Dr. Sukumar Sur Roy

Dr. Sukumar Sur Roy I'm a general physician, practicing at ibne sina Prime Diagnostic Centre, ullapara, Sirajganj.

I want to disseminate medical general knowledge to common people thereby update their health consciousness...

"প্রতিদিন সকালের ৩০ মিনিট হাঁটা। হার্টের ভিতরে বড় ম্যাজিক!" "আমরা হৃদরোগ ও প্রেসারের হাজার টাকার ওষুধের খোঁজে ব্যস্ত থাক...
24/08/2026

"প্রতিদিন সকালের ৩০ মিনিট হাঁটা। হার্টের ভিতরে বড় ম্যাজিক!"

"আমরা হৃদরোগ ও প্রেসারের হাজার টাকার ওষুধের খোঁজে ব্যস্ত থাকি, অথচ প্রতিদিন সকালের একজোড়া জুতো আর ৩০ মিনিটের সাধারণ হাঁটা আমাদের রক্তনালী ও হার্টের ভেতরে আস্ত একটি প্রাকৃতিক ফার্মেসি খুলে দেয়—তা কি আমরা শারীরবৃত্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জানি?"

কার্ডিওভাসকুলার মেডিসিন ও মানব ফিজিওলজির (Cardiovascular Physiology) আলোতে নিয়মিত সকালের ৩০ মিনিট হাঁটা কীভাবে হৃদযন্ত্র ও রক্তচাপকে সুরক্ষিত রাখে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. হার্টের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও মায়োকার্ডিয়াল স্বাস্থ্যঃ

হাঁটা মূলত একটি চমৎকার মডারেট-ইনটেনসিটি অ্যারোবিক এক্সারসাইজ (Moderate-Intensity Aerobic Exercise), যা হার্টের পেশি বা মায়োকার্ডিয়ামকে সরাসরি শক্তিশালী করে।

* স্ট্রোক ভলিউম ও কার্ডিয়াক আউটপুট:

নিয়মিত হাঁটলে হৃদপিণ্ডের প্রতি পাম্পে রক্ত বের করার ক্ষমতা (Stroke Volume) বাড়ে। ফলে হার্টকে তুলনামূলক কম পরিশ্রমে সারা শরীরে পর্যাপ্ত রক্ত পাঠাতে হয়।

* কোলেটেরাল সার্কুলেশন তৈরি:

নিয়মিত হাঁটলে হার্টের নিজস্ব রক্তনালীতে (Coronary Arteries) রক্তপ্রবাহ বাড়ে এবং নতুন সূক্ষ্ম রক্তজালক (Collateral Vessels) তৈরি হতে উদ্দীপনা পায়, যা ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুলাংশে কমায়।

* লিপিড প্রোফাইলের ভারসাম্য:

এটি রক্তে ক্ষতিকর LDL (লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন) এবং ট্রাইগ্লিসারাইড কমিয়ে উপকারী HDL (হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন) বাড়ায়, যার ফলে করোনারি ধমনীতে চর্বির প্লাক জমা (Atherosclerosis) বাধাগ্রস্ত হয়।

২. উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension) নিয়ন্ত্রণে ভূমিকাঃ

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সকালের হাঁটা রক্তনালীর মেকানিক্স ও হরমোনাল লেভেলে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

* ভাসোডাইলেশন ও নাইট্রিক অক্সাইড (Nitric Oxide): হাঁটার সময় রক্তপ্রবাহের ঘর্ষণে রক্তনালীর ভেতরের স্তর (Endothelium) থেকে নাইট্রিক অক্সাইড নিঃসৃত হয়।

এই রাসায়নিক উপাদানটি রক্তনালীর মসৃণ পেশিগুলোকে শিথিল (Vasodilation) করে দেয়, যার ফলে প্রান্তীয় রক্তপ্রবাহের বাধা (Systemic Vascular Resistance) কমে রক্তচাপ প্রাকৃতিকভাবে ৫ থেকে ৮ mmHg পর্যন্ত নেমে আসে।

* ধমনীর স্থিতিস্থাপকতা (Arterial Compliance):

বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধমনী শক্ত বা অনমনীয় হয়ে যায় (Arterial Stiffness)। নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম রক্তনালীর স্থিতিস্থাপকতা ধরে রাখে, ফলে সিস্টোলিক রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৩. রক্তের প্রবাহ ও মেটাবলিজমের সার্বিক উন্নয়নঃ

* ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি:

সকালের হাঁটা কঙ্কাল পেশির গ্লুকোজ গ্রহণ ক্ষমতা বাড়ায়, যা ডায়াবেটিস ও মেটাবলিক সিনড্রোম নিয়ন্ত্রণ করে পরোক্ষভাবে হার্টকে ভালো রাখে।

* রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি হ্রাস:

এটি প্লাটিলেটের অতিরিক্ত আঠালো ভাব কমায় এবং রক্ত তরল রাখার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া (Fibrinolysis) সক্রিয় রাখে, ফলে ধমনীতে হঠাৎ রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমে।

প্রতিদিন সকালে মাত্র ৩০ মিনিট ঘাম ঝরিয়ে হাঁটার অভ্যাস কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই রক্তনালীর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করে।

উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নির্ভরতা কমায় এবং হার্টকে আজীবন সক্রিয় ও দীর্ঘস্থায়ী রাখে।

সকালের ঘুমকে না বলে মাত্র ৩০ মিনিটের হাঁটার অভ্যাসটা গড়ে তুলুন। অর্গানিক খাবার খান। হৃদরোগ থেকে বিপদমুক্ত থাকুন।

সৌজন্যে : শামীম চৌধুরী

সোনার হরিণ l  পর্ব -- ২০। __ "গুরুচরণ"। গুরুচরনের ' সাথে প্রথম পরিচয় আজ থেকে একত্রিশ  বছর আগে।যেদিন রাজশাহী থেকে বদলি হয়...
21/08/2026

সোনার হরিণ l
পর্ব -- ২০। __ "গুরুচরণ"।

গুরুচরনের ' সাথে প্রথম পরিচয় আজ থেকে একত্রিশ বছর আগে।
যেদিন রাজশাহী থেকে বদলি হয়ে একদম অঁজ গ্রামের এই হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসাবে যোগাদান করি সেদিন আমার এখানেই থেকে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

প্রথম সমস্যা দেখা দিল থাকবো কোথায়?

হাসপাতালে ডাক্তারদের থাকার জন্য কোয়ার্টার আছে বটে কিন্তু সে কোয়ার্টারে
কেউ থাকে না।

বেশিরভাগ ডাক্তার নিকটবর্তী শহরে থাকেন।
যিনি প্রধান কর্মকর্তা তিনি কোয়ার্টারের একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়ে রেখেছেন কিন্তু নিয়মিত অবস্থান করেন না।

আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসাবে আমি কোয়ার্টারেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।
কিন্তু আজই কেমন করে সেখানে উঠবো?
আমার না আছে ফার্নিচার, না আছে বেডিং, না আছে কোন কিছু।

বেলা দুইটা বাজে। হাসপাতালের অফিস ছুটি হয়ে গেছে। প্রধান কর্মকর্তাও চলে গেছেন।
সমস্যাটির কথা বলতেই হাসপাতালের ইনচার্জ সিস্টার নাজমা হাঁক ছাড়লেন --
-- গুরুচরণ, গুরুচরণ --!

