18/05/2026
'টাইফয়েড মেরি' Mary)-র কাহিনী চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত, বিতর্কিত এবং একটি ক্লাসিক ঘটনা। এটি মূলত এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি নিজে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন কিন্তু তার অজান্তেই তিনি ছিলেন শত শত মানুষের জন্য এক মারাত্মক 'চলন্ত বোমা'।
১. কে ছিলেন এই টাইফয়েড মেরি?
মেরি ম্যালন ছিলেন একজন আইরিশ নারী, যিনি ১৮৮৩ সালে ১৫ বছর বয়সে আয়ারল্যান্ড থেকে ভাগ্য অন্বেষণে আমেরিকায় (নিউইয়র্ক) অভিবাসী হন। তিনি পেশায় ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ বাবুর্চি বা রাঁধুনি (Cook)। নিউইয়র্কের ধনী পরিবারগুলোতে রাঁধুনি হিসেবে তার বেশ ভালো সুনাম ও চাহিদা ছিল।
২. কীভাবে তিনি রোগ ছড়াতেন?
মেরি নিজেই ছিলেন ইতিহাসের প্রথম চিহ্নিত 'উপসর্গহীন দীর্ঘমেয়াদী বাহক' (Asymptomatic Chronic Carrier)। তার পিত্তথলিতে (Gallbladder) টাইফয়েডের জীবাণু (Salmonella Typhi) স্থায়ী বাসা বেঁধেছিল। কিন্তু মেরির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এত চমৎকার ছিল যে, তার নিজের কখনো টাইফয়েডের কোনো লক্ষণ (যেমন: জ্বর, ডায়রিয়া বা দুর্বলতা) প্রকাশ পায়নি।
তিনি যখন খাবার রান্না করতেন, বিশেষ করে তার জনপ্রিয় ডেজার্ট "পিচ আইসক্রিম" (যা তৈরি করতে আগুনের তাপ লাগতো না), তখন তার হাত থেকে জীবাণু খাবারে মিশে যেত। খাবার খেয়ে পরিবারের সদস্যরা একে একে টাইফয়েডে আক্রান্ত হতেন। আর যখনই কোনো পরিবারে রোগ ছড়িয়ে পড়তো, মেরি কাউকে কিছু না জানিয়ে চাকরি ছেড়ে অন্য পরিবারে চলে যেতেন। এভাবে ১৯০০ থেকে ১৯০৭ সালের মধ্যে তিনি বেশ কয়েকটি পরিবারে টাইফয়েড ছড়িয়ে দেন।
৩. কীভাবে ধরা পড়লেন? (জর্জ সোপারের অনুসন্ধান)
১৯০৬ সালে নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডের এক ধনী ব্যাংকারের পরিবারে টাইফয়েড হানা দেয়। সেই পরিবারের ১১ জন সদস্যের মধ্যে ৬ জনই আক্রান্ত হন। টাইফয়েড সাধারণত নোংরা ও বস্তি এলাকায় বেশি হতো, তাই ধনী এলাকায় এর প্রকোপ দেখে স্যানিটারি ইঞ্জিনিয়ার জর্জ সোপার (George Soper) বিষয়টি তদন্ত করতে নামেন।
সোপার নিখুঁতভাবে অনুসন্ধান করে দেখলেন, আক্রান্ত পরিবারগুলো অতীতে যে সমস্ত রাঁধুনি নিয়োগ করেছিল, তাদের মধ্যে একজন নারী কমন ছিলেন—তিনি মেরি ম্যালন। সোপার যখন মেরিকে খুঁজে বের করেন এবং তার মল ও মূত্রের নমুনা পরীক্ষা করতে চান, মেরি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হন। কারণ মেরি নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও হৃষ্টপুষ্ট দেখতেন, তাই ডাক্তারের কথাকে তিনি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং অপমান মনে করে একটি মাংস কাটার ছুরি নিয়ে সোপারকে তাড়া করেছিলেন।
৪. প্রথম কোয়ারেন্টাইন ও আইনি লড়াই
অবশেষে ১৯০৭ সালে নিউইয়র্ক স্বাস্থ্য বিভাগ পুলিশের সহায়তায় মেরিকে জোরপূর্বক আটক করে। পরীক্ষায় দেখা যায়, তার মলে প্রচুর পরিমাণে টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ তাকে নিউইয়র্কের নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডের (North Brother Island) একটি হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে দেয়।
সেখানে তিন বছর বন্দি থাকার পর, মেরি আদালতের শরণাপন্ন হন। ১৯১০ সালে তিনি এই শর্তে মুক্তি পান যে—তিনি আর কখনো 'বাবুর্চি' বা রাঁধুনির পেশায় ফিরে যাবেন না এবং লন্ড্রি বা অন্য কোনো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করবেন।
৫. শর্ত ভঙ্গ ও স্থায়ী নির্বাসন
মুক্তির পর মেরি কিছুদিন লন্ড্রিতে কাজ করেন, কিন্তু সেখানে মজুরি ছিল অনেক কম। বাধ্য হয়ে এবং নিজের জেদের বশে (যেহেতু তিনি বিশ্বাস করতেন না যে তার শরীরে রোগ আছে) তিনি নিজের নাম বদলে ফেলেন। 'মেরি ব্রাউন' ছদ্মনাম নিয়ে তিনি আবার বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং হাসপাতালে রাঁধুনির কাজ শুরু করেন।
১৯১৫ সালে নিউইয়র্কের 'স্লোন মেটারনিটি হসপিটাল'-এ (Sloan Hospital for Women) হঠাৎ এক ভয়াবহ টাইফয়েড প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ২৫ জন নার্স ও ডাক্তার আক্রান্ত হন এবং ২ জন মারা যান। তদন্তে নেমে জর্জ সোপার আবার সেই চেনা হাতের রান্না এবং ছদ্মনামধারী মেরিকে ধরে ফেলেন।
এবার স্বাস্থ্য বিভাগ আর কোনো ঝুঁকি নেয়নি। ১৯১৫ সালে তাকে আবার সেই নর্থ ব্রাদার আইল্যান্ডে নির্বাসনে পাঠানো হয়। জীবনের বাকি ২৩ বছর তিনি সেখানেই একাকী বন্দি অবস্থায় কাটান। অবশেষে ১৯৩৮ সালে, ৬৯ বছর বয়সে স্ট্রোক করে তিনি ওই হাসপাতালেই মারা যান। মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তে তার পিত্তথলিতে জীবন্ত টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ঘটনার গুরুত্ব
Carrier Concept: চিকিৎসাবিজ্ঞান নিশ্চিতভাবে জানতে পারে যে, কোনো ব্যক্তি নিজে অসুস্থ না হয়েও রোগ ছড়াতে পারে।
Public Health vs Individual Liberty: এই ঘটনাটি জনস্বার্থ বনাম ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দ্বন্দ্বের এক ঐতিহাসিক উদাহরণ। একজনের স্বাধীনতার চেয়ে হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা করা যে জনস্বাস্থ্য বিভাগের মূল দায়িত্ব, তা এই ঘটনার মাধ্যমেই প্রথম আইনি ভিত্তি পায়।
অফিসিয়ালি মেরির মাধ্যমে ৫১ জন আক্রান্ত এবং ৩ জনের মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে ধারণা করা হয় পরোক্ষভাবে তিনি শতাধিক মানুষকে আক্রান্ত করেছিলেন। আর এভাবেই ইতিহাসের পাতায় তার নাম স্থায়ী হয়ে যায়—'টাইফয়েড মেরি'।
Dr. Md. Abde Hannan