23/08/2026
শরৎ—প্রকৃতির রঙ বদলের সঙ্গে আমার জীবনেরও কত স্মৃতি
শরতের শুরু। প্রতিদিনের মতো আজও শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরের আমার কলেজে আসছিলাম। সকালে তখনও রোদটা পুরোপুরি ওঠেনি। আকাশ ধীরে ধীরে নীল হয়ে উঠছিল, তার বুকে ভেসে বেড়াচ্ছিল সাদা মেঘের ভেলা। কাশফুল এখনো পুরোপুরি ফোটেনি, শিউলিও হয়তো আর কয়েকটা দিন পরে ভোরের উঠোন ভরিয়ে দেবে—তবু বাতাসে কোথাও যেন শরৎ আসার খবরটি পৌঁছে গেছে।
আমার প্রতিদিনের এই পথচলার একটা বড় আনন্দ আছে। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও আমি প্রকৃতিকে প্রাণ ভরে দেখতে পারি।
কখন বাতাসের স্বভাব বদলায়, কখন ভেজা হাওয়া কমে এসে একটু শুকনো পরশ লাগে, কখন মৌসুমি বায়ুর চরিত্র বদলে যায়, কখন উত্তরের হাওয়ার আভাস মেলে—এসব আমি খুব অনুভব করি।
আমাদে বাড়ি শিলাঙ্গন চারদিকেই বেশ খোলা, এই বাড়িতে আসার পর থেকে ঋতুর গতি-প্রকৃতি যেন আরও স্পষ্টভাবে টের পাই।
সূর্যের আলো কেমন করে বদলায়, আকাশের রং কীভাবে পাল্টায়, বাতাসে কখন আর্দ্রতা আর কখন শুষ্কতা—সবই যেন চোখে পড়ে।
আগে যখন নিয়মিত জামালপুর যেতাম, দেড় ঘণ্টার সেই পথেও জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখতাম, প্রকৃতি কী নিঃশব্দে বদলে যায়।
আমাদের বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ—গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। এই ছয় ঋতুর আগমন-বিদায় খুব তীব্র নয়, খুব ধীরে, খুব স্বাভাবিক।
বর্ষা একদিনে শেষ হয়ে যায় না, শরৎও হঠাৎ এসে দাঁড়ায় না।
প্রথমে বৃষ্টি কমে, জলাশয়ের পানি একটু একটু করে নামে, আকাশ পরিষ্কার হয়, মেঘের ফাঁক বাড়ে, বাতাসে অন্যরকম হালকা পরিবর্তন আসে—তারপর একদিন মনে হয়, হ্যাঁ, শরৎ এসে গেছে।
এই ধীর পরিবর্তনটাই আমাদের ঋতুর বড় সৌন্দর্য। প্রকৃতি যেন আমাদের সময় দেয় মানিয়ে নেওয়ার জন্য।
পৃথিবীর অনেকদেশ, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বড় অংশে, ঋতু সাধারণত চারটি—বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরৎ এবং শীত।
সেখানে ঋতুর পরিবর্তন অনেক বেশি তীব্র ও চোখে পড়ার মতো
। শীতে তাপমাত্রা অনেক জায়গায় শূন্যের নিচে নেমে যায়, বরফে ঢেকে যায় চারদিক, গাছপালা পাতাহীন ন্যাড়া দণ্ডের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
বসন্ত এলে নতুন কুঁড়ি, নতুন পাতা, নতুন ফুল—প্রকৃতি হঠাৎ যেন জেগে ওঠে।
গ্রীষ্মে চারপাশ সবুজ, আর শরৎ এলে গাছের পাতাগুলো লাল, হলুদ, কমলা হয়ে ঝরে পড়ে; রাস্তাঘাট রঙিন পাতায় ঢেকে যায়।
সেখানে ঋতু বদলের এই নাটকীয়তা খুব প্রবল। আমাদের এখানে তা নয়—আমাদের ঋতুগুলো অনেক বেশি কোমল, সহনীয়, ধীরে ধীরে আসে, ধীরে ধীরে যায়।
আমাদের ছয় মাস বরফের নিচে গুটিয়ে থাকতে হয় না, আবার রোদের জন্য হাহাকার করতেও হয় না। এই ধীর, সহজ, মানিয়ে নেওয়া ঋতুচক্রই বাংলার সৌন্দর্য।