একজন মধ্যবয়সী মানুষ সিস্টারের রুমের
দরজার পাশে এসে দাঁড়ালো।
বেঁটে খাটো চেহারা, গায়ের রঙ শ্যামলা । বিনয়ী ভঙ্গিতে বলল -- জ্বী আপা।

নাজমা সিস্টার বললেন --" নতুন 'আরএমও' স্যার আজ এখানে থাকবেন। ডক্টর্স কোয়ার্টারে দোতলার একটা রুম পরিষ্কার করে গোজ গাজ করে দিয়ে এসো।"

জ্বী আপা, আমি ঘরদোর পরিষ্কার কইর‍্যা আসি, আপনে ইস্টোর থেইক্যা নতুন চাদর বালিশ বাইর কইর‍্যা রাখেন।

তার পর আমাকে উদ্দেশ্য করে গুরুচরন বলল -
স্যার, আমি আগে সব ঠিক ঠাক করি, তারপর আপনে আইসেন ।

একথা বলে গুরুচরন চলে গেল।
আমি সিস্টারের সাথে কথা বলে নতুন হাসপাতালের খুঁটিনাটি জানার চেষ্টা করতে লাগলাম।

কিছুক্ষণ পর গুরুচরন এসে আমাকে সাথে নিয়ে রুমে ঢুকিয়ে দিল। বাথরুম, টয়লেট,কিচেন, দেখিয়ে দিয়ে তালার চাবি আমার হাতে দিয়ে বিদায় নিতে চাইল।

তখনই আমার মনে হল ক্ষিদা লেগেছে। খাওয়া দরকার।
গুরুচরন কে জিজ্ঞাসা করলাম - আশে পাশে কোন খাবার হোটেল নাই?

গুরুচরন বলল -- না স্যার, এখানে তো কোন খাওয়ার হট্যাল নাই।

তা হলে উপায় কি?

স্যার, উপায় আছে। 'রুপসীর মা' নামে এক মহিলা আছে। বড় স্যার যখন এখানে থাকে, রুপসীর মা 'বড় স্যারের পাক সাক্ কইর‍্যা দেয় ।

আমি বললাম --'সেতো বুঝলাম, বড় স্যারের হয়তো রান্নার সরঞ্জামাদি আছে, বাজার ঘাটের ব্যবস্থা আছে, সেখানে রুপসীর মা রান্না করে দেয়। আমার তো খালি হাত, খালি পা। আমার এখন উপায় কি?

গুরুচরন বলল --স্যার, কোন চিন্তা কইরেন না,আপনি হাত মুখ ধুইয়া ফেরেশ হন। আমি এখুনি আপনের খাওয়ার বেবস্থা কইরত্যাছি।
একথা বলেই গুরুচরন চলে গেল।

জামাকাপড় ছেড়ে বাথরুমে কলের জল ছাড়তেই হলুদের গুড়ার মত দানা দানা জিনিষ বের হতে লাগল।
বুঝলাম অনেকদিন এসব ব্যবহার করা হয় নাই।
যাই হোক ফ্রেশ টেশ হয়ে কিছুক্ষণ জানালা
দিয়ে বাইরের পুকুরের দিকে উদাস তাকিয়ে থেকে পেটের ক্ষিদা ভুলে থাকার চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই গুরুচরন দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো। পেছনে মধ্যবয়সী রুপসীর মা। দুই জনের হাতে গামলা ঢাকা খাবার দাবার।

গরম ভাত। সাথে আলুভর্তা ও ডিম ভাজা।
খেয়ে দেয়ে গুরুচরনের পেতে দেয়া সরকারি খাটে, সরকারি চাদর ও বালিশে গা' এলিয়ে দিয়ে কখন যেন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে পড়ে না।

পরদিন সকালে হাসপাতালের ওয়ার্ডে রাউন্ডের সময় গুরুচরন কে দেখা গেলো এক গাদা ফাইল হাতে নিয়ে সিস্টারের সাথে সাথে ঘুরতে।
তখনো গুরুচরনের পদবি জানা হয় নাই।
মহিলা ওয়ার্ডে রাউন্ডের এক পর্যায়ে যখন সিস্টারের দৃষ্টি আকর্ষন করে বললাম --------- টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ আসছে! তখনই সিস্টার -'রা' রা' করে উঠে গুরুচরন কে হুকুম করলেন -শিগগীর টয়লেট পরিষ্কার কর।

গুরুচরন ত্রস্তব্যস্ত হয়ে ফাইলের স্তুপ একজন রোগীর বেডে রেখেই দ্রুত গতিতে টয়লেটের দিকে ছুটে গেলো!

সিস্টারকে জিজ্ঞেস করলাম -- 'গুরুচরন কী -'ওয়ার্ড বয় ' নয়?

নাজমা সিস্টার বললেন -না, ওতো সুইপার।

তা হলে ওয়ার্ড বয়ের কাজ করছিলো যে!

ওয়ার্ডবয় যে আছে, তার ডিউটি বিকালে, তাই গুরুচরন এখন ওয়ার্ডবয়ের দায়িত্ব পালন করছে।

ও, আচ্ছা। তাহলে গুরুচরন কি একাই সুইপার?
আর কোন সুইপার নাই?

নাজমা বললেন -জাত্ সুইপার গুরুচরন একাই।
আরো দুই সুইপার পোষ্টে লোক আছে, তবে তারা মুসলমান, ওরা টয়লেট পরিষ্কার করে না। আর দুইটা সুইপারের পোষ্ট খালি আছে।

পরে অবশ্য সুইপারের পোষ্ট পুরন হয়েছিল,
ততদিনে 'সুইপার' পদবি পরিবর্তন হয়ে ' ক্লিনার বা 'পরিচ্ছন্নতাকর্মী ' হয়েছিল।

সেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কেউ জাত্ সুইপার ছিল না।
ফলে টয়লেট পরিষ্কারের কাজ গুরুচরণকে একাই করতে হত।

পরবর্তীতে আস্তে আস্তে গুরুচরণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা হতে লাগলো।

গুরুচরনের বাড়ি হাসপাতাল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দুরবর্তী শহরতলীর 'ঋষি পাড়ায়।'
খুব ভোরে হাসপাতালের কোন স্টাফ বা অন্য কেউ যখন এসে পৌছায় নাই, সেই কাক ডাকা ভোরে গুরুচরন একটি ভাঙ্গা সাইকেল চালিয়ে হাসপাতালে উপস্থিত হত।

উপস্থিত হয়েই তার কার্যক্রম শুরু করে দিত। প্রথমেই সে টয়লেট পরিষ্কার করতো। তারপর ওয়ার্ড, অন্যান্য রুম, বারান্দা, ঝারু দিয়ে শেষ করে, হাসপাতালের আঙ্গিনা ঝারু দিতে শুরু করত।

ততক্ষনে হয়তো কেউ কেউ এসে পৌছাতো, সেই 'কেউ কেউ 'আবার গুরুচরণকে ধমক দিত -- আরো সকালে আসতে পারো না? ধুলা উড়ছে! একটু পানি ছিটিয়ে নিলে ভাল হত না?
গুরুচরণ বিনা বাক্য ব্যয়ে টিউবওয়েল থেকে বালতি ভর্তি পানি নিয়ে এসে ছিটিয়ে দিতো।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ হলে গুরুচরণ চট করে অফিসিয়াল ইউনিফর্ম পরে নিতো। তারপর অন্য কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তো।
প্রথমে তার উপরে হুকুম হতো -- রোগিদের বেডে বেডে ব্রেকফাস্ট পৌছে দাও।

এরপরের হুকুম -- আরএমও স্যার রাউন্ড দিবেন, -বেডে বেডে ফাইল গুলি দিয়ে দাও।

এসব করতে করতেই হয়তো জরুরি তলব এল -- জরুরি বিভাগে 'বিষ খাওয়া' রোগি এসেছে , গুরুচরন শিগগির চলে আসো। "

গুরুচরণ বালতি, স্টমাক ওয়াশ টিউব, ইত্যাদি নিয়ে দ্রুত ছুটে যেত 'বিষ খাওয়া' রোগির স্টমাক ওয়াশ দিতে।

কখনো বা একসাথে অনেক একসিডেন্টের রোগি চলে আসত, গুরুচরন ছুটে যেত জরুরি বিভাগের দিকে।

গুরুচরন হরিজন সম্প্রদায়ের নীঁচু জাতের মানুষ, কোন লেখা পড়া জানতো না।
তা হলে কি হবে! সে পরিনত হয়েছিল এই হাসপাতালের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে , একজন অতি প্রয়োজনীয় মানুষ হিসাবে।

তাকে ছাড়া হাসপাতাল সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার কথা কল্পনাও করা যেত না।

সে নিজেও জানতো, বলার আগেই তাকে অনেক ধরনের কাজ করে ফেলতে হবে। না করলে কাজ জমে যাবে ; এবং শেষ পর্যন্ত তাকেই তা শেষ করতে হবে।

