15/08/2026
#স্বাস্থ্যবার্তা
আজকের এই লেখার ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি হয়েছে ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের কিছু বক্তব্য ও বিষয়কে কেন্দ্র করে। তাঁর মাধ্যমে সমস্ত মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে এবং কেউই উপকৃত হচ্ছে না—এ ধরনের বক্তব্য আমি দিচ্ছি না। তিনি সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্যায়ামের কথা বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষগণ যেমন শারীরিক শ্রম করেছেন, লাইফস্টাইল মডিফিকেশন, প্রিভেনশন ইত্যাদি নিয়ে বলেন। আলহামদুলিল্লাহ, এগুলো অবশ্যই সুন্দর পরামর্শ, যাতে মানুষ উপকৃত হতে পারে।
তবে তিনি মেডিকেল সায়েন্সের কিছু এস্টাবলিশড থিওরিকে এমনভাবে মিসইন্টারপ্রেট করছেন ও ব্যাখ্যা করছেন, যার বেশিরভাগেরই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অধিকন্তু তিনি পাবলিক স্পিকিংয়ে প্রায়ই বিভিন্ন কোরআনের আয়াত ও হাদিস রেফারেন্স হিসেবে টানেন, যা সর্বৈব সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয় না বলেই পরিলক্ষিত হয়। পাশাপাশি JK Lifestyle ও Health Revolution-এর মাধ্যমে উচ্চমূল্যে বিভিন্ন প্রোডাক্ট বিক্রি ও মার্কেটিং করছেন, যার বেশিরভাগেরই কোনো স্বীকৃত প্রমাণ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রমাণিত নয়।
মনে রাখতে হবে, চিকিৎসা একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও সময়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জেনারেল হেলথ এডুকেশন মাস পর্যায়ে দেওয়া এক কথা, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রোগী কোনো একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে ভালো হয়ে গেছেন—এমন একটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা-অভিজ্ঞতাকে যখন জনসমক্ষে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা দেখে অন্য অসুস্থ ব্যক্তিরা একই পদ্ধতি নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে উৎসাহিত হন, তখন বিষয়টি আর সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষার মধ্যে থাকে না; এটি চিকিৎসা-পরামর্শের পর্যায়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে সামান্য একটি ক্লিনিক্যাল পার্থক্যের কারণেই রোগীর জীবনের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি নেমে আসতে পারে।
এখানে তিনি বা তাঁর অনুসারীরা প্রায়ই একটি যুক্তি উপস্থাপন করেন, “যারা সরাসরি তাঁর চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁরা তো উপকৃত হচ্ছেন এবং সুস্থ থাকছেন। আর যারা ফেসবুক বা ইউটিউবে তাঁর ভিডিও দেখে নিজে নিজে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কিংবা যাদের শারীরিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে, এই দায় তো আমার বা ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের নয়।”
আপনি যখন উন্মুক্ত মাধ্যমে চিকিৎসাগত পরামর্শ দেবেন, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ ওষুধ বন্ধ করে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, যার ভুরি ভুরি প্রমাণ হাসপাতালে রয়েছে, তখন সেটির দায়ভার আপনার ওপর বর্তাবেই। ফিকহের কাওয়ায়েদের অন্যতম একটি মূলনীতি হচ্ছে, ক্ষতি দূর করতে হবে (সাদ্দুয যারায়ি)। ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে—এমন পথও বন্ধ করতে হবে।