টি হলদেটে হয়ে আসে।
(7)চল্লিশ বছর বয়সের পর কাছের ছোট লেখা পড়তে চশমা লাগে । কিন্তু ছানি পড়লে অনেক ক্ষেত্রে চশমা ছাড়াই আবার কাছের লেখা পড়া যায় । এতে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই, এটি ছানি পড়ার প্রথম লক্ষণ।
এই উপসর্গগুলি দেখা দিলে চোখের ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে ।
♦প্রাথমিক অবস্থায় খুব অল্প ছানি হলে চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করে কিছু দিন কাজ চালানো যায় ।তবে অপারেশন ই একমাত্র চিকিৎসা।
কিন্তু যদি ঘন ঘন চশমার পাওয়ার পাল্টাতে হয় বা রোগীর চলাফেরা করতে অত্যধিক সমস্যা হয়, সেক্ষেত্রে দেরি না করে অপারেশন করাই শ্রেয় ।
ছানি অত্যধিক পরিপক্ক হয়ে গেলে অপারেশনের সময় নানা প্রকার জটিলতা হতে পারে ।
তাছাড়া ছানি অত্যধিক পরিপক্ক হয়ে গেলে চোখের মধ্যে ফেটে যায় এবং যন্ত্রণা দায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, রোগী চিরকালের মতো অন্ধ হয়ে যান।
ছানি অপারেশনের আগে রোগীর সুগার, প্রেশার, ই সি জি পরীক্ষা করে নেওয়া হয়।
রোগীর চোখের পর্দা বা রেটিনা এবং অপটিক নার্ভও পরীক্ষা করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরী । রেটিনা বা অপটিক নার্ভের সমস্যা থাকলে অপারেশনের পর রোগীর দৃষ্টিশক্তি আশানুরূপ হবে না।
♦ছানির অপারেশন
ছানি অপারেশনে, চোখের ভিতরের অস্বচ্ছ লেন্সটি বের করে তার জায়গায় কৃত্রিম স্বচ্ছ লেন্স বসানো হয়।
ছানি অপারেশন বিভিন্নভাবে করা হয়।
যেমনঃ
১) ফ্যাকো সার্জারী (সেলাই বিহীন ছানি অপারেশন)
২) প্রচলিত ছানি অপারেশন -ক) সেলাইযুক্ত খ) সেলাইবিহীন (এস, আই,সি,এস)
♦ফ্যাকো সার্জারী
ফ্যাকো সার্জারি, ছানি অপারেশনের এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। এটি একটি সহজ অপারেশন। একটি ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ফ্যাকো মেশিনের সাহায্যে ঘোলা লেন্সটিকে ভেঙ্গে ছোট ছোট টুকরায় বের করে আনা হয় এবং তার জায়গায় একটি নতুন কৃত্রিম লেন্স বসানো হয়।
পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে। এই কৃত্রিম লেন্সটি পূর্বের স্বাভাবিক লেন্সের মত কাজ করবে। একে Intraocular Lens বা চোখের প্রতিস্থাপিত লেন্স বলে।
♦ফ্যাকো সার্জারীর সুবিধাসমূহঃ
১) এই পদ্বতিতে ঘোলা লেন্সটিকে ভেঙ্গে ছোট ছোট টুকরায় বের করে আনা হয়। ফলে না কেটে, শুধুমাত্র একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র (২.২-৩.২ মি.মি.) করে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব।
২) সেলাই বিহীন।
৩) রক্তক্ষরণ সাধারণত হয় না, হলেও সামান্য।
৪) অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাসপাতালে থাকতে হয় না,অপারেশনের পরেই বাড়ী চলে যাওয়া যায়।
৫) খাবারের ব্যাপারে কোন বিধি নিষেধ নেই।
৬) চোখ সামান্য কাটা হয় বলে দ্রুত সেরে উঠে।
৭) প্রায় ব্যাথামুক্ত।
♦প্রচলিত ছানি অপারেশনের অসুবিধাঃ
১) এই অপারেশনে ঘোলা লেন্সটিকে একসাথে বের করে আনা হয়। ফলে বেশি কাটতে হয়।প্রায়
২) বেশি কাটার কারনে রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা থাকে, ব্যাথা অনুভব হতে পারে এবং সেরে উঠতে বেশি সময় নেয়।
♦প্রতিস্থাপিত লেন্স ( Intraocular Lens)
চোখের ভিতরে অস্বচ্ছ লেন্সটিকে সরিয়ে যে কৃত্রিম লেন্সটি বসানো হয়,তাকে প্রতিস্থাপিত লেন্স বলে।
এটি দুরকমের হয়ঃ
১) শক্ত লেন্স (Rigid Lens)