নিজের শিডিউল কাজের বাইরেও এমন কোন কাজ নেই যা সে করতো না।

সে মুলত সুইপার, কিন্তু ওয়ার্ডবয়, পিয়ন, মালি, সিকিউরিটি গার্ড, বাবুর্চি, কারো কাজ করতেই সে পিছপা হতো না। এমনকি চিকিৎসকের ছোট খাটো কাজও সে করে ফেলতো অবলীলাক্রমে, অবশ্যই প্রটোকল মেনে। কারো বিরুদ্ধে তার কোন অভিযোগ ছিলো না । উপরন্তু, সকল কাজ সে করতো সন্তুষ্ট চিত্তে,নিজ দায়িত্বে।
যেন এই হাসপাতাল তার কাছে মন্দির, হাসপাতালের কাজ করা তার কাছে উপাসনার মত!
ছোট খাটো সেলাই করা , ফোঁড়া কাটা, ব্যান্ডেজ করা, ড্রেসিং করা তার নৈমিত্তিক কাজ। কোন আগুনে পোড়া রোগীর দুর্গন্ধে যখন কেউ সেই বেডের কাছে যেতে চাইতো না,, তখন ওয়াশ করার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিত গুরুচরন।

এভাবেই তার উপস্থিতিতে 'আরএমও' হিসেবে আমার নিজেরও একধরনের স্বস্তি বোধ হতো।

ধীরে ধীরে অন্যদের মত আমি নিজেও গুরুচরনের উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে লাগলাম।
গুরুচরন কে একদন্ড না দেখলেই অস্বস্তি হতো! জিজ্ঞেস করতাম-"সে কোথায়?" তখন হয়তো সে বর্জ্য ফেলতে গেছে কিংবা ফাইল নিয়ে বড় স্যারের রুমে গিয়েছে।

হঠাৎ কখনো কখনো জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন হতো। তখন গুরুচরনের দায়িত্ব পড়তো 'ওটি' রেডি করার, ওটি 'পরিষ্কার করার। শুধু কি তাই?
'ওটি 'তে এনেস্থেসিস্টের সহকারীর দায়িত্বও পালন করতে হত গুরুচরনকে।
এনেস্থিসিয়া মেশিনের নাটবল্টুর সমস্যা হচ্ছে ! -- কোন্ ফাঁকে গুরুচরন একটি রেঞ্জার হাতে নিয়ে তা ঠিকঠাক করে দিচ্ছে মুহুর্তে!
অক্সিজেন সিলিন্ডারের প্যাঁচ খুলছেনা? শিগগির গুরুচরন কে ডাকো! , সব কিছু দ্রুত ব্যবস্থা হয়ে যাবে!

একদিন গভীর রাতে আমার দরজায় ঠক্ ঠক্ আওয়াজ শুনে বললাম-কে.. ?
গুরুচরন সভয়ে বলল --স্যার, ইমার্জেন্সিত এক বৃদ্ধ রোগি আইছ্যে, পেশাব বন্দ হয়্যা খুব কষ্ট পাইত্যাছে, একটু ওঠেন স্যার।

দেখলাম, আশি বছরের নুরানি চেহারার এক বৃদ্ধ মানুষ, তার পেট ফুলে ঢোল হয়ে আছে, দুইদিন হল এক ফোঁটা প্রস্রাবও হয় নাই! জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে অসহ্য যন্ত্রনায় আল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌ করে চিৎকার করে কাঁদছেন।

জানলাম, দুই বছর আগে হজে যাওয়ার আগে তার প্রস্টেটের সমস্যা ধরা পড়েছে।

ডাক্তার অপারেশনের কথা বলেছিলেন, কিন্তু তা করা হয়ে ওঠে নাই। কষ্টেসৃষ্টে এতদিন প্রস্রাব করা চলছিল, কিন্তু দুইদিন হল প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে!

গুরুচরন কে জিজ্ঞেস করলাম - ''ক্যাথেটার করার চেষ্টা করা হয়েছে কিনা?" সে ঘাড় নেড়ে, হ্যাঁ' সূচক জবাব দিল, কিন্তু সফল হয় নাই তাও বললো।

আমি নিজে একবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম।
বিকল্প হিসাবে 'মেটালিক ক্যাথেটার 'দিয়ে চেষ্টা করা হল। তাতে প্রস্রাবের বদলে রক্ত আসা শুরু হল!

রোগীর লোকজনকে বললাম -এখানে সম্ভব হচ্ছেনা, সদরে রেফার করবো।
তখনই গুরুচরন আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস্ করে বলল -- স্যার, অনেকদিন আগেনা একবার প্যাট ফুটা কইর‍্যা পেশাব বাইর কইর‍্যা দিছিল্যান!"

গুরুচরনের কথায় সম্বিৎ ফিরে পেলাম। 'সুপ্রাপিউবিক পাংকচারের ' কথা বলছে গুরুচরণ।

পঞ্চাশ সিসি সিরিঞ্জের মোটা সূঁচ তলপেট দিয়ে প্রস্রাবের থলিতে ঢুকিয়ে, সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে টেনে প্রস্রাব বের করা শুরু হলো।

কিছুক্ষনের মধ্যে প্রস্রাব দিয়ে বড় দুইটি গামলা ভরে গেলো!

বৃদ্ধ হাজি সাহেব আরামে চোখ বন্ধ করে যেন ঘুমিয়ে পড়লেন! আমাদের কাজ শেষ হওয়ার পর টেবিল থেকে নেমে, তিনি হুড়মুড় করে গুরুচরন কে বুকে জড়িয়ে ধরে নানা রকম দোয়াদরুদ পড়ে আশির্বাদ করতে লাগলেন।

প্রতি ঈদের দিনে আমরা যারা ডিউটিরত থাকতাম তাদের জন্য খাবার রান্না করতো গুরুচরন। কোরবানির ঈদের দিন রান্না শেষ করেই বেলা এগারোটার দিকে গুরুচরন হাত কচলাতে কচলাতে অতি বিনয়ের সাথে ' দুই ঘন্টার ' জন্য ছুটি চাইতো। প্রথম প্রথম বুঝিনি, কি জন্য ওর ছুটির দরকার পড়তো।
পরে অন্যদের কাছে জেনেছি -- ' ওর জাত ব্যবসা '।
কোরবানির পশুর কিছু চামড়া ওর অল্প পুঁজি দিয়ে সংগ্রহ করে লবন মাখিয়ে রেখে আসতো।
এটাই ছিল চাকরির বাইরে ওর দুই পয়সা উপড়ি আয়।

একদিন গুরুচরনের বাড়িতে তার মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ পাওয়া গেলো। হাসপাতালে কর্মরত সবাইকে নিমন্ত্রণ দিয়েছে। আমরা সবাই মিলে গুরুচরনের বাড়ি নিমন্ত্রণ খেতে যাচ্ছি।
মনে মনে চিন্তা হচ্ছে -- ' গুরুচরন তো একদম নিম্ন জাতি! অচ্ছ্যুত জাতির লোক! তার বাড়িতে খাওয়া!?
অফিসে তার হাতের রান্না খেয়েছি, সেটাতো কেউ জানেনা। তাই বলে তারই সমাজে, তারই বাড়িতে, প্রকাশ্যে দিবালোকে, ঘটা করে নেমন্তন্ন খাওয়া!'
মনের ভাবনাটা প্রকাশ করে ফেললাম।

নাজমা সিস্টার অভয় দিয়ে বললেন -- " না স্যার, ওর বাড়ির পাশের এক মুসলমান বাড়িতে আয়োজন করা হয়েছে, আলাদা কেনাকাটা করা হয়েছে, মুসলমান বাবুর্চি রান্না করেছে, কোন সমস্যা নাই। "
আশ্বস্ত হয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

এভাবে জীবনের অনেকটা সময়, অনেকগুলি বছর, ধরতে গেলে চাকুরি জীবনের অর্ধেকটা সময় জুড়ে, গুরুচরণ
আমার একজন একনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে আমার পাশে পাশে থেকেছে।

পরের দিকে গুরুচরন অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ওর হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। একটু খানি পরিশ্রম করলেই হাঁপিয়ে উঠতো।
এর জন্য বড় কোন হার্টের ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা নিতে রাজি করানো যায়নি। বলতো - আপনেগরে ওষুধ খাইয়াই ভালো থাকমু, অন্য কোন খানে যাওয়া লাইগব্যো না স্যার।

মাঝে মাঝে কার্তিক মাসের ভোর বেলায় কপালে চন্দনের তিলক এঁকে গুরুচরনকে কীর্তনিয়া দলের সাথে '' হরে কৃষ্ণ, হরে রাম '' গান করতে দেখা যেতো।

অনেক দিন গুরুচরনের কথা মনে ছিল না।

ঢাকা থেকে অবসর নিয়ে নিজ এলাকাতে চলে এসেছি।
একদিন গুরুচরন দেখা করতে এলো।
কথায় কথায় বলল সেও কয়েক মাস হল অবসরে গিয়েছে।
জিজ্ঞেস করলাম -পেনশনের টাকা পয়সা পেয়েছো কিনা? পেয়ে থাকলে টাকা পয়সা দিয়ে কী করেছে?

