03/07/2026
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে কার দায়টা বেশি?
সম্পর্ক, ভালোবাসা আর সংসারের সমীকরণটা আদতে অত্যন্ত জটিল। দুটি মানুষ যখন একটি বন্ধনে জড়ায়, তখন সেখানে মিশে থাকে আশা, স্বপ্ন আর অনেকগুলো না বলা প্রত্যাশা। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা হরহামেশাই দেখছি, সম্পর্কের স্থায়িত্ব যেন অনেকটা ফিকে হয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে চিড় ধরা, একপাক্ষিকভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, কিংবা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি—সব মিলিয়ে সম্পর্কের বুনন আজ বেশ নাজুক।
কিন্তু আমরা কি কখনও ভেবে দেখি, কেন এমনটা হচ্ছে? তৃতীয় পক্ষ হিসেবে আমরা যখন অন্যের সম্পর্কের ভাঙন দেখি, তখন খুব সহজেই বিচারকের আসনে বসে পড়ি। আমাদের নিজস্ব আদর্শ বা ভালো-লাগার চশমা দিয়ে আমরা এক পক্ষকে অপরাধী আর অন্য পক্ষকে ভিকটিম বানিয়ে দিই। অথচ সম্পর্কের গভীরে জমে থাকা বিষাদ, বোঝাপড়ার অভাব, কিংবা কোন জায়গাটাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে, তা আমাদের অজানাই থেকে যায়।
আজ আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সম্পর্কের সেই অন্ধকার দিকটি, যেখানে অনেক পুরুষ নীরবে হারিয়ে যান। পুরুষদের দায়ভার বা দোষ নিয়ে কথা বলাটা আমাদের সমাজে খুব সহজ। কিন্তু সেই অভিযোগের পেছনে থাকা পুরুষটির মানসিক অবস্থা, তার নীরবতার কারণ, কিংবা দায়িত্বের চাপে পিষ্ট হয়ে যাওয়ার গল্পগুলো কি আমরা শুনতে চাই?
আমাদের সমাজে পুরুষের সংজ্ঞা যেন বেঁধে দেওয়া হয়েছে 'প্রদানকারী' (Provider) হিসেবে। সংসার ভালো না চললে অভিযোগের আঙুলটা সবার আগে স্বামীর দিকেই ওঠে। কিন্তু এই অভিযোগগুলোর নেপথ্যে থাকা বৈপরীত্যগুলো কি আমরা খেয়াল করি?
পুরুষ যখন তার ক্যারিয়ারে সফল হতে পারেন না বা পর্যাপ্ত উপার্জন করতে পারেন না, তখন তাকে অযোগ্য বলতে সমাজ বা পরিবারের দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না। দিনের পর দিন অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য তাকে ভেতর থেকে নিঃস্ব করে দেয়। সম্পর্কের সেই পরম আশ্রয়স্থলই তখন তার জন্য হয়ে ওঠে রণক্ষেত্র।
ঠিক বিপরীত চিত্রটিও সমান সত্য। যখন পুরুষটি পরিবারের প্রতিটি চাহিদা পূরণ করতে দিনরাত পরিশ্রম করেন, ক্যারিয়ারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখনই অভিযোগ ওঠে—"তুমি তো সময় দাও না।" পরিবারের স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে গিয়ে তিনি যে নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিচ্ছেন, সেই মানসিক ক্লান্তিটুকু দেখার অবকাশ কি সত্যিই আমরা পাই?
পুরুষের আত্মত্যাগের সবচেয়ে করুণ রূপ দেখা যায় প্রবাসীদের জীবনে। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের দেশের মাটি, পরিবার, প্রিয়জনদের ছেড়ে বছরের পর বছর সুদূর কোনো দেশে একা সংগ্রাম করে যান একজন প্রবাসী। তার কাছে নিজের বলে আসলে কী থাকে?
দিনের শেষে তিনি একাকী, ক্লান্ত। দেশে ফেলে আসা সন্তান বড় হচ্ছে, স্ত্রী একাকীত্বে ভুগছেন, বাবা-মা বৃদ্ধ হচ্ছেন—এই দূরত্বটুকু কেবল ভৌগোলিক নয়, আবেগীয়ও বটে। প্রবাসীদের ক্ষেত্রে সম্পর্কের স্থায়িত্ব টিকিয়ে রাখা এক অগ্নিপরীক্ষার মতো। অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের সবার চাহিদা মেটাতে গিয়ে তিনি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছেন। তার নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের খোঁজ রাখার মতো কেউ থাকে না। দিনশেষে যখন তিনি ফিরে আসেন, তখন হয়তো দেখেন—তার জীবনের দীর্ঘ সময়ের দূরত্ব আর কখনোই দূর হওয়ার নয়, কিংবা সে জায়গাটি অন্য কেউ দখল করে নিয়েছে।
একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনে কখনোই শুধু একজনের দায় থাকে না। সম্পর্কের রসায়নটি দুইজনেরই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় টিকে থাকে। পুরুষ মানেই যে শুধু যন্ত্রের মতো দায়িত্ব পালন করে যাবে, তার কোনো অনুভূতি থাকবে না—এই ধারণাটি ভাঙার সময় এসেছে।
পুরুষের নীরবতা মানেই তার সম্মতি বা সুখ নয়। তার অবসাদ, তার কাজের চাপ, তার বিসর্জনগুলোকেও আমাদের স্বীকার করতে হবে। যখন আমরা কাউকে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন' বলি, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত, কোনো পুরুষই শখ করে নিজের ঘরটা ভাঙতে চায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, তিনি তার সক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়ার পরই নিরুপায় হয়ে হাল ছেড়ে দেন।
সম্পর্ক কোনো প্রতিযোগিতার জায়গা নয়, এটি আশ্রয়ের জায়গা। একজন পুরুষের প্রতি যখন অবহেলার দেয়াল তোলা হয়, যখন তার অবদানের চেয়ে ব্যর্থতাকে বড় করে দেখা হয়, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের খোলসের ভেতর ঢুকে পড়ে। সম্পর্কের ভাঙন রোধ করতে হলে একে অপরকে জাজ করা বন্ধ করতে হবে।
পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া, তার সীমাবদ্ধতাগুলোকে সহমর্মিতার সাথে দেখা এবং 'মানুষ' হিসেবে তার আবেগগুলোকে মূল্যায়ন করাটাই হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের চাবিকাঠি। আমাদের মনে রাখতে হবে—পুরুষও মানুষ, তারও ক্লান্ত হওয়ার অধিকার আছে, তারও ভালোবাসার অভাববোধ থাকে। সম্পর্কের ভাঙনে শুধু একজনকে দোষারোপ না করে, আসুন আমরা একে অপরের প্রতি আরেকটু সহনশীল হই।
-এস এম সালমান রশিদ শান্ত
সাইকোলজিস্ট | সফট স্কিল ট্রেইনার | পারসোনাল গ্রোথ কোচ