২) নরম লেন্স (Foldable Lens)
♦শক্ত লেন্সের ( Rigid/Foldable Intraocular Lens) অসুবিধাঃ
১) শক্ত বলে ভাঁজ করা যায় না। ফলে বেশি কাটতে হয়।
২) বেশি কাটার কারনে প্রদাহ, রক্তক্ষরণ, ব্যাথা সবকিছুই বেশি হয় এবং সেরে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগে।
৩) পুনরায় ঘোলা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে(শতকরা ৩০-৩৫ ভাগ)। সেক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি পুনরায় কমে যায়।
৪)তুলনামুলক দাম কম।
♦নরম লেন্স ( Soft Foldable Intraocular Lens) এর সুবিধাঃ
১) নরম হওয়ায় ভাঁজ করা যায়। ফলে শুধুমাত্র একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র করে লেন্স প্রতিস্থাপিত করা যায়।
২) কম কাটার কারনে প্রদাহ, ব্যাথা এবং রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা প্রায় থাকে না এবং খুব দ্রুত সেরে উঠে।
৩) পুনরায় ঘোলা হওয়ার সম্ভাবনা শক্ত লেন্সের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অনেক কম। শতকরা ১-১০ ভাগ।
৪)তুলনামূলক দাম বেশি।
♦লেন্স প্রতিস্থাপনের পর পুনরায় ঘোলা দেখা
লেন্সের চারপাশের একটি আবরণ থাকে, সামনের আবরনের ঠিক পেছনে একজাতীয় কিছু কোষ থাকে, এগুলোকে বলা হয় লেন্স ইপিথিলিয়াল কোষ
( LEC ) আধুনিক ছানি অপারেশনে সামনের কিছু অংশ কেটে,ভিতর থেকে লেন্সের অস্বচ্ছ অংশ বের করে আনা হয়। ফলে সামনের আবরনের কিছু অংশ এবং পিছনের আবরন সম্পূর্ন থেকে যায় একে ক্যাপ্সুলার ব্যাগ বলে, এই ব্যাগের ভিতর কৃত্রিম লেন্স প্রতিস্থাপন করা হয়। থেকে যাওয়া সামনের আবরনের সাথে লাগানো কোষগুলো পরবর্তীতে বৃদ্ধি পেয়ে পিছনে চলে আসে এবং পুনরায় পেছনের স্বচ্ছ আবরণকে অস্বচ্ছ করে, যার ফলশ্রুতিতে রোগি আবার কম দেখে। একে বলা হয় Posterior Capsule Opacification(PCO) অথবা পুনরায় ছানি।
♦কিভাবে ছানি পুনরাবৃত্তি ( PCO) প্রতিরোধ করা যায়ঃ
আধুনিক ছানি অপারেশনের মূল লক্ষই হচ্ছে, ছানির পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করা কিংবা এটিকে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসা। অনেকগুলো পদ্বতিতে ছানির পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করা যায়, এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-
১) ফ্যাকো পদ্ধতিতে ছানি অপারেশন-কারন মেশিনের সাহায্যে সামনের আবরনের কোষ এবং লেন্সের অস্বচ্ছ অংশ ভালভাবে পরিষ্কার করা যায়, যা প্রচলিত ছানি অপারেশনে খুবই কষ্টসাধ্য
২)উন্নতমানের লেন্স প্রতিস্থাপন
Alcon Lens ( আমেরিকায় তৈরী এবং FDA Approved)
1. Alcon PMMA ( শক্ত লেন্স )
2. Alcon AcrySof Single Piece ( নরম লেন্স )
3. Alcon Acrysof IQ ( নরম লেন্স )
এই উন্নতমানের লেন্স নরম লেন্স তাই সহজে ভাঁজ করে চোখে ঢুকানো যায়। চোখে ক্ষুদ্র (২.২-৩ মি.মি. ) ছিদ্র করে লেন্স প্রবেশ করানো হয়, ফলে চোখে প্রদাহ কম হয়।সিঙ্গেল পিস এবং AcrySof নামক Acrylic উপাদানে তৈরি, যা সহজে ভাঁজ হয় এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নত দৃষ্টি দেয়।হাইড্রোফোবিক ( Hydrophobic ) উপাদানে তৈরি বলে লেন্সের পুনরায় ঘোলা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
🔺ছানির চিকিৎসা না করলে কি হবে?
দৃষ্টি ধীরে ধীরে কমতে থাকবে । বেশি দেরি করলে গ্লুকোমা, প্রদাহ, তীব্র ব্যাথাসহ পুরোপুরি অন্ধ হয়ে মারাত্মক জটিলতা বয়ে আনতে পারে।