Prof. Dr. Shila Sen

Prof. Dr. Shila Sen Professor & Head of Gynae & Obs. department, CBMCB

নয় বছরের অপেক্ষা, ১৩৩ কেজি ওজন—শেষ পর্যন্ত মায়ের কোলে ছেলেআজ আমার কাছে একটি বিশেষ আনন্দের দিন। শ্রীপুর, গাজীপুর থেকে আ...
26/08/2026

নয় বছরের অপেক্ষা, ১৩৩ কেজি ওজন—শেষ পর্যন্ত মায়ের কোলে ছেলে

আজ আমার কাছে একটি বিশেষ আনন্দের দিন। শ্রীপুর, গাজীপুর থেকে আসা এই মায়ের কোলে আজ এসেছে তার বহুল প্রতীক্ষিত ছেলে—বিয়ের নয় বছর পর।

যখন প্রথম আমার কাছে এসেছিল, তখনই ওর ওজন ছিল প্রায় ১১৪ কেজি। সঙ্গে ছিল খুব বেশি অবাঞ্ছিত লোম বা সিভিয়ার হিরসুটিজম—মুখমণ্ডল থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে ঘন লোম। পিসিওএসের বৈশিষ্ট্যও ছিল।

আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,

“তোমার ওজন এত বেড়ে গেল কীভাবে?”

ও খুব সরলভাবে বলেছিল,

“ম্যাডাম, হোস্টেলে থাকতাম। রসমালাই খুব পছন্দ করতাম। রসমালাই আর মাংস নিয়ে যেতাম, অনেক খেতাম। আমাদের পরিবারেও মোটা হওয়ার প্রবণতা আছে।”

কথার ফাঁকে আরেকটি বিষয় আমাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। বাবা নেই। অনার্সে পড়ছিল। কিন্তু বিয়ের পর সন্তান নেওয়ার জন্য নয় বছর ধরে এক ডাক্তার থেকে আরেক ডাক্তার, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটতে ছুটতে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনাটাও আর শেষ করা হয়নি।

তারপর একদিন সেই বহু প্রতীক্ষিত সুখবর এলো—সে গর্ভবতী হয়েছে।

গর্ভধারণের পর থেকে ওকে আমি নিয়মিত ফলোআপে রেখেছিলাম। কারণ অতিরিক্ত ওজনের গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (GDM), উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই শুরু থেকেই খাবার, রক্তে শর্করা, রক্তচাপ, ওজন এবং শিশুর বৃদ্ধির দিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছে।

ভালো লাগার বিষয় হলো—এত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বড় কোনো জটিলতা ছাড়াই সে ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ করতে পেরেছে।
আজ সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে তার একটি সুন্দর ছেলে হয়েছে।

এত বেশি ওজনের একজন রোগীর অপারেশন মোটেও সহজ নয়। বর্তমানে তার ওজন প্রায় ১৩৩ কেজি, আর পেটের সামনের অংশটি অনেকটাই ঝুলে গিয়েছিল। অপারেশনের সময় সেই অংশটিও যতটা নিরাপদভাবে সম্ভব গুছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে শুধু সার্জনের নয়, পুরো টিমেরই কাজ অনেক কঠিন হয়ে যায়। রোগীকে ওঠানো-নামানো থেকে শুরু করে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া, অপারেশন করা, অপারেশনের পর পর্যবেক্ষণ—সবকিছুতেই বাড়তি সতর্কতা দরকার। ওষুধ ও অ্যানেস্থেশিয়ার ব্যবস্থাপনাও কঠিন হতে পারে। অপারেশনের পর রক্ত জমাট বেঁধে পা বা ফুসফুসে যাওয়ার (থ্রম্বোএম্বোলিজম) ঝুঁকিও বেশি থাকে। তাই অ্যানেস্থেশিয়া টিম পায়ের নড়াচড়া, ম্যাসাজ এবং দ্রুত নিরাপদভাবে চলাফেরা শুরু করার ব্যাপারেও বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে।

আমার অ্যানেস্থেশিয়া টিম এবং অপারেশনে যারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন—সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ। আজকের এই হাসিমুখের পেছনে পুরো দলের অনেক শ্রম রয়েছে।

আর এই গল্প থেকে মা-বাবাদের জন্য আমার ছোট্ট একটি অনুরোধ—

সন্তানকে আদর করবেন, তার পছন্দের খাবারও দেবেন; কিন্তু ভালোবাসার নামে অতিরিক্ত মিষ্টি, ফাস্টফুড বা উচ্চ ক্যালরির খাবার খাওয়াতে খাওয়াতে যখন ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে, তখন অবশ্যই সচেতন হবেন।

শিশু-কিশোর বয়স থেকেই অতিরিক্ত ওজন ভবিষ্যতে পিসিওএস, মাসিকের অনিয়ম, বন্ধ্যাত্ব, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কারণ আজ আমরা আদর করে যে অতিরিক্ত খাবারটা তুলে দিচ্ছি, তার কারণে তৈরি হওয়া শারীরিক কষ্টটা ভবিষ্যতে কিন্তু সন্তানকেই সারাজীবন বহন করতে হতে পারে।

আজ অবশ্য সব চিন্তার ঊর্ধ্বে একটি আনন্দই বড়—
নয় বছরের অপেক্ষার শেষে একজন মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন।

এই হাসিটুকুই আজ আমাদের পুরো টিমের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

সিজারিয়ান অপারেশন সব সময় সহজ নয়—বিশেষ করে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারআজ কলেজ ছুটি। সকালে বেশ আয়েশ করেই ঘুম থেকে উঠেছিলাম। ...
26/08/2026

সিজারিয়ান অপারেশন সব সময় সহজ নয়—বিশেষ করে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার

আজ কলেজ ছুটি। সকালে বেশ আয়েশ করেই ঘুম থেকে উঠেছিলাম। কিছুক্ষণ ইন্টারনেটে পড়াশোনা করে আবার কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, বুঝতেই পারিনি।

এর মধ্যে সীমান্ত আমাকে দুবার ফোন করেছে—একবারও ধরতে পারিনি। ওর বাবা বলল,
“তুমি একবার ফোন করো। ও মনে হয় রেগে আছে!”