এর জবাবে গুরুচরন যা বলল ---
টাকা পয়সা পাওয়া গ্যাছে। স্যার, অনেক দিনের আশা আছিল আমাগ'রে পাড়ায় একটো গোবিন্দের মন্দির বানামু। গোবিন্দ সেই আশা পুরন কইরছ্যে।
'ছয় লক্ষ টাকা খরচ কইর‍্যা মন্দির বানাইছি।
আপনে একবার মন্দির দেইখপ্যার আইসেন স্যার।

গুরুচরনের সেই মন্দির দেখে এসেছি।
ওদের পাড়া 'ঋষি পাড়ায় ' প্রায় চার শো হরিজন সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করে। ওরা বেশিরভাগই গরিব। জুতা সেলাই, জুতা পালিশ করা, চামড়া প্রসেসিং করা ওদের মুল উপার্জনের পথ। কেউ কেউ পৌরসভা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা গুরুচরনের মত হাসপাতালের ক্লিনারের কাজ করে। ওদের উপাসনার জন্য কোন মন্দির ছিল না।

গুরুচরন নিজের সারা জীবনের অর্জিত টাকার ছয় লক্ষ টাকা দিয়ে মন্দিরটি বানিয়েছে, এর জন্য অন্য কারো কাছ থেকে একটি পয়সা সে নেয় নাই।

ইতিমধ্যে পৌর মেয়র কে দিয়ে মন্দির উদ্বোধন করিয়ে, মন্দিরের চাবি তার পাড়ার স্বগোত্রীয়দের হাতে তুলে দিয়েছে।

আমি মনে মনে ভাবলাম - গুরুচরনের মন্দির নির্মানের তো কোন প্রয়োজন ছিলো না!

সারাজীবন তার কর্মস্থল হাসপাতালকেই সে মন্দির মনে করে এসেছে! অসুস্থ মানুষের নিঃস্বার্থ সেবা করাটা ছিল তার কাছে উপাসনার মত!

ইট কাঠের মন্দির, আর পাথরের দেবতার উপাসনা তার আদৌ প্রয়োজন ছিল কি?
আমার এটাও মনে হল --
গুরুচরন কোন হরিজন নয়, গুরুচরন কোন হিন্দুও নয়।
সে স্রেফ একজন মানুষ। একজন সত্যিকারের দেবতা তূল্য মানুষ!

( ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ দিবাগত রাতে গুরুচরণ মারা গেছেন)।

ডাঃ সুকুমার সুর রায়।।

★★★★"সোনার হরিণ "★★★★(অষ্টাদশ - পর্ব) মহাপরিচালকের আগমন। রিকশাওয়ালা দুক্কা মিয়াঁ পড়িমরি করে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় রিকশা চা...
19/08/2026

★★★★"সোনার হরিণ "★★★★

(অষ্টাদশ - পর্ব) মহাপরিচালকের আগমন।

রিকশাওয়ালা দুক্কা মিয়াঁ পড়িমরি করে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় রিকশা চালিয়ে নিচ্ছে! দুক্কা মিয়াঁ কেমন করে যেন বুঝে ফেলেছে যে, আমি নিশ্চয়ই কোন বিপদে পড়েছি। দ্রুত অফিসে পৌঁছালে আমি বিপদ থেকে কিছুটা হলেও হয়তো পরিত্রান পেতে পারি।
ঘটনাটি খুলে বলা যাক।
মেডিক্যাল অফিসার হিসাবে আমার চাকরি জীবনের এইটি তৃতীয় কর্মস্থল এবং একদম নিজের এলাকা।
চাকরির বয়স ছয় বছর পার হয়ে গেছে।

ঘটনার সময়কাল ১৯৯০ সালের জুন মাস।

সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে হাইওয়ের পাশে পাচিলা বাজারে আমার ছোট্ট প্রাইভেট চেম্বারে বসেছি। দুই একটি রোগি দেখে সকাল ৯টা বাজতেই দুক্কা মিয়াঁর
রিকশায় উঠেছি।
দুক্কা আমার প্রতিদিনের বাঁধা রিকশাওয়ালা।
গত তিন মাস যাবত সে আমাকে অফিসে পৌছে দেয় আবার নিয়ে আসে।

রিকশা চলার পাঁচ মিনিটের মাথায় খেয়াল করলাম দুইটি জিপগাড়ি আমার রিকশার পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে পুর্বদিক হতে পশ্চিম দিকে চলে গেলো।
প্রথম গাড়িটি ঝকঝকে সাদা অফিসিয়াল জিপ গাড়ি।
দ্বিতীয় গাড়িটিও অফিসিয়াল গাড়ি, তবে অনেক পুরোনো, নীল রঙের লক্কড় মার্কা গাড়ি। হাইওয়েতে কত রকমের গাড়িইতো ছুটে চলে। তাতে আমার কিবা এসে যায়!
তবে হ্যাঁ, যে গাড়ির সাথে আমার চাকরি বাকরি রক্ষার সম্পর্ক, তাতে তো কিছু এসে যায় বইকি! ওই নীল রঙের গাড়িটি চালাচ্ছে যে ড্রাইভার সে অতি পরিচিত রবিউল ড্রাইভার!
আর এই লক্কড় মার্কা নীল গাড়িটি হচ্ছে আমাদের জেলার সিভিল সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ ইসহাক আলি স্যারের গাড়ি।

এখন কথা হল সিভিল সার্জনের গাড়িতে সিভিল সার্জন নাই কেন?
তবে কি সামনের সাদা গাড়িতে রয়েছেন ?
তাহলে সাদা গাড়িটি কার?
তখন মনে হলো নিশ্চয়ই সাদা গাড়িটি কোন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের।

তা তারা যাচ্ছেন কোথায় ?
আমার অফিস যেদিকে সেদিকেই যাচ্ছে গাড়ি!

তবে এখান থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ রোডের মোড় থেকে রাস্তা দুই ভাগ হয়ে দুই দিকে গেছে।

যদি দক্ষিন দিকে যায় তা হলে আমার কোন চিন্তা নাই। আর যদি উত্তর দিকে গিয়ে হাটিকুমরুল বাস স্ট্যান্ড থেকে পশ্চিম দিকের রাস্তায় যায় তাহলে আমার চিন্তার কারন আছে। কারন পশ্চিম দিকে সলঙ্গা ইউনিয়ন সাব সেন্টার হল আমার অফিস।

অফিসিয়াল গাড়ির বিষয়টি উচ্চারন করতেই আমার মনের এই দুঃশ্চিন্তার কথা রিকশাওয়ালা দুক্কা মিয়াঁ বুঝে ফেলেছে।
দুক্কা মিয়াঁ উল্কার গতিতে রিকশা ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে।
যতই উল্কার বেগে ছুটুক গাড়ির গতির সাথেতো রিকশা পেরে উঠবেনা।

সেই সময় আমাদের এই হাইওয়েটি এখনকার মত ঢাকার হাইওয়ে হয়ে ওঠে নাই। গাড়ি ঘোড়াও খুব কম। তাই অনেকদূর থেকে গাড়িগুলির গতিবিধি লক্ষ্য করা যায়।

গাড়িগুলি কোথায় যেতে পারে সে বিষয়ে একটি ধারনা মনে মনে তৈরি হয়ে গেছে।

দুইদিন আগে চৌবিলা গ্রামের উপর দিয়ে এক প্রলয়ঙ্করী ঘুর্নিঝড় বয়ে গেছে। তাতে বেশ কিছু মানুষ মারা গেছে।

সেই গ্রামে প্রেসিডেন্ট হুসেন মুহাম্মদ এরশাদ ইতিমধ্যে হেলিকপ্টারে উড়ে এসে দেখে গেছেন।
এই গাড়ি গুলির লক্ষ্য যে সেই গ্রাম, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।

বিপদের কথা হলো, সেই ঘুর্নিঝড় বিদ্ধস্ত গ্রামের অবস্থান আমার অফিস থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দক্ষিনে। আরো বিপদের কথা হলো সেই গ্রামে যেতে হলে আমার অফিসের পাশ দিয়েই যেতে হবে।!

