12/09/2026
আমাদের সমাজে কাউকে ঘন ঘন প্রস্রাব করতে দেখলে প্রায়ই হালকা টিটকারি করে বলতে শোনা যায়, "তোর মনে হয় ডায়াবেটিস হয়ে গেছে!" কারণ সাধারণ মানুষের কাছে ডায়াবেটিস মূলত একটি 'বহুমূত্র রোগ' হিসেবেই পরিচিত। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীন ইরানি সভ্যতায় যখন কোনো মানুষের প্রস্রাব মাটিতে পড়লে সেখানে পিঁপড়া বা ছোট ছোট পোকামাকড় আকৃষ্ট হতো, তখন ধারণা করা হতো সেই প্রস্রাবে শর্করার উপস্থিতি রয়েছে। তারা আরও লক্ষ্য করেছিল, যাদের প্রস্রাবে চিনির উপস্থিতি অনুমান করা যায়, তাদের শরীরে প্রায়ই যন্ত্রণাদায়ক ফোড়া বা ক্ষত দেখা দেয়। এভাবেই মানবসভ্যতায় ডায়াবেটিস রোগ শনাক্তকরণ ও তার চিকিৎসার প্রাথমিক ধারণার উৎপত্তি হয়।
সাধারণত ডায়াবেটিস হয়েছে কিনা তা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের জন্য আমরা ফার্মেসিতে গিয়ে গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তের শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করি। অনেক সময় শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডায়াগনস্টিক ল্যাবে কিছু রুটিন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করানো হয়। তবে কখনো কখনো দেখা যায়, ল্যাবের সব রিপোর্ট স্বাভাবিক আসছে এবং বলা হচ্ছে রক্তের শর্করা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে—অথচ রোগীর শরীরে ডায়াবেটিসের উপসর্গ যেমন: ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা পাওয়া কিংবা রাতে বারবার প্রস্রাবের চাপে ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো থেকেই যাচ্ছে।
তাহলে রক্তে চিনি না থাকা সত্ত্বেও কেন এমন লক্ষণ দেখা দিচ্ছে? এর পেছনের মূল কারণ হতে পারে ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস (Diabetes Insipidus)।
আমরা সচরাচর ডায়াবেটিস বলতে যে রোগটিকে চিনি, সেটি হলো ডায়াবেটিস মেলিটাস (Diabetes Mellitus)। ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি শারীরিক অবস্থা। এই দুটি রোগের উৎপত্তি, কারণ, রোগ নির্ণয় পদ্ধতি এবং চিকিৎসায় রয়েছে মৌলিক পার্থক্য।
# ডায়াবেটিস মেলিটাস (Diabetes Mellitus)
আমাদের বহুল পরিচিত ডায়াবেটিস মেলিটাস মূলত রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘটে থাকে। কার্যকারণ ও প্রকাশের ওপর ভিত্তি করে একে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১। টাইপ-১ ডায়াবেটিস: শরীরে ইনসুলিন তৈরির ক্ষমতা কমে গেলে বা অগ্ন্যাশয় (Pancreas) একেবারেই ইনসুলিন তৈরিতে অক্ষম হয়ে পড়লে এটি হয়। সাধারণত শিশু ও তরুণদের মধ্যে এটি বেশি দেখা গেলেও যেকোনো বয়সে হতে পারে। এর মূল চিকিৎসা হলো ইনসুলিন থেরাপি।
২। টাইপ-২ ডায়াবেটিস: এই ক্ষেত্রে শরীরে ইনসুলিন তৈরি হলেও তা ঠিকমতো কাজ করতে পারে না (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স) অথবা চাহিদার তুলনায় কম নিঃসৃত হয়। অতিরিক্ত ওজন, বংশগত বা পারিবারিক ইতিহাস, এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাব এর প্রধান ঝুঁকি। বয়স্কদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। জীবনযাত্রার পরিবর্তন (Life Style Modification), মুখে খাওয়ার ওষুধ এবং প্রয়োজনভেদে ইনসুলিনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
৩। গেস্টেশনাল ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes): এটি গর্ভাবস্থায় গর্ভবতী মায়ের রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার একটি সাময়িক অবস্থা। উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে গর্ভাবস্থায় এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং সাধারণত সন্তান প্রসবের পর এটি দূর হয়ে যায়। তবে পরবর্তীতে এসব মায়ের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকে।