সীমান্ত এখন ইউরোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর চূড়ান্ত পরীক্ষার সামনে। গবেষণার কাজও চলছে। বাসায় থাকলে নাকি ঠিকমতো পড়া হয় না, তাই ছুটির দিনেও হাসপাতালে থেকে পড়াশোনা করছে।

ও যখন খুব মানসিক চাপে থাকে, তখন আমাকে ফোন করে। আবার খুব আনন্দ পেলেও ফোন করে। কোনো জটিল অপারেশন ভালোভাবে করতে পারলেও সেই আনন্দটা আমার সঙ্গে ভাগ করে নেয়।

আজকের ফোনটাও ছিল তেমনই একটি ঘটনা নিয়ে।

গতরাতে পড়াশোনা শেষ করে প্রায় রাত একটার দিকে ও ঘুমিয়েছিল। হঠাৎ দরজায় ধুমধুম শব্দ—

“স্যার ভাই, একজন ইউরোলজির ডাক্তার একটু আসেন। গাইনি অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাকছে।”

গিয়ে দেখে, একজন রোগীর তৃতীয় সিজারিয়ান অপারেশনের সময় প্রস্রাবের থলি গুরুতরভাবে কেটে গেছে।

রোগীর আগে দুটি সিজার হয়েছিল। আগের অপারেশনের কারণে পেটের ভেতরে এমনভাবে জোড়া লেগে গিয়েছিল যে প্রস্রাবের থলি আর জরায়ুর দেয়াল আলাদা করাই খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক জায়গায় প্রস্রাবের থলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

সীমান্ত বলল,
“মা, খুব ধীরে ধীরে জায়গাগুলো চিনে চিনে সেলাই করে ঠিক করেছি। প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগেছে।”

আজ আবার রোগীকে দেখে এসেছে। আপাতত তিনি ভালো আছেন।

ঘটনাটা শুনে আমার মনে হলো, এ নিয়ে কিছু কথা বলা খুবই দরকার।

আজকাল সিজারিয়ান অপারেশন এত বেশি হচ্ছে যে অনেকের কাছেই এটি যেন খুব সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—

প্রথম সিজার আর দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ সিজার এক জিনিস নয়।

প্রতিবার সিজারের পর পেটের ভেতরের অঙ্গগুলো একে অন্যের সঙ্গে লেগে যেতে পারে। কখনো প্রস্রাবের থলি জরায়ুর সঙ্গে শক্তভাবে লেগে যায়। কখনো অন্ত্রও লেগে যেতে পারে।

ফলে পরেরবার অপারেশন করতে গিয়ে আগের স্বাভাবিক গঠন আর সহজে বোঝা যায় না।

তখন হতে পারে—

প্রস্রাবের থলি কেটে যাওয়া,
অন্ত্রে আঘাত লাগা,
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ,
অপারেশন দীর্ঘ হওয়া,
এমনকি মা ও শিশুর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়া।

তাই প্রথম সিজারটিও খুব যত্নের সঙ্গে করা দরকার। কোথায় কাটছি, কোথায় সেলাই করছি, রক্তক্ষরণ ঠিকভাবে বন্ধ হয়েছে কি না—সবকিছু খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে।

কারণ আজকের প্রথম সিজারই হয়তো কয়েক বছর পর সেই মায়ের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সিজারের পথ তৈরি করে দিচ্ছে।

রোগী ও তাঁর পরিবারের প্রতিও আমার অনুরোধ—

আগে একবার, বিশেষ করে দুইবার বা তার বেশি সিজার হয়ে থাকলে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেবেন না।

আগে থেকেই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে রাখুন—

কোথায় সন্তান জন্ম দেবেন,
কোন চিকিৎসক অপারেশন করবেন,
সেখানে রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না,
জরুরি অবস্থায় অন্য বিভাগের অভিজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যাবে কি না।

শুধু বাড়ির কাছে বা ছোট জায়গা বলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সিজার করাতে চলে যাবেন না।

গতরাতের রোগীটির ভাগ্য ভালো ছিল—সেই হাসপাতালে তখন একজন ইউরোলজির চিকিৎসক ছিলেন। তাই সঙ্গে সঙ্গে প্রস্রাবের থলির ক্ষত সারানো সম্ভব হয়েছে।

সব জায়গায় কিন্তু এমন চিকিৎসক সব সময় থাকেন না।

তখন ছোট একটি ভুলও একজন নারীর সারা জীবনের কষ্টের কারণ হয়ে যেতে পারে।

আর আগেরবার সিজার হয়েছে মানেই এবারও অবশ্যই সিজার করতে হবে—এ কথাটাও সব সময় ঠিক নয়।

উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে আগের সিজারের পরেও স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হতে পারে। তবে সেটি অবশ্যই এমন হাসপাতালে হতে হবে, যেখানে হঠাৎ সমস্যা হলে দ্রুত জরুরি সিজার করার ব্যবস্থা আছে।

বিশেষ করে যাঁদের আগে দুইবার বা তার বেশি সিজার হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত অবশ্যই অভিজ্ঞ প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নিতে হবে।

আমার সহকর্মী চিকিৎসকদের প্রতিও একটি কথা—

আমরা যখন একজন মায়ের প্রথম সিজার করছি, তখন শুধু আজকের অপারেশনটাই করছি না।

আমরা তাঁর ভবিষ্যতের অপারেশনের নিরাপত্তার পথও তৈরি করছি।

অপারেশন শেষ করাই শুধু লক্ষ্য নয়—রোগীকে যতটা সম্ভব নিরাপদ রেখে অপারেশন শেষ করাই আসল লক্ষ্য।

আজকের রোগী যেন আগামী দিনে আমাদের কাছে আরও জটিল রোগী হয়ে ফিরে না আসেন—এই দায়িত্বটুকু আমাদের সবার।

আগের সিজারকে গুরুত্ব দিন।
আগে থেকেই পরিকল্পনা করুন।
আর সিজারিয়ান অপারেশন—প্রথম হোক বা তৃতীয়—সঠিক জায়গায়, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের

সবাই ভালো থাকবেন।
ধন্যবাদ।
অধ্যাপক ডাঃ শিলা সেন
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
গাইনী বিভাগ সিবিএমসিবি


১১ বছরের অপেক্ষার পর—নীল চোখের ছোট্ট বিসমিকা জান্নাত এইমাত্র আমার চেম্বারে এসেছিলেন সুইটি ও সবুজ মিয়া, মদন, নেত্রকোনা থ...
25/08/2026

১১ বছরের অপেক্ষার পর—নীল চোখের ছোট্ট বিসমিকা জান্নাত

এইমাত্র আমার চেম্বারে এসেছিলেন সুইটি ও সবুজ মিয়া, মদন, নেত্রকোনা থেকে। সঙ্গে আজ তাদের ছোট্ট মেয়েটি আসেনি, কিন্তু মোবাইল খুলে একের পর এক ছবি দেখাতে লাগলেন।

ওদের মেয়ের নাম বিসমিকা জান্নাত। বয়স আড়াই বছর। আর এই ছোট্ট মেয়েটি তাদের জীবনে এসেছে বিয়ের দীর্ঘ ১১ বছর পর। এত বছরের অপেক্ষা, আশা আর প্রার্থনার পর যখন বিসমিকা তাদের কোলে আসে, সেই আনন্দ যে কতটা গভীর ছিল, তা মা-বাবার চোখেমুখেই বোঝা যায়।

বিসমিকার জন্মও হয়েছিল আমার হাতেই, আমার এই ক্লিনিকে।

মা বললেন,
“ম্যাডাম, আপনি তো বাচ্চাদের নিয়ে কত সুন্দর গল্প লেখেন। আমার মেয়েকে নিয়েও একটা গল্প লিখবেন?”

তারপর মোবাইলে বিসমিকার কয়েকটি ছবি দেখালেন। আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলাম! কী সুন্দর, মিষ্টি একটা শিশু—আর ওর চোখ দুটো যেন আলাদা করে নজর কেড়ে নেয়, নীলচে চোখ।

মা-বাবা বললেন, বিসমিকা খুবই বুদ্ধিমান। আড়াই বছর বয়সেই অনেক কথা বলতে পারে, বইয়ের প্রতি আগ্রহও বেশ। মা জানতে চাইলেন,
“ম্যাডাম, চার বছর হওয়ার আগেই কি স্কুলে দেব?”

আমি বললাম,
“না, চার বছরটা পূর্ণ হোক। এখন ও খেলুক, গল্প শুনুক, বইয়ের ছবি দেখুক, মা-বাবার আদরে বড় হোক।”

১১ বছর অপেক্ষার পর যে সন্তানকে তাঁরা পেয়েছেন, তাকে ঘিরে তাঁদের আনন্দ, স্বপ্ন আর ভালোবাসা সত্যিই আমাকে ছুঁয়ে গেল।

আজ সুইটি আর সবুজ মিয়া আবার এসেছেন—এবার তাঁদের আরেকটি আশা, পরিবারে আসুক আরেকটি ছোট্ট অতিথি।

একজন চিকিৎসকের জীবনে এমন মুহূর্তগুলো খুব মূল্যবান। কোনো শিশুকে পৃথিবীতে আসতে সাহায্য করার পর, কয়েক বছর পরে তার মা-বাবা যখন আবার এসে ছবি দেখান, তার বেড়ে ওঠার গল্প বলেন—তখন মনে হয়, চিকিৎসার সম্পর্ক কখন যেন অজান্তেই পরিবারের গল্পের অংশ হয়ে যায়।

বিসমিকা জান্নাত, তুমি অনেক বড় হও, সুস্থ থাকো, বুদ্ধিমতী ও ভালো মানুষ হয়ে ওঠো। তোমার জন্য অনেক দোয়া ও ভালোবাসা।

আর সুইটি ও সবুজ মিয়ার জন্যও রইল আন্তরিক শুভকামনা—
খুব শিগগিরই যেন বিসমিকা একটি ছোট্ট ভাই বা বোন পায়।

ভালো থেকো তোমরা।
১১ বছরের অপেক্ষার পর পাওয়া এই নীল চোখের ছোট্ট বিসমিকা সত্যিই আজ আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল।

অধ্যাপক ডাঃ শিলা সেন

একটোপিক প্রেগন্যান্সি মানেই কি শুধু টিউবে বাচ্চা?আমরা সাধারণত একটোপিক প্রেগন্যান্সি বললেই মনে করি—বাচ্চা জরায়ুর বাইরে, ...
25/08/2026

একটোপিক প্রেগন্যান্সি মানেই কি শুধু টিউবে বাচ্চা?

আমরা সাধারণত একটোপিক প্রেগন্যান্সি বললেই মনে করি—বাচ্চা জরায়ুর বাইরে, ফ্যালোপিয়ান টিউবে আটকে গেছে। আসলে কথাটা পুরোপুরি এমন নয়।

একটোপিক প্রেগন্যান্সি হলো—গর্ভটি জরায়ুর স্বাভাবিক গহ্বরের সঠিক জায়গায় না বসে অন্য কোথাও বসে যাওয়া।

এর বেশিরভাগই, প্রায় ৯৫ শতাংশ, হয় ফ্যালোপিয়ান টিউবে। তাই আমরা একটোপিক প্রেগন্যান্সি বলতে প্রায়ই টিউবের গর্ভধারণকেই বুঝি। কিন্তু একটোপিক আরও কয়েক জায়গায় হতে পারে।

আগে সিজারিয়ান হয়ে থাকলে জরায়ুর নিচের দিকে যে পুরোনো কাটা দাগ বা সিজারিয়ানের ক্ষতস্থান থাকে, সেই ক্ষতের মধ্যেও কখনো গর্ভ বসে যেতে পারে। একে বলা হয় সিজারিয়ানের ক্ষতস্থানে একটোপিক প্রেগন্যান্সি।

আবার গর্ভটি যদি জরায়ুমুখের ভেতরে বসে, তাকে বলা হয় জরায়ুমুখের একটোপিক গর্ভধারণ। ডিম্বাশয়ে বসলে ডিম্বাশয়ের একটোপিক গর্ভধারণ, আর খুব বিরল ক্ষেত্রে পেটের ভেতরেও গর্ভ স্থাপন হতে পারে।

কিছুদিন ধরে আমাদের সিবিএমসিতে একটি সেমিনারের প্রস্তুতি চলছে। সেই উপলক্ষে এ বছরের একটোপিক প্রেগন্যান্সির রোগীদের হিসাব বের করছিলাম।

দেখলাম, আমাদের হাসপাতালে এ বছর প্রায় ৩০টির মতো একটোপিক প্রেগন্যান্সি এসেছে। এর বেশিরভাগই ছিল টিউবে। কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল আরেকটি সংখ্যায়—এর মধ্যে তিনটি ছিল আগের সিজারিয়ানের ক্ষতস্থানে গর্ভধারণ।

অর্থাৎ প্রায় ৩০টির মধ্যে তিনটি—মোটামুটি ১০ শতাংশ।

সংখ্যাটি আমাকে ভাবিয়েছে।

টিউবে গর্ভধারণ হলেও সব রোগী একই অবস্থায় আমাদের কাছে আসেন না।

কারও টিউব তখনো ফাটেনি। গর্ভটি টিউবের মধ্যেই আছে। একে আমরা সহজভাবে বলতে পারি—টিউবে থাকা, কিন্তু এখনো না-ফাটা একটোপিক গর্ভধারণ।

আবার কারও ক্ষেত্রে টিউবের শেষ প্রান্ত দিয়ে গর্ভের অংশ বের হয়ে যেতে থাকে। এটাকে বলা হয় টিউবাল অ্যাবরশন, সহজ বাংলায়—টিউবের মুখ দিয়ে গর্ভ বের হয়ে যাওয়া।

সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো যখন টিউব ফেটে যায়। তখন পেটের ভেতরে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে। একজন সুস্থ-সবল নারীও খুব অল্প সময়ের মধ্যে শকে চলে যেতে পারেন। দ্রুত চিকিৎসা না হলে জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই কারণেই একটোপিক প্রেগন্যান্সিকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া যায় না।

তবে আরেকটি ভুল ধারণাও আছে—একটোপিক হলেই কি সব সময় অপারেশন করে টিউব ফেলে দিতে হয়?

