24/08/2026
বয়স মাত্র ২৩। একটা পাবলিক ভার্সিটির শিক্ষার্থী। ক্লাস, এসাইনমেন্ট, টিউশনি, আড্ডা; বয়সের আর দশটা মেয়ের মতোই ব্যস্ত জীবন।
সমস্যার শুরুটা অনেক আগে, প্রায় তিন-চার বছর আগে। মাসিকের সময় তলপেটে এমন তীব্র ব্যথা হতো যে বিছানা থেকে উঠতে পারতো না। তখন এক বান্ধবীর পরামর্শে ফার্মেসি থেকে কিনে আনলো একটা ট্যাবলেট "কিটোরোলাক"। খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই যেন জাদুর মতো কাজ করে। ব্যথা একদম উধাও হয়ে যায়।
সেই থেকে এটাই হয়ে গেলো তার ব্যথার সময়ের সঙ্গী। মাসিকের ব্যথা, মাথাব্যথা, রাত জেগে পড়ার পর ঘাড় কোমরের ব্যথা, যেকোনো ব্যথাতেই এই একটা ট্যাবলেট। ফার্মেসি থেকেই সহজে পাওয়া যেতো। মাসে তিন-চারবার, কখনো তার চেয়েও বেশি।
শুরুর দিকে কিছুই টের পায়নি। মাঝেমধ্যে পেটে একটু জ্বালাপোড়া হতো, ভাবতো গ্যাসের সমস্যা, একটা গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ বা অ্যান্টাসিড খেয়ে নিতো। এভাবেই কেটে গেলো তিন-চারটা বছর।
কিন্তু একদিন হুট করেই সব ওলটপালট হয়ে গেলো।
টানা দুই দিন বমি হচ্ছিল, কিছুতেই থামছিলো না। সাথে বুকে-পেটে অসহ্য জ্বালাপোড়া, শরীর একদম নেতিয়ে পড়েছিলো। দেরি না করে তার রুমমেট তাকে নিয়ে গেলো হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে।
ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন খুঁটিনাটি প্রশ্ন। কবে থেকে সমস্যা, আগে থেকে কোনো ওষুধ খান কিনা। নাদিয়া প্রথমে একটু এড়িয়ে গেলো "মাঝেমধ্যে ব্যথার ওষুধ খাই, তেমন কিছু না।" ঠিক কতদিন ধরে, কতবার, কোন ওষুধ, এসব নিয়ে খোলাসা করে বলেনি প্রথমে। কারণ ওর মাথায়ই আসেনি যে এই "সাধারণ" ট্যাবলেটটার সাথে আজকের এই অবস্থার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে।
কিন্তু ডাক্তার যখন নাছোড়বান্দার মতো প্রশ্ন করে গেলেন "ঠিক কোন ওষুধ? দিনে কয়বার? এভাবে কতদিন ধরে চলছে?" তখন আস্তে আস্তে পুরো ছবিটা ক্লিয়ার হলো।
বিগত তিন-চার বছর ধরে প্রায় নিয়মিতই কিটোরোলাক খেয়ে যাচ্ছেন নাদিয়া, কোনো ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই।
রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়লো। সিরাম ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা স্বাভাবিকের অনেক গুণ বেশি। কিডনি ইতিমধ্যেই অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত। সাথে শ্বাসকষ্টও দেখা দিয়েছিলো দীর্ঘদিনের রক্তক্ষরণজনিত রক্তশূন্যতা আর কিডনি বিকল হয়ে শরীরে অ্যাসিড জমে যাওয়ার কারণে।
আসলে কী ঘটেছিলো নাদিয়ার শরীরে?
কিটোরোলাকের মতো ব্যথার ওষুধ (NSAID গ্রুপের) শরীরে প্রোস্টাগ্লান্ডিন নামের একটা কেমিক্যাল কমিয়ে দেয়, যেটা আসলে কিডনিতে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল বজায় রাখতে আর পাকস্থলীর ভেতরের লেয়ারকে অ্যাসিড থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
একবার খেলে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু ঘন ঘন খেলে কিডনির রক্তপ্রবাহ কমতে কমতে কিডনি বিকল হতে শুরু করে, আর পাকস্থলীর দেয়ালে ঘা তৈরি হয়ে সেই ঘা থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয় — যেটা থেকেই আসলে এই বমি আর জ্বালাপোড়া।
কিটোরোলাক মূলত অপারেশন পরবর্তী তীব্র ব্যথার জন্য অল্প কয়েকদিনের (সর্বোচ্চ ৫ দিন) ব্যবহারের ওষুধ হিসেবে ডাক্তাররা ব্যবহার করেন। নিয়মিত মাসিকের ব্যথা বা মাথাব্যথার জন্য বছরের পর বছর ব্যবহার করার ওষুধ এটা না।
মেয়েটাকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা শুরু হলো। কয়েক সপ্তাহের চিকিৎসার পর কিডনির অবস্থা কিছুটা উন্নতি হলো, কিন্তু ডাক্তার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন যতটুকু ক্ষতি হয়ে গেছে, তার পুরোটা হয়তো আর কখনো আগের মতো হবে না। বাকি জীবন নিয়মিত কিডনির পরীক্ষা করিয়ে যেতে হবে তাকে।
এই গল্প থেকে আমাদের কিছু জিনিস শেখার আছে
ব্যথা হলেই সহ্য না করে ওষুধ খেয়ে ফেলাটা স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু বারবার একই ব্যথানাশক খাওয়া মানে শুধু ব্যথাটাই কমালেন, আসলে এই ব্যথার পেছনের কারণ কি, শরীরে কি সমস্যা হচ্ছে সেই সমস্যাটাকে আড়াল করে রাখা, সমাধান করা না।
কিটোরোলাকের মতো শক্তিশালী ব্যথার ওষুধ স্বল্প সময়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দেওয়া হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া বারবার নিজে থেকে খাওয়া উচিত না।
মাসিকের সময় নিয়মিত তীব্র ব্যথা হওয়াটাকে "স্বাভাবিক" ধরে নিয়ে চেপে না গিয়ে, এর পেছনের আসল কারণ জানতে গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডাক্তারের কাছে নিজের ওষুধ খাওয়ার সত্যি কথা লুকানো নিজের জন্যই বিপজ্জনক। এতে সঠিক রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়ে যায়, ঠিক যেমনটা মেয়েটার ক্ষেত্রে প্রায় হয়েই যাচ্ছিলো।
পেটে দীর্ঘদিনের জ্বালাপোড়া, কালচে পায়খানা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা প্রস্রাব কমে যাওয়া এসব লক্ষণ ভুলেও উপেক্ষা না করে দ্রুত ডাক্তার দেখানো উচিত।
আপনার পরিচিত কারো মধ্যে যদি "ব্যথা হলেই ব্যথার ঔষুধ খাই" এই অভ্যাসটা থাকে, তাকে সাবধান করুন। যে হারে আমাদের দেশে কিডনী রোগী বাড়ছে তাতে ঘরে ঘরে এসব নিয়ে সচেতনতা ছাড়া আর উপায় নেই। আপনার একটা ছোট নলেজ হয়ত কারো কিডনি বাঁচিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে নিজের এলাকার পরিচিত ফার্মেসি দোকানদারদের সচেতন করুন যেন কারো কাছে প্রেস্ক্রিপশন ছাড়া এবং দীর্ঘমেয়াদে এসব ঔষধ বিক্রি না করেন।
সবাই সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।
মাইক্রোবায়োলজিস্ট, স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা ও ডিপ্লোমা চিকিৎসক
মোঃ পলাশ মিয়া
ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি.