06/01/2026
★ "প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং প্রতিষ্ঠাতা"
- স্বাবলম্বনের মূর্ত্ত-প্রতীক, অযাচক আশ্রম-প্রতিষ্ঠাতা অভিক্ষু-সন্ন্যাসী শিক্ষাবিদ শ্রীশ্রীস্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব শিক্ষার জগতে এক নূতন আলোকবর্তিকা নিয়ে আবির্ভূত হ'লেন।
- তিনি বিহারের ধানবাদ জেলার পুপুনকী গ্রামে প্রতিষ্ঠা করলেন এক নূতন শিক্ষায়তন 'দি-মালটিভারসিটি', যার মূল ভিত্তি হ'ল অভিক্ষা, স্বাবলম্বন, ত্যাগ, চরিত্রবত্তা এবং সংযম।
- এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হ'ল চরিত্র-গঠন; "Character building is the guiding principle of this institution"।
- শিক্ষার্থীদের এক পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপে গড়ে তোলার কারখানা হল 'দি-মালটিভারসিটি বা স্বাবলম্বী বিদ্যাপীঠ'।
- কর্মভিত্তিক শিক্ষার সার্থক রূপায়ণ ঘটালেন শ্রীশ্রীবাবামনি।
- তাঁর জীবনের প্রায় ৪০-৪৫ বৎসর কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা অর্দ্ধাহারে, অল্পাহারে, অনাহারে থেকে তিল তিল রক্তবিন্দু ক্ষয় ক'রে প্রতিষ্ঠা করলেন তাঁর সাধের প্রতিষ্ঠান।
- সম্পূর্ণ ভারতীয় ঋষি-জীবনের শিক্ষার নবতর রূপায়ণ ঘটাতে চাইলেন এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
- দেশ যখন চরিত্রহীনতার পঙ্কিলতায় নিমজ্জমান, সেই পতনোন্মুখ জাতিকে নূতন পথ-নির্দেশ করার জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন এই 'শিক্ষায়তন'।
★ "প্রতিষ্ঠা এবং উদ্বোধন"
- ইং ১৯৭৪ সালের ১লা জানুয়ারী ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ৬০ জন ছাত্রকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ গড়ার কারখানার দ্বারোদঘাটন করলেন।
- উদ্বোধন-অনুষ্ঠানে পরমপুজ্যপাদ শ্রীশ্রীবাবামণি, পুজনীয়া মা (ব্রহ্মচারিণী সাধনা দেবী), পরমপূজনীয়া শ্রীশ্রীমামনি তাঁদের অমূল্য, ঐতিহাসিক অমৃতময়ী উপদেশ-বাণী প্রদান করেন।
- কি ভাবে চললে শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ মানুষ-রূপে গড়ে উঠতে পারে এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পথনির্দেশ করলেন।
- পূজনীয়া ভাইদা (ব্রহ্মচারী স্নেহময়), ব্রহ্মচারী প্রেমাঞ্জনদা, ব্রহ্মচারী সদাসুন্দরদা, অন্যান্য আশ্রম-কর্মী, বহু সজ্জন ব্যক্তি এবং ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত বহু অখণ্ড ও বিশিষ্ট সংগঠন-কর্মীর উপস্থিতিতে এই শুভ অনুষ্ঠান আলোকোজ্জ্বল হ'য়ে উঠে।
★ "শিক্ষক বৃন্দ এবং প্রাথমিক কার্যকলাপ"
- এই বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক হিসাবে বাঁকুড়া জেলার স্বনামধন্য স্বাধীনতা-সংগ্রামী শ্রীফকির চন্দ্র বটব্যাল মহোদয় এবং সহকারী শিক্ষক-রূপে চারজন যোগদান করেছিলেন।
- স্বাবলম্বী বিদ্যাপীঠ আরম্ভ হওয়ার ৪-৫ দিন পর থেকেই আরম্ভ হয় শ্রীশ্রীবাবামণিকে নিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের আনন্দের হাট।
- প্রায় প্রতিদিনই ছাত্র এবং শিক্ষকমহাশয়গণ শ্রীশ্রীবাবামণির উপস্থিতিতে করেছেন শ্রমদান।
- শ্রীশ্রীবাবামণি ছাত্রদের নিয়ে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামে বেড়াতে যেতেন এবং সেখানে হরিওঁ কীর্ত্তন এবং অখণ্ড-সংহিতা পাঠ হতো।
★ "দৈনন্দিন রুটিন এবং শিক্ষা-অনুষ্ঠান"
- সকাল সন্ধ্যায় উপাসনায় যোগদান, আসনমুদ্রা, দিনলিপি লিখা, অখণ্ড-সংহিতা পাঠ, এই অনুষ্ঠানগুলিতে ছাত্রদের যোগদান ছিল বাধ্যকর।
- শ্রীশ্রীবাবামণি নিজে ছাত্র ও শিক্ষকদের সমবেত উপাসনার শুদ্ধত্বর শিক্ষা দিতেন এবং প্রদান করতেন তাঁর অমৃতময় উপদেশবাণী।