না।

রোগীর অবস্থা, গর্ভের আকার ও অবস্থান, রক্তে গর্ভের হরমোনের মাত্রা এবং আল্ট্রাসনোগ্রাফির ফল দেখে কিছু রোগীকে ওষুধের মাধ্যমেও চিকিৎসা করা যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ছোট অপারেশন বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে চিকিৎসা করা যায়। রোগী যদি রক্তক্ষরণ নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় আসেন, তখন অবশ্যই দ্রুত অপারেশনই জীবন বাঁচায়।

সিজারিয়ানের পুরোনো ক্ষতস্থানে গর্ভধারণের চিকিৎসাও রোগীভেদে আলাদা। কাউকে ওষুধ দিয়ে, কাউকে আল্ট্রাসনোগ্রাফির সাহায্যে বিশেষ পদ্ধতিতে, আবার কাউকে অপারেশন করে চিকিৎসা করতে হয়। তাই এটি এমন একটি সমস্যা, যেখানে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অভিজ্ঞ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

এই বিষয়টি আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথাও মনে করিয়ে দেয়—

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান করা উচিত নয়।

সিজারিয়ান অনেক সময় মা ও শিশুর জীবন বাঁচায়—সেটি অবশ্যই আশীর্বাদ। কিন্তু চিকিৎসাগত কারণ ছাড়া শুধু সুবিধার জন্য সিজারিয়ান করালে ভবিষ্যতে আরও কিছু জটিলতার পাশাপাশি সিজারিয়ানের ক্ষতস্থানে একটোপিক গর্ভধারণের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকেই মাসিক বন্ধ হওয়ার পর শুধু বাড়িতে প্রস্রাব পরীক্ষা করে দেখেন—দুইটি দাগ উঠেছে, অর্থাৎ গর্ভ হয়েছে—তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে যান।

কিন্তু শুধু গর্ভ হয়েছে কি না জানলেই তো হলো না।

গর্ভটি কোথায় বসেছে, সেটিও জানতে হবে।

বিশেষ করে যাদের আগে সিজারিয়ান হয়েছে, আগে একটোপিক হয়েছে, বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা নিয়েছেন, পেলভিক ইনফেকশন হয়েছে কিংবা তলপেটে ব্যথা বা রক্তপাত হচ্ছে—তাদের ক্ষেত্রে শুরুতেই একটি ভালো জায়গা থেকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।

মাসিক বন্ধ হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর, অর্থাৎ গর্ভের আনুমানিক ছয় সপ্তাহের দিকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করলে অনেক সময়ই বোঝা যায়—গর্ভটি জরায়ুর স্বাভাবিক জায়গায় আছে কি না।

আরেকটি কারণও মনে রাখা দরকার। যৌনবাহিত কিছু সংক্রমণ এবং পেলভিক ইনফেকশন ফ্যালোপিয়ান টিউবের ক্ষতি করতে পারে। টিউব পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ু পর্যন্ত পৌঁছাতে না পেরে টিউবেই আটকে যেতে পারে। সেখান থেকেই হতে পারে একটোপিক প্রেগন্যান্সি।

আর যদি কখনো একটোপিক প্রেগন্যান্সির কারণে একটি টিউব ফেলেও দিতে হয়, তাতেও ভেঙে পড়ার কারণ নেই।

অন্য টিউবটি যদি ভালো ও সুস্থ থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আবার গর্ভধারণ হতে পারে—এবং হয়ও।

আর আজকের দিনে যদি কোনো কারণে দুইটি টিউবই না থাকে, তাহলেও আধুনিক চিকিৎসায় টেস্টটিউব পদ্ধতিতে গর্ভধারণের সুযোগ রয়েছে।

তাই ভয় নয়—দরকার সচেতনতা।

মনে রাখবেন—

গর্ভধারণের পরীক্ষা শুধু বলবে আপনি মা হতে যাচ্ছেন।
কিন্তু আল্ট্রাসনোগ্রাফি বলবে—গর্ভটি সঠিক জায়গায় আছে কি না।

একটোপিক প্রেগন্যান্সি যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে, চিকিৎসা তত সহজ হবে, জটিলতা তত কমবে এবং অনেক ক্ষেত্রেই টিউব ও ভবিষ্যতের সন্তান ধারণের ক্ষমতাও রক্ষা করা সম্ভব হবে।

গর্ভধারণের শুরুতেই সচেতন হোন।
অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান এড়িয়ে চলুন।
সংক্রমণের সঠিক চিকিৎসা নিন।
আর পেটব্যথা বা রক্তপাত হলে কখনো দেরি করবেন না।

একটু সচেতনতাই হয়তো একজন মায়ের জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।

ধন্যবাদ সবাইকে, এতক্ষণ আমার সঙ্গে থাকার জন্য।

সোমবার, বৈদ্যনাথ আর আমার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ব্রতের গল্পআজ সোমবার। কিছুদিন আগেই শ্রাবণ মাস চলে গেল। সোমবার এলেই...
24/08/2026

সোমবার, বৈদ্যনাথ আর আমার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ব্রতের গল্প

আজ সোমবার। কিছুদিন আগেই শ্রাবণ মাস চলে গেল। সোমবার এলেই আমার জীবনের খুব পুরোনো, খুব ব্যক্তিগত একটি স্মৃতি মনে পড়ে। কারণ সোমবারের শিবব্রতের সঙ্গে যেন আমার জন্মের গল্পটাই জড়িয়ে আছে।

আমার জন্মের আগে মায়ের চারটি সন্তানই বাঁচেনি—কেউ মৃত জন্মেছিল, একজন জন্মের কিছুদিন পর মারা গিয়েছিল। তখনকার দিনে আজকের মতো আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা ছিল না, এত পরীক্ষা-নিরীক্ষারও সুযোগ ছিল না। তাই মায়ের পরের সন্তান নিয়েও পরিবারের সবার মনে ছিল ভয় আর উৎকণ্ঠা।

মা যখন আমাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, তখন তিনি মামার বাড়িতে ছিলেন। সেই সময় কামরূপ-কামাখ্যা থেকে একজন সাধু সেখানে এসেছিলেন। পরিবারের লোকজন মাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন। বললেন, “ওর কোনো সন্তানই বাঁচে না। এবার যেন সন্তানটা বেঁচে থাকে—কিছু আশীর্বাদ করুন।”

সাধু মাকে দেখে বলেছিলেন,
“মা, তুমি প্রতি সোমবার বৈদ্যনাথ শিবের ব্রত করবে। পারলে উপবাস থাকবে, না পারলে নিরামিষ খাবে। সন্ধ্যায় ফুল, বেলপাতা, জল—যা তোমার সাধ্য—দিয়ে বাবাকে পূজা করবে। তারপর প্রসাদ গ্রহণ করবে। দেখবে, তোমার এই সন্তান বেঁচে থাকবে।”

সেদিন থেকেই মা সোমবারের সেই ব্রত শুরু করেছিলেন—আমি তখন তাঁর গর্ভে।

আজ এত বছর পরে ভাবি, সেই সন্তানই আমি—মায়ের পঞ্চম সন্তান, এখনো আপনাদের মাঝে বেঁচে আছি।

মা যতদিন বেঁচেছিলেন, আমার জন্য এই ব্রত পালন করেছেন। আমার দিদিমাও আমাকে নিয়ে ব্রত করতেন। ছোটবেলায় সারাদিন উপবাস থাকতে পারতাম না। দিদিমা বলতেন, অর্ধেক দিন থাক, তারপর শিবের মাথায় জল দাও, ফুল-বেলপাতা দাও, প্রসাদ খাও। এভাবেই অজান্তে আমার শৈশবের সঙ্গে সোমবার, শিব আর বৈদ্যনাথ নামটা জড়িয়ে গেল।