আবার নিরক্ষীয় অঞ্চলের অনেক দেশে, যেমন সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ায়, আমাদের মতো ছয়টি স্পষ্ট ঋতু নেই। সেখানে মূলত ভেজা ও অপেক্ষাকৃত শুকনো সময়ের পার্থক্যই বেশি
বোঝা যায়।
তাই মনে হয়, আমাদের এই ছয় ঋতুর দেশ সত্যিই বিশেষ। আর সেই ছয় ঋতুর মধ্যে শরৎ যেন এক মায়াময় সেতু—একদিকে বিদায়ী বর্ষা, অন্যদিকে আগমনী হেমন্ত।
বাংলার শরৎ কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; এটি আমাদের শিল্প, সংস্কৃতি, কৃষি, স্মৃতি ও উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
আমার ছোটবেলার শরৎ মানেই ফরিদপুরের সকাল।
শারদীয় দুর্গাপূজার প্রায় এক মাস আগে থেকেই বড় বড় পূজামণ্ডপে প্রতিমা গড়া শুরু হতো। প্রথমে খড় দিয়ে কাঠামো, তারপর মাটির প্রলেপ—এক মাটি, দো-মাটি—ধীরে ধীরে অবয়ব ফুটে উঠত। তারপর রং, গয়না, শাড়ি, সাজ। প্রতিদিন সকালে ফুল তুলতে বের হতাম, আর সেই সঙ্গে প্রতিমা গড়া দেখতে যেতাম। প্রতিমার সামনে কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকত, আর আমরা কৌতূহল সামলাতে না পেরে পর্দা একটু তুলে দেখে নিতাম—আজ কতটুকু তৈরি হলো! সেই প্রতিদিনের বদলে যাওয়া রূপ দেখা ছিল শরতের এক বড় আনন্দ।
শরৎ মানেই শিউলি ফুল। ভোরের শিশিরভেজা মাটিতে সাদা পাপড়ি আর কমলা ডাঁটার শিউলি ছড়িয়ে থাকত। শিউলি কুড়িয়ে মালা গাঁথা, পূজার থালা সাজানো—এই ছোট্ট ফুলটার গন্ধেই যেন শরতের ভোর চেনা যায়। শরৎ মানেই আবার কাশফুল—নদীর ধারে, বিলের পাড়ে সাদা কাশ দুলতে থাকে, দূর থেকে মনে হয় মাটির ওপর সাদা মেঘ নেমে এসেছে।
মহালয়ার ভোরও শরতের এক অদ্ভুত আবেগময় স্মৃতি। খুব ভোরে বাড়ির সবাই উঠে পড়ত। রেডিওতে বাজত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। তখন তার সব কথা বুঝতাম না, তবু তাঁর সেই ভরাট কণ্ঠ, আবৃত্তি, স্তোত্র, গানের ফাঁকে ফাঁকে উচ্চারণ—মনকে ছুঁয়ে যেত। মনে হতো, পূজা বুঝি সত্যিই এসে গেছে।
তারপর শুরু হতো পূজার জামার জন্য অপেক্ষা।
তখন তো রেডিমেড পোশাকের এত চল ছিল না। বাবা আমাদের তিন বোনের জন্য একই রকম কাপড় কিনে দিতেন। সেই কাপড় নিয়ে যেতে হতো দর্জি কাকুর কাছে। তিনি মাপ নিতেন, আর বাবার নির্দেশ থাকত—ফ্রক একদম হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হবে। আমরা যতই একটু ছোট করতে চাই, দর্জি কাকু বাবার কথাই মানতেন। তারপর প্রায় প্রতিদিনই দর্জি কাকুর বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়া—কাপড় কাটা হয়েছে কি না, সেলাই শুরু হয়েছে কি না। আর এর সঙ্গে ছিল আরেকটা গোপন আনন্দ—পুতুলের জামা বানানোর জন্য ছিট কাপড় সংগ্রহ করা। নতুন জামা হাতে পাওয়া যেত পূজার ঠিক আগের রাতে বা এক-দুদিন আগে। কিন্তু সেই অপেক্ষার আনন্দই ছিল সবচেয়ে বড়। এখনকার মতো তিন দিনের জন্য তিনটা নতুন জামা ছিল না; একটাই নতুন জামা, অষ্টমীর অঞ্জলিতে সেটাই পরার আনন্দ ছিল অপার। বাবা-মায়ের সঙ্গে পূজা দেখতে যাওয়া, ঢাকের বাদ্য, ধূপের গন্ধ, মণ্ডপের আলো—এসবই ছিল আমার শরৎ।