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এমন কোনো অসুস্থতা দেননি, যার শিফা দেননি।” এছাড়া তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি, যার সঙ্গে তার চিকিৎসাও অবতীর্ণ করেননি; যে তা জানে না, সে জানে না, আর যে জানে, সে জানে।” এই হাদিসগুলোর ব্যাখ্যায় ইমাম নববী ও ইবনু হাজার আসকালানীসহ অন্যান্য স্কলারগণ বলেছেন, যুগে যুগে মানুষের জ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে এমন চিকিৎসাপদ্ধতিও আবিষ্কৃত হবে, যা একসময় অনেক কঠিন, দুষ্প্রাপ্য কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াপূর্ণ ছিল; সময়ের সঙ্গে তা আরও উন্নত ও রিফাইন্ড হবে এবং ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন হাদিস এবং অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে পরবর্তী যুগের তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি, মুফাসসির, মুহাদ্দিস এবং প্রখ্যাত ক্লাসিক্যাল ইসলামিক স্কলারগণ—যেমন ইমাম নববী, ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী, ইমাম গাজ্জালী, ইমাম ফখরুদ্দিন আর-রাযী, ইবনু সিনা, ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ—চিকিৎসার একটি মৌলিক কাঠামো ও নিয়মনীতিও তৈরি করে দিয়ে গেছেন।
শরিয়াহর দৃষ্টিতে কোনো ওষুধ, অপারেশন, ভেষজ বা প্রযুক্তিকে ‘চিকিৎসা’ হিসেবে গ্রহণ করার মানদণ্ড কী? ক্লাসিক্যাল উলামাদের আলোচনায় এর একটি সুস্পষ্ট ফিকহি কাঠামো পাওয়া যায়:
১. ভিত্তি হতে হবে নির্ভরযোগ্য অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ (তাজরিবা): হাফিজ ইবনু হাজার ফাতহুল বারীতে কিতাবুত তিব্বের শুরুতেই বলেছেন, শারীরিক চিকিৎসার কিছু এসেছে নবী (সাঃ) থেকে, কিছু অন্যদের থেকে; তবে এর অধিকাংশই ফিরে যায় তাজরিবা তথা অভিজ্ঞতার দিকে (ফাতহুল বারী, ১০/১৩৪)। কোনো ওষুধের নাম সরাসরি নসে থাকা শর্ত নয়; সেটি বাস্তবে উপকার করে কি না, তা নির্ণয় করবে চিকিৎসাবিদ্যার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা।
‘তাজরিবা’ মানে কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়। “অমুকে খেয়ে ভালো হয়েছে”—এই একটি ঘটনা দিয়ে কোনো চিকিৎসার কার্যকারিতা প্রমাণিত হয় না।
২. উপকারের প্রবল সম্ভাবনা: ইমাম নববী রওদাতুত তালিবীনে বলেছেন, চিকিৎসাটি যদি এমন হয়, যার উপকার প্রত্যাশিত এবং ক্ষতি থেকে নিরাপত্তা আশা করা যায়, তবে তা গ্রহণযোগ্য (রওদাতুত তালিবীন, ৪/৯৪)। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে একেই রিস্ক-বেনিফিট রেশিও বলা হয়।
৩. রোগের সঙ্গে চিকিৎসার সংগতি: ইবনু হাজার বলেন, কোনো একটি রোগের ক্ষেত্রে নিরাময়ের প্রভাব দেখা গেলেই সেটিকে সর্বজনীন চিকিৎসা বলা যায় না। কোনো ভেষজের প্রদাহনাশক গুণ পাওয়া গেলেই তা দিয়ে ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব কিংবা সবকিছুর চিকিৎসা করা সম্ভব—এমনটা বলা যায় না।
৪. নিরাপত্তা ও বৃহত্তর কল্যাণ: ইমাম ইজ্জ ইবনু আবদুস সালাম ‘কাওয়াইদুল আহকাম’-এ জীবন রক্ষার প্রয়োজনে পচনধরা হাত কেটে ফেলার উদাহরণ দিয়ে বলেছেন: চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঝুঁকির তুলনায় উপকার ও নিরাপদ থাকার সম্ভাবনা যখন বেশি থাকে, তখনই সেই চিকিৎসার যৌক্তিকতা তৈরি হয় (কাওয়াইদুল আহকাম, ২/৯২)।
শরিয়াহর আরেকটি মৌলিক বিষয় হচ্ছে, যখন দুটি চিকিৎসাপদ্ধতির একটি প্রমাণিত আর একটি অপ্রমাণিত, তখন শুধু একজনের ওপর কোনো চিকিৎসা কাজ করেছে বলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে অন্য ব্যক্তির ওপরও একইভাবে কাজ করবে। একই চিকিৎসার একেকজনের ওপর একেক রকম ইফেক্ট হতে পারে। এই বিষয়টি ফিকহের চারটি স্তরের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়:
ইয়াকিন (শতভাগ নিশ্চয়তা) অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে ১০০ জনের ক্ষেত্রেই একই ইফেক্ট হবে। জন্নে গালেব (অর্ধেক বা তা বেশি) বলতে বুঝায় ১০০ জনের মধ্যে ৭০ থেকে ৮৫ জনের ওপর ইফেক্ট পড়বে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য বর্তমান সময়ের এভিডেন্স-বেজড মেডিসিনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো এই পর্যায়ের সম্ভাব্যতা।