দূর থেকেই দেখা গেল দুইটি গাড়ির বহর দক্ষিন দিকে না গিয়ে উত্তর দিকে টার্ন নিল।
আমার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

রিকশা ধোপাকান্দি গ্রাম বরাবর পৌছাতেই দুই পাড়ার মাঝখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে দেখা গেল গাড়িবহর পশ্চিম দিকের সলঙ্গার রাস্তা ধরেছে!

আমার বুকের ধুকপুকানি আরো বেড়ে গেল!

মনে হতে লাগলো ছয় বছরের চাকরি জীবনে কোন রকম অফিস টাইম হেরফের হয় নাই।
আজ এমন দিনে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ এলো, যেদিন আমার আধাঘণ্টা লেট হয়েছে।

যাত্রার আগে দুইটি রোগি দেখতে আধা ঘন্টার মত সময় ব্যয় হয়েছে জন্য, নিজের ঠোঁট কামড়াতে ইচ্ছা হল।

এখন চিন্তা হল, আমার পিয়ন সাখাওয়াত অফিস খুলেছে কিনা?
পাগলা টাইপের ফার্মাসিস্ট ' মদন বাবু' উপস্থিত হয়েছে কিনা?

সিভিল সার্জন স্যারের পরিকল্পনা থাকতে পারে আমার অফিসে পৌছে, আমাকে সাথে নিয়ে ঘুর্নিদুর্গত এলাকায় যাবে!

অফিসের ওরা যদি অনুপস্থিত থাকে এবং কর্তৃপক্ষ যদি অফিস তালাবন্ধ পায় তাহলে কপালে দুঃখ আছে।

কী আর করা? ভবিতব্যের উপর সব ছেড়ে দিয়ে দুক্কাকে বললাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাও।

অফিসে পৌছে দেখলাম অফিস খোলা। পিয়ন সাখাওয়াত উপস্থিত আছে।
কেউ এসেছিল কিনা জিজ্ঞাসা করায় বলল -
" না স্যার। "
যাক্ বাবা বাঁচা গেল।

হাঁটতে হাঁটতে মোড়ের দোকানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করায় জানালো দুইটি গাড়ি চৌবিলা গ্রামের দিকে গেছে।

অফিসে ফিরে মনোযোগ দিয়ে কাজ শুরু করলাম। । সাখাওয়াত কে বলে রেখেছি কোন গাড়ি আসে কিনা খেয়াল রাখতে।

বারোটা বাজার পর হাঁটতে হাঁটতে আবার মোড়ের কাছে গিয়ে দেখি দুইটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
কাছে গিয়ে ড্রাইভার রবিউলকে জিজ্ঞাসা করতেই জানালো - " ঢাকা থেকে গতরাতে স্বাস্থ্য মহাপরিচালক প্রফেসর এ, টি, সিদ্দিকী স্যার এসে সার্কিট হাউজে ছিলেন। সকালে সিভিল সার্জন স্যারকে সাথে নিয়ে চৌবিলা গ্রামে ভিজিটে গিয়েছিলেন।"

বললাম - এখন কোথায়?
ও বলল -"হাটের মধ্যে সবজি কিনতে ঢুকেছে।"

দ্রুত সবজি বাজারে গিয়ে দেখি ডিজি স্যার পাগলের মত টাটকা সবজি কিনছেন এবং ডিজি স্যারের ড্রাইভার একটি ব্যাগ এবং আমাদের সিভিল সার্জন স্যার অসহায়ের মত আরেকটি ব্যাগ ধরে আছেন!

আমি গিয়ে লম্বা করে একটি সালাম দিতেই সিভিল সার্জন স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন -- " স্যার, স্যার, আমাদের এখানকার 'মেডিক্যাল অফিসার,' স্যার। "

আমি আমার অফিসে বসার জন্য স্যারকে বিনীত অনুরোধ করলাম। তিনি প্রত্যাখান করে বললেন - "সময় নাই, ঢাকায় ফিরতে হবে। "

কী একটি সবজির দাম সিভিল সার্জন স্যার দিতে চাইলে ডিজি স্যার কড়া ধমক দিয়ে বলে উঠলেন।

সিভিল সার্জন স্যারের অসহায়ত্ব দেখে মনে মনে বেশ কষ্ট পেলাম। মিথ্যা বলবো না, মজাও পেলাম। তার হাত থেকে ব্যাগটি নিয়ে তাকে একটু লাঘব করার চেষ্টা করলাম।

অবশেষে হাটের বাইরে এসে গাড়ির কাছে পৌঁছাতেই একজন লোককে মাথায় করে মাঝারি সাইজের একটি পাঁকা কাঁঠাল নিয়ে হাটের দিকে যেতে দেখা গেল৷

ডিজি স্যার আমাকে উদ্দেশ্যে করে বললেন - "এম,ও, সাহেব! তোমার এলাকা, কাঁঠাল কিনে দাওতো দেখি। "

আমি মহা সমারোহে দামাদামি করে পঁচিশ টাকা ঠিক করলাম, স্যারকে জানালাম " স্যার, পঁচিশ টাকা। "

স্যার মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করা শুরু করতেই আমি ভয়ে ভয়ে ভদ্রতাসূচক বললাম - স্যার, আমার নিজের এলাকা....!
ডিজি স্যার রা' রা' করে থামিয়ে দিয়ে, কাঁঠালের দাম দিয়ে, আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে গাড়িতে উঠে গেলেন।

কোথা থেকে রিকশাওয়ালা দুক্কা মিয়াঁ হন্ত দন্ত ভাবে হাজির হয়ে বলল - " স্যার! এত্ত বড় অফিসার! কাঁটোলের দামডো আফনে দিয়্যা দিব্যার পাইরত্যান

---- ডাঃ সুকুমার সুর রায়।।

★★★★★"সোনার হরিণ "★★★★★(সপ্তদশ -পর্ব) / অষ্টাশির কড়চা।    ১৯৮৮ সালে সিরাজগঞ্জের 'খোকশাবাড়ি দশ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ছিল...
18/08/2026

★★★★★"সোনার হরিণ "★★★★★
(সপ্তদশ -পর্ব) / অষ্টাশির কড়চা।


১৯৮৮ সালে সিরাজগঞ্জের 'খোকশাবাড়ি দশ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ছিল আমার সরকারি চাকরি জীবনের দ্বিতীয় কর্মস্থল।

চৌহালি উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেব হাজতে যাওয়ার পর বহু চেষ্টা তদবির করে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে অন্যান্য অফিসারদের মতো আমিও সেইখান থেকে বদলি হয়ে আসতে পেরেছিলাম।

দুইজন মেডিক্যাল অফিসারের পোষ্ট ছিল এই হাসপাতালে।
বন্ধু ডাঃ রফিকুল ইসলাম ছিল আমার সহকর্মী। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে হাসপাতালটির অবস্থান।
রফিক কোয়ার্টারেই থাকতো। আমি শহরে ছিলাম, স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশে ' মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের ' ঠিক দক্ষিন পাশের ওয়াল ঘেঁষে যে টিন শেড বাড়িটি, সেখানে ভাড়া থাকতাম । আসলে বাড়িটি আমার হাইস্কুল শিক্ষক সন্তোস স্যারের বাড়ি। উনি তখন ডিসি অফিসে চাকরিরত। আমি তখন ব্যাচেলর। ছোট এক ভাই আর এক বোন আমার সাথে থাকতো।

