25/06/2026
"খারাপ পার্টনার থাকার চেয়ে একা থাকাই শ্রেয়।"
জনপ্রিয় এই নারী অভিনেত্রীর বক্তব্যটি আক্ষরিক বা শাব্দিক অর্থে একদম লিঙ্গ-নিরপেক্ষ (Gender Neutral) এবং আপাতদৃষ্টিতে সঠিক মনে হতে পারে। কিন্তু যখন এ ধরণের বক্তব্য লাখ লাখ ফলোয়ার থাকা একজন সেলিব্রেটির মুখ থেকে আসে, তখন আমাদের সমাজের একটি বড় অংশের মনস্তত্ত্বে এর একপেশে ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
একটু গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখবেন, কোনো পুরুষ শিল্পী বা সেলিব্রেটির মুখ থেকে সচরাচর এমন বক্তব্য চোখে পড়ে না। কেন পড়ে না? এর পেছনে কাজ করে আমাদের শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত সমাজের নারী ও পুরুষের মধ্যকার গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক পার্থক্য।
যখন একটি পরিবারে পুরুষ পার্টনার বা স্বামী তার স্ত্রীর সাথে প্রতারণা বা মানসিক-শারীরিক নির্যাতন করে, তখন সমাজ ও আইনের সহানুভূতির কারণে সেই নারী নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করতে পারেন, ভোকাল হতে পারেন। কিন্তু একটি পরিবারে যখন একজন স্ত্রী তার স্বামীর সাথে প্রতারণা বা মানসিক নির্যাতন করেন, তখন সেই শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত স্বামীটি লোকলজ্জা, তথাকথিত সামাজিক ইমেজ আর ইগোর ভয়ে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যান। বড়জোর তিনি নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিয়ে নিজের আলাদা একটা জগতে নিজেকে বন্দি করে ফেলেন, যেই জগতে কেউ তাকে বিরক্ত বা অপমান করতে পারেনা। কারণ সমাজ তাকে সহানুভূতি দেখানোর বদলে উল্টো "দুর্বল" বলে উপহাস করবে — এই ভয়ে তিনি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যান, কিন্তু মুখে বোবা হয়ে থাকেন। পুরুষের এই অপ্রকাশটা প্রতিপক্ষের কোনো শক্তিও নয়, বিজয়ও নয়। এটি আসলে এক ধরণের বাধ্যতামূলক সামাজিক মুখোশ, একটা অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু স্বেচ্ছা নির্বাসন। অবশ্য হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকেও নিজেকে একা করে ফেলার, এবং নিজের একাকিত্বের মধ্যে প্রশান্তচিত্তে ডুবে থাকার এই ক্ষমতা সম্ভবত সব পুরুষের থাকেনা।
যাইহোক, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আমরা হয়তো এর চেয়েও বড় যে সংকটের দিকে এগোচ্ছি, তা হলো এই ধরণের বক্তব্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রচ্ছন্ন "পুরুষ বিদ্বেষ"। স্বাধীনতা আর স্বাবলম্বিতার চটকদার স্লোগান দিয়ে আজ তরুণীদের মনে অবচেতনভাবেই পুরুষের প্রতি একটা অনাস্থার বীজ বপন হচ্ছে। এই বীজ যখন বিশাল বৃক্ষ হয়ে উঠবে, তখন সামান্য মতানৈক্য, মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কিংবা বিয়ের ভেতরের যেকোনো দায়িত্বকে ইয়াং মেয়েরা "খারাপ পার্টনারশিপ" বা "অধীনতা" হিসেবে ধরে নিবে বা আজকাল অনেকেই নিচ্ছে।
এর ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য "সামাজিক রক্তক্ষরণ"। এই রক্তের রঙ লাল হয় না, তাই চট করে তা বোঝা যায় না। তরুণ প্রজন্মের নারী ও পুরুষ যখন ভেতরে ভেতরে পরস্পরকে সহযাত্রী না ভেবে "প্রতিপক্ষ" বা "শত্রু" মনে করে বড় হবে, তখন কেউ কারো ওপর আস্থা রাখতে পারবে না।
