14/07/2025
গত ১০ জুলাই ২০২৫ তারিখে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে । প্রতিবছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় ভীষণ ভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকি । কারণ ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন কারণে প্রত্যাশিত ফল পেতে যে সব ছেলেমেয়েরা ব্যর্থ হয় তাদের প্রতি হটাৎ করে বাবা মা ভাই-বোন আত্মীয় স্বজন শিক্ষক বন্ধু বান্ধব ও পাড়া প্রতিবেশীর নেতিবাচক মনোভাব, তিরস্কার বা হেয় করার প্রবণতা হটাৎ করে এতোটাই বেড়ে যায় যে এই সব কমলমতি ছেলেমেয়েরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। কোন ভাবেই তা নিতে পারে না। এই সময় তারা নিজেদের চরম ভাগ্যহতো ও একা মনে করতে শিখে । ফলে পরীক্ষার ফলাফলের ব্যর্থতার দায় পুরোপুরিই তারা নিজের ওপর নিয়ে নেয় ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে । অসহনীয় এই সব পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার চেয়ে অনেকেই নিজেকে লুকিয়ে রাখাতে চাই । কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো মারাত্মক ভুল ও অপরাধমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। সব অশান্তি থেকে নিজেকে মুক্ত ও সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে এক পর্যায়ে তারা আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে । যদি কোনো অভিভাবক এই ধরণের পরিস্থিতির শিকার হন তবে আমি প্রথমেই সেই সব অভিভাবকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাবো তারা যেন এমন পরিস্থিতিতে তাদের সন্তানদের প্রতি আরো বেশি সংবেদনশীল আচরণ করেন। তাদের সব সপ্ন যেন ভেঙ্গে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।। ছেলেমেয়েরা যেন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে সেটা দেখতে হবে ।
আমরা জানি যে, আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। তারপরও অনেক মানুষ আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে মুহূর্তের অসহায়তায় নিজের জীবনের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নেয়। কখনো সেই সিদ্ধান্ত সফল হয়, কখনো বা ব্যর্থ। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটি একটি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক পরিণতি।
বাংলাদেশে দৈনিক গড়ে ৫৬ জন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন—একটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান যা আমাদের সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা নির্দেশ করে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে সমস্যা আছে, থাকবে। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের কাজ হচ্ছে সেই সমস্যার মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা। ২০২২ সালে দেশে মোট ৫৩২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১৩ জনে। ২০২৪ সালের মধ্যেই প্রায় ৩১০ জন শিক্ষার্থী (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে) আত্মহত্যা করেছে। এ তথ্য আমাদের হতবাক করে তোলে।
শিক্ষার্থীরা কেনো আত্মহত্যার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? এর পেছনে দায়ী কে বা কারা? পরিবার? শিক্ষা ব্যবস্থা? সামাজিক চাপ? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম? নাকি নিজের মানসিক প্রস্তুতির অভাব? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের এখনই খুঁজতে হবে। এটি শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের বিষয় নয়—এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
মানসিক চাপ, প্রতিযোগিতার চাপ, ব্যর্থতার ভয়, পারিবারিক অসহযোগিতা এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের নেতিবাচক প্রভাব অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীকে গভীর হতাশায় ডুবিয়ে দেয়। যদি সময়মতো কাউন্সেলিং, সহানুভূতিশীল কথা ও সহায়তা না মেলে, তাহলে একজন কোমলমতি শিক্ষার্থীও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে।
সমস্যা ছাড়া কোনো মানুষ নেই। তাই আত্মহত্যা নয়, সমস্যা সমাধানই হতে হবে আমাদের পথ। আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত সচেতনতা বাড়াতে হবে, স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং সেবা চালু করতে হবে এবং পরিবারে ভালোবাসা ও মনোযোগ দিতে হবে।
সমস্যার কারণ খুঁজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে যত দ্রুত সম্ভব তার সঠিক সমাধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একজন মানুষ বেঁচে থাকলে শত সুযোগ, আনন্দ ও আশার দরজা খোলা থাকে। জীবনকে ভালোবাসুন, মানুষকে সময় দিন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন।
লেখক পরিচিতি
রওশন আরা জামান রুবি
* সাবেক চিফ সাইকোলজিস্ট ও পরিচালক (গবেষণা), বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (PSC)।
* সিইও, অ্যাসোসিয়েশন ফর ডিজএবল্ড পিপল (ADP)। সংস্থাটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
📧 [email protected] |