রেগুলার একই রিকশায় চেপে অফিসে যেতাম। রিকশাওয়ালার নাম আয়নাল। তার বাড়ি ছিল ফকিরতলা গ্রামে। আয়নালের কাজ হল প্রতিদিন সকালে আমাকে রিকশায় করে অফিসে পৌছে দেওয়া।পৌঁছে দিয়েই সে বেরিয়ে পড়তো। এদিক ওদিক খ্যাপ মেরে ঠিক যথা সময়ে আবার আমাকে অফিস থেকে নিয়ে আসতো।
আগষ্ট মাসের কোন এক সন্ধ্যায় শহরের লোকজনের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
জানা গেল শহরের উত্তরে রানীগ্রামের পাশে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙ্গে প্রবল তোড়ে শহরে জল ঢুকছে।
আতঙ্ক নিয়েই রাতে এক সময় ঘুমাতে গেলাম।
পরদিন সকালে রিকশাওয়ালা আয়নাল হাজির।
বলল " স্যার, এহুনো রাস্তা জাগো আচে, অপিসে গেলি চলেন রউনা হই । "
রিকশায় চেপে রওনা হয়ে দরগা রোড পার হতেই দেখা গেল রাস্তার উপর দিয়ে চিপচিপানি জল গড়িয়ে যাচ্ছে। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে কাজিপুর রোডে পড়তেই দেখা গেল রাস্তায় হাঁটু জল !
তবুও আয়নাল রিকশা টেনেই চলেছে। দুই একজন লোক উল্টো দিক থেকে আতঙ্কিত হয়ে ছুটে আসছিল। তাদেরই একজন বললো ''শিগগীর ফিরে যাও, পানির প্রবল তোড়ে এই মাত্র কাজিপুর রোডের 'কাঠের ব্রীজ ' ভেঙ্গে গেছে। যাওয়ার কোন উপায় নাই।"
অগত্যা শহরের দিকে ফিরে আসতে হল।
ফিরে এসে সিভিল সার্জন অফিসে রিপোর্ট করতে হল - অফিসে যাওয়া সম্ভব হল না বলে।

তখন সিভিল সার্জন ছিলেন সুজাবত স্যার। তিনি বললেন "এই জরুরি অবস্থায় অবশ্যই কর্মস্থলে অবস্থান করতে হবে। আজ যাওয়া সম্ভব না হলে আগামীকাল যে কোন উপায়ে নৌকা টৌকা জোগাড় করে সেখানে গিয়ে থাকতে হবে।"

বাসায় ফিরলাম। , ভাই বোনদের বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম।
বিকেলে শহরে বের হলাম। ইতিমধ্যে গোটা শহর জলের নিচে তলিয়ে গেছে। শহরের তিনটি উঁচু জায়গায় মানুষ গিজগিজ করছে। একটি হল বাজার স্টেশনের প্লাটফর্ম এলাকা, দ্বিতীয়টি হল ইলিয়ট ব্রীজ এলাকা এবং তৃতীয়টি বাহিরগোলা স্টেশনের অল্প একটু এলাকা।

বাসায় ফিরে দেখি উঠানে জল ঢুকেছে!
ঘরে ঢুকে খাটের পায়ার নীচে কয়েকটা ইট দিয়ে উঁচু করে নিলাম। রাত দশটার দিকে ঘরে জল ঢুকতে শুরু করল। এই অবস্থায় খাটে শুয়ে পড়লাম।

মাঝরাতে সন্তোষ স্যারের চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙ্গলো। তিনি বললেন তার খাট জল ছুঁই ছুঁই করছে! আমি বললাম আমার খাট এখনো কিছুটা উঁচু আছে কারন ইট দিয়ে উঁচু করা হয়েছে। তিনি তখন বললেন তার ছেলে অজয়কে আমার খাটে নিয়ে নিতে। ওনারা বসেই থাকবেন। শেষ পর্যন্ত সারা রাত বসেই কাটাতে হল।

সকালে বাড়ি ছাড়ার তোড়জোড় শুরু হল। আমি ব্যাচেলর মানুষ, আমার তেমন কিছুই ছিল না।
বিছানাপত্র গুটিয়ে সিলিঙের উপরে তুলে ফেললাম। স্যার সপরিবারে পাশের ম্যাটসের হোস্টেলে উঠে গেলেন। আমি জল ভেঙ্গে ভেঙ্গে বাহির গোলার দিকে আগাতে থাকলাম। উদ্দেশ্য অফিসের দিকে যাওয়া।

বাহিরগোলা ঘাটে একটা ছোট নৌকাতে দুই তিনজন যুবককে দেখা গেল। তাদের জিজ্ঞেস করতে জানালো তারা খোকশাবাড়ি হাসপাতালে যাবে।
নিজের পরিচয় দিতেই তারা নৌকায় উঠতে বলল।
নৌকায় উঠে দেখলাম তিনটা ঝাঁকা খবরের কাগজ দিয়ে ঢাকা আছে। এগুলিতে কী জিজ্ঞেস করতেই ওরা জানালো - " স্যার, আপনি যখন এই হাসপাতালেরই মেডিক্যাল অফিসার, আপনাকে আমাদের সহযোগীতা করতে হবে। "
ওরা সারা রাত জেগে তিন ঝাঁকা রুটি তৈরি করেছে।
খোকশাবাড়ি হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় পাঁচ ছয়শো মানুষ। এই মানুষ গুলি দুইদিন যাবত একদম না খেয়ে আছে। এই অল্প পরিমান রুটি এত মানুষের মাঝে কেমনে নিয়ে যাওয়া হবে এই নিয়ে তারা খুবই চিন্তিত।

হাসপাতালে পৌছে দেখা গেল এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। হাসপাতালের গ্রাউন্ড ফ্লোরে চিপচিপানি জল
সেই জলের মধ্যেও শত শত অভূক্ত মানুষ। বাচ্চাদের কান্নার রোল।, মায়েদের হাহাকার! তাদের হাহাকার 'ক্ষুধার্ত '-এই জন্য নয় - তারা সর্বস্ব হারিয়ে এখানে চলে এসেছে। বাঁধ ভাঙ্গা জলের তোড়ে তাদের ঘর বাড়ি সহায় সম্বল সব কিছু ভেসে গেছে। কারো কারো বাড়ি ঘরের চিহ্নমাত্র নাই। যেখানে বাড়ি ছিল সেখানে এখন ভয়ানক জলের ঘুর্নিপাক বয়ে চলেছে! এক রাতের মধ্যে তারা শুধু পৈত্রিক জান'টা হাতে নিয়ে এখানে এসে পৌছেছে!

খাতা কলম হাতে নিয়ে দ্রুত আশ্রিতদের একটা তালিকা তৈরি করে ফেললাম।
সেই তিন হৃদয়বান যুবকের তিন ঝাঁকা রুটি দিয়ে প্রাথমিক ত্রান তৎপরতা শুরু করা হল।

ডাক্তারদের কোয়ার্টারের মেঝেতেও জল । এক বেডেই রফিকের সাথে রাত্রিযাপন করে সকালে আরেক বিপত্তি। টয়লেট করা সম্ভব নয়, জলে সয়লাব।
তৃতীয় শ্রেণির তিন তলা কোয়ার্টারের একটা রুমে সাময়িক আশ্রয় নিতে হল।

দেখা দিল খাওয়াদাওয়ার বিপত্তি। সকালে কাজের বুয়া রান্না করে দিয়ে গেছে ভাত আর বিলাতি ভর্তা। সকালের নাস্তা করা হয়ে গেছে। দুপুরে বুয়ার কোন দেখা নাই। অপেক্ষা ক'রে ক'রে রান্না ঘরে ঢুকে দেখা গেল, বড় গামলা ভর্তি অনেক ভাত ঢাকা আছে। পাশেই আরেক ছোট গামলাতে অনেক খানি বিলাতি ভর্তা। বোঝা গেল বুয়া একবারেই তিনবেলার খাবার রান্না করে দিয়ে গেছে! এছাড়া তার পক্ষে আর কী বা করার ছিল।

