02/07/2026
ফিরে দেখা: কেমন ছিল Covid বা করনার দিনগুলো?
একজন করোনা রোগীর দিন - রাত।
---------------
হোসেন সাহেব একজন পেশাজীবি। করোনা মহামারির শুরু থেকেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন কিন্তু কোন একসময় তিনি করোনাক্রান্ত হন।করোনা তার দাপট দেখিয়ে, আতংক ছড়িয়ে সবরোগকে এমনকি ক্যান্সারকেও পিছনে ফেলে একনম্বর মর্যাদার আসনে উঠে গেছে।কারণ বিগত এক দেড় দশকে কারো ক্যান্সার ধরা পরলেও প্রিয়জনেরা এতটা আতংকিত হয়না যতটা করোনা হলে হয়।তার প্রিয়জনদের কেউ রোজা রাখে, কেউ সদকা মানত করে আবার কেউবা নিজের হায়াতের বিনিময় হলেও তার রোগ মুক্তি কামনা করে। শুরু হয় নিজের ঘরে বন্দী জীবন। বিছানাপত্র,থালা বাটি সবই আলাদা। দরজার ফাঁক দিয়ে খাবার দাবার দেয় এবং সেখান থেকে নিয়ে খেতে হয়ে। করোনার একটা ধ্রুব সত্য উপসর্গ খাবারে স্বাদগন্ধ কিছুই থাকে না। কাদামাটির যেমন নির্দিষ্ট স্বাদ গন্ধ নাই তেমনি সবখাবার কাদামাটি মনে হয়।
নিজের কাজ নিজেই করা উচিত এশিক্ষাটা করোনা আবার মনে করিয়ে দিলো।থালাবাসন পরিস্কার করা, রুম ঝাড়ু দেয়া,মোছা, বাথরুম পরিস্কারপরিচ্ছন্ন করা সবই নিজেই করে।
এভাবে করোনা ছড়িয়ে পরার জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে সে মনে মনে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে। মনে মনে এজন্য যে, এখানে পদস্থ কোন ব্যক্তি বা সংস্থার দায়িত্বে অবহেলা বা অসততার কথা প্রকাশ্যে বললে লালদালানের ভয় আছে। মহামারীর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা আছেন তারা প্রথম থেকে বলে আসছেন তারা প্রস্তুত।অথচ দুএকসপ্তাহ যেতে না যেতেই শুধু সংকট আর সংকট। মাস্ক কেলেংকারী,লকডাউন নাটক, গার্মেন্ট কর্মীদের নিয়ে ইদুর বিড়াল খেলা, সবশেষে ঈদের সময় প্রাইভেট কারের ফতোয়া সবকিছুই করোনাকে সমভাবে পুরোমানচিত্রে ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
হঠাৎ লক্ষ্য করে দরজা সামান্য ফাঁক করে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা অশ্রুসিক্ত নয়নে তার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভাবছে আল্লাহ চাইলে এযাত্রা বেচে যাবে নয়তো দুচারদিন পরে প্রশাসনের লোক অথবা স্বেচ্ছাসেবকরা এসে পলিথিন মুড়িয়ে নিয়ে যাবে। হোসেন সাহেব নিজেও টিভিতে দেখেছে করোনায় মৃত্যুদের জানাযায় আপন লোকজন থাকে না। কখনো কখনো লাশটাও নিজের গ্রামে ঢুকতে দেয়না।এদৃশ্যগুলো যখন তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন সে আবেগ আপ্লূত হয়ে পরে। দরজাটা চেপে দেয় কারণ এঅবস্থায়
চোখে চোখ পরলে অন্য রকম পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এরমধ্যে একটা ফোন আসে, নিজেকে সামলে নিয়ে ফোন ধরে। অফুরন্ত সময় কাটানোর জন্য শুভাকাঙ্ক্ষীদের ফোন অন্যতম অনু সংগ। ফোনে একের পরে একটা টোটকা চিকিৎসা আসতে থাকে। সে ভাবে যত টোটকা আসে তার সবগুলো পালন করতে গেলে করোনায় কিছু না হলেও টোটকা চিকিৎসার চাপে ধরাশায়ী হতে হবে। তাই সে তার পছন্দমতো,কিছু কিছু পালন করে।