সম্ভাবনা ৫০%-এর নিচে নেমে গেলে কাজ হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। এ অবস্থাকে বলা হয় শাক। আর কার্যকারিতার সম্ভাবনা যখন ২৫% বা তারও নিচে নেমে আসে, তখন সেটিকে বলা হয় ওয়াহম। ক্লাসিক্যাল উলামা এবং বিভিন্ন ফিকহ একাডেমি একে বিভ্রান্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অনেকেই ফার্মাসিউটিক্যালসের অতিরিক্ত কমার্শিয়ালাইজেশন, তাদের পলিসি এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি অল্টারনেটিভ সিস্টেম ডেভেলপ করার জন্য কাজ করছেন। এখানে সবচেয়ে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো, ভেষজ উপাদান থেকে সাস্টেইনেবলভাবে ওষুধ তৈরির জন্য যে পরিমাণ জায়গাজুড়ে কমার্শিয়াল কাল্টিভেশন প্রয়োজন এবং সেই পরিমাণ গাছ থেকে যে পরিমাণ মেডিসিনাল কম্পোনেন্ট পাওয়া যায়, তা দিয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। বিজ্ঞানীরা এই স্বল্পতা কাটাতে কৃত্রিম ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের দিকে যান।
ব্যাক ইন সেভেনটিন্থ সেঞ্চুরি, যখন ওষুধ প্রদানের মৌলিক উৎস ছিল ভেষজ উপাদান, তখনকার পরিস্থিতি যদি আমরা দেখি, লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে কেবল রিসোর্স বা ওষুধের স্বল্পতার কারণে। সুতরাং, ড্রাগ ইন্ডাস্ট্রির বিজনেস পলিসি নিয়ে সমালোচনা থাকা এক কথা, কিন্তু তাদের ট্রিটমেন্ট প্রসিডিউর বা ন্যাশনাল গাইডলাইনের সবকিছুই মানুষকে বোকা বানিয়ে চিরকালের জন্য অসুস্থ বানিয়ে রাখার চক্রান্ত—এই ধরনের বক্তব্য কার্যত ভুল।
উদাহরণ স্বরুপ, ডায়াবেটিস বা হাইপারটেনশনের ক্ষেত্রে তিনটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণ: Discipline, Diet and Drug। কিন্তু ঢাকাতেই প্রায় ৩ কোটির ওপর লোক বাস করে। প্রতিদিন সকাল ৭টায় উঠে বিপুলসংখ্যক মানুষকে অফিসের জন্য ছুটতে হচ্ছে, সারাদিন কাজ করে রাত ৮টায় বাসায় ফিরতে হচ্ছে। এই অর্থনীতির যাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লাইফস্টাইল মডিফিকেশন বা ডায়েটের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অর্থাৎ, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় লাইফস্টাইল মডিফিকেশনেরও একটা বড় সামাজিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পরিশেষে এটুকুই বলতে চাই, চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধু একজনের ওপর কোনো একটি পদ্ধতি কাজ করেছে—এটাকে এভিডেন্স বলা যাবে না। সেটাকে তাজরিবার একটি যথাযথ কাঠামোর মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং সেই অভিজ্ঞতাকে স্ট্রাকচারাল ও এভিডেন্স-বেজড প্রটোকলের মধ্যে আনতে হবে। আধুনিক গবেষণার ভাষায় একেই আমরা রেন্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল বা আরসিটি বলে থাকি।
যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা করা সম্ভব না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সামনে সেটাকে এস্টাবলিশড ট্রিটমেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করা, তার প্রচার ও প্রসার করা এবং গণহারে ওষুধ বন্ধ করতে বলা—শরিয়াহ ও চিকিৎসাবিজ্ঞান কোনো দৃষ্টিতেই উপযুক্ত নয়।
ডাঃ কবীর উদ্দিন আহমদ
এমবিবিএস, এমপিএইচ (কমিউনিটি মেডিসিন), এমবিএ (মার্কেটিং)
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জেনারেল প্র্যাকটিশনার
ডিসক্লেইমার:
1. ছবিঃ এআই জেনারেটেড।
2. ডা. মো. শরিফুল ইসলাম, ফাউন্ডিং ডিরেক্টর, Research Academy for Medical Fiqh and Islamic Treatment (RAMFIT)-এর দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টের আলোকে লেখা। রাসূল (সাঃ) এবং সাহাবাগণ চিকিৎসার ব্যাপারে আমাদের কী ধরনের আকিদা ও দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে বলেছেন, চিকিৎসার নীতি ও দিকনির্দেশনা কী হওয়া উচিত এবং সেই নির্দেশনার আলোকে আমরা কীভাবে আধুনিক মেডিকেল সায়েন্সকে শরিয়াহর সঙ্গে আরও অ্যালাইন করতে পারি—RAMFIT এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছে।