18/09/2026
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আজ আমাদের একটি প্রশ্নের উত্তর চাই—
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে?
আজ আমি শুধু একজন চিকিৎসক হিসেবে নয়, একজন স্বামী, একজন সহকর্মী এবং একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে এই কথাগুলো লিখছি।
আমরা কি আমাদের কর্মস্থলে নিরাপদ?
চিকিৎসা দিতে এসে যদি চিকিৎসকরাই হামলা ও হেনস্তার শিকার হন, তাহলে আমরা কীভাবে নির্ভয়ে মানুষের সেবা করব?
আজ আমার কর্মস্থল #মিরপুরউপজেলাস্বাস্থ্যকমপ্লেক্সেকুষ্টিয়া তে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদের সবাইকে গভীরভাবে আতঙ্কিত করেছে।
আজ সকাল আনুমানিক ৯ ঘটিকায় মাত্র ৩ বছর বয়সী একটি শিশুকে হাসপাতালে আনা হয়। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় শিশুটি হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুবরণ করেছিল। কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে যথাযথভাবে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই যদি একজন রোগীর মৃত্যু ঘটে, তাহলে সেই রোগীকে পরীক্ষা করে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা ছাড়া একজন চিকিৎসকের আর কী করার থাকে?
চিকিৎসক সময়কে পেছনে ফিরিয়ে নিতে পারেন না।
মৃত্যুর পর কাউকে জীবিত করে তুলতে পারেন না।
তবুও সেই মৃত্যুর পর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এরপর হাসপাতালে ভাঙচুর করা হয়। দরজা ভেঙে ফেলা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা হামলার শিকার হন। হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যও হামলার শিকার হয়েছেন।
আর সবচেয়ে কষ্টের বিষয়—
হামলার শিকার হওয়া সেই নারী চিকিৎসক আমার স্ত্রী।
তিনি আমার স্ত্রী, আবার আমারই চিকিৎসক সহকর্মী।
আমি আগের রাতে সারারাত হাসপাতালে নাইট ডিউটি করেছি। পরদিন সকালে নিজের কর্মস্থলেই আমার স্ত্রী ও সহকর্মীদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে—একজন স্বামী ও একজন চিকিৎসক হিসেবে এই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
আজ শুধু আমার স্ত্রী নয়—
আমার হাসপাতালের প্রতিটি চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং নিরাপত্তাকর্মীর নিরাপত্তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।
আমরা জানি, একটি শিশুর মৃত্যু একটি পরিবারের জন্য অসহনীয় বেদনা। সেই পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা রয়েছে। কিন্তু শোক, ক্ষোভ বা অভিযোগের জায়গা থেকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা, হেনস্তা, হুমকি বা হাসপাতাল ভাঙচুর কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না।
অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক।
ভুল হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হোক।
কিন্তু হামলার মাধ্যমে বিচার নয়—আইনের মাধ্যমে বিচার হোক।
বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনা নিয়ে আমরা বারবার উদ্বিগ্ন হচ্ছি। অথচ আমাদের দেশে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট রয়েছে। সীমিত জনবল নিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে সেবা দিতে হচ্ছে। রাতের পর রাত ডিউটি, জরুরি রোগী, সীমিত সুযোগ-সুবিধা—সবকিছুর মধ্যেও আমরা দায়িত্ব পালন করছি।
তারপরও যদি দায়িত্ব পালন শেষে আমাদের নিজেদের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েই ভয় পেতে হয়, তাহলে আমরা কীভাবে নিশ্চিন্ত মনে চিকিৎসা দেব?
একজন চিকিৎসকও কারও সন্তান।
কারও স্বামী।
কারও স্ত্রী।
কারও ভাই বা বোন।
কারও বাবা বা মা।
হামলার শিকার এই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আমাদেরই পরিবারের অংশ।
তাদের হেনস্তা করা, হুমকি দেওয়া বা মারধর করা শুধু একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে আঘাত করা নয়—একটি পরিবারকে আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেওয়া।
আজকের ঘটনার পর আমরা নিরাপত্তা চাই।
আমি আমার জন্য নিরাপত্তা চাই।
আমার স্ত্রী ও সহকর্মীর জন্য নিরাপত্তা চাই।
আমার হাসপাতালের সকল চিকিৎসকের জন্য নিরাপত্তা চাই।
নার্স ও সকল স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য নিরাপত্তা চাই।
হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীদের জন্য নিরাপত্তা চাই।
আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না।
আমরা শুধু চাই—নিজেদের জীবন ও জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় না করে দায়িত্ব পালন করতে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।
একই সঙ্গে মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের তাৎক্ষণিক ও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি বিনীত আবেদন জানাচ্ছি।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি—
আজ আমরা আতঙ্কিত।
আজ আমরা নিরাপত্তাহীনতায় আছি।
আজকের ঘটনার পর আমাদের জানমাল ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
আমরা চিকিৎসা দিতে চাই।
আমরা মানুষের পাশে থাকতে চাই।
আমরা আমাদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে চাই।
শুধু আমাদের নিরাপদ রাখুন।
কারণ—
চিকিৎসক নিরাপদ না থাকলে চিকিৎসাসেবা নিরাপদ থাকবে না।
হাসপাতাল নিরাপদ না থাকলে রোগীও নিরাপদ থাকবে না।
হাসপাতাল হোক মানুষের জীবন বাঁচানোর নিরাপদ আশ্রয়—
ভয়, হুমকি ও সহিংসতার স্থান নয়।
🙏 এই পোস্টটি সর্বস্তরে পৌঁছে দিন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করুন।
আমাদের নিরাপত্তার দাবিটি পৌঁছে দিন।