তখন অবশ্য এত কিছু জানতাম না। পরে জেনেছি, বৈদ্যনাথ—‘বৈদ্য’ অর্থ চিকিৎসক, ‘নাথ’ অর্থ প্রভু। অর্থাৎ আরোগ্যদাতা, চিকিৎসকদেরও প্রভু মহাদেব। পৌরাণিক কাহিনিতে আছে, রাবণ কঠোর তপস্যায় নিজের মস্তক একে একে শিবের চরণে অর্পণ করেছিলেন। শিব সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে পুনরায় সুস্থ করে তুলেছিলেন। সেই আরোগ্যদাতা রূপ থেকেই তাঁর নাম বৈদ্যনাথ। ভারতের ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে বৈদ্যনাথ ধাম দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম বলে পূজিত।

আমার শিবভক্তির সঙ্গে ফরিদপুরের স্মৃতিও খুব গভীরভাবে জড়ানো।

ফরিদপুর শহরে কুমার নদীর একেবারে পাড়ে, মেছো বাজারের কাছে একটি সুন্দর শিবমন্দির ছিল। মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভগবান আগরওয়াল নামে একজন রাজস্থানি ব্যবসায়ী। ছোটবেলায় তাঁকে দেখতাম প্রতিদিন সকালে বাড়ি থেকে পূজার সামগ্রী নিয়ে মন্দিরে আসতেন, চন্দন দিতেন, প্রদক্ষিণ করতেন। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর পূজা দেখতাম, আর শেষে প্রসাদ নিয়ে বাড়ি ফিরতাম।

আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি, এক শ্রাবণ মাসে মা আমাকে প্রায় পুরো মাসই কুমার নদীতে স্নান করিয়ে সেই মন্দিরে নিয়ে গেছেন। পরীক্ষার পড়াশোনা ছিল, ব্যস্ততা ছিল—তবু আমি বাবার মাথায় জল অর্পণ করেছি। বাবা সেই জল গ্রহণ করেছিলেন কি না জানি না, কিন্তু আমার মনের সেই সমর্পণটা আজও রয়ে গেছে।

এই লেখাটা লিখব ভেবে আজ আমার সেই সময়ের ক্লাসমেট, ফরিদপুরের পরিচিত সাংবাদিক পান্না বালাকে জিজ্ঞেস করলাম, “ওই শিবমন্দিরটা কি এখনো আছে?”

ও বলল, “হ্যাঁ, এখনো আছে।”

কথাটা শুনে মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। এত বছর কেটে গেছে, জীবন কত দূরে নিয়ে এসেছে—কিন্তু কুমার নদীর পাড়ের সেই মন্দিরটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

আজও আমি সোমবার নিরামিষ খাই। দেশে থাকি বা দেশের বাইরে—যতটা সম্ভব এই নিয়মটা রাখি। আমার কলেজের সবাইও জানে সোমবার আমার এই নিয়মের কথা। বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে অনেকেই সোমবারের কথা মাথায় রাখে। আমার মেয়ে খুব শিবভক্ত, নাতনিরাও, পুত্রবধূও—পরিবারের অনেকেই এই সোমবারের ব্রতের কথা জানে, মনে রাখে।

আর একটা বিষয় আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বাবা শিবের প্রতি আমার ভক্তি আমাকে কখনো সাম্প্রদায়িক করেনি, কোনো ছুঁতমার্গের মধ্যেও নিয়ে যায়নি। বরং মানুষকে আরও কাছ থেকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।

আমার পূজার ফুল এনে দেয় সাতার মিয়া, মামুন, জুয়েল, কাউসার—ওরাই যত্ন করে বাবার পূজার ফুলের ব্যবস্থা করে দেয়। সোমবার আমি নিরামিষ খাই বলে জুহরা আমার জন্য নিরামিষ রান্না করে খাওয়ায়। নাহার আমার খাবার আলাদা করে তৈরি করে দেয়। আমি যখন FCPS পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখনও এভাবেই আমার সোমবারের খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

কখনো মনে হয়নি—আমার পূজার ফুল কোন ধর্মের মানুষের হাত দিয়ে এলো, আমার নিরামিষ খাবার কে রান্না করে দিল। ভালোবাসার কি কোনো ধর্ম থাকে?

তাই আমার এই শিবভক্তি আমাকে মানুষ থেকে আলাদা করেনি, বরং মানুষকে আরও আপন করে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, সত্যিকারের ধর্ম মানুষকে সংকীর্ণ করে না; মানুষকে বড় করে, হৃদয়কে প্রশস্ত করে।

আজ আমি শুধু নিজের জন্য শিবের কাছে প্রার্থনা করি না। কোনো রোগী বিপদে পড়লে, অপারেশন জটিল হলে, কোনো মা বা শিশুকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকলে—অজান্তেই বাবাকে ডাকি।

চিকিৎসক হিসেবে আমি আমার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করি। তারপর যেখানে আমার হাতের সীমা শেষ, সেখানে মনে মনে বলি—
“বাবা, বাকিটা তুমি দেখো।”

আমার কাছে শিব মানে শুধু একটি মন্দির, একটি প্রতীক বা একটি পূজার দিন নয়।

শিব মানে মঙ্গল।
শিব মানে শান্তি।
শিব মানে সমর্পণ।
শিব মানে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ না করা।
শিব মানে জীবের মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া।

সোমবার এলে আজও আমার মনে হয়—আমি যেন আবার সেই ছোট্ট মেয়েটি হয়ে গেছি, দিদিমার হাত ধরে অর্ধেক দিন উপবাস করে হাতে ফুল-বেলপাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি বাবার সামনে।

শেষ করি সেই চিরচেনা প্রার্থনায়—

ওঁ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্।
উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাৎ॥

অর্থ—
আমরা ত্রিনয়ন মহাদেবের উপাসনা করি, যিনি আমাদের জীবনকে পুষ্ট করেন। পাকা ফল যেমন সহজে তার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়, তেমনি তিনি যেন আমাদের দুঃখ, রোগ ও মৃত্যুভয় থেকে মুক্ত করে অমৃতময় চেতনার পথে নিয়ে যান।

নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং ত্বং গতিঃ পরমেশ্বর॥

অর্থ—
হে শান্তস্বরূপ শিব, সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের মূল কারণ, তোমার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করি। তুমিই আমার আশ্রয়, তুমিই আমার পরম গতি।

ওঁ নমঃ শিবায়।
হর হর মহাদেব।

অধ্যাপক ডাঃ শিলা সেন
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
গাইনী বিভাগ সিবিএমসিবি


23/08/2026

শিলাঙ্গনের আজকের অতিথি—সোহাগ ও সোহান, দুই ভাই

পাঁচ বছর আগে তাদের মা-বাবার বিয়ে। মা নিজেই একজন মিডওয়াইফ। কিন্তু দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ায় একসময় দুজনেই খুব মন খারাপ করে ফেলেছিলেন। আগের একটি HSG রিপোর্টে বলা হয়েছিল—দুই পাশের টিউবই ব্লক। তাই তাদের মনে হয়েছিল, হয়তো আর কখনো বাবা-মা হওয়া হবে না।

বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নেওয়ার পর একসময় তারা আমার চেম্বারে এলেন। রিপোর্টগুলো দেখে আমার মনে হয়েছিল, টিউব পুরোপুরি নয়, কিছুটা আংশিক ব্লক ছিল। চিকিৎসার মাধ্যমে টিউবের পথটা খোলার চেষ্টা করলাম।

সেদিন মজা করেই বলেছিলাম,

“যাও, তোমার তো টুইন বেবি হবে!

