19/05/2026
প্রাগৈতিহাসিক -১৮ ।।
""""""""""'"""" আইন """""""""""""""""""
" জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক, নিজের যে কথা গুলিকে চিরকালের জন্য শ্রুতিগোচর করিতে চাহিয়াছিলেন, সেগুলিকে তিনি পাষাণের গায়ে খুদিয়া দিয়াছিলেন। ভাবিয়া ছিলেন পাষাণ কোন কালে মরিবে না, সরিবে না, অনন্ত কালের পথের ধারে দাঁড়াইয়া এক কথা চিরকাল উচ্চারণ করিতে থাকিবে।"
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাচীন ভারতীয় মৌর্য যুগের মহান সম্রাট ' অশোক ' সম্পর্কে উপরিউক্ত মন্তব্যটি করেছিলেন। এটি ছিল যথার্থ মন্তব্য।
আজ হতে ২৩০০ বছর আগের কথা। তখন সম্রাট অশোক পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে দিয়েছিলেন অনেক অমর বানী। বিশেষ করে ৪০/ ৫০ ফুট উঁচু পাথরের গায়ে খোদাই করা হয়েছিল নানানরকম বানী যা এখন "অশোক স্তম্ভ" নামে পরিচিত হয়ে আছে।
সম্রাট অশোকেরও দেড় হাজার বছর আগে মেসোপোটেমিয়ার ব্যবিলনে এক মহাপরাক্রমশালী সম্রাট রাজত্ব করতেন।
তাঁর নাম ছিল -- " হাম্মুরাবি "।
তিনি ছিলেন প্রথম ব্যবিলনীয় সাম্রাজ্যের ষষ্ঠ সম্রাট।
১৭৯২ থেকে ১৭৫০ খ্রীস্টপূর্ব সময়কালে তিনি রাজত্ব করেছিলেন।
তাঁর রাজত্ব কালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল তিনি " হাম্মুরাবি কোড অফ ল "
লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
এইটিই বিশ্বের প্রাচীনতম এবং পুর্নাঙ্গ আইনী বিধান, যা তিনি পাথরের গায়ে খোদাই করে দিয়েছিলেন।
হতে পারে এর রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্য ছিল। হতে পারে বিভিন্ন ভাষাভাষী, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে এক কাতারে নিয়ে আসার একটি সাংবিধানিক কৌশল ছিল।
যে কারনেই হোক, এইটিই বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান।
প্রায় চার টন ওজনের সাড়ে সাত ফুট উচ্চতার একটি কালো পাথরের স্তম্ভের গায়ে খোদাই করে লেখা হয়েছিল ২৮২ টি আইন ও সেই আইনের আওতায় কী সাজা হবে তার বর্ননা।
আক্কাদীয় ভাষায়, কিউনিফর্ম লিপিতে এসব লেখা হয়েছিল।
স্তম্ভটির উপরের দিকে স্বয়ং " সম্রাট হাম্মুরাবির " মূর্তি বসানো রয়েছে, যিনি ন্যায়বিচারের দেবতা " শামাশের " কাছ থেকে একটি ন্যায়দণ্ড গ্রহন করছেন!
