30/04/2026
মুক্তির বাউল
নিসর্গ বিন্দু (মোহাম্মদ মহসীন)
শৈশব থেকেই আমার দুচোখে একটা রঙিন স্বপ্ন ছিল—দুটো ময়না পাখির সাথে কথা বলব। মনে পড়ে, মেঠো পথ ধরে বোনের বাড়ি যাওয়ার সময় এক মুক্তিযোদ্ধার বাড়ির আঙিনায় পোষা ময়না দেখতাম; সে কী অদ্ভুত সুন্দর মানুষের মতো কথা কইত! আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতাম। মাঝে মাঝে মনে হতো খুব কাছে গিয়ে পাখিটাকে ধরে ফেলি, কিন্তু হাতের নাগালে গিয়েও বারবার ব্যর্থ হতাম। সেই অপূর্ণ শখ মেটাতেই বছরখানেক আগে দুটো শালিক আর দুটো পাহাড়ী টিয়া কিনলাম।
ওদের নিয়ে আমার ভাবনার যেন শেষ ছিল না। এমনকি ওদের প্রতিদিনের খুঁটিনাটি লিখে রাখার জন্য দুটো আলাদা খাতাও কিনেছিলাম। কিন্তু মায়ার চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি হতো; কোথাও ঘুরতে গেলে সারাক্ষণ মনে হতো ওরা ঠিক আছে তো? শালিক দুটো একটু ডাঙ্গর হতেই খাঁচার ফাঁক গলে বের হওয়ার চেষ্টা করত। একদিন ওরা ঠিকই উড়াল দিয়ে সামনের শিমুল গাছে গিয়ে বসল। তবে ওরা বেইমানি করেনি; প্রতিদিন নিয়ম করে আমার কর্মস্থলের সামনে চলে আসত। নিচে রাখা হাসনাহেনা আর দামী ফুলের গাছের ছায়ায় বসে আমি ওদের পরম আদরে খাবার দিতাম।
টিয়াগুলো ছিল পাহাড়ী, বড্ড একগুঁয়ে। একদিন আমার ছোট ছেলেটা হঠাৎ বলল, “বাবা, পাখিদের বন্দি করতে নেই, ওদের ছেড়ে দাও।” ওর কথা শুনে বুকটা কেঁপে উঠল; মনে হলো বয়স ছোট হলেও ওর চিন্তার গভীরতা আকাশছোঁয়া। আমি মুক্ত করার কথা ভাবার আগেই একদিন ওরা নিজেরাই ডানা মেলে উড়ে গেল নীল দিগন্তে।
এখন প্রতিদিন একঝাঁক চড়ুই আর বাউল পাখির আনাগোনা হয় আমার চারপাশে। আমি নিয়ম করে ওদের গম, শস্যদানা আর মটর খেতে দিই। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন—
"এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;"
ঠিক তেমনি, প্রকৃতিকে প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেওয়াই হলো চিরন্তন নিয়ম। আজ আমি অনেক বেশি আনন্দিত যে, আমাকে আর বন্দিত্বের সেই নীরব কষ্ট পোহাতে হয় না। আমার আঙিনায় এখন যে পাখিরা আসে, তারা আমার শেখানো বুলি বলে না ঠিকই, কিন্তু তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দের মাঝে আমি জীবনের সত্যিকারের স্পন্দন খুঁজে পাই। বন্দী পাখি যা বলে তা কেবল শেখানো বুলি, কিন্তু মুক্ত পাখির কিচিরমিচির হলো অন্তরের গভীর থেকে আসা মুক্তির গান। দিনশেষে ওরা যার যার নীড়েই ফিরে যায়, আর আমি আমার অন্তরে খুঁজে পাই এক পরম প্রশান্তির ঠিকানা।