23/08/2026
একজন চিকিৎসক হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর কাছে আমার কিছু কথা
বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বেশ কিছু উদ্যোগ ও কাজ আমার ভালো লাগছে। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি তাঁর কাজকে সমর্থন করি এবং আশা করি, স্বাস্থ্যখাতকে আরও কার্যকর, মানবিক ও জনবান্ধব করার যে প্রচেষ্টা চলছে, তা আরও শক্তিশালী হবে।
তবে আজ আমি প্রশংসার পাশাপাশি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
আমি চাই বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল এমন একটি জায়গা হোক, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে অস্বস্তি, ভয় কিংবা হতাশা নিয়ে ফিরবেন না।
একই সঙ্গে আমি চাই, সেই হাসপাতালেই কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরাও যেন নিরাপদ, সম্মানজনক এবং সুন্দর কর্মপরিবেশ পান।
কারণ একজন রোগীর জন্য যেমন একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও মানবিক হাসপাতাল প্রয়োজন, তেমনি একজন চিকিৎসকের জন্যও প্রয়োজন নিরাপদ কর্মস্থল।
রোগী কেন সরকারি হাসপাতালে গিয়ে হতাশ হবেন?
আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে দেখা যায়—
• অতিরিক্ত ভিড়
• অপর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা
• অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ
• দীর্ঘ অপেক্ষার সময়
• পর্যাপ্ত তথ্য ও নির্দেশনার অভাব
• রোগী ও স্বজনদের অসচেতনতা
• হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা
• চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি
• দালালচক্র ও অনিয়মের অভিযোগ
• জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত চাপ
• পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামোর সংকট
এসব কারণে একজন সাধারণ মানুষ অনেক সময় মনে করেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে তাঁকে অনেক ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
অথচ সরকারি হাসপাতালই হওয়া উচিত দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান জায়গা।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মানুষ অনেক সময় বেশি টাকা খরচ করেও অপেক্ষাকৃত সুন্দর পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, গাইডলাইন ও ব্যবস্থাপনার সুবিধা পান। তাহলে সরকারি হাসপাতাল কেন এমন হবে না?
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে বা কম খরচে পাওয়া যায় বলেই সেখানে পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা ও রোগীর অভিজ্ঞতা খারাপ হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
এবার আসি চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়ে
একজন সরকারি চিকিৎসক প্রতিদিন অসংখ্য রোগী দেখেন। সীমিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অনেক সময় রোগীর অবস্থা অত্যন্ত জটিল থাকে। সব চিকিৎসা প্রচেষ্টার পরও প্রত্যেক রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসার ফলাফল প্রত্যাশিত না হলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা, হুমকি, গালাগালি কিংবা কর্মস্থলে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে।
এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।
একজন চিকিৎসক যদি রোগী দেখতে গিয়ে মনে করেন,
“ভুল হলে আমার ওপর হামলা হতে পারে।”
“রোগীর স্বজন রেগে গেলে আমাকে হুমকি দিতে পারে।”
“চিকিৎসা করতে গিয়ে আইনি বা শারীরিক নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে পারি।”
তাহলে সেই চিকিৎসকের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হবেই।
আর একজন ভয় পাওয়া চিকিৎসক কীভাবে সর্বোচ্চ আত্মবিশ্বাস ও মনোযোগ নিয়ে চিকিৎসা করবেন?
আমি মনে করি, এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।
রোগীর অধিকার যেমন আছে, চিকিৎসকেরও নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়ার অধিকার আছে।
রোগীকে সম্মান করতে হবে। চিকিৎসককেও সম্মান করতে হবে।
রোগীর অভিযোগ থাকলে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকতে হবে। চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলার অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। কিন্তু কোনো অভিযোগের বিচার কখনোই হাসপাতালের ভেতরে হামলা, হুমকি বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে হতে পারে না।
সরকারি চিকিৎসকরাও এই দেশেরই সন্তান
BCS ক্যাডারের অন্যান্য কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকে।
BCS চিকিৎসকরাও একই রাষ্ট্রের কর্মকর্তা এবং তাঁরা প্রতিদিন মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁদেরও এমন একটি কর্মপরিবেশ প্রয়োজন যেখানে তাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে এবং ভয়মুক্তভাবে।
আমি চাই না চিকিৎসক ও রোগীকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হোক।
বরং আমি চাই—
রোগী নিরাপদ থাকুক।
চিকিৎসক নিরাপদ থাকুক।
নার্স নিরাপদ থাকুক।
হাসপাতালের প্রতিটি কর্মী নিরাপদ থাকুক।
আমি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে কয়েকটি বিষয় বিবেচনার অনুরোধ করছি
১. সরকারি হাসপাতালকে শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়, একটি সম্পূর্ণ Patient-Friendly Environment হিসেবে গড়ে তোলা হোক।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত বসার জায়গা, টয়লেট, পানির ব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র, রোগী নির্দেশনা, অপেক্ষার ব্যবস্থাপনা এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন।
২. প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে রোগীর নিরাপত্তার পাশাপাশি Healthcare Worker Safety নিশ্চিত করা হোক।
হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, CCTV, জরুরি নিরাপত্তা response এবং প্রয়োজনে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
৩. চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলার বিষয়ে Zero Tolerance নীতি বাস্তবায়ন করা হোক।
অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, বিচার হবে। কিন্তু হাসপাতালে হামলা বা হুমকিকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়।
৪. রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি কমাতে Hospital Communication System উন্নত করা হোক।
কেন রোগী অপেক্ষা করছেন, কেন পরীক্ষা লাগছে, কেন রেফার করা হচ্ছে, চিকিৎসার ঝুঁকি কী, চিকিৎসার ফলাফল কী হতে পারে, এসব বিষয়ে রোগী ও স্বজনদের বোঝানোর জন্য প্রশিক্ষিত জনবল থাকা প্রয়োজন।
৫. সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত Quality Audit ও Patient Experience Assessment চালু করা যেতে পারে।
শুধু হাসপাতাল ভবন, যন্ত্রপাতি বা ডাক্তার সংখ্যা দিয়ে একটি হাসপাতালের মান বিচার করা উচিত নয়।
রোগী হাসপাতাল থেকে কী অভিজ্ঞতা নিয়ে বের হচ্ছেন, চিকিৎসক কী ধরনের কর্মপরিবেশ পাচ্ছেন, নার্সরা কতটা নিরাপদ, হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কেমন, অভিযোগের সমাধান কত দ্রুত হচ্ছে, এসবও নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার।
৬. চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
কারণ একজন চিকিৎসক ভালো পরিবেশে কাজ করলে তার মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রোগীর সঙ্গে যোগাযোগও ভালো হবে।
আমি আসলে কী চাই?
আমি চাই না সরকারি হাসপাতালগুলো বেসরকারি হাসপাতালের মতো বিলাসবহুল হোক।
আমি চাই সরকারি হাসপাতালগুলো পরিষ্কার, সুশৃঙ্খল, মানবিক, নিরাপদ এবং রোগীবান্ধব হোক।
আমি চাই একজন দরিদ্র মানুষ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে যেন মনে করেন,
“আমি গরিব বলে আমার চিকিৎসা বা সম্মান কম নয়।”
আবার একজন চিকিৎসক যেন হাসপাতালে ঢুকে মনে করেন,
“আমি নিরাপদ। আমি ভয় ছাড়া আমার দায়িত্ব পালন করতে পারব।”
আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পক্ষ হলো রোগী এবং স্বাস্থ্যকর্মী।
এক পক্ষকে নিরাপদ রেখে অন্য পক্ষকে অনিরাপদ রেখে একটি ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়।
তাই মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একজন চিকিৎসক হিসেবে আমার বিনীত অনুরোধ—
সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করুন।
আজ যদি আমরা হাসপাতালের পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা, রোগীর অধিকার এবং চিকিৎসকের নিরাপত্তা একসঙ্গে নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে সরকারি হাসপাতালের প্রতি মানুষের আস্থা অনেকটাই ফিরে আসবে।
আমি বিশ্বাস করি, একজন রোগী যেন সরকারি হাসপাতালে গিয়ে নাক না সিঁটকান এবং একজন চিকিৎসক যেন সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভয় না পান।
আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাই, যেখানে রোগী চিকিৎসা পাবেন সম্মানের সঙ্গে এবং চিকিৎসক চিকিৎসা দেবেন নিরাপত্তার সঙ্গে।
মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি আমার আন্তরিক সমর্থন ও শুভকামনা রইল।
স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন শুধু হাসপাতাল নির্মাণ বা নতুন যন্ত্রপাতি কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
স্বাস্থ্যখাতের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হবে, যখন হাসপাতালের ভেতরের মানুষ এবং হাসপাতালের সেবা নিতে আসা মানুষ, দুজনই নিরাপদ, সম্মানিত ও স্বস্তিতে থাকবেন।
#সরকারি_হাসপাতাল #চিকিৎসক_নিরাপত্তা