পরের দিন আবার শহরে ফিরে এলাম।
স্যার ও তার পরিবারকে খুঁজে বের করলাম মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের হোস্টেলের তিন তলার এক রুমে।

স্যার বললেন ' " চল বাসায় যেতে হবে। একটা নৌকা নিয়ে ফ্রিজসহ বেশ কিছু জিনিষ পরে আছে জলের নীচে, একদম নষ্ট হয়ে যাবে, সেগুলি উদ্ধার করতে হবে । "
একটা নৌকা ভাড়া করে যাওয়া হল। আমি টিনের চালা বেয়ে উঠানের মধ্যে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম। ধারনা হল বুক জল হবে। কিন্তু যখন ঝাঁপ দিলাম একদম ডুবে গেলাম।
যাহোক অনেক কষ্টে জলে ডুব দিয়ে তালা খোলা হল। এদিকে সাপের ভয়! লাঠি দিয়ে শব্দ করে করে ভিতরে ঢুকে প্রয়োজনীয় দামি জিনিষগুলি উদ্ধার করে আনা হল।

বেলা চারটায় বৌদি ডাক দিলেন, "ঠাকুরপো ভাত খেয়ে যাও। "
ভাত, ডাল আর আলু ভর্তা, মনে হল অনেকদিন যাবত ভাত খাইনা। গোগ্রাসে সেই খাবার খেয়ে ফেললাম।

পাশের রুমে আশ্রয় নিয়েছিল এক বন্ধু সমাজকল্যাণ অফিসার সোবহান। তার রুমে ডাব্লিং করে থাকতে শুরু করলাম।
সব চেয়ে বড় সমস্যা যেটি, তা হলো পানীয় জলের সমস্যা।
এ তল্লাটে একটা মাত্রই টিউবওয়েলের মাথা জেগে ছিল , সেটা ছিল সদর হাসপাতালের টিউবওয়েল ।

কলা গাছের ভেলা ঠেলে ঠেলে নার্সেরা কলসি ভর্তি জল নিয়ে আসতো। অবলীলায় সেই জলে ভাগ বসাতাম। আর খাওয়ার সময় হলে বৌদির সেই মোলায়েম সুরের ডাক পেতাম "ঠাকুরপো ভাত খেয়ে যাও। "

একদিন সকালে সদর হাসপাতালে আড্ডা মারছিলাম।
' আরএমও ' মকবুল ভাই বললেন; " এই তুমি এখানে কেন? শিগগীর খোকশাবাড়ি যাও, স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিছুক্ষন আগে খোকশাবাড়ি হাসপাতাল ভিজিটে গেছেন "।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তখন প্রফেসর ডাঃ এম এ মতিন সাহেব।

সর্বনাশ! চাকরিটা গেল।
দ্রুত একটা নৌকায় উঠে খোকশাবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। হাসপাতালে পৌছার আগেই দেখলাম মন্ত্রী মহোদয়ের 'স্পিডবোট বহর ' শহরের দিকে ফিরে আসছে !

বুঝলাম চাকরিটা আর রক্ষা করা গেল না!
হাসপাতালে ঢুকে রফিককে সভয়ে জিজ্ঞেস করলাম চাকরি কি আছে?
রফিক বলল - " আছে "।
বললাম কীভাবে থাকে! এই জরুরী অবস্থায় কর্মস্থলে অনুপস্থিতি! তাও আবার নিজেদের মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর হাতে ধরা খাওয়া। সেটাও আবার সামরিক শাসনের আমলে! যখন 'এমএলও নং- ৯ ' চাকরি খাওয়ার জন্য যথেষ্ট।
রফিক বলল - জিজ্ঞেস করেছিল, " কয়জন ডাক্তার? "
বলেছি -" দুইজন, আরেকজন কে শহরে পাঠিয়েছি বাজার আনতে, আমাদেরও যে খাওয়া লাগে!"
এই ছিলো কলিগ কাম বন্ধু!
আবার সেই রকম বৌদি! যিনি কিনা এই মহা দুর্যোগের মধ্যেও পরম মমতায় বলবেন -- " ঠাকুরপো, ভাত খেয়ে যাও। "

ডাঃ সুকুমার সুর রায়।।

★★★★★" সোনার হরিণ " ★★★★★-( পঞ্চদশ - পর্ব)  একজন ডাকাতের কাহিনি। পঁচাশি সালের জুলাই মাসে যখন চৌহালি উপজেলায় প্রথম মেডিক্...
16/08/2026

★★★★★" সোনার হরিণ " ★★★★★

-( পঞ্চদশ - পর্ব) একজন ডাকাতের কাহিনি।

পঁচাশি সালের জুলাই মাসে যখন চৌহালি উপজেলায় প্রথম মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে যোগদান করতে যাই, তখন পাড়া প্রতিবেশী ও বন্ধু বান্ধবদের অনেকেই বলেছিলেন যে, এমন জায়গায় পোস্টিং হলো! জায়গাটা তো যমুনা নদীর দুর্গম চর!
সেখানে তো ডাকাতদের আস্তানা! তাছাড়া সেখানকার লোকজন ভয়ঙ্কর দুর্ধর্ষ প্রকৃতির! তাই খুব সাবধানে থাকতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব সেখান থেকে বদলি হয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে।

জয়েন করার পর থেকেই মানুষের এই অযাচিত পরামর্শের কারনে মনের ভিতরে এক ধরনের ভয় লেগেই থাকতো।
জায়গাটা যে ভয়ানক রকমের দুর্গম এব্যাপারে কারও কোন দ্বিমত ছিল না।

এই উপজেলাটি সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও আসলে টাঙ্গাইল জেলার সাথেই এর যোগাযোগ ব্যবস্থা তুলনামূলক ভাল।
ছয়টি ইউনিয়নের চারটিই নদীর গহবরে অথবা চরাঞ্চল। প্রতি বছরই সেই চর এলাকার ভূগোল পরিবর্তিত হয়ে যেতো।
দুইটি ইউনিয়নের স্থলভাগ যমুনার পূর্বপাড়ে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সংলগ্ন।

যমুনার পশ্চিম পাড়ে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি ও শাহজাদপুর উপজেলা সংলগ্ন স্থায়ী ভূমির পরিমান নগন্য।
পূর্ব পাড়ে খাষকাউলিয়া ইউনিয়ন হেডকোয়ার্টারই মূলত উপজেলা হেডকোয়ার্টার।
তার পূর্বদিকে বয়ে গেছে ধলেশ্বরী নদী।এটি যমুনার একটি শাখা নদী।
মাঝখানে যমুনার চর গুলি একটা থেকে আরেকটার দুরত্ব অনেক এবং একমাত্র বাহন নৌকা। তাও আবার তখনকার সময়ের দাঁড়টানা বা লগি ঠেলা নৌকা

চৌহালি উপজেলা সদর থেকে নিকটবর্তী শহর ছিলো টাঙ্গাইলের নাগরপুর, যার দুরত্ব পনেরো কিলোমিটার পায়ে চলা পথ।

চৌহালি উপজেলা সদর ' শিবির ' নামে পরিচিত।
কারন কোন এক বন্যার সময় এটাই ছিল একমাত্র উঁচু জায়গা এবং সেখানে ত্রান শিবির খোলা হয়েছিল।

উপজেলা পরিষদ, হাসপাতাল, থানা, ব্যাংক, স্কুল, এগুলোসব একটা জায়গাতেই সাজানো গোছানো ছিল। কিন্তু কোন রাস্তাঘাট, বাজার ও সভ্যতার মূল উপাদান বিদ্যুৎ ছিল না।
সন্ধ্যার পর এক অসহনীয় ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করতো।

যমুনা নদীর গতিপ্রকৃতি এমনি বিচিত্র যে, একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিল যিনি জানিয়েছিলেন যে, তার সারা জীবনে না হলেও বিশ বার তার বাড়িঘর যমুনা গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিলো!
আবার নতুন চরে নতুন করে বসতি গড়ে তুলতে হয়েছিল । তাদের এই সংগ্রামী জীবন যাপনই হয়তো তাদেরকে সাহসী ও দুর্ধর্ষ করে তুলে থাকতে পারে।

