11/02/2026
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সাইকোলজি নিয়ে সবার মনেই একটা করে ধারণা আছে।
কেউ ভাবেন, আমরা মানুষের মন পড়তে পারি, কেউ ভাবেন বাস্তববুদ্ধি একেবারে লোপ পেলে সাইকোলজিস্টের কাছে গিয়ে লাভ নেই ("কারণ পাগল না হলে কেউ আর এখানে আসে নাকি!")।
আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মনস্তত্ত্ব নিয়ে মানুষের সবথেকে বড় মিথ হল, "আমাদের কাছে" তাদের যাবতীয় সমস্যার উত্তর আছে।
কেউ হয়ত শেষ দুই বছর ঠিকমত ঘুমাতে পারেননি, আমাদের মুহূর্তের মন্ত্রবলে প্রথম সেশনেই আমরা ঠিকঠিক কারণটা খুঁজে পেয়ে যাব।
কারোর হয়ত, যে কারণেই হোক, তার বাড়ির লোকেদের সাথে একেবারে বনিবনা হচ্ছে না। কারোর বা লং-টার্ম পার্টনার হঠাৎ ছেড়ে চলে গেছে। কারোর কাছে চাকরির দৈনন্দিন রুটিন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
"কিন্তু, কেন?"
এই উত্তর যেন আমাদের দরজায় হাজিরা দিলেই জানতে পারা যাবে।
ব্যাপারটা হল, ধরুন আপনি ট্রেনে করে বেড়াতে যাচ্ছেন, সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন হন্তদন্ত হয়ে আপনার কামরায় এসে আপনারকে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, আমার চাবিটা কোথায় রেখেছি বলতে পারবেন?"
আসলে, আমাদের কাছে আপনার উত্তর নেই।
আমাদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে কিছু জ্ঞান আছে, অভিজ্ঞতা আছে।
হ্যাঁ, আমরা একদিনে হয়ত ডায়াগনোসিস করতে পারি।
বলে দিতে পারি আপনার কতটা ডিপ্রেশন রয়েছে, আপনার ওসিডিটা হয়ত অনেকটা জেনেটিক। আপনার অ্যাংজাইটি কমানোর কিছু উপায়ও বলে দিতে পারি।
কিন্তু আপনার জীবন কোন খাতে কেন এতদিন বয়ে এসেছে- আমাদের কোনো ধারণা নেই।
তা আছে স্রেফ আপনার কাছে।
আমরা কাউন্সেলিং সেশনে প্রধানত যেটা করি, আপনাদের কথা শুনি।
এবং, আপনাদের স্পেস দিই।
নিজেদের কথা বলার।
সেইগুলো কথা নিজে শোনার।
এই দ্বিতীয় পয়েন্টটা খুব প্রয়োজনীয়।
রোজকার জীবনে আমরা হয়ত সবাই নিজেদের কথা খুব বেশি ভাবি না।
ভাবলেও, নিজেদের আবেগগুলো, নিজস্ব ন্যারেটিভ গুলোই মনে মনে আওড়ে যাই।
বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের কাছে যদি কখনো আমাদের সমস্যা শেয়ারও করি, আমরা মূলত ভ্যালিডেশন চাই। বা অবশ্যই, তারা তাদের ভার্শন, তাদের নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের ঘটনাগুলোকে দেখে।
কিন্তু আমরা চেষ্টা করি, সামনের জন যাতে বুঝতে পারে, তার কথা শোনার মত কেউ আছে। তার কষ্টকে কমিয়ে দেখছি না, পুরোপুরি অস্বীকার করছি না- তার সমস্যাটা, অসুবিধাটা গুরুত্ব পাচ্ছে আমাদের কাছে।
বরং তাদের কথাটা মন দিয়ে শুনছি। কেউ যদি আমাদের কাছে এসে একটানা ৩টে কি ৫টা সেশন ধরে কেবল তাঁদের কথাই বলে যান, আমরা চেষ্টা করব তাঁদের সব কথাই মন দিয়ে শোনার। কিছু কিছু প্রশ্ন করব, এনকারেজ করব তাঁদের কথা শেয়ার করার জন্য।
এবং তখনই, তাঁদের নিজেদের উত্তর তাঁরা শুনতে শুরু করবেন। তাঁদের কোন চিন্তাভাবনা এখনো কুড়ি বছর আগেকার একটা ঘটনা দিয়ে চালিত হচ্ছে, কোন বিশ্বাসটা একেবারেই আবেগতাড়িত।
অনেক ক্লায়েন্ট নিজের কথা শুনে মাঝেমাঝে নিজেই অবাক হয়ে যান। আমাদের কোনো প্রশ্নের যে উত্তর ওনাদের কাছে আছে- তা শুনে নিজেই চমকে ওঠেন। এমন কোনো ঘটনা মনে পড়ে যায়, এমন কিছু বিষয়ের সাথে ওনাদের এখনকার মানসিক অবস্থার লিংক করতে পারেন- যার ফলে নিজেদেরই নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করেন।
অবশ্যই, আমরা মানুষের মন ও মস্তিষ্ক নিয়ে বিভিন্ন তথ্য শেয়ার করি, বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে ওনাদের নেশ কিছু বিষয় বুঝতে সাহায্য করে থাকি।
এমনকি বেশ কিছু সম্ভাব্য উত্তরও শেয়ার করতে পারি।
কিন্তু ক্লায়েন্টদের জীবনের জ্যান্ত উত্তর আমাদের কাছে থাকে না, তা থাকে ওনাদের কাছেই। কাউন্সেলিং সেশনে এসে ওনারা শুরু সেগুলো খুঁজে পান আমাদের সাথে কাজ করে।
আসলে, চারপাশে এত ব্যস্ততার মধ্যে আমরা নিজেদের কথা শোনার সময় সবসময় পাই না। বা, নিজে যে সত্যিগুলো মন থেকে জানি, সেগুলোকে সবসময় স্বীকার করে উঠতে পারি না- লজ্জা, ভয়, মরাল অবলিগেশনের মত বহু বাধা আমাদের সহজ সত্যিটাকে সহজে নিতে দেয় না।
আর, সেইখানেই অনেকসময় দরকার হয়ে ওথে একজন মনোবিদের।
"আমাদের কাছে" আপনাদের উত্তর সবসময় থাকে না।
কিন্তু "আমাদের কাছে এসে" আপনারা নিজেদের উত্তর নিজেদের মত করে খুঁজে পেয়ে যেতে পারেন।
আপনারা নিজেদের জীবনে কার কাছে "heard" ফিল করেন? কার কাছে উজাড় করে মনে কথা বলে হাল্কা বোধ করেন?
কমেন্ট সেকশনে তাদের ট্যাগ করতে ভুলবেন না।
সাইকোলজি নয়ে এরকম বিভিন্ন তথ্যের ও আলোচনার জন্য ফলো করুন এই পেজটি।
শ্রীজিতা সোম
- MA, Clinical Psychology
Contact: 093309 01127