03/07/2026
চিকিৎসাসেবার আলোকবর্তিকা: অধ্যাপক ড. এম মুস্তাফিজুর রহমান (১৯৩৫ - ২০১৪)
বাংলাদেশের চক্ষু চিকিৎসা এবং অন্ধত্ব দূরীকরণ আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী নাম অধ্যাপক ড. এম মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি একাধারে ছিলেন এ দেশের আধুনিক গ্লুকোমা চিকিৎসার পথপ্রদর্শক, কিংবদন্তি চক্ষু বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক মানের গবেষক এবং মহান মানবহিতৈষী। চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নিঃস্বার্থ ও অনন্য সাধারণ সেবা দিয়ে তিনি লাখো মানুষের অন্ধ চোখের আলো ফিরিয়ে দিয়েছেন।
১. জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
অধ্যাপক ড. এম মুস্তাফিজুর রহমান ১৯৩৫ সালে ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার ধলিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামীণ জীবনের সাধারণ আবহে বেড়ে উঠলেও ছোটবেলা থেকেই মানুষের কল্যাণে কাজ করার গভীর আকঙ্ক্ষা তাঁর মনে প্রোথিত ছিল।
২. শিক্ষা ও উচ্চতর ডিগ্রি লাভ
মেধাবী ছাত্র মুস্তাফিজুর রহমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা বিদ্যাপীঠ ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে সফলভাবে এমবিবিএস (MBBS) ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে উচ্চতর চিকিৎসার জন্য তিনি সরকারি বৃত্তিসহ (State Scholarship) ১৯৬২ সালে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। চিকিৎসা বিজ্ঞানে সুদূরপ্রসারী জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তিনি নিম্নলিখিত উচ্চতর আন্তর্জাতিক ডিগ্রি ও স্বীকৃতি অর্জন করেন:
DO (Diploma in Ophthalmology): ১৯৬৪ সালে ইংল্যান্ড থেকে অর্জন করেন।
FRCS (Ireland): ১৯৬৬ সালে আয়ারল্যান্ড থেকে লাভ করেন।
FRCS (Edinburgh): ১৯৬৮ সালে এডিনবরা থেকে অর্জন করেন।
FRC Ophth: ১৯৮৯ সালে ইংল্যান্ড থেকে লাভ করেন।
৩. চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনন্য অবদান ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা
বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর লোভনীয় ও বিলাসবহুল জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে তিনি দেশের মানুষের সেবা করার ব্রত নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (Director) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে আধুনিক ও উপ-বিশেষায়িত (Sub-specialty) চক্ষু চিকিৎসার বিপ্লব শুরু হয় মূলত তাঁর হাত ধরেই।
ক) অরবিস ফ্লাইং আই হাসপাতাল ( ):
১৯৮৫ সালে অধ্যাপক ড. এম মুস্তাফিজুর রহমানের একক ও অগ্রগামী প্রচেষ্টায় বিশ্ববিখ্যাত আকাশচারী চিকিৎসাকেন্দ্র 'অরবিস ফ্লাইং আই হাসপাতাল' প্রথমবার বাংলাদেশে আসে। এটি বাংলাদেশের চক্ষু চিকিৎসা ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে এবং তৎকালীন চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক মানের অস্ত্রোপচার প্রশিক্ষণে অনবদ্য ভূমিকা রাখে।
খ) মুস্তাফিজ গ্লুকোমা রিসার্চ ও চক্ষু হাসপাতাল:
১৯৯৩ সালে ঢাকার মিরপুরে একটি ছোট্ট ক্লিনিক হিসেবে এটি যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে বাংলাদেশ সরকার এবং প্রবাসীদের মানবিক সংগঠন 'NABIC'-এর যৌথ সহায়তায় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অত্যাধুনিক হাসপাতালে রূপ নেয়।
গ) বাংলাদেশে গ্লুকোমা সমীক্ষা ও গবেষণা:
তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯৯৩ এবং ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম এবং একমাত্র গ্লুকোমা বিষয়ক জনসংখ্যা-ভিত্তিক বৃহৎ সমীক্ষা (Population-based survey) চালানো হয়। তাঁর এই মূল্যবান গবেষণাপত্রটি পরবর্তীতে ২০০৪ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সাময়িকী 'ব্রিটিশ জার্নাল অব অফথালমোলজি' (British Journal of Ophthalmology)-তে প্রকাশিত হয়ে বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলে।
ঘ) প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সোসাইটি প্রতিষ্ঠা:
