14/05/2025
#বিচিত্র এই দুনিয়ায় হরেকরকম মানুষের বসবাস।
সব সময় আমরা চিকিৎসকরা এমন রোগী পাই, কিন্তু সবাইকে জানানো হয় না অথবা জানাই না। কিন্তু আমি আজ এই কাহিনী বলবো, মনের কষ্ট থেকে।
ঘটনা :১
স্থান: অপারেশন থিয়েটার, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।
গত ১৩/০৫/২৫, সোমবার, সময় আনুমানিক সন্ধ্যা ৬ টা বাজে। এই ভদ্রলোক আমাদের অপারেশন থিয়েটারে আসেন ড্রেসিং করাতে। তার রোগ Diabetic foot ulcer. নিয়মিত ড্রেসিং করতে হয়।
আমি ড্রেসিং করার আগে রোগীর কি সমস্যা, কত টুকু ইনভলভ দেখতে ব্যান্ডেজ খুলি।
ব্যান্ডেজ খুলে দেখি রোগীর আক্রান্ত পা থেকে পুজ পরছে, আর পোকা হাটছে এবং ১ টা আঙ্গুল আগে থেকেই ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং পাশের আরেকটা আঙ্গুল ও পচে গেছে। রাখা যাবে না।
রোগীর সাথে থাকা লোক কে ডাকলাম দেখতে এবং যে আঙ্গুল একদম মরে পচে গেছে সেটা রাখা যাবে না তা জানাতে। রোগী দেখে বমি করেই ফেলবে এমন অবস্থায় তারাতাড়ি বললো, স্যার যেটা ভালো মনে হয় করেন, বলে চলে গেলো।
আমি রোগীকে জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে হলো।
তার উত্তর : হঠাৎ করেই হয়েছে।
আমি : মনে মনে হাসলাম এবং তাকে বললাম " বাবা! এটা জীবনেও কয়েকদিনে হঠাৎ করে হওয়ার রোগ না। আমরা প্রতিদিনই আপনার মতো রোগী পাই।
আবার জিজ্ঞেস করলাম : ডায়াবেটিস কত বছর ধরে?
উনি উত্তর দিলেন : ২০ বছর।
তারপর বুঝিয়ে বললাম। আপনার ডায়াবেটিস হয়তো অনেক দিন ধরেই কন্ট্রোলে নেই। নিয়ম কানুন ঠিক মতো মানেন না। তাই আপনার আজ এতো কষ্ট। কেউ আপনার পাশে দাড়াতেও চায় না।
যাইহোক, তাকে সব কিছু বুঝিয়ে বললাম এবং অপারেশন করলাম।
এখন কথা হলো এসব কেন হয়?
কারণ টা একদম সোজা।
-আপনি নিয়ম মানেন না।
⛔ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে 3D সুত্র মানতে হবে।
D-Diet (পরিমিত খাদ্য আহার করা)
D-Drug (নিয়মিত ঔষধ খাওয়া)
D-Discipline (নিয়মিত ব্যায়াম করা/ কমপক্ষে ৩০ মিনিট করে হাটা)
এই ৩ টির একটাও যদি আপনি বাদ দেন, আপনি পুরোপুরি সুস্থ থাকবেন না। সুতরাং চেষ্টা করবেন ৩
3D সুত্র মেনে চলতে।
মনে রাখবেন একমাত্র চিকিৎসকই জনগণের একদম কাছের ।
আমরা চিকিৎসকরা শুধু চিকিৎসা দেই কিন্তু সুস্থ করার মালিক আল্লাহ। আল্লাহ সব কিছু একটা উছিলায় করেন, আমরা হলাম উছিলা।
আপনাদের নিশ্চই মনে আছে। করোনার সময় অনেক রোগীকে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলো। পরিবারের লোকজন সেই সব কোভিড আক্রান্ত রোগিদের ঘরে ফেলে চলে গেছে। সেই সময় অসহায় জীবন নিয়ে অনেকে মরে গিয়েছিল, পরেছিলো শুধু তাদের লাশ।
অনেকে চিকিৎসা নিতে এসেছে কিন্তু বাচানো যায়নি সেই মৃতদের লাশ পর্যন্ত নেয়নি।
কিন্তু চিকিৎসকরা সব সময় আপনাদের পাশে ছিলো। নিজের জীবন, নিজের পরিবার সব কিছু ছেড়ে, আপনাদের সেবায় হাসপাতালে পরেছিলেন। কত চিকিৎসক এই কোভিড পেন্ডেমিকের সময় চিকিৎসা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে জানেন?
আমি শিউর -জানেন না।
আচ্ছা পরিবার গুলো কেন তাদের একা ঘরে রেখে চলে গেলো?
কেন তাদের লাশ গুলো হাসপাতাল থেকে নিলো না?
- মরে যাওয়ার ভয়ে?
- না! আসলে তারা মানুষ হয়ে জন্মিয়েছে কিন্তু মানুষ হতে পারেনি। মনুষ্যত্ব নেই তাদের মাঝে।
আর এই যে রোগীটা আমাদের কাছে আসলো।
যেখানে তার রক্তের সম্পর্কের মানুষ জনও গন্ধে তার কাছে আসেনা।
যদিও আমার রক্তের কেউ না, আমরা চিকিৎসকরাই সে রোগীর অপারেশন করলাম।
এমন হাজারো পচা পচা রোগী প্রতিদিন কোন না কোন হাসপাতালে যাচ্ছে। আর আমাদের চিকিৎসকরা যত্ন সহকারে চিকিৎসা করে রোগীকে সুস্থ করছে।
তারপরও দেখতে পাই। আপনারা বুঝে না বুঝে হাসপাতালে চিকিৎসকের গায়ে হাত তুলছেন।
খুব কষ্ট পাই এসব দেখে। আপনারা যদি মনে করেন ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেছে, তার মানে আপনি সঠিক চিকিৎসা জানেন। তাহলে চিকিৎসাটা তো আপনারা নিজেই দিয়ে দিলে পারেন। চিকিৎসকের কাছে কেন নিয়ে আসেন?
প্লিজ এসব বন্ধ করেন। আপনারা যদি এসব করতেই থাকেন, চিকিৎসকরা আতঙ্কিত হবে, তখন তারা যদি চিকিৎসা না দেয়, সেই রোগীর কি হবে?
মনে রাখবেন, চিকিৎসকদের সাথে রোগীদের কোন শত্রুতা নেই। প্রত্যেক চিকিৎসকই ১০০ ভাগ চেষ্টা করে তার রোগীকে বাঁচাতে এবং সুচিকিৎসা দিতে।
হাতে যদি সময় থাকে ২৪ ঘন্টার জন্য একদিন একজন চিকিৎসক এর সাথে থাকবেন, তারপর দেখবেন, চিকিৎসকরা রোগীদের জন্য কত কি করে। আমার সাথেও থাকতে পারেন। স্বাগতম আপনাকে।
যাইহোক নিয়ম কানুন মানুন, সুস্থ থাকুন।
আল্লাহ সবাইকে সুস্থ রাখুক। আমিন