25/09/2026
মাননীয় মন্ত্রী, মানুষ শুধু মুখের কথায় সব পেছনে ফেলে ফিরে আসবে না। সে আশা করাও ঠিক হবে না। আপনি কর্মক্ষেত্র তৈরি করুন, আপনাকে আর তাঁদের ডাকতে হবে না। ওনারা আপনা আপনি চলে আসবেন।
যা যা করা আপনার ক্ষমতার মধ্যে আছে, তার কয়েকটা উদাহরণ দেই।
এক.
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেশ-বিদেশে সকলের জন্য খুলে দিন। গবেষণা, পাবলিকেশন, পড়ানোর অভিজ্ঞতা আর ভবিষ্যৎ গবেষণার পরিকল্পনা দেখে নিয়োগ দিন। প্রার্থী কোন দল করেন, কার আত্মীয়, তাঁর হয়ে কে ফোন করলেন, এসব প্রশ্ন যেন সেখানে জায়গা না পায়।
আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ দলীয় বিবেচনা আর তদবিরের মাধ্যমে হয়, সেটা তো আপনার না জানার কথা না। বিদেশে দশ বছর গবেষণা করা একজন তরুণ যদি মনে করেন তাঁর সেই দশ বছর একটা রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে হেরে যাবে, তিনি কেন দেশে ফেরার ঝুঁকি নিবেন?
বেতন বিদেশের সমান করতে হবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে দুজনকে চিনি, যাঁরা অক্সফোর্ডে পড়াশোনা শেষে কেমব্রিজে পিএইচডি ও পোস্টডক করেছেন, এবং এখন দেশে ফিরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে যাচ্ছেন। ওনারা যুক্তরাজ্যের বেতনের আশায় ফিরছেন না। সম্মানজনক কাজের পরিবেশ পেলে মানুষ কম বেতনেও ফেরে। তবে বেতন অন্তত এতটুকু হতে হবে, যাতে সংসার চালাতে একজন শিক্ষককে তিন জায়গায় খণ্ডকালীন ক্লাস নিতে না হয়।
দুই.
গবেষণাকে শিক্ষকের মূল কাজ বানান, আর সেই কাজের জন্য ল্যাবে যথাযথ বরাদ্দ দিন। একজন দক্ষ সার্জনও ভোঁতা ছুরি হাতে ভালো অপারেশন করতে পারেন না। আমাদের ল্যাবগুলোর যে অবস্থা, তাতে একজন গবেষক যত মেধাবীই হোন, এমন অনেক কিছু তিনি আবিষ্কার করতে পারবেন না, যা ভালো সুবিধা পেলে পারতেন। বরাদ্দ দিন, গবেষকেরা প্রপোজাল লিখে ফেয়ার প্রসেসে সেখান থেকে ফান্ড পাবেন। সেই ফান্ড দিয়ে যাঁরা ভালো রিসার্চ আউটপুট দিতে পারবেন, নিয়োগে তাঁরা এগিয়ে থাকবেন।
তিন.
দেশে ফেরা গবেষকদের জন্য শুরুতে কিছু ফান্ড রাখুন। বাইরের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নতুন শিক্ষককে প্রথম কয়েক বছরের জন্য একটা স্টার্ট-আপ ফান্ড দেয়, যা দিয়ে তিনি ল্যাব সাজান, একজন রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট নেন। ফিরে এসে যদি প্রথম দুই বছর যন্ত্রপাতির পেছনে দৌড়াতেই চলে যায়, মানুষটা হতাশ হয়ে আবার বাইরে চলে যাবেন।
চার.
একজন গবেষক একা একা কিছু করতে পারেন না, তাঁর একটা দল লাগে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তিসহ পিএইচডি ও পোস্টডক পদ তৈরি করুন। তাহলে যিনি ফিরবেন তিনি একটা টিম গড়তে পারবেন, আর দেশে ভালো মানের পিএইচডি করার সুযোগ তৈরি হবে।
পাঁচ.
পদোন্নতির সময় কে কত সিনিয়র, তার চেয়ে কে কী কাজ করেছেন সেটা দেখুন। কে কত ভালো গবেষণা করলেন, কত ভালো পড়ালেন, কতজন শিক্ষার্থী তৈরি করলেন, এসব দেখে পদোন্নতি হলে মানুষ বুঝবেন এখানে পরিশ্রমের দাম আছে। আর ক্লাসের চাপ এমন রাখুন, যাতে গবেষণার সময়টুকু থাকে।
ছয়.
গবেষণার স্বাধীনতা নিশ্চিত করুন। গবেষণার ফল সরকারের পছন্দ না হলেও কোনো গবেষককে যেন হয়রানির ভয় পেতে না হয়। আর যতদিন শিক্ষক রাজনীতির দলীয় প্যানেল ঠিক করবে কে নিয়োগ পাবেন, কে পদোন্নতি পাবেন, কে প্রশাসনিক পদে বসবেন, ততদিন কোনো দল না করা মেধাবী মানুষ এখানে নিজেকে নিরাপদ ভাববেন না।
সাত.
যাঁরা এখনই ফিরতে পারছেন না, তাঁদেরও কাজে লাগান। ফেরা মানেই সব ছেড়ে একবারে চলে আসা না। ভিজিটিং প্রফেসর, জয়েন্ট অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কো-সুপারভাইজার, ছুটিতে এসে কয়েক মাস পড়ানো, এমন সুযোগ থাকলে বাইরে থেকেও তাঁরা দেশের কাজে লাগবেন। আর এই যোগাযোগ থেকেই অনেকে একদিন পুরোপুরি ফিরে আসবেন। ফেরার পথের ছোট ঝামেলাগুলোও দূর করুন।
আট.
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো না, আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীনেই আরও অনেক জায়গায় এই মানুষদের দরকার। কারিকুলাম আর পাঠ্যবই বানানো, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি ঠিক করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষানীতি তৈরি, এসব জায়গায় তাঁদের কম্পিট করার সুযোগ তৈরি করুন। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে স্পিনাউট কোম্পানি করার পথ সহজ করুন, যাতে গবেষকের আবিষ্কার রিয়াল লাইফে সমাধান নিয়ে আসে আর তিনি নিজেও তার একটা ন্যায্য শেয়ার পান। যেমন অক্সফোর্ডের কোভিড ভ্যাক্সিন আবিষ্কার থেকে Vaccitech কোম্পানি প্রতিষ্ঠা হয়। BioNTech প্রতিষ্ঠা হয় জার্মানির University of Mainz থেকে।
নয়.
বিদেশে থাকা মানুষ ফেরার আগে দেখেন, দেশে থাকা মানুষের কাজের দাম আছে কি না। দেশে যাঁরা আছেন তাঁদের মূল্য দিন, বাইরে যাঁরা আছেন তাঁরাও ফিরতে চাইবেন।
আহ্বানের জন্য ধন্যবাদ। তবে আপনার আহ্বান আন্তরিক কি না, তা বোঝা যাবে আপনি সুযোগ তৈরি করেন কি না, সেটা দেখে।