শরতের আরেকটি বিশেষ চিহ্ন ভাদ্রের গরম। দিনের বেলায় গরম অনেক সময় বেশ অসহ্যই লাগে। আমরা তো বলিই—“ভাদ্রের গরমে তাল পাকে।” আর সেই পাকা তাল দিয়ে তৈরি তালের বড়া, তালের পিঠা—এসবও শরতের নিজস্ব স্বাদ। অন্য অনেক পিঠা শীতের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু তালের পিঠা ভাদ্র-শরতের বিশেষ খাবার, আমাদের সংস্কৃতির এক আলাদা অংশ। অষ্টমীর দিন তালের বড়া বা তালের পিঠার স্বাদও অনেক বাড়িতে আলাদা করে মনে রাখা হয়।
প্রকৃতিতেও তখন অপূর্ব দৃশ্য। বর্ষায় রোপণ করা আমন ধান শরতে এসে ঘন সবুজ হয়ে ওঠে। বাতাস বয়ে গেলে মাঠের ওপর সবুজ ঢেউ খেলে যায়। শরতের শেষে, হেমন্তে, সেই ধান ধীরে ধীরে পেকে সোনালি হবে। খাল-বিল-পুকুর-নদীর পানি বর্ষার তুলনায় একটু একটু করে কমে আসে। জল আর তেমন ঘোলা থাকে না; তুলনামূলক স্বচ্ছ, টলটলে হয়ে যায়। সেই স্থির জলে নীল আকাশ আর সাদা মেঘের ছায়া পড়ে। কোথাও শাপলা ফুটে থাকে, কোথাও পদ্ম। ছোটবেলায় শ্রাবণের শেষদিকে ভেলায় চড়ে শাপলা তুলতে যাওয়ার স্মৃতিও মনে পড়ে। টলটলে জলে আকাশের ছায়া, তার ভেতর শাপলা-পদ্ম—এ যেন শরতের প্রকৃতির এক অপূর্ব ছবি।
আমার জীবনের আরও দুটি বড় স্মৃতি শরতের সঙ্গে জড়ানো—আমার দুই সন্তান সাগতা ও সীমান্তের জন্ম এই সময়ে, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। একসময় আগস্ট এলেই ওদের জন্মদিনের বায়না শুরু হয়ে যেত। কবে কেনাকাটা করতে হবে, কী কিনব, জন্মদিন কীভাবে হবে—কত পরিকল্পনা! আমার নিজের কাজের ব্যস্ততায় ওদের খুব বেশি সময় দিতে পারতাম না; কখনো কখনো বকুনিও দিতে হয়েছে। তারপর হঠাৎ একদিন সময় বের করে কেনাকাটা, জন্মদিনের আয়োজন—এসব নিয়েই ওদের ছোটবেলার শরৎ। এখন ওরা বড় হয়ে গেছে। জন্মদিন সামনে এলে জিজ্ঞেস করি, “কী নেবে?”—ওরা আর তেমন কিছুই চায় না। তখন মনে হয়, ঋতুর মতোই মানুষও বদলে যায়, শিশুরাও বড় হয়ে যায়, সময়ও নিঃশব্দে অন্য রূপ নেয়।
তবু শরৎ এলেই আমার ভেতরে ছোটবেলার সেই সকালগুলো আবার বাজতে থাকে—শিউলি কুড়োনো, প্রতিমা গড়া দেখতে যাওয়া, মহালয়ার রেডিও, দর্জি কাকুর দোকানে যাওয়া, পুতুলের কাপড় আনা, বাবা-মায়ের সঙ্গে পূজা দেখা, ভাদ্রের তালের পিঠা, সবুজ ধানক্ষেত, টলটলে জলে শাপলা-পদ্ম, দূরে কাশফুলের সাদা দোলা।
এই জন্যই, এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমি প্রকৃতিকে অনুভব করতে ভুলে যাই না।
কারণ আমার কাছে ঋতু শুধু ক্যালেন্ডারের নাম নয়। ঋতু আসে বাতাসের গন্ধে, আকাশের রঙে, ধানের মাঠে, শিউলির সুবাসে, কাশফুলের দোলায়, ঢাকের বাদ্যে, তালের পিঠার স্বাদে, আর বহু পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে।
এই আমাদের বাংলার শরৎ—বর্ষার হাত ধরে আসে, হেমন্তের হাতে হাত রেখে চলে যায়। আর মাঝখানের এই অল্প সময়টুকুতে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, কৃষি, উৎসব আর স্মৃতিকে এক অপূর্ব সুরে মিলিয়ে দিয়ে যায়।