13/08/2026
কল্পনা করুন একজন সৈনিককে। তাকে বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো—কীভাবে অস্ত্র চালাতে হয়, কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্র পড়তে হয়, কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সব শেষে তাকে বলা হলো, "যাও, দেশ রক্ষা করো।" কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে দেখা গেল—তার হাত থেকে আধুনিক অস্ত্র কেড়ে নিয়ে শুধু কয়েকটা পুরনো, প্রায় অকেজো জং ধরা অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি সব নিষিদ্ধ।
এই অবস্থায় সে শত্রু চিনতে পারবে। কিন্তু শত্রুকে হারাতে পারবে না।
এটা কোনো রূপকথা নয়। এটা বাংলাদেশের ডিএমএফ চিকিৎসকদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
সমস্যাটা কোথায়?
বাংলাদেশে ডিএমএফদের প্রশিক্ষণ দেয় স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের লাইসেন্স দেওয়া হয়, বলা হয়—রোগী দেখো, রোগ চেনো, চিকিৎসা দাও। কিন্তু চিকিৎসা দিতে গেলে যে ওষুধ লাগে, সেই ওষুধ লেখার অধিকার তাদের সীমিত। বিএমডিসির দেয়া একটি পুরনো তালিকা ধরে তারা কাজ করতে বাধ্য, যা বছরের পর বছর হালনাগাদ হয়নি।
ফলাফল? রোগী দেখবেন। কিন্তু আধুনিক, কার্যকর চিকিৎসা দিতে পারেন না।
কেনিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে একটা গল্প বলি। ১৯৮৮ সালের Clinical Officers Act-এর দ্বিতীয় তফসিলে ক্লিনিক্যাল অফিসারদের প্রেসক্রিপশনের জন্য মাত্র ৪০-৪৩টি সীমিত ও সেকেলে ওষুধের তালিকা ছিল। সেই তালিকায় ছিল ক্লোরোকুইন—তখনকার দিনে ম্যালেরিয়ার প্রধান ওষুধ।
কিন্তু ২০০০-এর দশকে এসে বিশ্বব্যাপী ম্যালেরিয়া পরজীবী ক্লোরোকুইনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই ওষুধ আর কাজ করছিল না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে বাদ দেয়, নতুন ওষুধ আসে।
ক্লিনিক্যাল অফিসাররা আইনত বাধ্য ছিলেন সেই অকার্যকর ওষুধই লিখতে। বিজ্ঞান এগিয়েছে, আইন পিছিয়ে থেকেছে—আর এর খেসারত দিয়েছেন সাধারণ মানুষ।
২০১৭ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি কেনিয়ার জাতীয় সংসদে ক্লিনিক্যাল অফিসার বিল-এর ওপর বিতর্ককালে সংসদ সদস্য ডা. রবার্ট পুকোসে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দেন—
"এই দেশের ক্লিনিক্যাল অফিসাররা একটি obsolete (অপ্রচলিত) আইনের ভিত্তিতে কাজ করছেন, যে আইনে স্পষ্ট নেই তাদের কী প্রেসক্রাইব করা উচিত। সেই আইনে এখনও ক্লোরোকুইন ও অন্যান্য সেকেলে ওষুধের কথা বলা আছে—যা এই দেশের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন প্র্যাকটিসকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।"
এই ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তির পর কেনিয়ার সংসদ ব্যবস্থা নেয়। সে বছরই কেনিয়া নতুন আইন পাস করে। পুরনো তালিকা বাতিল হয়। ক্লিনিক্যাল অফিসাররা এখন জাতীয় ওষুধ তালিকা অনুযায়ী আধুনিক ওষুধ লিখতে পারেন—যা প্রতি বছর হালনাগাদ হয়।
বাংলাদেশের ডিএমএফ চিকিৎসকরা আজ ঠিক সেই একই অবস্থানে আছেন, যেখানে কেনিয়ার মত দেশ ছিল।
অন্য দেশগুলো কী করছে?
নেপাল: নেপালের Health Assistant (HA)-দের জন্য Nepal Health Professional Council (NHPC) কর্তৃক অনুমোদিত প্রেসক্রিপশন তালিকা প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের জন্য অত্যন্ত যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি।
অর্থাৎ শিক্ষা হলো—
তালিকা থাকতে পারে, তবে সেই তালিকা হতে হবে বিজ্ঞানসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং নিয়মিত হালনাগাদ।
ভারত: ২০০৩ সালের Subhasis Bakshi & Ors. v. West Bengal Medical Council & Ors. মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট diploma-trained practitioners-এর চিকিৎসা ও prescription-এর অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়।
২০০৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে স্পষ্ট করে বলেছিল—যখন কাউকে চিকিৎসা করার অধিকার দেওয়া হয়, তখন সেই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ লেখার অধিকারও তাকে দিতে হবে। রোগ চেনা আর রোগ সারানো—এ দুটো আলাদা করা যায় না। Prescription হলো recognized right to treat-এর সঙ্গে যুক্ত একটি consequential right।
অবশ্যই, এটি বাংলাদেশের জন্য binding precedent নয়; এটি একটি persuasive judicial principle।
অর্থাৎ, রাষ্ট্র যদি চিকিৎসা কোর্স হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে লাইসেন্স দেয়, তবে সেই শিক্ষাক্রমের মূল উপাদান—প্রেসক্রিপশন—কেও স্বীকৃতি দিতেই হবে। নির্ণয় আর নিরাময় একই মুদ্রার দুই পিঠ। যোদ্ধাকে যদি রণাঙ্গনে পাঠানো হয়, তবে তাঁর হাতে অস্ত্রও দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের PA মডেলও একই শিক্ষা দেয়
যুক্তরাষ্ট্রে Physician Assistant-দের prescribing authority কোনো একক ৪০ বা ৭৩টি fixed-drug list-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।তারা অ্যাডারাল (Schedule II), ওজেম্পিক, নরকো—সব ধরনের আধুনিক ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধই লিখতে পারেন, শুধু State law, scope of practice এবং controlled-substance regulations-এর মাধ্যমে authority নির্ধারিত হয়।
অর্থাৎ এখানেও মূল দর্শন—
Clinical responsibility → Scope → Regulated prescribing।
বাংলাদেশের প্রশ্নটা খুব সরল: যে চিকিৎসাকর্মীকে রোগী দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, রোগ চেনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—তাকে কি সেই দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত সরঞ্জাম দেওয়া হবে না?
সৈনিককে যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়ে অস্ত্রহীন রাখা কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না। তেমনি চিকিৎসককে রোগীর সামনে দাঁড় করিয়ে আধুনিক ওষুধ থেকে বঞ্চিত রাখা কোনো আধুনিক স্বাস্থ্যনীতি হতে পারে না।
আমাদের দাবি একটাই—আইন অনুযায়ী ‘মেডিসিন’ বলতে আধুনিক মেডিসিনকেই বোঝাতে হবে এবং ডিএমএফ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও নির্ধারিত দায়িত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, বিজ্ঞানসম্মত, নিরাপদ ও যুগোপযোগী ওষুধ ব্যবহারের ও প্রেসক্রাইব করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে উন্নত ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা আধুনিক মেডিসিনের সর্বশেষ জ্ঞান, চিকিৎসা-নির্দেশিকা ও নিরাপদ ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে সবসময় আপডেটেড থাকেন।
যেন রোগ চেনার পর, রোগীর প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসাটাও দিতে পারি।