এরপর অবাক করার মতো ঘটনা—চিকিৎসার মাত্র এক মাসের মধ্যেই তিনি কনসিভ করলেন! আর সত্যিই গর্ভে এল দুই সন্তান।
আজ সেই দুই ভাই পৃথিবীতে এসেছে—দুজনেই ভালো আছে। আমি আদর করে নামও রেখে দিলাম—সোহাগ ও সোহান।

বাচ্চাদের মা আজ হাসতে হাসতে বলছিলেন,

“ম্যাডাম, আপনি কি জ্যোতিষী?

আমি জ্যোতিষী নই। তবে চিকিৎসক হিসেবে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন রোগীর স্বপ্ন সত্যি হতে দেখে নিজের মনটাও আনন্দে ভরে যায়।

আজ সোহাগ-সোহানের পরিবার যেমন আনন্দিত, আমরাও তেমনি খুশি।

দুই ভাইয়ের জন্য সবাই আশীর্বাদ করবেন—সুস্থ, সুন্দর আর আলোকিত জীবন হোক তাদের।

শিলাঙ্গনের আজকের সবচেয়ে মিষ্টি দুই অতিথি—সোহাগ ও সোহান।

আজ আমি বাসায় ছিলাম, কলেজে যাইনি। ভেবেছিলাম একটু বিশ্রাম নেব। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাসায় থাকলে যেন কাজ আরও বেড়ে যা...
23/08/2026

আজ আমি বাসায় ছিলাম, কলেজে যাইনি। ভেবেছিলাম একটু বিশ্রাম নেব। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাসায় থাকলে যেন কাজ আরও বেড়ে যায়! সারাদিনই বেশ ব্যস্ত ছিলাম।
এই ব্যস্ততার কারণেই আপনাদের সঙ্গে নিয়মিত লাইভে আসা হয়ে ওঠে না। তারপরও মনে হলো, আজ একটু আপনাদের খোঁজ নিই। আপনারা কেমন আছেন?
সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আপনারাই আমার শক্তি। আপনারা আছেন, আপনাদের ভালোবাসা আছে বলেই আমি ভালো থাকি, কাজ করার অনুপ্রেরণা পাই।
সবাইকে অনেক ভালোবাসা ও ধন্যবাদ।

শরৎ—প্রকৃতির রঙ বদলের সঙ্গে আমার জীবনেরও কত স্মৃতি শরতের শুরু। প্রতিদিনের মতো আজও শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরের আমা...
23/08/2026

শরৎ—প্রকৃতির রঙ বদলের সঙ্গে আমার জীবনেরও কত স্মৃতি

শরতের শুরু। প্রতিদিনের মতো আজও শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরের আমার কলেজে আসছিলাম। সকালে তখনও রোদটা পুরোপুরি ওঠেনি। আকাশ ধীরে ধীরে নীল হয়ে উঠছিল, তার বুকে ভেসে বেড়াচ্ছিল সাদা মেঘের ভেলা। কাশফুল এখনো পুরোপুরি ফোটেনি, শিউলিও হয়তো আর কয়েকটা দিন পরে ভোরের উঠোন ভরিয়ে দেবে—তবু বাতাসে কোথাও যেন শরৎ আসার খবরটি পৌঁছে গেছে।

আমার প্রতিদিনের এই পথচলার একটা বড় আনন্দ আছে। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও আমি প্রকৃতিকে প্রাণ ভরে দেখতে পারি।

কখন বাতাসের স্বভাব বদলায়, কখন ভেজা হাওয়া কমে এসে একটু শুকনো পরশ লাগে, কখন মৌসুমি বায়ুর চরিত্র বদলে যায়, কখন উত্তরের হাওয়ার আভাস মেলে—এসব আমি খুব অনুভব করি।
আমাদে বাড়ি শিলাঙ্গন চারদিকেই বেশ খোলা, এই বাড়িতে আসার পর থেকে ঋতুর গতি-প্রকৃতি যেন আরও স্পষ্টভাবে টের পাই।
সূর্যের আলো কেমন করে বদলায়, আকাশের রং কীভাবে পাল্টায়, বাতাসে কখন আর্দ্রতা আর কখন শুষ্কতা—সবই যেন চোখে পড়ে।
আগে যখন নিয়মিত জামালপুর যেতাম, দেড় ঘণ্টার সেই পথেও জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখতাম, প্রকৃতি কী নিঃশব্দে বদলে যায়।

আমাদের বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ—গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। এই ছয় ঋতুর আগমন-বিদায় খুব তীব্র নয়, খুব ধীরে, খুব স্বাভাবিক।
বর্ষা একদিনে শেষ হয়ে যায় না, শরৎও হঠাৎ এসে দাঁড়ায় না।

প্রথমে বৃষ্টি কমে, জলাশয়ের পানি একটু একটু করে নামে, আকাশ পরিষ্কার হয়, মেঘের ফাঁক বাড়ে, বাতাসে অন্যরকম হালকা পরিবর্তন আসে—তারপর একদিন মনে হয়, হ্যাঁ, শরৎ এসে গেছে।
এই ধীর পরিবর্তনটাই আমাদের ঋতুর বড় সৌন্দর্য। প্রকৃতি যেন আমাদের সময় দেয় মানিয়ে নেওয়ার জন্য।

পৃথিবীর অনেকদেশ, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বড় অংশে, ঋতু সাধারণত চারটি—বসন্ত, গ্রীষ্ম, শরৎ এবং শীত।

সেখানে ঋতুর পরিবর্তন অনেক বেশি তীব্র ও চোখে পড়ার মতো

। শীতে তাপমাত্রা অনেক জায়গায় শূন্যের নিচে নেমে যায়, বরফে ঢেকে যায় চারদিক, গাছপালা পাতাহীন ন্যাড়া দণ্ডের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
বসন্ত এলে নতুন কুঁড়ি, নতুন পাতা, নতুন ফুল—প্রকৃতি হঠাৎ যেন জেগে ওঠে।
গ্রীষ্মে চারপাশ সবুজ, আর শরৎ এলে গাছের পাতাগুলো লাল, হলুদ, কমলা হয়ে ঝরে পড়ে; রাস্তাঘাট রঙিন পাতায় ঢেকে যায়।

সেখানে ঋতু বদলের এই নাটকীয়তা খুব প্রবল। আমাদের এখানে তা নয়—আমাদের ঋতুগুলো অনেক বেশি কোমল, সহনীয়, ধীরে ধীরে আসে, ধীরে ধীরে যায়।
আমাদের ছয় মাস বরফের নিচে গুটিয়ে থাকতে হয় না, আবার রোদের জন্য হাহাকার করতেও হয় না। এই ধীর, সহজ, মানিয়ে নেওয়া ঋতুচক্রই বাংলার সৌন্দর্য।