বেশিরভাগ ফোন আসে মনোবল চাংগা করার জন্য। যেমন একজন বললেন মন শক্ত রাখবেন। তারপর ৭/৮ জনের নাম একসাথে বলে যে তারা মারা গিয়েছে তাদের ডায়াবেটিস ছিল, প্রেসার ছিল, আপনার তো এগুলো নাই। অথচ সে জানেনা হোসেন সাহেবের ও এসমস্যা গুলো অল্প স্বল্প আছে। আরেকজন ফোন করে বলল,একটু ও চিন্তা করবেন না। তার পরে একশ্বাসে হাফডজন নাম বলে। তারা তো মারা গিয়েছে তাদের ধুমপানের অভ্যাস ছিল। হোসেন সাহেব কিভাবে তাকে বলবে যে তারও তোএবদঅভ্যাস কমবেশি ছিল। মনোবল চাংগা হবার পরিবর্তে যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও চুরমার হয়ে গেল।কেউ বলে আপনার কতদিন হলো।সে বলে আজ অষ্টমদিন।ফোন দাতা বলে ভয় নাই তবে দশম দিন খুব ঝুঁকিপূর্ণ।আরেকজন বলে তের চৌদ্দ দিনের মাথায় রোগী গুলো খারাপ হয়ে যায়। ভয় করবেন না। মনে মনে সে বলে ভয়তো দিয়েই দিচ্ছেন আরও ভয় করা লাগবে কেন।
কিছু ফোনে বিনোদনও থাকে। যেমন একজন বললেন আপনার রক্তের গ্রুপ কি? হোসেন সাহেব তার রক্তের গ্রুপ বলে। অপর প্রান্ত থেকে বলতে থাকে আপনার ভয়নাই,আপনার জন্য দোয়া করব কিন্তু একটা শর্ত আছে। আপনি যদি সুস্থ হন আর আমি যদি করোনা আক্রান্ত হই তবে প্লাজমা দিতে হবে। হোসেন সাহেব চিন্তা করে বাঁচি কিনা তারই ঠিক নাই তবে স্বীকার করতে অসুবিধা কি! একজন করোনা রোগী সুস্থ হয়ে ক'জনকে প্লাজমা দিতে পারে তা তার সঠিক জানা নাই। কিন্তু দোয়া করার শর্তে ফেলে কমপক্ষে সাত-আটজন তার মৌখিক অঙীকার আদায় করে নিয়েছে।
গল্পে শুনেছে,পেপার পত্রিকায় পড়েছে ভয়ংকর অপরাধীদের জেলখানায় নাকি তার মতো একটি রুমে থাকতে হয়।আমাদের সমাজেও করোনারোগীর সাথে কখনো কখনো অপরাধীর মত আচরণ করা হয়।তার ইচ্ছে করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাহিরের রাস্তার দৃশ্য দেখবে। কিভাবে রিকশা আলা থুতনিতে মাস্ক ঝুলিয়ে দুজনের জায়গায় তিনজন মাস্কবিহীন বে আক্কেল যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে আর করোনাকে তিরস্কার করছে। কিন্তু বারান্দায় যেতে সে ভয়পায়।যদি কোনো প্রতিবেশী্ অভিযোগ করে যে তাদের বাসার দিকে তাকিয়ে হাঁচি দিয়েেছ।তখন হয়ত পাড়ার মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে
পারে। করোনা রোগী বাসায় থাকতে পারবে না।হাসপাতালে পাঠাতে হবে। হাসপাতালে গেলে বেড পাওয়া যায় না, বেড পেলে অক্সিজেন সাপ্লাই নাই। আর যদি আই সি ইউর প্রয়োজন পরে তবে ওখানে চিকিৎসা থেমে যাবে, জীবন প্রদীপও নিভে যাবে। এ-ই চিন্তা করে সে বারান্দায় যায় না।
দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে আর অজানা একটা আতংক বুকে চেপে বসে।কারণ রাতে কোন সমস্যা হলে কাকে ফোন করবে। পরিচিত যাঁরা আছেন তারা কেউ রাতে ফোন বন্ধ করে রাখেন, কেউ বা আবার সাইলেন্ট করে রাখেন। আর যেকোনো জরুরি সেবাও রাতের বেলা তার গতি হারায়।
একচিকিৎসক বন্ধু বললো মাঝে মাঝে অক্সিজেন মাত্রা চেক করতে। কিন্তু পালস অক্সিমিটার তো নাই।তাই জরুরি ভাবে এক ছোট ভাইয়ের সহায়তায় একটা পালস অক্সিমিটার ৪৫০০ টাকা দিয়ে কিনে আনা হলো যার স্ব চরাচর দাম ২৪০০ টাকা। বিপদের সময় প্রায় দ্বিগুণ দাম নিলো এজন্য কেউ তাদেরকে কসাই বা অমানুষ বলবেনা।আসলে আমাদের সমাজে হতাশার জায়গাটা এখানে যে দূর্নীতিবাজ,জুলুমবাজদের মানুষ ঘৃণা করতেও ভুলে গেছে।
এরমধ্যেই এক অনুজ চিকিৎসক ফোন করে বলে বার বার অক্সিজেন মাত্রা দেখবেন। আজ হাসপাতালে একরোগী সারাদিন ভালো ছিল হঠাৎ সন্ধ্যায় অক্সিজেন মাত্রা কমে যায় এবং যথারীতি ঢাকা পাঠিয়ে দেই।একথা শুনে তার অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সে ভাবে তাহলে একবার অক্সিজেন মাত্রাটা দেখে নেয়া যাক।তার বাম হাতের বুড়ো আঙুলে সে পালস অক্সিমিটার লাগায়।প্রথমে দেখে ৯৮%। একমিনিট পরে তা কমে ৯৭% হয়।পরের মিনিটে ৯৬%। আরও যায় কোথায়, ডান হাত দিয়ে হেঁচকা টান দিয়ে পালস অক্সিমিটার সজোরে দেয়ালের দিকে ছুড়ে মারে এবং তা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তার ধারণা আর দশমিনিট হাতে লাগিয়ে রাখলে অক্সিজেন মাত্রা কমতেই থাকবে। তাই সে ট্রাম্পের থিউরি ফলো করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় বলেছিলো নো টেস্ট, নো পেশেন্ট। সেরকম অক্সিজেন মাপবো ও না,অক্সিজেন কমবেও না।একপর্যায়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে। তা আবার চিত হয়ে শোয়া নিষেধ। কাত অথবা উপুড় হয়ে শুতে হবে। সে কাত হয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে কিন্তু হার্টের প্রতিটি স্পন্দন তার কানে টুক টুক করে বাজে।তার ঘুম হয়না।সে বিছানা ছেড়ে রুমের ভিতর পায়চারি করতে থাকে। রাত যত গভীর হয়ে তার হাটার গতি কমে যায়। একসময় মসজিদ থেকে ফজরের আজানের শব্দ ভেসে আসে। সে ওজু করে নামাজ পড়ে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পরে। ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে যে সে সুস্থ হলো কয়েকদিন। অনেকদিন হলো বাসার বাইরে যায় না। তাই বাসার কাছে বাজারে যেতে ইচ্ছে করছে। টুকিটাকি কিছু কেনাকাটা করবে আর পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে একটু গল্প স্বল্প করবে। কিন্তু বাজারে গিয়ে সে অবাক। বাজারের অবস্থা দেখে বোঝার কোন উপায় নাই যে এদেশে করোনা বলতে কিছু আছে! অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই। দু’একজনের থাকলেও তা থুতনিতে ঝুলানো।শারীরিক দূরত্ব তো দূরের কথা, গাদাগাদি, ঠেলাঠেলি করে যে যেমন পারছে, কেনাকাটা করছে। আসলে আমাদের দেশে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের প্রধান বাধা হচ্ছে জনসংখ্যা। সে চিন্তা করে এতটুকু ভূখণ্ডে এতে জনসংখ্যার কারণে অনেক সময় পেঁয়াজ, নুনের দামও কন্ট্রোল করা যায় না। কিন্তু বিষয়গুলো যাদের ভাববার কথা তাদের তো এনিয়ে ভাবার সময় নাই। কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকার আর কেউ কিভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যায় এনিয়ে ভাবতে ভাবতেই সময় শেষ। হঠাৎ দরজায় ঠকঠক শব্দ। মেয়ের কন্ঠ বাবা নয়টা বাজে।তার ঘুম ভেঙে যায়। মোবাইলে তারিখ দেখে নেয় আর কতদিন পর মুক্তি পাবে! আদৌ মুক্তি মিলবে তো!!
(সংগৃহীত)