ফলশ্রুতিতে, "বিয়ে" নামক সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথাটি একদিন বিলুপ্তির পথে হাঁটবে। তরুণ-তরুণীরা বিয়েকে এখন কেবল "হানিমুন" বা রোমান্টিক উৎসব ভাবছে। অথচ বিয়ে কেবল তা নয়; বিয়ে হলো একটা "দায়িত্বের শৃঙ্খল", যা দুটো লাগামহীন প্রাণীকে লাগাম ধরতে শেখায় এবং দায়িত্ব নিতে বাধ্য করে। যখন এই লাগাম টেনে ধরার মানসিকতা গায়েব হয়ে যাবে, তখন মানুষ কেবল নিজের প্রয়োজনের তাগিদে (অর্থের অভাব পূরণ বা নির্দিষ্ট নিয়মে শারীরিক চাহিদা মেটানো) স্বাবলম্বী হতে চাইবে।
"কেউ কারো দায়িত্ব নেবে" — এই পরম সত্যটি তখন তাদের কাছে হাস্যকর মনে হবে।
আজকের পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা এই সংকটের চূড়ান্ত রূপ দেখতে পাই। সেখানে বিয়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে। যে যার মতো টাকা কামাচ্ছে, লিভ-ইন করছে, প্রয়োজনে সন্তানও জন্ম দিচ্ছে — কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কেউ কারো দায়িত্ব নিতে চাইছে না।
সেসব দেশে আমরা দূর থেকে দেখি যে, পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর সন্তানদের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিচ্ছে (চাইল্ড কেয়ার, সিঙ্গেল মাদার এলাউন্স ইত্যাদি) এবং সেটাকে আমরা বাহবা দিই। কিন্তু এর পেছনের গভীর ক্ষতটা আমরা দেখি না। রাষ্ট্র একটা শিশুকে অর্থ দিতে পারে, আইন দিতে পারে, কিন্তু মায়ের মমতা বা বাবার বটবৃক্ষের মতো নিরাপত্তা দিতে পারে না। ফলে পশ্চিমে আজ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চরম একাকীত্ব, ডিপ্রেশন আর শেষ বয়সে ওল্ডহোমের দীর্ঘশ্বাস জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
(অবশ্য বাস্তবতার নিরিখে ওল্ডহোম থাকাকে আমি খারাপ চোখে দেখিনা। "পরিবারকে" যখন ধ্বংস করেই ফেলেছে, ক্ষতিপূরণের জন্য কিছু না কিছুতো রাখতেই হবে!)
তথাকথিত প্রোগ্রেসিভ বা আধুনিকতার এই অন্ধ অনুকরণ আমাদের সমাজকেও সেই পশ্চিমা অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। যেখানে মানুষ থাকবে, ক্যারিয়ার থাকবে, অর্থ থাকবে — শুধু থাকবে না "পরিবার" নামক সেই একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়টি।
লাগামহীন স্বাধীনতা মানুষকে সাময়িক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজকে একটি বিশৃঙ্খল এবং নিরাপত্তাহীন খাঁচায় পরিণত করে।
কারো জীবনের ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকলে তার প্রতি আমাদের সমবেদনা। কিন্তু সেটাকে পাবলিক প্লেসে এনে চর্চা করলে যে সস্তা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ন্যারেটিভ তৈরি হতে পারে, যেটা আগামী প্রজন্মের জন্য বিপদজনক ম্যাসেজ দিতে পারে - সেটুকু কমনসেন্স কি এইসব সেলিব্রেটি ও সংবাদ প্রচারকারীদের কাছ থেকে আশা করতে পারিনা?
আমার মনে হয়, এসবের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজন। আমাদের মিডিয়া কাদেরকে সেলিব্রেটি বানাচ্ছে? আমরা কাদেরকে সেলিব্রেটি বানাচ্ছি? কার কথায় নিজেদেরকে প্রভাবিত করছি? - এগুলো ভাবাটা ভীষণ জরুরী।
নতুবা সামাজিক ক্ষয়ের চরম খেসারত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেতো দিতে হবেই, হয়তো আমরাও সেটার দাম চুকানো থেকে বাদ যাবো না।
মঙ্গল কামনায়,
গাজী মাজহার
ইয়োগা প্রোফেশনাল