আবার নিরক্ষীয় অঞ্চলের অনেক দেশে, যেমন সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ায়, আমাদের মতো ছয়টি স্পষ্ট ঋতু নেই। সেখানে মূলত ভেজা ও অপেক্ষাকৃত শুকনো সময়ের পার্থক্যই বেশি
বোঝা যায়।
তাই মনে হয়, আমাদের এই ছয় ঋতুর দেশ সত্যিই বিশেষ। আর সেই ছয় ঋতুর মধ্যে শরৎ যেন এক মায়াময় সেতু—একদিকে বিদায়ী বর্ষা, অন্যদিকে আগমনী হেমন্ত।

বাংলার শরৎ কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; এটি আমাদের শিল্প, সংস্কৃতি, কৃষি, স্মৃতি ও উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

আমার ছোটবেলার শরৎ মানেই ফরিদপুরের সকাল।
শারদীয় দুর্গাপূজার প্রায় এক মাস আগে থেকেই বড় বড় পূজামণ্ডপে প্রতিমা গড়া শুরু হতো। প্রথমে খড় দিয়ে কাঠামো, তারপর মাটির প্রলেপ—এক মাটি, দো-মাটি—ধীরে ধীরে অবয়ব ফুটে উঠত। তারপর রং, গয়না, শাড়ি, সাজ। প্রতিদিন সকালে ফুল তুলতে বের হতাম, আর সেই সঙ্গে প্রতিমা গড়া দেখতে যেতাম। প্রতিমার সামনে কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকত, আর আমরা কৌতূহল সামলাতে না পেরে পর্দা একটু তুলে দেখে নিতাম—আজ কতটুকু তৈরি হলো! সেই প্রতিদিনের বদলে যাওয়া রূপ দেখা ছিল শরতের এক বড় আনন্দ।

শরৎ মানেই শিউলি ফুল। ভোরের শিশিরভেজা মাটিতে সাদা পাপড়ি আর কমলা ডাঁটার শিউলি ছড়িয়ে থাকত। শিউলি কুড়িয়ে মালা গাঁথা, পূজার থালা সাজানো—এই ছোট্ট ফুলটার গন্ধেই যেন শরতের ভোর চেনা যায়। শরৎ মানেই আবার কাশফুল—নদীর ধারে, বিলের পাড়ে সাদা কাশ দুলতে থাকে, দূর থেকে মনে হয় মাটির ওপর সাদা মেঘ নেমে এসেছে।

মহালয়ার ভোরও শরতের এক অদ্ভুত আবেগময় স্মৃতি। খুব ভোরে বাড়ির সবাই উঠে পড়ত। রেডিওতে বাজত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। তখন তার সব কথা বুঝতাম না, তবু তাঁর সেই ভরাট কণ্ঠ, আবৃত্তি, স্তোত্র, গানের ফাঁকে ফাঁকে উচ্চারণ—মনকে ছুঁয়ে যেত। মনে হতো, পূজা বুঝি সত্যিই এসে গেছে।

তারপর শুরু হতো পূজার জামার জন্য অপেক্ষা।
তখন তো রেডিমেড পোশাকের এত চল ছিল না। বাবা আমাদের তিন বোনের জন্য একই রকম কাপড় কিনে দিতেন। সেই কাপড় নিয়ে যেতে হতো দর্জি কাকুর কাছে। তিনি মাপ নিতেন, আর বাবার নির্দেশ থাকত—ফ্রক একদম হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হবে। আমরা যতই একটু ছোট করতে চাই, দর্জি কাকু বাবার কথাই মানতেন। তারপর প্রায় প্রতিদিনই দর্জি কাকুর বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়া—কাপড় কাটা হয়েছে কি না, সেলাই শুরু হয়েছে কি না। আর এর সঙ্গে ছিল আরেকটা গোপন আনন্দ—পুতুলের জামা বানানোর জন্য ছিট কাপড় সংগ্রহ করা। নতুন জামা হাতে পাওয়া যেত পূজার ঠিক আগের রাতে বা এক-দুদিন আগে। কিন্তু সেই অপেক্ষার আনন্দই ছিল সবচেয়ে বড়। এখনকার মতো তিন দিনের জন্য তিনটা নতুন জামা ছিল না; একটাই নতুন জামা, অষ্টমীর অঞ্জলিতে সেটাই পরার আনন্দ ছিল অপার। বাবা-মায়ের সঙ্গে পূজা দেখতে যাওয়া, ঢাকের বাদ্য, ধূপের গন্ধ, মণ্ডপের আলো—এসবই ছিল আমার শরৎ।

শরতের আরেকটি বিশেষ চিহ্ন ভাদ্রের গরম। দিনের বেলায় গরম অনেক সময় বেশ অসহ্যই লাগে। আমরা তো বলিই—“ভাদ্রের গরমে তাল পাকে।” আর সেই পাকা তাল দিয়ে তৈরি তালের বড়া, তালের পিঠা—এসবও শরতের নিজস্ব স্বাদ। অন্য অনেক পিঠা শীতের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু তালের পিঠা ভাদ্র-শরতের বিশেষ খাবার, আমাদের সংস্কৃতির এক আলাদা অংশ। অষ্টমীর দিন তালের বড়া বা তালের পিঠার স্বাদও অনেক বাড়িতে আলাদা করে মনে রাখা হয়।

প্রকৃতিতেও তখন অপূর্ব দৃশ্য। বর্ষায় রোপণ করা আমন ধান শরতে এসে ঘন সবুজ হয়ে ওঠে। বাতাস বয়ে গেলে মাঠের ওপর সবুজ ঢেউ খেলে যায়। শরতের শেষে, হেমন্তে, সেই ধান ধীরে ধীরে পেকে সোনালি হবে। খাল-বিল-পুকুর-নদীর পানি বর্ষার তুলনায় একটু একটু করে কমে আসে। জল আর তেমন ঘোলা থাকে না; তুলনামূলক স্বচ্ছ, টলটলে হয়ে যায়। সেই স্থির জলে নীল আকাশ আর সাদা মেঘের ছায়া পড়ে। কোথাও শাপলা ফুটে থাকে, কোথাও পদ্ম। ছোটবেলায় শ্রাবণের শেষদিকে ভেলায় চড়ে শাপলা তুলতে যাওয়ার স্মৃতিও মনে পড়ে। টলটলে জলে আকাশের ছায়া, তার ভেতর শাপলা-পদ্ম—এ যেন শরতের প্রকৃতির এক অপূর্ব ছবি।