প্রাচীন এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি বর্তমানে প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
এই পাথরের স্তম্ভে যে ২৮২ টি আইন লিপিবদ্ধ করা আছে তার কয়েকটি মাত্র নীচে লিপিবদ্ধ করা হলো।
(৩)
" যদি প্রমানিত হয় যে কেউ মিথ্যা স্বাক্ষ্য প্রদান করেছে, তবে তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হবে। "
(৬)
" যদি কেউ মন্দিরের কিংবা বিচারালয়ের সম্পত্তি চুরি করে তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। যার কাছে চুরির মালামাল পাওয়া যাবে তাকেও মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে। "
(৮)
যদি কেউ মন্দির কিংবা বিচারালয়ের গরু, ছাগল, ভেরা ইত্যাদি চুরি করে তবে তাকে সাজা হিসাবে চুরি যাওয়া সম্পদের ৩০ গুন সম্পদ ফেরত দিতে হবে।
এই সম্পদ যদি কোন সাধারণ নাগরিকের হয়, সেক্ষেত্রে ৩০ গুনের জায়গায় ১০ গুন ফেরত দিতে হবে।
যদি চোরের এই পরিমান সম্পদ ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য না থাকে তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করতে হবে। "
(১৪)
" যদি কেউ অন্য কারো নাবালক পুত্রকে অপহরণ করে তবে তার সাজা হবে মৃত্যু দন্ড। "
(১৫)
দাস দাসী অপহরণ করার শাস্তিও হবে মৃত্যু দন্ড। "
(২২)
" ডাকাতি বা দস্যুবৃত্তি কালে ধরা পড়লে শাস্তি হবে মৃত্যু। "
(১২৯)
" কোন লোকের স্ত্রী যদি পরপুরুষের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তাহলে সাজা হিসাবে দুইজনকেই হাত পা বেঁধে পানিতে নিক্ষেপ করা হবে। "
(১৯৫)
" কোন পুত্র যদি তার পিতার গায়ে হাত তোলে, তবে পুত্রের হাত ভেঙ্গে দেওয়া হবে। "
(১৯৬)
" কোন লোক যদি অন্য কোন লোকের চোখ তুলে ফেলে, তবে তারও চোখ তুলে নেওয়া হবে। " ( চোখের বদলে চোখ) ।
(১৯৭)
" যদি কেউ অন্য কোন লোকের হাড্ডি ভেঙ্গে দেয় তবে তারও হাড় ভেঙ্গে দেওয়া হবে। "
( হাড়ের বদলে হাড়) ।
(১৯৯)
" এই হাড় ভেঙ্গে ফেলা বা চোখ তুলে ফেলা যদি কোন দাস দাসীর ক্ষেত্রে ঘটে তবে চোখের বদলে চোখ বা হাড়ের বদলে হাড় নয়, সেক্ষেত্রে এক গোল্ড মিনার অর্ধেক জরিমানা দিলেই চলবে। "
(২০০)
যদি কেউ অন্য কারো দাঁত ভেঙে দেয় তবে সাজা হিসাবে তারও দাঁত তুলে নেওয়া হবে"
( দাঁতের বদলে দাঁত) ।
(২০২)
" যদি কোন লোক অন্য কোন উচ্চ বংশীয় বা উচ্চ পদবীর লোকের শরীরে আঘাত করে তবে তাকে সাজা স্বরুপ ৬০ ঘা চাবুকের আঘাত খেতে হবে। "
(২০৩)
যদি কেউ তার সমান পদবীর কারো শরীরে আঘাত করে তবে তাকে চাবুকের বারি খেতে হবে না, জরিমানা স্বরুপ একটি স্বর্নমুদ্রা দিলেই চলবে। "
(২৮২)
" যদি কোন দাস বা দাসী তার প্রভুকে বলে যে - " তুমি আমার প্রভু নও ", তাহলে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে দাস বা দাসীর কান কেটে নেওয়া হবে। "
২৮২ টি আইনের ১৫ টি এখানে উল্লেখ করা হল।
আরো একটি বিষয় এই যে, এই "হাম্মুরাবি কোড অফ ল " এর ৩০০ বছর পুর্বে আরো একটি এই রকম সংবিধান ছিল, যার নাম ছিল -- " কোড অফ উর নাম্মু "।
তবে সম্রাট " হাম্মুরাবি " সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আইন সংক্রান্ত বিষয়গুলি যোগারযন্ত্র করে একত্রে এই -- " হাম্মুরাবি কোড অফ ল " প্রস্তুত করেছিলেন। এই কারনেই এই প্রাচীন ব্যবিলনীয় সম্রাট ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।।
___ ডাঃ সুকুমার সুর রায়।