- শ্রীশ্রীবাবামণির সান্নিধ্যে ছাত্র ও শিক্ষকদের চরিত্র-সুগঠিত হ'তে থাকে।
★ "প্রিন্টিং প্রেস এবং দক্ষতা উন্নয়ন"
- ১৯৭৫ সালে পুপুন্কী আশ্রমে প্রিন্টিং-প্রেস্ চালু হয়।
- ছাত্ররা শিখতে আরম্ভ করে প্রেসের কাজ; ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে ছাত্ররা প্রিন্টিংএর কাজগুলি শিখতে আরম্ভ করে।
- এদের মধ্যে ২-৩ বৎসরের মধ্যে কয়েক জন ছাত্র বিশেষ দক্ষতা লাভ করে।
★ "ভাষণ শিক্ষা এবং প্রচার কার্যকলাপ"
- ১৯৭৫ সালেই শ্রীশ্রীবাবামনির নির্দেশে স্বাবলম্বী বিদ্যাপীঠে শুরু হয় ভাষণ শিক্ষার ক্লাস।
- তিনি বলেছিলেন, "আমার এখান থেকে ছাত্ররা 'লাল-বাল-পাল' হ'য়ে বেরুবে। প্রত্যেকটি ছাত্র ডিনামাইট হ'য়ে বেরুবে।" (লাল = লালা লাজপত রায়, বাল = বাল গঙ্গাধর তিলক, পাল = বঙ্কিম চন্দ্র পাল)।
- শ্রীশ্রীবাবামণি নিজে উপস্থিত থেকে ছাত্রদের ভাষণ-দানের কৌশল শিক্ষা দিতেন; শিক্ষা দিতেন স্বয়ং 'কবিতা-লিখন কৌশল'।
- এর ফলে ছাত্রদের মধ্যে গভীর উৎসাহের সঞ্চার হয়।
- ছাত্ররা ভাষণ দান এমন ভাবে আয়ত্ত করেছিল যে, বিভিন্ন জায়গার অখণ্ডমণ্ডলীর আমন্ত্রণে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য (বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ প্রভৃতি) শত শত সভায় শ্রীশ্রীবাবামণির অমৃতময় উপদেশ-বাণী ভাষণের মাধ্যমে প্রচার করে এবং সুনাম অর্জন করে।
- একমাত্র শ্রীশ্রীবাবামণির আশীর্ব্বাদেই এই দুরূহ কাজ সম্ভব হয়েছে।
- প্রতিটি জায়গার শ্রোতৃমণ্ডলী ছাত্রদের ভূয়সী প্রণংসা করেন এবং বর্তমান দিনে চরিত্র-গঠন-আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।
★ "শিক্ষাদান প্রণালী এবং একাডেমিক অর্জন"
- বিদ্যায়তনের শিক্ষাদান প্রণালীও বিশেষ-ভাবে উল্লেখযোগ্য; শিক্ষক মহাশয়দের সুচারু শিক্ষাদান পদ্ধতি দ্বারা ছাত্ররা বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে সাফল্য অর্জন করল।
- গত ইংরাজী ১৯৮০ সালে প্রথম আমাদের দশ জন ছাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়; দশ জন পরীক্ষার্থীই ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়; প্রত্যেকে ২-১টি বিষয়ে Star-Mark পায়।
- ছাত্রদের এই সাফল্যের সংবাদ পেয়ে গুরুধামে শ্রীশ্রীবাবামণি আনন্দাশ্রু বিসর্জন করেছেন এবং পূজনীয়া মা, পরম-পূজনীয়া মামণি ও অন্যান্য সকল আশ্রম-কর্মীদের আনন্দের অবধি ছিল না।
- ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ এই চার বৎসরের মধ্যে প্রতি বৎসরই আমাদের শিক্ষায়তনের ছাত্ররা মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হ'য়ে আসছে; উল্লেখ্য যে কোন কোন বৎসর ২-১ জন ছাত্র দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে।
- ১৯৮৪তে ১১ জন পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কেবল মাত্র একজন পরীক্ষার্থী দ্বিতীয় বিভাগে এবং বাকী ১০ জনই প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়।
- তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার একটি ছাত্র শ্রীতীর্থাশীষ মণ্ডল ৮৪০ নম্বর পায়।
- এই প্রতিষ্ঠানের Academic দিক্ বিচার করলে এই বিদ্যাপীঠ সারা বিহারে তুলনামূলক ভাবে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী।
- শিক্ষক মহাশয়দের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং সর্ব্বোপরি শ্রীশ্রীবাবামণির আশীর্বাদে এই কাজ সম্ভব হয়েছে; এর পিছনে ছাত্রদের নৈতিক শিক্ষারও যথেষ্ট অবদান রয়েছে।
★ "খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ"
- বিদ্যাপীঠের ছাত্ররা পড়াশুনাতে কৃতিত্ব প্রদর্শন ছাড়াও খেলা-ধূলাতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে।
- বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠানে (Annual Sports), বিভিন্ন খেলায় (ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট প্রভৃতিতে) ছাত্ররা অংশ গ্রহণ করে এবং কৃতিত্ব অর্জন করে; যাহারা কৃতিত্বের অধিকারী হয়, প্রত্যেককে পুরষ্কৃত করা হয়।
- ১৯৮০ এবং ১৯৮২ সালে বিদ্যাপীঠের পক্ষ থেকে Football প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল; এই প্রতিযোগিতায় পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি অংশ গ্রহণ করেছিল।
- ১৯৮৪ ইং সালে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে (পুপুন্কী, কালাপাথর, শিয়ালগাজরা, মুদিডী) বিদ্যাপীঠের ছাত্ররা খেলায় অংশ গ্রহণ করে এবং ২-৩ জন ছাত্র Best player হিসাবে পুরস্কৃত হয়।
- আশ্রমের মধ্যে ৩/৪ বার ভলিবল প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়, তাতে পুপুনকী, চাশ প্রভৃতি জায়গা থেকে ছেলেরা এই খেলায় অংশ গ্রহণ করে।
- খেলাধূলার মাধ্যমে গ্রামগুলির সঙ্গে আন্তরিক সৌহৃদ্য ও প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তোলাই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য।
- বিদ্যাপীঠে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্ররা সবাই যোগদান করে; শিক্ষক মহাশয়রাও এই বিষয়ে ছাত্রদের উৎসাহিত করেন।
★ "কৃষি এবং শ্রমদান"
- কৃষি-বিজ্ঞানী শ্রীশ্রীবাবামণির নির্দ্দেশে বিদ্যাপীঠের ছাত্ররা মঙ্গলবাঁধ নির্ম্মাণ-কার্য্য, ফুলবাগানে এবং কৃষিক্ষেত্রে শ্রমদান করত।
- এবং শ্রমদানকালীন পূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবাবামণির কৃষি-সংক্রান্ত বিভিন্ন উপদেশ শ্রবণ করত; শিক্ষক মহাশয়রাও এই শ্রমদানে যোগ দিতেন।
- বর্তমানেও সেই কাজ অব্যাহত রয়েছে।
★ "শ্রীশ্রীবাবামণির সঙ্গ এবং পরিবারের ভূমিকা"
- পুপুন্কী স্বাবলম্বী বিদ্যাপীঠে শ্রীশ্রীবাবামণির সঙ্গ প্রায় পাঁচ বৎসর ধরে বিদ্যার্থীরা পেয়েছে; তাই, তখন বিদ্যাপীঠে আনন্দ ও উৎসাহের ঘাটতি ছিল না।
- শ্রীশ্রীবাবামনি যখন আশ্রমে থাক্তেন না, তখন পত্র লিখে ছাত্র ও শিক্ষকদের উৎসাহিত করতেন।
- গত ৪ঠা ডিসেম্বর আমাদের পরমপূজনীয়া মা (ব্রহ্মচারিণী সাধনা দেভী) এবং ৭ই ডিসেম্বর, ১৯৮৪ ইং পরমপূজনীয়া শ্রীশ্রীমামণি পুপুন্কীতে শুভাগমন করেছেন।
- তাঁদের প্রেরণায় ও উৎসাহে সকলের মনে এক নূতন আশার সঞ্চার হয়েছে।
- শ্রীশ্রীমামণি প্রায় প্রতিদিনই খাওয়ার সময় ঘুরে ঘুরে দেখেন।
- শ্রীশ্রীমামণির আগমনে আশ্রমের রূপ সম্পূর্ণ পরিবর্ত্তিত হয়ে গেছে।
- শ্রীশ্রীমামণির নির্দ্দেশ ছাত্ররা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে; শিক্ষক মশাইরা শ্রীশ্রীমামণির প্রতি এত অনুগত যে, ভাবতেও আনন্দ বোধ হয়।
- শুধু অনুগতই নন, তাঁরা শ্রীশ্রীমামণিকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসেন এবং শ্রদ্ধা করেন।
- শ্রীশ্রীমামণি এখন মালটিভারসিটির বিভিন্ন কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
- শ্রীশ্রীমামণির প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা ও ভক্তি আছে।
- তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায় এবং সুদৃঢ় হস্তক্ষেপে মালটিভারসিটি ভারতবর্ষের একটি শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।
★ "উপসংহার এবং প্রার্থনা"
- সর্ব্বশেষে পরমপুজ্যপাদ শ্রীশ্রীবাবামণির রতুল-চরণে আমাদের ভক্তিপ্লুত প্রণাম জানাই।
- পরমারাধ্য শ্রীশ্রীবাবামণির আশীর্ব্বাদে আমাদের অগ্রগতি অপ্রতিহত থাকুক-ইহাই আমাদের একমাত্র প্রার্থনা।
- ("স্বাবলম্বী বিদ্যাপীঠ" প্রতিধ্বনি পৌষ ১৩৯১, পৃঃ ৭৯৪-৭৯৯)।
© Copy Post .....