আমার জীবনের আরও দুটি বড় স্মৃতি শরতের সঙ্গে জড়ানো—আমার দুই সন্তান সাগতা ও সীমান্তের জন্ম এই সময়ে, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। একসময় আগস্ট এলেই ওদের জন্মদিনের বায়না শুরু হয়ে যেত। কবে কেনাকাটা করতে হবে, কী কিনব, জন্মদিন কীভাবে হবে—কত পরিকল্পনা! আমার নিজের কাজের ব্যস্ততায় ওদের খুব বেশি সময় দিতে পারতাম না; কখনো কখনো বকুনিও দিতে হয়েছে। তারপর হঠাৎ একদিন সময় বের করে কেনাকাটা, জন্মদিনের আয়োজন—এসব নিয়েই ওদের ছোটবেলার শরৎ। এখন ওরা বড় হয়ে গেছে। জন্মদিন সামনে এলে জিজ্ঞেস করি, “কী নেবে?”—ওরা আর তেমন কিছুই চায় না। তখন মনে হয়, ঋতুর মতোই মানুষও বদলে যায়, শিশুরাও বড় হয়ে যায়, সময়ও নিঃশব্দে অন্য রূপ নেয়।

তবু শরৎ এলেই আমার ভেতরে ছোটবেলার সেই সকালগুলো আবার বাজতে থাকে—শিউলি কুড়োনো, প্রতিমা গড়া দেখতে যাওয়া, মহালয়ার রেডিও, দর্জি কাকুর দোকানে যাওয়া, পুতুলের কাপড় আনা, বাবা-মায়ের সঙ্গে পূজা দেখা, ভাদ্রের তালের পিঠা, সবুজ ধানক্ষেত, টলটলে জলে শাপলা-পদ্ম, দূরে কাশফুলের সাদা দোলা।

এই জন্যই, এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমি প্রকৃতিকে অনুভব করতে ভুলে যাই না।

কারণ আমার কাছে ঋতু শুধু ক্যালেন্ডারের নাম নয়। ঋতু আসে বাতাসের গন্ধে, আকাশের রঙে, ধানের মাঠে, শিউলির সুবাসে, কাশফুলের দোলায়, ঢাকের বাদ্যে, তালের পিঠার স্বাদে, আর বহু পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে।

এই আমাদের বাংলার শরৎ—বর্ষার হাত ধরে আসে, হেমন্তের হাতে হাত রেখে চলে যায়। আর মাঝখানের এই অল্প সময়টুকুতে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, কৃষি, উৎসব আর স্মৃতিকে এক অপূর্ব সুরে মিলিয়ে দিয়ে যায়।

22/08/2026

Pretermbirth at 31 weeks

প্রি-টার্ম বেবি—মায়ের গর্ভে প্রতিটি দিনই মূল্যবানআজ শিলাঙ্গনে একটি সিজার করলাম। এই মা প্রথম এসেছিলেন ৩৫ সপ্তাহে preterm...
22/08/2026

প্রি-টার্ম বেবি—মায়ের গর্ভে প্রতিটি দিনই মূল্যবান
আজ শিলাঙ্গনে একটি সিজার করলাম। এই মা প্রথম এসেছিলেন ৩৫ সপ্তাহে preterm labour নিয়ে। তখন ওষুধ দিয়ে labour কিছুটা থামিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল। আজ প্রায় ৩৭ সপ্তাহে, বাচ্চার নড়াচড়া কমে যাওয়ায় এবং আগের একটি সিজার থাকায় আবার এলেন। সিজার করলাম।
বাচ্চার ওজন ২.৬ কেজি, ভালো আছে, মায়ের কাছেই আছে, বুকের দুধ খাচ্ছে—NICU লাগেনি।
এই শিশুটিকে দেখে মনে হচ্ছিল—মায়ের গর্ভে পাওয়া ওই বাড়তি কয়েকটা দিন কত মূল্যবান!
আমার ওয়ার্ডে এখন আরেকজন মা—চৈত্রী। প্রথম সন্তান, গর্ভকাল মাত্র প্রায় ৩০ সপ্তাহ। Severe UTI নিয়ে এসেছিল; সঙ্গে বারবার পেটে ব্যথা, show—অর্থাৎ preterm labour শুরু হয়ে গিয়েছিল।
আমি পরিবারকে বললাম,
“এখনই যদি বাচ্চা হয়ে যায়, ওকে বাঁচানোর লড়াইটা অনেক কঠিন হবে। যতক্ষণ মা ও শিশু নিরাপদ আছে, মায়ের গর্ভটাই এখন ওর সবচেয়ে ভালো incubator।”
UTI-এর চিকিৎসা চলছে। Labour কিছুটা থামিয়ে রাখার জন্য ওষুধ দেওয়া হয়েছে। এত অল্প সপ্তাহে delivery-এর আশঙ্কা থাকায় শিশুর brain protection-এর জন্য magnesium sulfate দেওয়া হয়েছে। আমাদের চেষ্টা—অন্তত আরও কিছুদিন, সম্ভব হলে আরও দুটো সপ্তাহ, শিশুটিকে মায়ের গর্ভে রাখা।
কারণ ৩০ সপ্তাহ আর ৩২–৩৪ সপ্তাহের মধ্যে পার্থক্য অনেক।
এখানেই মনে পড়ে শান্তার ২৯ সপ্তাহের যমজ বাচ্চা দুটির কথা। জন্মের পর দীর্ঘদিন NICU-তে থাকতে হয়েছে, surfactantসহ অনেক intensive care লেগেছে। পরিবারের প্রায় ১৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। আজ তিন মাস পর বাচ্চা দুটো ভালো আছে—এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।
তাই preterm baby-র ক্ষেত্রে শুধু “বাচ্চাকে বের করে দিলেই হলো” নয়।
৩৫–৩৬ সপ্তাহের অনেক শিশু একটু extra care পেলেই মায়ের কাছে থাকতে পারে। কিন্তু ২৮–৩১ সপ্তাহে জন্মালে NICU, শ্বাসের সাহায্য, feeding support, কখনো surfactant—অনেক কিছুই লাগতে পারে।
আর শুধু বেঁচে থাকাই শেষ কথা নয়।
ওদের চোখ, শ্রবণশক্তি, মস্তিষ্কের বিকাশ, ভবিষ্যতের শেখার ক্ষমতা—সবই নজরে রাখতে হয়। ঝুঁকিপূর্ণ preterm শিশুর ROP screening-ও করতে হয়; তবে সব শিশুর চোখে laser লাগে না, প্রয়োজন হলেই চিকিৎসা করা হয়।
বাংলাদেশে আনুমানিক প্রতি ৬টি শিশুর মধ্যে ১টি preterm জন্মায়।
তাই আমাদের লক্ষ্য তিনটি—
preterm labour যতটা সম্ভব প্রতিরোধ করা, শুরু হলে নিরাপদ ক্ষেত্রে কিছুটা সময় অর্জন করা, আর delivery অনিবার্য হলে সঠিক NICU সুবিধাযুক্ত জায়গায় শিশুটিকে সর্বোচ্চ যত্ন দেওয়া।
আজ একটি বাচ্চা ৩৭ সপ্তাহের কাছাকাছি এসে মায়ের কোলে।
আরেকটি ৩০ সপ্তাহের ছোট্ট প্রাণ এখনও মায়ের গর্ভে—আমরা তাকে আরও কিছুটা সময় দেওয়ার চেষ্টা করছি।
প্রি-টার্ম শিশুর জন্য মায়ের গর্ভে নিরাপদে পাওয়া প্রতিটি দিনই যেন একেকটি উপহার।

Address

Mymensingh

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Prof. Dr. Shila Sen posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share