23/07/2026
চার বছরের মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন তাসলিমা বেগম রেনু। কিন্তু স্কুল থেকে আর জীবিত ফিরতে পারেননি তিনি। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ‘ছেলেধরা’ গু*জ*ব বিশ্বাস করে শত শত মানুষ তাঁর ওপর ঝাঁ/পি/য়ে পড়ে! প্রকাশ্য দিবালোকে পি*টি*য়ে হ* করা হয় দুই সন্তানের এই মাকে।
তাসলিমা বেগম রেনুর বয়স তখন ৪০ বছর। ইডেন কলেজ থেকে ডিগ্রি পাসের পর সরকারি তিতুমীর কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর করেছিলেন তিনি।
বিয়ের পর আড়ং ও ব্র্যাকে চাকরিও করেন। পরে সন্তানকে সময় দেওয়ার জন্য চাকরি ছেড়ে দেন। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ছেলে থাকত বাবার কাছে, আর ছোট মেয়ে তাসমিন মাহিরা তুবা থাকত মায়ের সঙ্গে।
২০১৯ সালের ২০ জুলাই সকালে উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান রেনু। উদ্দেশ্য ছিল ছোট্ট তুবাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর নিয়মকানুন জানা।
বিদ্যালয়ে উপস্থিত কয়েকজন নারী তাঁর কথাবার্তা ও সেখানে আসার কারণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে ‘ছেলেধরা’ বলে গু*জ*ব ছড়ানো হয়।
খবরটি দ্রুত স্কুলের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশের এলাকা থেকে কয়েক শ নারী-পুরুষ স্কুল প্রাঙ্গণে জড়ো হন! পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে রেনুকে রক্ষার জন্য বিদ্যালয়ের দোতলায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে রাখা হয়।
কিন্তু উত্তেজিত জনতা কলাপসিবল গেট ভেঙে সেখানে ঢুকে পড়ে। তাঁকে চুল ধরে টে*নে*হিঁ*চ*ড়ে নিচে নামানো হয়। এরপর কি*ল, ঘু*ষি, লা*থি ও লাঠি দিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে নি*তন করা হয়।
গুরুতর আ*ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃ/ত ঘোষণা করেন।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ভিডিও ও স্থিরচিত্র বিশ্লেষণ করে পুলিশ অন্তত ৫০ জন নারী-পুরুষের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছিল।
তবে পূর্ণাঙ্গ পরিচয় ও সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে শেষ পর্যন্ত ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তদন্তে ১৯ জনকে শনাক্ত করা হলেও চারজনের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা পাওয়া যায়নি।
হ*কা/ণ্ডে/র দিনই রেনুর ভাগনে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু বাড্ডা থানায় অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ ব্যক্তির বিরুদ্ধে হ* মা*ম*লা করেন। ২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ডিবি পুলিশের পরিদর্শক আবদুল হক ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন।
২০২১ সালের ১ এপ্রিল ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন। মামলার ৩৬ সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। অপর দুই আসামি জাফর হোসেন পাটোয়ারী ও ওয়াসিম আহমেদ ঘটনার সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকায় তাঁদের বিচার শিশু আদালতে আলাদাভাবে চলতে থাকে।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
প্রধান আসামি ইব্রাহিম ওরফে হৃদয় মোল্লাকে মৃ*দ/ণ্ড দেন আদালত। রিয়া বেগম ওরফে ময়না, আবুল কালাম আজাদ, কামাল হোসেন ও আসাদুল ইসলামকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। প্রত্যেককে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং তা পরিশোধ না করলে আরও এক বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মো. শাহিন, বাচ্চু মিয়া, মো. বাপ্পি, মুরাদ মিয়া, সোহেল রানা, বেল্লাল মোল্লা, মো. রাজু ও মহিন উদ্দিনকে খালাস দেন আদালত।
রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি রেনুর পরিবার। রেনুর বোন নাজমুন নাহার নাজমা জানান, হ*কা/ণ্ডে বহু মানুষ অংশ নিলেও কয়েকজনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতে যাওয়ার ঘোষণাও দেয় পরিবার।
রায়ের সময় রেনুর ছেলে তাসিন আল মাহিরের বয়স ছিল ১৬ এবং ছোট মেয়ে তুবার বয়স ৯ বছর। তারাও দোষীদের সর্বোচ্চ শা*স্তি প্রত্যাশা করেছিল।
রেনু হ*কা/ণ্ড শুধু একজন নিরপরাধ নারীর মৃত্যু নয়; এটি গু*জ*ব, বিচারহীন মানসিকতা এবং জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ভয়াবহ পরিণতির উদাহরণ।
সেদিন ছোট্ট তুবা জানত না, তাকে স্কুলে ভর্তি করার খবর নিতে যাওয়া মা আর কখনো ফিরবেন না। কয়েক বছর পর আদালতের রায় এসেছে, কিন্তু মায়ের শূন্যতা এবং একটি গু*জ*বে ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিবারের ক্ষত আজও রয়ে গেছে।
Disclaimer: This post is shared solely for public awareness, historical documentation, and journalistic discussion. It does not promote violence, vigilantism, harassment, or harm against any individual or group. Any reference to violence is presented in a factual and non-graphic manner to highlight the dangers of misinformation, mob justice, and unlawful actions.