ইতিমধ্যে খাষকাউলিয়া ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর নওয়াজেশ আলি মোল্লার সাথে পরিচয় হয়েছে।
প্রায়শই হাসপাতাল গেটে চা'য়ের দোকানে তাকে আড্ডা দিতে দেখা যেতো।
বেঁটেখাটো গাট্টা গোঁট্টা চেহারা, গায়ের রঙ ধবধবে ফর্সা, ব্যাকব্রাশ করা কোঁকড়ানো মাথার চুল, চোখ দুটো টকটকে লাল!
তার চেহারার মধ্যে এমন একটা কিছু ছি, যাতে তাকে দেখলে কেমন যেন মনের মাঝে এক ভয়ানক ভয়ের আবহ তৈরি হতো। মনের সেই ভয় সারা শরীরে শীতল স্রোতের মতো বয়ে যেতো। ফলে তার মুখ চোখের দিকে কখনোই সরাসরি তাকাতে সাহস করতাম না।

এহেন অবস্থায় নওয়াজেশ আলি মোল্লাকে দেখে আমার ভিতরের যে আতঙ্ক , তা একদিন সত্যি বলে জানলাম।
সেদিন তিনি কথাচ্ছলে বলে ফেললেন যে, কয়েক বছর আগেও তিনি নিজ হাতে অনেক মানুষ খুন করেছেন! কীভাবে ছুরি চালিয়ে পেট চিরে নদীতে ফেলে দিয়েছেন সে গল্প তিনি অবলীলাক্রমে গর্বের সাথে করে বসলেন।
তবে অভয় দিলেন যে এগুলো তিনি অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছেন!

এরপর থেকেই তাকে দেখলে আমার ভিতরে ভয়ের এক শিরশিরানি অনুভূতি বয়ে যেতো! ,কিন্তু বাইরে হাসিমুখে বীর বাহাদুরের মত তার সাথে কথাবার্তা চালিয়ে গেছি, এমনকি মোটর সাইকেলের পেছনে চেপে বাড়িতে তার অসুস্থ্য স্ত্রীর চিকিৎসা করতেও চলে গেছি।

দেখতে দেখতে ঈদুল ফিতর চলে এল।
উপজেলার সকল অফিসের সকল লোকজন ঈদের ছুটিতে বাড়ি চলে গেল।
ঈদের দিন সন্ধ্যায় হাসপাতাল কোয়ার্টারে আমিই একমাত্র প্রানী। সারা উপজেলা কমপ্লেক্সে দ্বিতীয় আর একটি প্রানিও নেই।
চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এল।
সাহাবুদ্দিন নামের একজন নৈশ প্রহরী আছে। সে আছে হাসপাতালের মেইন গেটে।
গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও সাহাবুদ্দিন আমার ডাক শুনতে পাবেনা। কারন হাসপাতাল ও কোয়ার্টারের মাঝখানে বিরাট এক মাঠ। তার মাঝে আছে আবার ইটের স্তুপ। ইটের স্তুপের মধ্যে থেকে বিকেল বেলায় দুই তিনটি শেয়াল বের হতে দেখেছি।

রাত আনুমানিক আটটা। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
আমি একটি হারিকেন জ্বালিয়ে গল্পের বই পড়ছিলাম। সাহাবুদ্দিন টেবিলের উপরে খাবার ঢেকে রেখে সন্ধ্যার আগেই বিদায় নিয়ে গেছে।

হঠাৎ একটা মোটর সাইকেলের আওয়াজ পেলাম! কান খাড়া করলাম! মনে হলো থানার কোন পুলিশের মোটরসাইকেল হতে পারে। আমার ঘরের উত্তর পাশে যেদিকে থানা সেদিকের জানালা খুলে রেখেছি। সেদিকে কাউকে দেখা গেল না। মনে হলো আমার কোয়ার্টারের মেইন গেটে এসে মোটর সাইকেল থেমে গেলো! তার পরেই দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো! মনকে শক্ত করলাম। বিপদে ভয় পেলে চলবেনা।
উত্তরের খোলা জানালা দিয়ে অসহায়ের মতো পুলিশ স্টেশনের দিকে তাকালাম, যদি কোন সেন্ট্রিকে বাইরে দেখা যায়।

আবারো জোরে কড়া নাড়ার শব্দ!
জিহবা শুকিয়ে গিয়েছিল।
ভয়ে গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হবে বলে মনে হল না। তারপরেও শক্তি সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করলাম,
"কে - ?"
ক্ষীণ কন্ঠের এই আওয়াজ বাইরে পৌঁছালো কিনা তা বলা মুশকিল।
বাইরে থেকে দরাজ কন্ঠে হুকুম এল -" দরজা খোলেন"।

কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম --
আপনি কে ?
তিনি বাঘের মত গর্জন করে বললেন -
- " আমি নওয়াজেশ আলি মোল্লা, দরজা খোলেন।"

আমি অতি বিনয়ের সাথে আবারও জিজ্ঞেস করলাম -
-ভাই, কি ব্যাপার? রোগী আছে নাকি ? হাসপাতালে তো সাহাবুদ্দিন আছে। গেটতো খোলাই আছে।

-'' আরে না রুগী টুগি না,দরজা খোলেন। ''
তার কণ্ঠস্বর আরো কড়া!

দেখলাম ভয় পেয়ে কোন লাভ নেই। কীসের ভয়? আমিতো চিকিৎসক। দুস্থ্য মানুষের সেবা করি। কারো সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করি নাই। আমার তো কোন শত্রু নেই। থাকার কথাও নয়। আমার কাছেতো কোন টাকা পয়সাও নেই যে ডাকাতি করবে!

যা থাকে কপালে। বীর বিক্রমে দরজা খুলে দিলাম। বললাম - নওয়াজেশ ভাই! রাতে হঠাৎ কি মনে করে ভাই ?

তিনি রীতিমত আদেশের ভঙ্গিতে বললেন -- " চলেন, ভিতরে চলেন! "

তার বাম হাতে টর্চ। ডান হাতে আলো আঁধারীতে কী যেন ঝুলতে দেখা গেল!

ঘোরের মধ্যে টলমল পায়ে রুমে ঢুকলাম।

প্রশ্ন হল : " দুপুরে কি খাইছেন?"

আমি বললাম - ভাই, সাহাবুদ্দিন ভাত রান্না করেছে। আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি। দুপুরে খেয়েছি। আবার রাতের জন্যও রেখে গেছে ঐযে টেবিলে।

নওয়াজেশ আলি মোল্লা হঠাৎ নরম গলায় বললেন - " দাদা, আজ ঈদের দিন।নানান ঝামেলায় ভুলেই গেছিলাম যে আপনি একলা একলা না খাইয়া আছেন! আপনার ভাবি খাবার পাঠাইছে। এই যে খাইয়া দাইয়া টিফিন ক্যারিয়ার খালি কইর‍্যা দ্যান।

টিফিন ক্যারিয়ার খুলে দেখলাম পোলাও, মুরগির মাংস, মাছ ভাজি, ডিম ভূনা।

প্লেটে সব ঢেলে নিয়ে টিফিন ক্যারিয়ার খালি করে দিলাম।
ফেরার সময় 'ডাকাত' নওয়াজেশ আলি মোল্লাকে' বললাম - ভাই, আমিতো একলা এতো খাবার খেতে পারবো না। মেইন গেটে সিকিউরিটি গার্ড শাহাবুদ্দিন আছে, ওকে একটু পাঠিয়ে দিয়েন।

-- ডাঃ সুকুমার সুর রায়।।।

Address

Thana Mor, Ullapara
Sirajganj
6760

Opening Hours

Monday 09:00 - 14:00
17:00 - 20:00
Tuesday 09:00 - 14:00
17:00 - 20:00
Wednesday 09:00 - 14:00
17:00 - 20:00
Thursday 09:00 - 14:00
Friday 09:00 - 14:00
Sunday 09:00 - 14:00

Telephone

+8801711301759

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Dr. Sukumar Sur Roy posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category