১৯৯৩ সালে ইস্পাহানি ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একটি আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলেন, যেখান থেকে দীক্ষা নিয়ে আজকের দেশের অনেক প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ তৈরি হয়েছেন।
তিনি ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ আই কেয়ার সোসাইটি (BECS) এবং ২০০৭ সালে বাংলাদেশ গ্লুকোমা সোসাইটি (BGS) প্রতিষ্ঠা করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অপথালমোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (OSB)-এর প্রেসিডেন্ট, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ এবং উপদেষ্টা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
৪. মানবসেবা, গ্রামীণ কল্যাণ ও 'ধলিয়া' প্রেম
অধ্যাপক ড. এম মুস্তাফিজুর রহমান স্যারের হৃদয়ের এক বিশাল অংশ জুড়ে ছিল তাঁর নিজের জন্মভূমি ভালুকার ধলিয়া গ্রাম। গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন:
ডা: মুস্তাফিজ দাতব্য চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা: ১৯৮৬ সালে ধলিয়া গ্রামে সম্পূর্ণ নিজস্ব জমি ও নিজস্ব অর্থায়নে তিনি এই দাতব্য হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা প্রায় চার দশক ধরে গ্রামীণ জনপদে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও চোখের ছানি অপারেশন দিয়ে আসছে।
আধুনিক প্রযুক্তির প্রবর্তন: ২০০২ সালের ১১ মে (২৮ বৈশাখ ১৪০৯ বঙ্গাব্দ) তৎকালীন মহামান্য রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ধলিয়ার এই হাসপাতালে গ্রামীণ পর্যায়ে নতুন পদ্ধতিতে (SICS) ইন্ট্রা অকুলার লেন্স স্থাপনের শুভ উদ্বোধন করেন, যা তৎকালীন গ্রামীণ চিকিৎসার জন্য এক অবিশ্বাস্য অগ্রগতি ছিল (চিত্র "58827.jpg" দ্রষ্টব্য)।
শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন: নিজ গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়াতে তিনি প্রচুর জমি দান করেন। নিজের মা আজিমুন্নেসার নামে নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে প্রতিষ্ঠা করেন 'ধলিয়া বহুলি আজিমুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়'। এ ছাড়াও এলাকার রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তিনি আজীবন অর্থায়ন ও নেতৃত্ব দিয়েছেন।
লায়ন্স ক্লাব লিডারশিপ: তিনি লায়ন্স ক্লাব অব বাংলাদেশ-এর অত্যন্ত সফল একজন 'ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর' (District Governor) হিসেবে মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অনন্য ভূমিকা পালন করেন।
৫. রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও সমাজকল্যাণে অসামান্য, গৌরবোজ্জ্বল ও জনহিতকর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দুই ডজনেরও বেশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন। তাঁর মধ্যে প্রধানতম পদকসমূহ হলো:
১. স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৮৯): চিকিৎসা বিজ্ঞান ও সমাজসেবায় অনন্য অবদানের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা।
২. স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু স্বর্ণপদক (১৯৯০)
৩. অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক (১৯৮৭)
৪. মেলভিন জোন্স ফেলো অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৭): আন্তর্জাতিক লায়ন্স ক্লাব কর্তৃক প্রদত্ত সম্মাননা।
৫. ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৯): লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক প্রাপ্ত।
৬. জীবনাবসান
চিকিৎসা ও সেবার এই মহানায়ক ২০১৪ সালে ৭৯ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর অমায়িক ব্যক্তিত্ব, তীক্ষ্ণ ক্লিনিক্যাল চোখ, দক্ষ অস্ত্রোপচারের হাত এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য এক কোমল মমতাময়ী হৃদয় তাঁকে চিরকাল এ দেশের মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখবে।
আজ তাঁর দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি—মহান আল্লাহ তাআলা যেন চিকিৎসাসেবায় মানবজাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থান দান করেন। আমিন।