৪। অন্যান্য কারণ: প্যানক্রিয়াটিক ডিজিজ, এন্ডোক্রাইন ডিসঅর্ডার, কিছু জেনেটিক সিন্ড্রোম, ইনফেকশন কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও ডায়াবেটিস মেলিটাস হতে পারে।
# ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস (Diabetes Insipidus)
অন্যদিকে, ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস কিন্তু রক্তের শর্করার সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি মূলত শরীরে এডিএইচ (ADH - Antidiuretic Hormone) বা ভাসোপ্রেসিন (Vasopressin) হরমোনের ঘাটতি কিংবা কিডনি এই হরমোনের প্রতি সঠিকভাবে সাড়া না দেওয়ার কারণে ঘটে। এটি মূলত চার ধরনের হয়ে থাকে।
১। সেন্ট্রাল ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস (Central Diabetes Insipidus): পূর্বে একে নিউরোজেনিক বা ক্রেনিয়াল ডিআই বলা হতো। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস বা পোস্টেরিয়র পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে এডিএইচ (ADH) হরমোন পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি বা নিঃসৃত না হলে এটি ঘটে। মস্তিষ্কে আঘাত, টিউমার, পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের সার্জারি বা অটোইমিউন জটিলতা এর অন্যতম কারণ।
২। নেফ্রোজেনিক ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস (Nephrogenic Diabetes Insipidus): শরীরে পর্যাপ্ত ADH হরমোন থাকা সত্ত্বেও কিডনি যদি এই হরমোনের প্রতি সঠিক সাড়া দিতে না পারে, তখন এই অবস্থা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদী কিডনির রোগ (CKD), কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের প্রভাব, রক্তে ইলেকট্রোলাইটের অস্বাভাবিকতা (যেমন: হাইপারক্যালসিমিয়া বা হাইপোক্যালিমিয়া) অথবা বংশগত কারণে এটি হতে পারে।
৩। প্রাইমারি পলিডিপসিয়া (Primary Polydipsia): এটি সরাসরি ক্লাসিক্যাল ডিআই না হলেও এর উপসর্গগুলো বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। এতে অতিরিক্ত পানি পানের কারণে প্রস্রাব অত্যন্ত পাতলা (dilute) হয়ে যায়। শরীরের তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কোনো অসঙ্গতির কারণে এটি দেখা দেয়।
৪। গেস্টেশনাল ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস (Gestational Diabetes Insipidus): গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা (অমরা) থেকে নিঃসৃত কিছু এনজাইমের প্রভাবে ভাসোপ্রেসিন হরমোন দ্রুত ভেঙে যাওয়ার ফলে এই সমস্যাটি তৈরি হয়। সন্তান প্রসবের পর এটি স্বাভাবিক হয়ে যায়।
যদিও ডায়াবেটিস মেলিটাস ও ডায়াবেটিস ইনসিপিডাসের মধ্যে কিছু বাহ্যিক উপসর্গের মিল রয়েছে (যেমন: অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ঘন ঘন প্রস্রাব), কিন্তু শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় এবং ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার রিপোর্টে এদের স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এদের ল্যাব ডায়াগনোসিস নিয়ে অন্যদিন লিখব।
উল্লেখ্য যে, শরীরে ডায়াবেটিসের কোনো উপসর্গ প্রকাশ পেলে বা সন্দেহ হলে আতঙ্কিত না হয়ে কিংবা নিজের মনমতো পরীক্ষা না করে শুরুতেই একজন হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ (Endocrinologist)-এর পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
লেখক:
আবু দারদা খান
ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি ও ল্যাবরেটরি স্পেশালিস্ট এবং একজন তরুণ স্বাস্থ্যসেবা উদ্যোক্তা।
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শনিবার
সকাল ৬:৪৮